24/01/2026
তালিবে ইলম কেন রমাযানের ছুটিতে দাওয়াতের সফরে বের হবেন ?
তালিবে ইলম রামাযান কীভাবে কাটাবে ?
তালিবে ইলম রমাযানের সময় কাজে লাগানোর এক ভালো উপায় হলো দাওয়াত ও তাবলীগের নিসবতে আল্লাহর রাস্তায় বের হয়ে যাওয়া। সার্বিক পরিস্থিতি ও বর্তমান পরিপার্শ্বিক বিবেচনায় রামাযানের এই ছুটিতে তাবলীগে বের হওয়ার অসংখ্য উপকারিতা রয়েছে। তবে একটি কথা না বললে নয়। সেটি হল, রমাযানের সময়গুলোর যথাযথ হেফাযতের জন্য তাবলীগে বের হওয়ার কোন বিকল্প নেই। কারণ, আমরা প্রত্যেকেই নিজের ব্যাপারে অবগত আছি যে, প্রত্যেক রমাযানের পূর্বেই আমরা নিয়ত করি যে, রমাযানে এই করবো, সেই করবো; বাঘ মারবো, হাতি মারবো; আরো কতো কি ? কিন্তু ক’জন ছাত্র তা পূরণ করতে পারেন ? সত্য কথা হল অধিকাংশ ছাত্রই এই সময়গুলোকে কাজে লাগাতে পারে না। পরীক্ষার পর থেকে মাদরাসা খোলার পূর্ব পর্যন্ত দেড়-দু’মাস দরস বন্ধ থাকে। কিন্তু খোলার তারিখে যদি হিসাব লাগানো হয়, দেখা যাবে এই দীর্ঘ বন্ধে এমন কোন কাজ হয়নি, যা উল্লেখ করা যেতে পারে। এই জন্য রমাযানের সময় হিফাযত করতে চাইলে, আরো বাড়িয়ে বললে রমাযানকে যথাযথ মর্যাদায় যাপন করতে চাইলে মসজিদের পরিবেশে চল্লিশ দিন কাটানোর বিকল্প নেই। এতে আশাকরা যায় জামাআতে নামায, আদাবসহ রোযা, তাহাজ্জুদ-নফল, দুআ-কান্নাকাটি, তিলাওয়াত-যিকির, তালীম-তাআল্লুম এবং দাওয়াত-তাবলীগের প্রশিক্ষণ গ্রহণসহ এক ঈর্ষণীয় সুন্দর রমাযান উদযাপিত হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। বাড়িতে থাকাকালে যা কল্পনাও করা যায় না।
আমাদের মহান আকাবির ও বুযুর্গানে দীন হারাম শরীফে রমাযানকাশি ও ইতিকাফ করতেন এবং এখনো করে থাকেন। কেউ মদীনা শরীফে অবস্থান করেন। কেউ বা কোন শাইখের কাছে চিল্লাকাশি করে থাকেন শুধু রমাযান শরীফকে ভালভাবে কাটানোর জন্য। হারাম শরীফ বা মদীনা শরীফে রমাযান কাটাতে যারা অক্ষম; তাদের জন্য বাইতুল্লা শরীফের শাখা দুনিয়ার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মসজিদের পরিবেশে অবস্থান করার চাইতে আর কি কোন উত্তম পরিবেশ হতে পারে ? এজন্য বিশেষ কোন ইলমী ব্যস্ততা বা প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের ইচ্ছা না থাকলে উস্তাদের সাথে পরামর্শ করে তাবলীগি জামাআতের সাথে সময় লাগানো উচিত। এক চিল্লা না হলে বিশদিন বা অল্প কিছুদিন হলেও সময় লাগানো উচিত।
