05/09/2026
মুর্শিদ বা পথপ্রদর্শকের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে আমাদের প্রতিদিনের নামাজের দিকে তাকালেই তা স্পষ্ট হয়ে যায়। আমরা প্রতিদিন প্রতিটি নামাজে আল্লাহর কাছে একটি বিশেষ দোয়া অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে করি:
اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ
“আমাদেরকে সরল সঠিক পথ দেখাও।”
(সূরা আল-ফাতিহা: ৬)
নামাজের এই প্রধান দোয়ায় সরল পথ বা ‘সিরাতাল মুস্তাকিম’ চাওয়ার ঠিক পরের আয়াতেই আল্লাহ তাআলা এই পথের বাস্তব পরিচয় ও সংজ্ঞা দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা কোনো বিমূর্ত ধারণা বা শুধু বই পড়ে পথ চেনার কথা বলেননি, বরং তিনি এই পথকে সুনির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিবর্গের সাথে সম্পর্কিত করে দিয়েছেন। আল্লাহ এরশাদ করেন:
صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ
“তাদের পথ, যাদের প্রতি আপনি অনুগ্রহ করেছেন।”
(সূরা আল-ফাতিহা: ৭)
পবিত্র কুরআনের অন্য আয়াতে এই অনুগ্রহপ্রাপ্ত ও ধন্য দলটির পরিচয় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে:
مِّنَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ ۚ وَحَسُنَ أُولَٰئِكَ رَفِيقًا
“(তারা হলেন) নবীগণ, সিদ্দিকীন (সত্যনিষ্ঠগণ), শহীদগণ এবং সালেহীন (সৎকর্মপরায়ণ আল্লাহওয়ালা বান্দাগণ)। আর সঙ্গী হিসেবে তারা কতই না চমৎকার!”
(সূরা আন-নিসা: ৬৯)
এই আয়াতসমূহ থেকে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, আল্লাহর কাছে সঠিক পথ পাওয়ার দোয়ার অর্থই হলো আল্লাহওয়ালা মানুষদের সান্নিধ্য ও পথনির্দেশনা পাওয়া। কারণ পথ কোনো ফাঁকা রাস্তা নয়, পথ চেনা যায় পথিকের পদাঙ্ক অনুসরণ করে। নবীগণের পর এই পৃথিবীতে ‘সিদ্দিকীন’ ও ‘সালেহীন’ তথা কামেল মুর্শিদ ও ওলী-আউলিয়াগণই হলেন সেই ধন্য কাফেলার প্রতিনিধি। তাঁদের হাত ধরাই মূলত ‘সিরাতাল মুস্তাকিম’-এ পথ চলার বাস্তব রূপ।
শরীয়তের দৃষ্টিতে আত্মশুদ্ধি অর্জন করা ফরজে আইন বা প্রত্যেকের জন্য আবশ্যিক কর্তব্য। কারণ কলব বা অন্তর যদি কলুষিত থাকে, তবে বাহ্যিক ইবাদত আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। আর এই আত্মিক ব্যাধির সুচিকিৎসার জন্যই একজন আধ্যাত্মিক চিকিৎসকের প্রয়োজন, যাকে পরিভাষায় পীর বা মুর্শিদ বলা হয়।
১. আল-কুরআনের আরও কিছু আলোকপাত
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন আয়াতে সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে কামেল ওলীদের সাহচর্য গ্রহণ এবং তাঁদের অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের (সাদিকীন) সঙ্গী হও।”
(সূরা আত-তাওবা: ১১৯)
এখানে আল্লাহ তাআলা শুধু তাকওয়া অর্জনের নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং তাকওয়া ধরে রাখার জন্য ‘সাদিকীন’ বা সত্যবাদী আল্লাহর ওলীদের সাথে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন:
وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَيَّ
“এবং তুমি তার পথ অনুসরণ করো, যে আমার অভিমুখী হয়েছে।”
(সূরা লুকমান: ১৫)
২. সুন্নাহ ও আসারে সাহাবা
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন এবং সাহাবায়ে কেরামের গঠনপদ্ধতি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ইসলাম শুধু কিতাব পড়ার ধর্ম নয়; এটি মূলত ‘সোহবত’ বা সাহচর্যের ধর্ম।
রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন:
الْمَرْءُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ
“মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের অনুসারী হয়। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকেরই লক্ষ্য করা উচিত, সে কার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করছে।”
