23/05/2026
🍃প্রকৃতিঃ
প্রকৃতি নিত্য, এই নিত্য প্রকৃতির অভিব্যক্তিই জগৎ। কারণ-প্রকৃতিতে জগৎ অব্যক্ত থাকে বলে প্রকৃতিকে অব্যক্ত বলা হয়। প্রকৃতি হল নির্বিশেষ ও নিরবয়ব। এজন্য প্রকৃতি প্রত্যক্ষগোচর নয়। প্রকৃতি হলো এক সর্বব্যাপী, অতিসূক্ষ্ম, অসীম ও জগতের আদিকারণরূপ জড়শক্তি। প্রকৃতিতে জগতের স্থিতি এবং প্রকৃতিতেই জগতের লয়। কারণরূপ প্রকৃতি অব্যক্ত ও প্রধান, এবং কার্যরূপ প্রকৃতি সৎরূপে প্রকাশিত। অব্যক্ত প্রধান বা প্রকৃতি ত্রিগুণরূপে সমবেত হয়ে কার্যাকারে পরিণত হয়। একই জল যেমন ভিন্ন ভিন্ন আধারে নানা পরিণাম প্রাপ্ত হয়, সেরূপ এক একটি গুণের প্রাধান্য অনুযায়ী ও সহকারীভেদে একই প্রকৃতি নানা পরিণাম প্রাপ্ত হয়।
প্রকৃতির পরিণামের ফলে জগতের সৃষ্টি, আবার প্রকৃতির পরিণামের ফলে জগতের লয়। সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ গুণ যখন সাম্যাবস্থায় থাকে, তখন তাদের মধ্যে পৃথক পৃথক ভাবে পরিণাম ঘটে। অর্থাৎ সত্ত্ব সত্ত্বরূপে, রজঃ রজোরূপে এবং তমঃ তমোরূপে পরিণত হয়। এরূপ পরিণামকে বলা হয় প্রকৃতির স্বরূপ পরিণাম বা সদৃশ পরিণাম। এই পরিণাম গুণত্রয়ের সাম্যাবস্থায় ঘটে। এই সাম্যাবস্থা যখন বিনষ্ট হয়, তখন প্রকৃতিতে অপর একপ্রকার পরিণাম দেখা যায়। এই পরিণামে সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ-এর পারস্পরিক শক্তির অন্তর্দ্বন্দ্ব ঘটে। এর ফলে কখনও সত্ত্ব, কখনও রজঃ আবার কখনও তমঃ গুণের প্রাধান্য ঘটে। প্রকৃতির এরূপ পরিণামকে বিরূপ পরিণাম বা বিসদৃশ পরিণাম বলে। বিরূপ পরিণামের ফলে জগতের সৃষ্টি এবং স্বরূপ পরিণামের ফলে জগতের লয় সূচিত হয়। প্রলয়কালে সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ গুণের সদৃশ পরিণাম হয়। গুণগুলোর স্বভাব পরিণাম, পরিণত না হয়ে এরা ক্ষণকালও থাকতে পারে না। তাই সত্ত্ব সত্ত্বরূপে, রজঃ রজোরূপে ও তমঃ তমোরূপে প্রলয়কালেও পরিণাম প্রাপ্ত হয়।
🍃প্রকৃতির স্বরূপঃ
এই জগতের ত্রিবিধ অনাদি সত্তার মধ্যে প্রকৃতি একটি। প্রকৃতি শব্দের উৎপত্তি 'কৃ' ধাতু থেকে (প্র-কৃ+তি)। 'কৃ' ধাতুর অর্থ হলো করা। সুতরাং প্রকৃতি শব্দের বুৎপত্তিগত অর্থে সেই প্রকৃতি, এই বিশ্ব যার কৃতি। বিশ্ব এবং তার যাবতীয় জড়বস্তু এবং প্রাণীর, মানুষের বুদ্ধি, মন, চিত্ত, অহং এবং ইন্দ্রিয়াদির তথা আত্মা ভিন্ন মানুষের সমস্ত অবশিষ্ট সত্তার, বিশ্বের যাবতীয় পরিবর্তন এবং বিবর্তনের মূল অনিঃশেষ কারণ প্রকৃতি।
বেদ বলছে-“এই নিত্য প্রকৃতি সর্বদাই পরিণামযুক্তা, পুরাতন, নব নব রূপধারিনী এবং সর্ব কাজে করণ রূপে বিরাজমানা। প্রত্যেক গতিশীল জীবের সঙ্গেই এই প্রকৃতি নিজের স্বরূপ ও সত্ত্বা প্রকাশ করিতেছে। "[87]
প্রকৃতি এই জগতের মূল উপাদান কারণ, কিন্তু তার মূল নেই। বিশ্বের যাবতীয় কার্য এবং সংঘাতের মূল কারণ এই প্রকৃতি। প্রকৃতি জগতের সব বস্তুরই মূল উপাদান কারণ, কিন্তু তার কোন উপাদান কারণ নেই। কিন্তু নেই কেন? উত্তরে মহর্ষি কপিল বলছেন-
