Most Ven. Sadhanananda Mahathera

Most Ven. Sadhanananda Mahathera Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from Most Ven. Sadhanananda Mahathera, Buddhist Temple, Rangamati.

বনভান্তের মূল্যবান ধর্মীয় শিক্ষা, বাণী, স্মৃতি ও বিভিন্ন কার্যক্রমের ছবি-ভিডিও এখানে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হবে। শ্রদ্ধেয় ভান্তের প্রতি ভক্তি, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি তাঁর মহান আদর্শ ও সদ্ধর্মের বাণী সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়াই আমাদের মূল উদ্দেশ্য।

19/08/2026

অর্হত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে বিশ্বাস করতে নেই!

যখন আপনি চাইবেন না, তখনই তা আপনার কাছে আসবে!সবকিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই হলো লোভ, পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। আপনি সবকিছু পেয়...
18/08/2026

যখন আপনি চাইবেন না, তখনই তা আপনার কাছে আসবে!

সবকিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই হলো লোভ, পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। আপনি সবকিছু পেয়ে গেলেন, মনে হলো খুব আনন্দ হচ্ছে। কিন্তু মৃত্যুর পর এগুলো সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবেন কি? সত্যিই পারবেন না! এগুলোকে বলা যায় “স্থাবর সম্পত্তি”, অর্থাৎ যে সম্পদ সরিয়ে সঙ্গে নেওয়া যায় না। তাহলে কীভাবে এগুলোকে রূপান্তর করা যায়? এগুলোকে পুণ্যে রূপান্তর করতে হবে। সদ্ধর্মের রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রতিষ্ঠায় সম্পদ ব্যবহার করলেই তা কুশল ফলের কারণ হয়। তখন সেই সম্পদ পুণ্যের রূপে ভবিষ্যৎ জীবনেও আপনার সঙ্গে অনুসরণ করবে।

বুদ্ধ বলেছেন, আপনি যে জিনিসটি ভালোবাসেন, সেই জিনিসই দান করে দিন। ভবিষ্যতে সেই জিনিসই আপনার সঙ্গে থাকবে। আপনি যদি অর্থ ভালোবাসেন, তাহলে অর্থ দান করতে হবে। ভবিষ্যতে, পরবর্তী জীবনেও অর্থ আপনার কাছে আসবে। কিন্তু আপনি যদি তা দান করতে না চান, তাহলে ভবিষ্যতে অর্থের অভাব হতে পারে। আপনি যে জিনিসটি ভালোবাসেন, সেটি ত্যাগ করতে পারলে ভবিষ্যতে আরও বেশি লাভ করতে পারেন।

আপনি যদি কোনো মানুষকে ভালোবাসেন, তাহলে তার প্রতি আসক্ত হবেন না। তাকে মুক্তি দিন, তার স্বাধীনতাকে সম্মান করুন। অতিরিক্তভাবে তাকে আঁকড়ে ধরে রাখবেন না। ভবিষ্যতে আপনি আরও সুন্দর, আরও মর্যাদাপূর্ণ এবং পবিত্র সঙ্গী লাভ করতে পারেন। আপনি যত বেশি তাকে আঁকড়ে ধরে রাখবেন, সে কি আপনার কথা শুনবে? এমনটা নিশ্চিত নয়। কিন্তু আপনি যদি তাকে ছেড়ে দিতে পারেন, তখন সে বরং আপনাকে হারানোর ভয় পেতে পারে। আপনি যখন আর আঁকড়ে ধরে রাখতে চাইবেন না, তখনই তা আপনার কাছে ফিরে আসতে পারে।

আপনি যদি সম্পদ পেতে চান, তাহলে প্রথমে সম্পদ দান করতে শেখুন। তখন সম্পদ আপনার কাছে আসবে।

আপনি যদি কোনো মানুষকে পেতে চান, তাহলে প্রথমে তাকে স্বাধীনতা দিন। তাকে আঁকড়ে ধরে রাখবেন না। তখন তার মন হয়তো আপনার কাছেই ফিরে আসবে। সে আপনাকে হারানোর ভয় পেতে পারে। সত্যিই এটি এক আশ্চর্যজনক যুক্তি!

