21/10/2025
টানা-হ্যাঁচড়ার শেষ নেই। এক দল আরেক দলের বিরুদ্ধে নিয়মিত তোপ দাগিয়ে যাচ্ছে। আশআরী-মাতুরিদীরা বলে আল্লাহ কেবল আরশে বা আকাশেই আছেন, এমন নয়। সালাফী চিন্তাবিদরা বলেন আল্লাহ তা'আলা আরশে সমাসীন আছেন। তবে এর সঠিক রূপ কেউ জানে না।
এ নিয়ে মল্লযুদ্ধ কেতাবেই সীমাবদ্ধ নেই! রীতিমতো ফেসবুক ছাড়িয়ে বিয়ে পর্যন্তও গড়ায়। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন বিজ্ঞপ্তি চোখে পড়ে,
-সহীহ আকীদার পাত্রী চাই।
কেউ কেউ নিজের ওয়ালে ঘোষণা দেয়,
-আসুন না, আমরা যারা ফেসবুকে সহীহ আকীদার আছি, একদিন সবাই মিলে চা খাওয়া যাক।
পাল্টা বিজ্ঞপ্তিও চোখে পড়ে,
-পাত্রী তাবলীগি পরিবারের হলে ভালো। অথবা 'অমুক' পীরের মুরীদ হলে প্রাধান্য পাবে।
***
দুজনে সেই ছেলেবেলা থেকে বন্ধু। পড়াশোনার পাট চুকার পর যে যার পথ ধরল। একজন সরকারি চাকরিতে, আরেক বন্ধু বউ-বাচ্চাসহ সৌদি। যৌবনের স্বপ্নমুখর দিনে, দুবন্ধু প্রতিজ্ঞা করেছিল, দুজনের সম্পর্কটাকে পোক্ত রূপ দিতে হবে। আল্লাহর কী মহিমা! দেশে থাকা বন্ধুর প্রথম সন্তান হলো ছেলে। প্রবাসী বন্ধু জীবিকার তাড়নায় সময়মতো বিয়ে করতে পারলনা, দেরি হয়ে গেল। দেশি বন্ধুর পাঁচ বছর পর বিদেশি বন্ধু বাসর করতে পারল। দু-বছরের মাথায় এল একটা ফুটফুটে কন্যা।
সপরিবারে প্রবাসে থাকার কারণে মেয়েটাও ওখানকার স্কুলেই পড়াশোনা করল। বাংলা মিডিয়াম থাকলেও বাবার ইচ্ছায় মেয়ে ইংরেজি ও আরবী মিডিয়ামে পড়াশোনা করল।
দু-বন্ধু দুই দেশে থাকলেও, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি কখনো। নিয়মিত সালাম-হ্যালো চলত। তবে বিয়ের ব্যাপারটা দুজনের বাইরে কেউ জানত না। এমনকি দুই বিবিও না। সময় গড়াতে গড়াতে এদিকে ছেলে লায়েক হয়ে উঠল। ওদিকে মেয়েও সোমত্ত হলো। বন্ধু দুজন ঠিক করল সামনের ঈদে শুভকাজ সমাধা করতে হবে। দেশি বেয়াই লায়েক ছেলেকে নিয়ে বিমানবন্দরে গেলেন। উদ্দেশ্য প্রথম থেকেই মৌমাছি আর ফুলকে কাছাকাছি করে দেয়া।
উভয় পক্ষের মুরুব্বিদের কথাবার্তা শেষ। এবার পাত্র-পাত্রীর পালা। কানভাঙানি আসতেও দেরি হলো না। একজন এসে পাত্রপক্ষের কানে কানে বলে গেল,
-পাত্রী এই বিয়েতে রাজি নয়।
-কেন? কেন?
-ছেলে বেদাতী আকীদা পোষণ করে।
ছেলের বাবা কথাটা বাড়তে দিলেন না। বন্ধু যেহেতু কিছু বলেনি, তাহলে ধরে নেয়া যায় সমস্যাটা বড় কিছু নয়। ওদিকের ঘটনাও প্রায় এক! কেউ একজন কান ভাঙানি দিল,
-ছেলে এই বিয়েতে রাজি নয়।-কেন?
-মেয়ে আহলে হাদীস।
মেয়ের বাবাও বিষয়টা নিয়ে বেশি নাড়াচাড়া করলেন না। ঠিক হলো, ঈদের পরদিন পাত্র আসবে। দুজনে একে অপরকে পছন্দ করলে সাথে সাথেই আকদ হয়ে যাবে!
যথাসময়ে ছেলে উপস্থিত! মেয়ে এল ছোটভাইকে সঙ্গে নিয়ে। ছেলে আগে কথা বলবে কি, লজ্জায় মরেই যাচ্ছিল। আবার আড়চোখে না তাকিয়েও পারছিল না। এত্ত সুন্দরও মানুষ হতে পারে? তার মুখ দিয়ে অজান্তেই বেরিয়ে গেল, সুবহানাল্লাহ!
মেয়ে সচকিত হয়ে চোখ তুলল! চারি চোখে মিলন! ছেলে চোরা চোখে তাকাতে গিয়ে ধরা পড়ে খুক করে কেশে উঠল! মেয়ের অবাক করা প্রশ্ন, -সুবহানাল্লাহ কেন বললেন?
-বলব না, না বলে উপায় আছে!