আর যারা ‘ফারিগ’ হতে চলেছেন, তাদের জন্য তো একবছর দাওয়াতের কাজে লাগানোর তাকাযা রয়েছে। আমাদের মহান আকাবিরে দেওবন্দের সকলেই এ ব্যপারে একমত পোষণ করেছেন। হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস (রাহঃ) যখন উলামায়ে কেরামের জন্য এই নেসাব নির্ধারণ করেন, তখনকার কোন বুযুর্গই এতে দ্বিমত পোষণ করেননি। হাকীমুল ইসলাম হযরত কারী তাইয়েব (রাহঃ) তো তাবলীগের দীনি তাজদীদি ও ইসলাহী গুরুত্ব স্বীকার করার পর একে একটি ফন, শাস্ত্র ও বিদ্যা হিসাবে মূল্যায়ন করেছেন। খুতুবাতে হাকীমুল ইসলামের একজায়গায় এ প্রসেঙ্গ বলেছেন, যার সারকথা হলো : “যুগে যুগে আল্লাহ তাআলা দীনের প্রচার-প্রসার, তাজদীদ ও সংস্কাররের কাজ বিভিন্নভাবে নিয়েছেন। প্রথমযুগে দাওয়াত ও সশস্ত্র জিহাদের মাধ্যমে। এরপর কখনো হাদীসের মাধ্যমে, কখনো ফিকহের মাধ্যমে, কখনো ইলমুল কালামের মাধ্যমে, কখনো তাযকিয়া ও তাসাউফের বিশেষ তরীকার মাধ্যমে, কখনো তা’লীমের মাধ্যমে, কখনো বিতর্ক-বহসের মাধ্যমে। যখন যেযুগে যা উপযোগী ছিল, তখন তার বিশেষ প্রভাবের মাধ্যমে দীনের কাজ করা হতো। বর্তমান জমহুরিয়াত তথা গণতন্ত্রের যুগে, যেখানে সংখ্যার আধিক্য বিশেষভাবে মূল্যায়িত হয়, তখন তিনি জামাতবদ্ধ হয়ে দীনের দাওয়াত ও সংস্কারের কাজ চালু করেছেন। আল্লাহ তাআলা হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস (রাহঃ) অন্তরে ইসলামের দাওয়াতের এই যুগোপযুগী তরীকার ইলহাম করেছেন। তাঁকে এই শাস্ত্রের বিশেষ ইলম দেওয়া হয়েছে; যেমনিভাবে দীনের অন্যান্য ইলমের জন্য তিনি যুগেযুগে খাস রিজাল ও বিশেষ ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি করেছিলেন।”
[টীকা : খুতুবাতে হাকীমুল ইসলাম ৪র্থ খন্ড দ্রষ্টব্য]
অর্থাৎ, ইমাম সেবওয়েহ (রাহঃ) কে যেমন ইলমে নাহুর, ইমামে আজম আবু হানীফা (রাহঃ) ও অন্যান্য ইমামদেরকে যেমন ইলমে ফিকাহর, ইমাম বুখারী ও মুসলিম (রাহঃ)-সহ মুহাদ্দিসীনকে যেমন ইলমুল হাদীস, ইমাম আবু নসর মাতুরীদিকে যেমন ইলমুল কালাম দেওয়া হয়েছে, তেমনি হযরত ইলিয়াস (রাহঃ) কে ‘ইলমুদ্দাওয়াত’ দেওয়া হয়েছে। তিনি শেষযুগে আল্লাহ প্রদত্ত সেই ইলম ও প্রজ্ঞা দ্বারা দাওয়াত ও তাবলীগের উসূল, আদাব, নিসাব নির্ধারণ করেছেন। সুতরাং তালিবে ইলমগণ যেমন তাফসীর, হাদীস, ফিকাহসহ বিভিন্ন শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞতা অর্জনের জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ের তাখাসসুস পড়ে থাকে, তেমনি এই দাওয়াত ও তাবলীগ বিষয়েও তাখাসসুস পড়া উচিত। এ বিষয়ে অবশ্যই বিভিন্ন ইসলামী ইউনিভার্সিটিতে বিভাগ রয়েছে, এবং এ বিষয়ে প্রচুর গবেষণা করা হয়; কিন্তু তা কেবল শাস্ত্রীয় ও তাত্ত্বিক অধ্যয়ন পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। খোদ শিক্ষার্থীদের জীবনে তার পাঠ্যবিষয়ের বিশেষ কোন প্রভাব প্রতিফলিত হয় না, তার দ্বারা অন্য কেউ উপকৃত হওয়া তো পরে কথা। বস্তুত দাওয়াত ও তাবলীগের বাস্তবজ্ঞান অর্জনের জন্য বাস্তব অনুশীলন অপরিহার্য। কারণ, বিষয়টি এমনই, যা ঘরে বসে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। কারণ, এটি সম্পূর্ণ পরিবেশ পরিস্থিতি, লোক ও সমাজের সাথে সংশ্লিষ্ট। কোন উন্নতমানের গবেষণাগারে বসে তা সম্পন্ন করার সুযোগ নেই। কেউ করে থাকলেও সেই গবেষণা এই প্যাকটিক্যাল জ্ঞানের বিকল্প হতে পারে না। এটা যেন ঠিক মেডিকেল ছাত্রদের ইন্টার্নি করার মতো, যা ছাড়া কখনো কেউ সার্জন হতে পারে না।