"মূল কারণের কোন কারণ থাকিতে পারে না। কারণ রহিত না হইলে তাকে মূল কারণ বলা যায় না। মূল কারণ অকারণ অর্থাৎ কারণ রহিত হইয়া থাকে এবং তাহা অনাদি। [৪৪]
"এইরূপ ভাবে পরম্পরা হিসাবে কারণ মানিতে মানিতে অন্তে একস্থানে পৌঁছিতেই হইবে। যে কারণ অন্তে স্থিত হইবে তাহাকে প্রকৃতির সংজ্ঞা দেওয়া হয়।"[89]
প্রকৃতি জড়াত্মক, জড়শক্তির আধার, অচেতন এবং ত্রিগুণাত্মিকা। সত্ত্ব, রজঃ এবং তমঃ, এই ত্রিবিধ গুণের সমষ্টি এবং শক্তির মূল সাম্যাবস্থার নাম প্রকৃতি। সৃষ্টির অনন্ত সম্ভাবনার অবিকৃত এবং পূর্ণ সাম্য-প্রকৃতিই প্রকৃতি।
সাধারণত গুণ বলতে আমরা 'ধর্ম'কে বুঝি। দর্শনে (সাংখ্য) গুণ বলতে উপাদানকে বুঝায়। সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ, এই তিনটি প্রকৃতির উপাদান। একটি রজ্জু যেমন তিনটি তারের সমষ্টি হতে পারে তেমনি প্রকৃতিও সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এই তিন গুণের সমষ্টি। এগুলোকে গুণ বলার কারণ এই যে, এরা পুরুষ বা আত্মার উদ্দেশ্য চরিতার্থ করে এবং পুরুষ বা আত্মাকে জগতের সঙ্গে বেঁধে রাখে।
প্রকৃতির গুণগুলো খুবই সুক্ষ্ম বলে এদের প্রত্যক্ষ করা যায় না। তবে গুণগুলোর কার্য থেকে গুণগুলোর অস্তিত্বকে অনুমান করা যায়। এদের অস্তিত্বকে অনুমান করার পদ্ধতি হলো এই,-
সংকার্যবাদ অনুসারে কার্য এবং কারণ সমভাবাপন্ন। জগতের প্রত্যেকটি বস্তুর মধ্যে তিনটি জিনিস দেখা যায়। যথা-সুখ, দুঃখ ও ঔদাসীন্য। যেমন, 'প্রভাতে পাখির গান' সঙ্গীতপ্রিয় রসিককে দেয় সুখ, রুগ্ন ব্যক্তিকে দেয় দুঃখ, আর অরসিক জন থাকে ঐ গানের প্রতি উদাসীন। জগতের প্রতিটি বস্তুই যখন কার্য এবং কার্যের মধ্যে যখন সুখ, দুঃখ ও উদাসীন্য এই তিনটি জিনিস দেখা যায়, তখন জগতের সকল বস্তুর মূল উপাদান যে প্রকৃতি তার মধ্যে নিশ্চয়ই এই তিনটির কারণ থাকবে। তাদের কারণ হল যথাক্রমে সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ।
মহর্ষি কপিল বলছেন-"প্রকৃতি পুরুষের চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ না হইলেও অনুমানের দ্বারা তাহাদের জ্ঞান হইয়া থাকে। যেমন দূরে পর্বত মধ্যস্থ অগ্নির জ্ঞান ধূম ও প্রকাশাদির প্রত্যক্ষের দ্বারা হইয়া থাকে সেইরূপ পৃথিব্যাদি কার্য, ভোগাদি চিহ্ন ও রচনাদি কৌশল প্রত্যক্ষ করিয়া সৃষ্টির উপাদান কারণ জড় সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ স্বরূপ প্রকৃতি, ভোক্তা জীবাত্মা ও অনন্ত জ্ঞানস্বরূপ পরমাত্মার জ্ঞান অনুমানের দ্বারা হইয়া থাকে।"[90]
🌺টিকাঃ
[87] এষা সনত্নী সনমেব জাতৈষা পুরাণী পরি সর্ব্বং বস্তুব।
মহী দেব্যু ষসো বিভাতি সৈকেনৈকেন মিষতা বিচষ্টে ৷৷
- অথর্ববেদ ১০। ৮।৩০
[৪৪] মূলেমূলাভাবাদমূলং মূলম্।
-সাংখ্য দর্শন ১।৬৭
[89] পরাম্পর্য্যেহপ্যেকত্রপরিনিষ্ঠেতি সংজ্ঞামাত্রম্।
-সাংখ্য দর্শন ১।৬৮
[90] অচাক্ষুষাণামনুমানেনবোধোধূমাদিভিরিববহ্নে।
-সাংখ্য দর্শন ১।৬০