মেয়ে মনে মনে বেজায় খুশি! সে শুনেছিল ছেলেটা নিতান্ত গোবেচারা টাইপের হুজুর! এখন দেখি তা নয়। বেশ সেয়ানাই মনে হচ্ছে। কিন্তু আকীদার প্রশ্নে আপোষ করা যাবে না। যেভাবেই হোক, আমার যা জানার তা জানতেই হবে! বেদাতী আকীদার কারও সঙ্গে জীবন কাটাতে চাই না! যাক একথা-ওকথা করে করে এগুতে লাগল। ছেলে একপর্যায়ে বলল, -আমার আসলে কিছুই জানার ছিল না। আর আপনাকে অপছন্দ করার কোনো কারণ থাকতেই পারে না!
-আমার কয়েকটা প্রশ্ন ছিল!
ছেলে ভয় পেয়ে গেল মনে মনে। এই সেরেছে, ঝামেলায় ফেলবে না তো! তারপরও মনের কথা মনে চেপে বলল,
-অবশ্যই! বলুন কী জানতে চান?
-কিছু মনে করবেন না। আমি শুধু দুটি প্রশ্নের উত্তর জানতে চাই।
-কোন বিষয়ে?
-আল্লাহ সম্পর্কে!
ছেলে সশব্দে আঁতকে উঠল। ইশশিরে! শেষ রক্ষা হলো না রে! এই হুরীকে বুঝি হারালাম। ইয়া আল্লাহ, ইয়া মাবুদ, আপনি যেখানেই থাকুন! আপনি আমার রব! আর কেউ নয়। এই গরিবের দিকে একটু রহমতের দৃষ্টি দিন!
-জি প্রশ্নটা বলুন। তবে আমার একটা শর্ত আছে।
-কী শর্ত?
-আপনি শুধু একটা প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইবেন। বাকিটা প্রথম প্রশ্নের উত্তর থেকে অনুমান করে নেবেন!
মেয়ে কমলার কোয়ার মতো অধর কামড়ে ধরে একটু ভেবে বলল, -আচ্ছা ঠিক আছে, বলুন তো আল্লাহ তা'আলা কোথায় আছেন?
ছেলে মনে মনে বলল,
বারে বারে ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান এইবার তোমার আমি বধিব পরাণ।যা ভেবেছি সেটাই প্রশ্ন করল। চোখ বন্ধ করে আল্লাহর মা'রেফতে ডুবে গেল। কোথায় আছেন তিনি? কোথায় আছেন তিনি? নিজের সত্যিকার আকীদা বলতে গেলে এমন হুরেঈনকে হয়তো হারাতে হবে। আবার নিজের আকীদা পাশ কাটিয়ে অন্য কিছু বললে, ভেতরে এক বাইরে আরেক হয়ে যাবে। এমন একটা উত্তর দিতে হবে, যাতে সালাফী-মাতুরিদী-আশ'আরী সব আকীদাই বোঝা যাওয়ার অবকাশ থাকে। ভাবতে ভাবতে বিদ্যুৎ-চমকের মতো মুসলিম শরীফের একটা দরসের কথা মনের পর্দায় ভেসে উঠল! সাথে সাথে বলল,
-এসব তো জটিল বিষয়! নিজের ভাষায় বলতে গেলে ভুল হয়ে যেতে পারে! আমি হাদীস দিয়ে উত্তর দিই?
-ওম্মা, তা হলে তো কথাই নেই!
ছেলে এবার দাওরা হাদীসে ইবারত পড়ার মতো সুর করে দুলে দুলে পড়তে শুরু করল,
ওয়া বিহি কালা হাদ্দাসানা
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا مِنْ رَجُلٍ يَدْعُو امْرَأَتَهُ إِلَى فِرَاشِهِ فَتَأْبَ عَلَيْهِ إِلَّا كَانَ الَّذِي فِي السَّمَاءِ سَاخِطًا عَلَيْهَا حَتَّى يَرْضَى عَنْهَا
যার হাতে আমার জীবন, তার শপথ! কোনো মহিলাকে তার স্বামী বিছানায় আহ্বান করল, কিন্তু মহিলা তাতে সাড়া দিতে অস্বীকৃতি জানাল, তা হলে আসমানে যিনি আছেন, তিনি মহিলার প্রতি ভীষণ ক্রুদ্ধ হবেন। স্বামী সন্তুষ্ট হওয়া পর্যন্ত তিনি তার প্রতি রাজি হবেন না।
ছেলের তখনো চোখ বন্ধ। সে অবস্থাতেই বলল, এটা সহীহ হাদীস। আলবানী রহ.-এর সার্টিফিকেটের দরকার নেই। মুসলিম শরীফে আছে। একথা বলে ভয়ে ভয়ে চোখ খুলল! দেখল সামনে বসা হুরপরীটা কীভাবে যেন আরও সুন্দর হয়ে গেছে! চেহারায় খেলা করছে আনন্দ আর রাজ্যের লজ্জা। সম্মতি! সংকোচ! অনুরাগ! আগ্রহ! কৌতূহল! বিস্ময়! আরও কত কী! চোখাচোখি হতেই পরীটা 'যাহ দুষ্ট' বলে মুখে ওড়না চাপা দিয়ে হাসতে হাসতে পালাল।
বই:- আই লাভ ইউ, পৃষ্ঠা :৫৩