অন্যভাবে বললে, নবীগণের আনীত দীন ও ইলম থেকে বহু শাস্ত্রের উদ্ভব হয়েছে, বহু বিদ্যা জন্ম নিয়েছে। বিশেষকের আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আনীত দীন ইসলামকে কেন্দ্র করে অসংখ্য ফন ও শাস্ত্রের উদ্ভব হয়েছে; যা ইসলাম আগমণের পূর্বে জগদ্বাসী দেখেনি। যেমন, ইলমুত তাফসীর, উসূলে তাফসীর, ইলমুল হাদীস ও উসূলে হাদীস, ফিকহ, উসূলে ফিকহ প্রভৃতি। আবার ইলমে নববীকে আহরণ, অনুধাবন ও শিক্ষাকরার সুবিধার্থে বহু ইলম আবিষ্কৃত হয়েছে। যেমন ইলমুন নাহু, সরফ, বালাগাত, লুগাত প্রভৃতি। আমাদের মাদরাসাসমূহে যুগযুগ ধরে এসব ইলমের পঠন-পাঠন, চর্চা-অনুশীলন ও শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ চলে আসছে। কিন্তু এই ইলমে দীনকে, যা আলিমগণের কাছে রক্ষিত বিশেষ আমানত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিটি উম্মাতের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর যে বিদ্যা ও শাস্ত্রের প্রয়োজন ছিল, তা দীর্ঘদিন থেকে আমাদের পাঠ্যবিষয়ের বাইরে পড়ে ছিল। ফলে আমরা জানতাম না দীনের এই আমানত জনমানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর নিয়ম ও তরীকা, পথহারা মানুষদের সঠিক পথে তুলে আনা উপায় ও পদ্ধতি, পতনোন্মুখ উম্মাতকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার অভিজ্ঞতা। এর অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল ব্যাপকভিত্তিক দাওয়াত; যা নবী-রাসূলগণ যুগেযুগে স্বজাতির হিদায়াত ও মুক্তির জন্য গ্রহণ করেছিলেন।
হযরত ইলিয়াস (রাহঃ)-কে আল্লাহ তাআলা রহম করুন, তিনি আমাদেরকে সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন এবং এর বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে আমাদের জন্য, এমনকি সকল মুসলমানের জন্য একটি নিয়ম ও নেসাব প্রণয়ন করে দিয়েছেন। যার যৌক্তিকতা, উপযোগিতা, উপকারিতা, কার্যকরিতা ও ফলপ্রসূতা আজ আসমানবাসী সবিষ্ময়ে প্রত্যক্ষ করছে, জমীনবাসী যার সুফল হাতেনাতে লাভ করছে। এজন্য প্রত্যেক তালিবে ইলমকে নবীগণের উম্মাত হিসাবে, বরং উত্তরসূরী হিসাবে তার বাস্তবজ্ঞান অর্জনকরা অপরিহার্য।
