21/03/2025
নূরনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, হে আলী ! খুব শীঘ্রই আমার পর এই উম্মত তোমার প্রতি অবাধ্যতা প্রকাশ করবে । আর তুমি আমার পথ অনুসরণ করবে এবং (যেহেতু) তুমি আমার সুন্নাত প্রচার করবে, তাই তোমাকেও শহীদ করা হবে ।
হে আলী ! যে তোমাকে ভালোবাসে সে আমাকেও ভালোবাসে । আর যে তোমাকে হিংসা করবে সে আমাকেও হিংসা করবে । তারপর মাথা ও চুলের দিকে তাকিয়ে বল্লেনঃ আর এই (পবিত্র দাঁড়ি ও এই মাথা) রক্তে রঞ্জিত হবে ।
৪০ হিজরির ১৯শে রমজানের বেদনাদায়ক রাতে মাওলায়ে মুত্তাকিয়ান, আমিরুল মোমেনীন, ইমামে আযম, শেরে খোদা মাওলা আলী (আঃ) কে আঘাত করা হয় ।
মাওলা আলী (আঃ) মসজিদে প্রবেশ করলেন এবং উপস্থিত মুয়াজ্জিন কে বললেন, "আজ তোমার পরিবর্তে আমি আযান দিব" । মাওলা আলী (আঃ) আযানের প্রথম ধ্বনি উচ্চারণ করলেন, "আল্লাহু আকবর" এই ধ্বনি সকলের কানে এমন ভাবে গেল, যেন কোনো বিষাদ বেদনার ইঙ্গিত । আযানের শব্দ কন্যাদের গৃহেও পৌঁছে, তারা বলে "বাবার কন্ঠে আজ কতো বেদনার বহিঃপ্রকাশ!"
ইমাম নামায শুরু করে কিরাআতের পরে সিজদায় গেলেন । এমন সময় ইবনে মুলজেম ইমাম (আঃ) এর পবিত্র শির মোবারকের ওপর বিষাক্ত তলোয়ারের আঘাত হানলো ।
সেই আঘাতের সাথে এই আঘাত গভিরতা মিলে মাওলার পবিত্র মস্তক কপাল পর্যন্ত ফেটে যায় । মাথার দুই-তৃতীয়াংশ ফেটে যায় । ইমাম আলী (আঃ) সিজদারত থাকাকালে ইবনে মুলজেম তার পবিত্র মস্তকে আঘাত হানে, মাথার পিছন ভাগে একেবারেই ভারী তলোয়ার টি ঢুকে যায় ।
মেহরাবের মধ্যে মাওলা আলী (আঃ) এর মাথা থেকে রক্ত প্রবাহিত হলো এবং তাতে তাঁর পবিত্র দাড়ি রঞ্জিত হয়ে উঠলো । এ অবস্থায় ইমাম (আঃ) বললেন-
[ফুজতো বে রাব্বিল কা'বা]
“কা’বার রবের শপথ, আমি বিজয়ী হয়েছি।”
অতঃপর তিনি এ আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন- আমাদেরকে এ (মাটি) থেকে সৃষ্টি করেছি, এতেই আবার আমাদেরকে প্রত্যাবর্তন ঘটাবো । আর পুনরায় এ থেকেই আমাদেরকে উথিত করবো ।
মসজিদ থেকে এমন ভাবে উনাকে শোয়ানো অবস্থায় বের করা হলো যেন কোনো লাশ বের হচ্ছে । সকল মুসল্লিদের ভীর কান্নাকাটি মাওলা আলী (আঃ) এর দু'হাত ইমাম হাসান (আঃ) ও ইমাম হুসাইন(আঃ) এবং দু'পা দুইপুত্র আব্বাস (আঃ) ও মুহাম্মাদ হানাফিয়া (আঃ) ধরে ঘরের দিকে দ্রুত অগ্রসর হতে লাগলেন । মাওলা আলী (আঃ) আহত অবস্থায় বলতে লাগলেন পিছনে যারা যাচ্ছিলেন তাদেরকে, "আমার একটি অনুরোধ আমার পিছে তোমরা এসোনা, আমাকে আমার পুত্রদের সাথে যেতে দাও, আমার গৃহের দরজার থেকে আমার কন্যাদের কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে, আমি চাইনা ওদের আওয়াজ তোমাদের কানে যাক" ।