আপনি যদি অধীরভাবে ধনসম্পদ ও সম্মান পাওয়ার পেছনে ছুটতে থাকেন, তাহলে প্রথমে জগতের ধনসম্পদ ও সম্মানের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করতে হবে। তখনই আরও বড় সম্পদ ও সম্মান লাভের সুযোগ তৈরি হবে। তাই আপনি যেসব জিনিস ভালোবাসেন, সেগুলোর দ্বারা নিজেকে বেঁধে রাখবেন না। আপনি যা পেতে মরিয়া হয়ে ছুটছেন, অতিরিক্ত আসক্তির কারণে অনেক সময় সেটিই আপনার নাগালের বাইরে চলে যায়।

আমরা সবাই পাওয়া ও হারানোর মধ্যে কষ্ট পেয়ে জীবন কাটিয়ে দিই। হারানোর ভয় করি, আবার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও করি। ফলে এগিয়ে যাব, নাকি পিছিয়ে আসব—এই দ্বিধার মধ্যে পড়ে থাকি। একটু ভেবে দেখুন, আমাদের জীবন কি এমনই নয়?

16/08/2026

পূজ্য বনভান্তে ধর্ম দেশনা

অবিদ্যা তৃষ্ণা উপাদান ক্লেশ স্কন্ধ আয়তন ধাতুই দুঃখের কারণ নির্বাণ যেতে হলে তোমরা স্বামী-স্ত্রী, পুত্র-কন্যা নিয়ে সংসারিক...
16/08/2026

