19/05/2026
তাকলিদ: উৎস থেকে বর্তমান (একটি সারগর্ভ ঐতিহাসিক পর্যালোচনা)
ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় 'তাকলিদ' (تقليد) অর্থ হলো— কোনো দলীল বা প্রমাণ অনুসন্ধান না করেই দ্বীনি বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য মুজতাহিদ (ইসলামী আইনজ্ঞ)-এর সিদ্ধান্তকে মেনে চলা। সাধারণ মানুষের পক্ষে কোরআন ও হাদীস থেকে সরাসরি বিধি-বিধান বা ইজতিহাদ করা সম্ভব নয় বলেই তাকলিদের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। নবীজির জামানা থেকে আজ পর্যন্ত তাকলিদের রূপান্তর ও এর ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা নিচে আলোচনা করা হলো:
১. নবীজি ও সাহাবায়ে কেরামের জামানা (সূচনাকাল)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে সাহাবীগণ সরাসরি তাঁর কাছ থেকে দ্বীনের বিধি-বিধান জেনে নিতেন। তবে দূরবর্তী অঞ্চলের সাহাবীগণ, যারা সরাসরি নবীজির কাছে আসতে পারতেন না, তারা সেই অঞ্চলের জ্ঞানী সাহাবীদের ফতোয়া অনুসরণ করতেন।
মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)-এর ঘটনা: নবীজি (সা.) যখন হযরত মুয়াজ (রা.)-কে ইয়ামেনে বিচারক হিসেবে পাঠান, তখন ইয়ামেনবাসীকে তাঁর সিদ্ধান্ত অনুসরণের নির্দেশ দেন। এটি ছিল তাকলিদের একটি প্রাথমিক ও প্রায়োগিক রূপ।
সাহাবাদের যুগ: নবীজির ওফাতের পর সব সাহাবী সমান স্তরের ফকীহ বা মুজতাহিদ ছিলেন না। ইবনে আব্বাস, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, হযরত আলী এবং আয়েশা (রা.)-এর মতো মুজতাহিদ সাহাবীদের ফতোয়া সাধারণ সাহাবী এবং তাবেয়ীগণ কোনো দলীল খোঁজা ছাড়াই মেনে নিতেন।
২. তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীদের যুগ (মাজহাবের বিকাশ)
ইসলামের সীমানা যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি হয়। এই সময়ে মক্কা, মদিনা, কুফা, বসরা ও সিরিয়ায় ফিকহী স্কুল বা মাদরাসা গড়ে ওঠে।
পরবর্তীতে হিজরি দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতাব্দীতে চারজন মহান ইমামের হাত ধরে ফিকহী মাসআলাগুলো সুবিন্যস্ত রূপ পায়। তারা হলেন:
১. ইমাম আবু হানিফা (রহ.) (হানাফী মাজহাব)
২. ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.) (মালিকী মাজহাব)
৩. ইমাম শাফেয়ী (রহ.) (শাফেয়ী মাজহাব)
৪. ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) (হাম্বলী মাজহাব)
সাধারণ মানুষ তাদের নিজস্ব অঞ্চলের ইমামের ফিকহী সিদ্ধান্ত ও ইজতিহাদের ওপর আস্থা রেখে তাকলিদ করতে শুরু করে।
৩. মাজহাব চতুষ্টয়ের স্থায়িত্ব ও 'তাকলিদে শখসি'
চতুর্থ হিজরি শতকের পর থেকে উম্মাহর আলেমদের মধ্যে একটি সাধারণ ঐক্যমত্য (ইজমা) তৈরি হয় যে, সাধারণ মুসলমানদের দ্বীনী বিশৃঙ্খলা থেকে বাঁচাতে চার মাজহাবের যেকোনো একটির তাকলিদে শখসি (নির্দিষ্ট একজন ইমামের অনুসরণ) করা আবশ্যক।
কেন নির্দিষ্ট একজনের তাকলিদ জরুরি হলো?
যদি কেউ নিজের ইচ্ছা মতো একেক সময় একেক মাজহাবের সহজ বিধানগুলো বেছে নেয়, তবে তা দ্বীন পালনের চেয়ে 'নফসের গোলামী' বা খেয়াল-খুশির অনুকরণে পরিণত হয়। এই বিশৃঙ্খলা রোধে চার মাজহাবের অনুশাসন মুসলিম বিশ্বে স্থায়িত্ব লাভ করে।
৪. সমকালীন বিশ্ব ও তাকলিদ (বর্তমান প্রেক্ষাপট)
বর্তমান যুগে তাকলিদের বিষয়টি মুসলিম উম্মাহর মধ্যে দুটি প্রধান ধারায় বিভক্ত:
ক. জুমহুর বা সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমদের অবস্থান (ঐতিহ্যবাহী ধারা)
দেওবন্দী, বেরলভী, আল-আজহার এবং মক্কা-মদিনার ঐতিহ্যবাহী আলেমদের বড় অংশই তাকলিদের পক্ষে। তাদের বক্তব্য হলো, সাধারণ মানুষ যার সরাসরি ইজতিহাদ করার যোগ্যতা নেই, তার জন্য তাকলিদ করা ওয়াজিব। এটি মূলত পবিত্র কোরআনের এই আয়াতের প্রতিফলন:
"যদি তোমরা না জানো, তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করো।" (সূরা আন-নাহল: ৪৩)
খ. আহলে হাদীস ও সালাফী ধারা (তাকলিদ বিরোধী অবস্থান)
বিগত কয়েক শতাব্দীতে (বিশেষ করে ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ, হাফেজ ইবনুল কাইয়্যিম এবং পরবর্তীতে শাহ ওয়ালিউল্লাহর কিছু চিন্তাধারার সূত্র ধরে) এবং বর্তমান যুগে আহলে হাদীস বা সালাফী ঘরানার আলেমগণ প্রচলিত তাকলিদের বিরোধিতা করেন। তাদের মতে, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির অন্ধ অনুকরণ না করে সরাসরি সহীহ হাদীসের অনুসরণ (ইত্তিবা) করা উচিত।
উপসংহার
ঐতিহাসিকভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাকলিদ কোনো নতুন আবিষ্কৃত বিষয় নয়, বরং এটি শরীয়তের বিধান সহজে আমল করার একটি সুশৃঙ্খল মাধ্যম। ইমামগণের ইজতিহাদ মূলত কোরআন ও সুন্নাহরই ব্যাখ্যা। তাই চরমপন্থা বর্জন করে, চার ইমামের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সাধারণ মানুষের জন্য তাকলিদের ওপর আমল করা উম্মাহর ঐক্য ও ফেতনা থেকে বেঁচে থাকার জন্য আজ পর্যন্ত সবচেয়ে নিরাপদ পথ হিসেবে প্রমাণিত।