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৮৩৩)
সাহাবায়ে কেরামের আদর্শ: সাহাবায়ে কেরাম (রা.) শুধু ইসলামের বিধানগুলো জেনে নিয়ে ঘরে বসে যাননি। তাঁরা বছরের পর বছর আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর পবিত্র সোহবতে থেকে নিজেদের চরিত্র গঠন করেছেন। কিতাব বা লিখিত কোনো কপির মাধ্যমে নয়, বরং নবীজির পবিত্র নূরানী চেহারা, তাঁর ওঠাবসা এবং সামগ্রিক আচরণের প্রতিচ্ছবি ধারণ করেই তাঁরা ‘সাহাবী’ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন।
পীর-মুরিদীর এই ধারা মূলত রাসূল (সা.) ও সাহাবাদের সেই সোহবতের ধারারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।
৩. উম্মতের ইজমা বা ঐকমত্য
ইসলামের ইতিহাসে চার মাযহাবের ইমামগণ, মুহাদ্দিসীন, মুফাসসিরীন এবং বড় বড় ফকীহগণ একমত হয়েছেন যে, অন্তরের ব্যাধি দূর করার জন্য একজন কামেল শায়খের তত্ত্বাবধান অত্যন্ত জরুরি।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.): তাঁর জীবনের শেষ দুই বছর সম্পর্কে বিখ্যাত উক্তি রয়েছে:
“যদি শেষ দুই বছর আমি শায়খ (ইমাম জাফর সাদিক (আঃ)-এর সোহবত না পেতাম, তবে নোমান (আবু হানিফা) ধ্বংস হয়ে যেত।”
ইমাম শাফেয়ী (রহ.): তিনি সুফিদের সান্নিধ্যে গিয়ে বলেছিলেন:
“আমি সুফিদের সুহবতে থেকে দুটি মূল্যবান জিনিস শিখেছি—
১. সময় তরবারির মতো, তাকে ভালো কাজে না কাটলে সে তোমাকে কেটে ফেলবে (নষ্ট হবে)।
২. তোমার নফসকে যদি তুমি হকের কাজে ব্যস্ত না রাখো, তবে সে তোমাকে বাতিলের কাজে লিপ্ত করবে।”
ইমাম গাজালী (রহ.): তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘এহয়াউ উলুমিদ্দীন’-এ স্পষ্ট লিখেছেন যে, মানুষের নিজের দোষ নিজে ধরা কঠিন। তাই একজন আধ্যাত্মিক চিকিৎসকের (মুর্শিদ) কাছে গিয়ে নিজের নফসের ব্যাধিগুলোর চিকিৎসা করানো ওয়াজিব বা আবশ্যক।
৪. কিয়াস বা যৌক্তিক বিশ্লেষণ
মানুষের সাধারণ জীবনযাত্রার দিকে তাকালে কিয়াসের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়।
একজন মানুষ বাজার থেকে সব ধরনের চিকিৎসার বই কিনে ঘরে বসে তা মুখস্থ করলেই ডাক্তার হতে পারে না। তাকে অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের অধীনে হাসপাতালে থেকে প্র্যাক্টিক্যাল ইন্টার্নি করতে হয়। অন্যথায় তার ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে।
ঠিক তেমনি, একজন মানুষ কুরআন-হাদিসের অনুবাদ পড়ে হয়তো তথ্য জানতে পারবে, কিন্তু নামাজে কীভাবে মনোযোগ (খুশু-খুজু) আনতে হয়, কীভাবে রাগ দমন করতে হয়, কীভাবে অহংকার থেকে মুক্ত হতে হয়—তা কেবল একজন আধ্যাত্মিক শিক্ষকের প্র্যাক্টিক্যাল তত্ত্বাবধান ও ট্রেইনিংয়ের মাধ্যমেই শেখা সম্ভব।
নিজের বিচার-বুদ্ধি দিয়ে মনের ভেতরের সূক্ষ্ম অহংকার বা রিয়া ধরা সম্ভব নয়।
উপসংহার
অতএব, কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াসের আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—ইবাদত যেমন শরীয়তের বিধান অনুযায়ী পালন করা অপরিহার্য, তেমনি অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা এবং চরিত্রকে সংশোধন করাও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। আর এই আত্মশুদ্ধির পথে অভিজ্ঞ ও আল্লাহমুখী মানুষের সোহবত মানুষের জন্য সহায়ক ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
পীর বা মুর্শিদ কোনো নতুন ইবাদত বা নতুন শরীয়ত নিয়ে আসেন না। তাঁর ভূমিকা হলো শরীয়তের বিধান অনুসরণে মানুষকে সহযোগিতা করা, নিজের নফসের ত্রুটি চিনতে সাহায্য করা এবং আল্লাহর দিকে অগ্রসর হওয়ার পথে আত্মিক প্রশিক্ষণ ও সোহবতের মাধ্যমে মুরিদকে পরিচালিত করা।
সংকলন ও সম্পাদনা: Gulshan-e-Chishty