সুতরাং দাওয়াত ও তাবলীগ যখন দীনের একটি শ্রেষ্ঠ বিদ্যা, যা দীর্ঘদিন অবহেলিত পড়ে ছিল; একজন তালিবে ইলম তার আহরিত ইলম ও জ্ঞান দ্বারা দেশ জাতি ও বিশ্বকে উপকৃত করতে চাইলে অন্তত একসাল সময় দিয়ে এই জ্ঞান অর্জন করা জরুরী। আল্লাহ চাহে তো এই এক বছরে আপনি এমনসব অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন, যা আপনার অন্য সাথীদের কেউ অর্জন করতে পারবে না, যারা একবছর সময় লাগায়নি। এই সময়ে আপনি কত অনুকূল প্রতিকূল, ঠান্ডা-গরম, গ্রীষ্ম-বর্ষা সহ কত মওসূম ও পরিস্থতির শিকার হবেন। তখন আপনাকে কী করতে হবে তার বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করবেন। এরপর কত শহর-নগর, গ্রামগঞ্জ, আবাদী-অনাবাদী, পাহাড়-সমতল, পাকাপথ, কাঁচাসড়ক সফর করবেন, এতে আপনার আরেক ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জিত হবে। এরপর দীনের শত্রæ-মিত্র, পক্ষেবিপক্ষে, আস্তিক-নাস্তিক, দোস্ত-দুশমন, নানান চিন্তাধারার লোকদের সাক্ষাত লাভ করবে, তাদের সকলের সাথে আপনাকে কথা বলতে হবে, এবং তাদের দীনে হকের দাওয়াত দিতে হবে। আপনি কীভাবে দিবেন, তার এক অভিজ্ঞতা আপনি লাভ করবেন। এরপর শিক্ষিত-অশিক্ষিত, আলিম-অনালিম, কৃষক-মজদুর, চাকুরীজীবি, ব্যবসায়ী, অফিসার-শিল্পপতি, বিভিন্ন পেশা ও নেশার মানুষ নিয়ে আপনি চলবেন, আবার এ ধরণের লাখ লাখ মানুষের পাল্লায় পড়বেন, তাদেরকে কীভাবে চালাতে হবে, তাদের সাথে কীভাবে কথা বলতে হবে, তার জ্ঞান আপনি লাভ করবেন। স্বভাবচরিত্রে হাজারো কিসিমের লোকের দেখা পাবেন, গরম-ঠান্ডা, অহংকারী-বিনয়ী, সুরুচি-কুরুচি, গোঁয়ার-অনুগত, বাধ্য-অবাধ্য, বোকা-চালাক, গরীব-ধনী নানানধরনের লোক আপনার জামাআতে থাকবে, আবার আপনার সাথে সাক্ষাত হবে, তাদের আপনি কীভাবে পরিচালনা করবেন, তারও কিছু জ্ঞান আপনি এ সফরে লাভ করবেন। বস্তুত আলিমগণ হলেন নবীগণের নায়িব। উম্মাতকে নিয়ে চলার যোগ্যতা অর্জন করা একজন প্রকৃত নায়েবে নবীর জন্য অপরিহার্য। নচেৎ তাঁরা আগামী দিনে কীভাবে দীনি ক্ষেত্রে উম্মাতের নেতৃত্ব দিবেন ? ইসলামী হুকুমতের যে স্বপ্ন সকলে লালন করে আসছে, তার জন্যে তো মানুষ চালানোর যোগ্যতা অর্জন করা অপরিহার্য। সম্ভবত প্রত্যেক নবীকে এ জন্য নুবুওত দেওয়ার পূর্বে ছাগল চরানোর কাজে লাগানো হতো, এবং গোঁয়ার জাতিকে চালানোর যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করা হতো। সে হিসাবে নায়েবে নবীগণকে যদি ছাগল চরানোর জন্য একসাল লাগানোর নির্দেশ দেওয়া হতো, তাহলে তা অযৌক্তিক হতো না। কিন্তু এখন তো তাঁদেরকে ছাগল চরাতে না বলে মানুষ চালাতে বলা হচ্ছে। এরপরেও যদি আমরা তা না করি, এবং দেশ ও দশকে নিয়ে চলার এবং তাদের নেতৃত্ব দানের অভিজ্ঞান অর্জন না করি, তা হলে যুগের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে লাভ কি ?
মোটকথা, তালিবে ইলমগণ, বিশেষকরে ফারিগ ছাত্ররা একসালের জন্য দাওয়াত ও তাবলীগে বের হওয়ার অসংখ্য যৌক্তিক কারণ রয়েছে। এখানে দাওয়াতকে কেবল একটি ফন ও শাস্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা হয়েছে একজন সমজদার তালিবুল ইলমের জন্য এতটুকুই যথেষ্ঠ মনে করি।