ইমামের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে কেউ আর উনার সাথে ঘর পর্যন্ত গেলো না, শুধু ইমামদ্বয় ও উনার পুত্ররা উনাকে নিয়ে দরজায় পৌছলেন । শাহজাদী যাইনাব (আঃ) ও উম্মে কুলসুম (আঃ) তাদের বাবা আলী-এ-মুরতাযা (আঃ) কে দেখলেন রক্তে ডুবা ও ভাই হাসান-হুসাইন (আঃ) দেখলেন রক্তভেজা জামায় দরজায় এসেছেন । বনি হাশিমের সকলেই উচ্চারণ করছিলেন, "আল্লাহর কসম, আজ হেদায়েতের স্তম্ভ ভেঙে গেলো" (তা'হাদদা বাদ ওয়াল্লাহ আরকানিল হুদা)
ইমাম (আঃ) কে বিছানায় শোয়ানোর জন্য সবাই চেষ্টা করল কিন্তু ইমাম (আঃ) বললেন, "আমাকে মাটিতে একটি মাদুরের উপর শুইয়ে দাও" । মাওলার রক্তের প্রবাহ এমনি বেশি হয়েছিল যে, ইমাম হাসান-হুসাইন (আঃ) এর দেহও রক্তে ডুবে গিয়েছিল । মাওলা আলী (আঃ) এর পবিত্র চেহারা মুবারাক কে বার বার পরিষ্কার করা হচ্ছিলো কিন্তু তাও রক্তাক্ত হয়ে যাচ্ছিলো ।
ইমাম আলী (আঃ) বার বার শুধু বলছিলেন, "আমার মাথার উপর চাদর দ্বারা আবৃত করো, আমার কন্যাদের দৃষ্টির বাইরে রাখো" । ইমাম হাসান (আঃ) তাঁর জখম কে ভালোভাবে দেখতে চাইলে তিনি বলেন, "এটাকে দৃষ্টিভরে দেখো না প্রিয়পুত্র! তোমার সহ্য হবেনা" । মাওলা আলী (আঃ) প্রত্যেকবার নিজের ছেলেদের মাথায় হাত রেখে বলছিলেন, "সবর করো, ঘাবড়ে যেও না, আমি আছি" । শাহজাদী যাইনাব (আঃ) ও উম্মে কুলসুম (আঃ) শুধু বার বার তাদের ভাই আব্বাস (আঃ) কে জিজ্ঞেস করছেন, "আমার বাবাজান বেঁচে যাবেন তো ? আমাদেরকে একটু কাছে যেতে দিন!"
মাওলা আলী (আঃ) নিজের চক্ষুদ্বয় বন্ধ করছেন আর খুলছেন, চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে কিন্তু রক্তের সাথে তা মিশে যাচ্ছে । শাহজাদীদেরকে বাবা আলীর মাথার কেটে যাওয়া সেই পাগড়ি দেওয়া হলো, তারা সেটাকে ধরে বিলাপ করতে লাগলেন ! "হায় আমার বাবার কি অপরাধ ছিলো, আমরা এখনও মা ফাতিমার শাহাদাত জ্বলন্ত দরজাকে ভুলতে পারিনি আর এখন আমার বাবা কে এইভাবে উম্মতেরা নির্যাতন করলো!"
মাত্র কয়েকদিন পর ঈদুল ফিতর আর এই গৃহে হয়ে গেলো মহান পিতার উপর নিকৃষ্ট আচরণ, ইমামের পুত্র - কন্যারা আর্তনাদ করছে, মুমিনেরা তাদের আমীরুল মুমিনীন কে বিদায় দিবে!
৩ দিনান্তে ২১শে রমযান মাওলা আলী আমীরুল মুমিনীন (আঃ) নিজের পরিবার সহ সমস্ত ভক্তদের কে বিদায় দেন ও শাহাদাত বরণ করেন ।
আল্লাহুম্মা লা আন কাতালাতা আমিরুল মোমেনিন
আস-সালামু আলাইকা ইয়া শাহিদ-এ-কুফা
আস-সালামু আলাইকা ইয়া আমীরুল মুমিনীন (আঃ)
সেইসাথে ইবনে মুলজিমের উপরে লা’নত
মাওলার হত্যার চক্রান্তকারীদের উপর লা'নত
বেশুমার! বেশুমার! বেশুমার! বেশুমার! বেশুমার!