অবিদ্যা তৃষ্ণা উপাদান ক্লেশ স্কন্ধ আয়তন ধাতুই দুঃখের কারণ

নির্বাণ যেতে হলে তোমরা স্বামী-স্ত্রী, পুত্র-কন্যা নিয়ে সংসারিক জীবন-যাপন করতে পারবে না। তোমাদের কাজ হল, পুনঃ গৃহী জীবনে ফিরে না যাওয়া এবং যেকোনো রমণীকে স্ত্রীরূপে দর্শন না করা। আবার আমি, আমার, আমিত্ব এধারণা সমুদয়ও ত্যাগ করতে হবে। বৌদ্ধধর্ম মতে আমি বা আত্মবাদ দুঃখমুক্তি নির্বাণ লাভের অন্যতম প্রধান অন্তরায়। আমি বললে মিথ্যাদৃষ্টি উদয় হয়। মিথ্যাদৃষ্টি উদয়ে নির্বাণ সুখকে বিশ্বাস করা যায় না। মনচিত্ত মধ্যে মিথ্যাদৃষ্টি ভাব বিদ্যমান থাকলে মার থাকে। আর মার নির্বাণ গমনের পথে নানাবিধ বাধা-বিপত্তি সৃষ্টি করে দেয়, অন্তরায় ঘটায়। সর্বোপরি যেকোনো উপায় অবলম্বন করেই হোক নির্বাণ লাভ করতে দেয় না। দুঃখমুক্তি নির্বাণ লাভে বাঁধা প্রদান করা, অন্তরায় সৃষ্টি করে দেওয়া মারের কাজ। মার কি বলে জান? কেন নির্বাণ লাভ করবে, সংসারে কত প্রকারই-না ভোগ্য বিষয়ে রয়েছে, সংসারের সেসব ভোগ্য বিষয় পরিভোগ কর। জীবনকে উপভোগ কর। আমোদ প্রমোদে রত হয়ে সুখভোগ না করলে জীবনের মূল্যই বা কোথায়? স্বামী-স্ত্রী, পুত্র-কন্যা, আত্মীয়-স্বজন, ভোগ ঐশ্বর্য, মান সম্মানাদির সহিত সংসারিক জীবন-যাপনে সুখের কোনো তুলনাই হয় না। নির্বাণ লাভের এখনও অনেক সময় রয়েছে, সুতরাং আগে ভোগ সুখে রত থাক। ভোগ সুখ করার শেষে না হয় নির্বাণ লাভের চেষ্টা করবে। এখন নির্বাণ লাভ করলে তো সেসব সুখভোগ করা হতে বঞ্চিত হবে। তোমরা মারের সেসব প্রলোভনে প্রলুব্ধ হওনা। কারণ মারের সেসব সুখের আশ্বাসসমূহ মরুভূমিতে সৃষ্ট মায়া মরীচিকার ন্যায় মিথ্যা আপাত সুখ বলে দৃষ্ট হলেও সে গুলোর পরিনামে সীমাহীন দুঃখ লাভ হয়। তোমাদের মনের মধ্যে অবিদ্যা, তৃষ্ণা, উপাদান, ক্লেশ, স্কন্ধ, আয়তন, ধাতু বিদ্যমান আছে বলে তোমরা দুঃখ পাচ্ছো। সেসব বিদ্যমান না থাকলে কিছুতে দুঃখ পেতে হতো না। দুঃখ কি, দুঃখ সমুদয় কি, দুঃখ নিরোধ কি, দুঃখ নিরোধের উপায় কি তা না জানাই অবিদ্যা। সদ্ধর্মের আস্বাদ না পাওয়া, কোনো বিষয় না জানাই অবিদ্যা। আলম্বনকে ঢেকে রেখে তার যথার্থ স্বভাবকে জানতে, দেখতে, বুঝতে না দেয়া অবিদ্যার কাজ। অবিদ্যা ঠিক চক্ষুছানির মত কালো আবরণ টেনে দিয়ে আলম্বনকে ঢেকে রাখে। অবিদ্যা অনিত্যকে নিত্য, দুঃখকে সুখ, অনাত্মে আত্মাবিশ্বাস জন্মায়। তাই অবিদ্যা জ্ঞানচক্ষুর আবরণ সদৃশ। তবে অকুশল, পাপমূলক কর্ম সম্পাদনে নানা উপায় অবলম্বনে অবিদ্যার শক্তি অত্যন্ত প্রবল। অবিদ্যাই সর্ব অকুশলের মূল। যেখানে পাপ অকুশল সেখানেই অবিদ্যা। লাভের ইচ্ছা, উপভোগের ইচ্ছাকে তৃষ্ণা বলে। তৃষ্ণা আকাঙ্ক্ষিত বিষয়ে পুনঃপুন তৃষিত করে। সেই আকাঙ্ক্ষিত তৃষ্ণার কোনো শেষ নেই, একটি শেষ হতে না হতে অন্য একটি তৃষ্ণার জন্ম হয়। জল-পিপাসা নিবারণ করতে কেহ যদি লবণার্থ জল পান করে তার তৃষ্ণা যেমন আরো বর্ধিত হয় তৃষ্ণাও ঠিক সেইরূপ। তৃষ্ণা তিন প্রকার, যথা : কাম-তৃষ্ণা, ভব-তৃষ্ণা, বিভব-তৃষ্ণা। পঞ্চকামগুণ (রূপ, শব্দ, গন্ধ, রস, স্পর্শ) বিষয়ে মুগ্ধ হয়ে কামনা লিপ্তাবস্থায় সংসারে সুখভোগের ইচ্ছাই কাম-তৃষ্ণা। পুনঃপুন উন্নত জন্মধারণ করে ভব-ভবান্তরে ভোগসুখে লালায়িত হওয়ার ইচ্ছাকে ভব-তৃষ্ণা বলে। উচ্ছেদবাদী ভোগ-তৃষ্ণা অর্থাৎ উচ্ছেদ জনিত বীততৃষ্ণাকে বিভব-তৃষ্ণা বলে। বর্তমান দুঃখগ্রস্ত অবস্থা হতে ত্রাণ লাভের জন্য আত্মহনন ইচ্ছা বা আত্মহত্যাও বিভব-তৃষ্ণার অন্তর্গত। আসক্তি, দৃঢ় গ্রহণ করাকে উপাদান বলে। তৃষিত বিষয়কে দৃঢ়ভাবে গ্রহণ করে ধরে রাখা উপাদানের কাজ। সাপ যেমন ভেক অনুসন্ধান করে ধৃত ভেককে দৃঢ়ভাবে মুখে ধারণ করে রাখে। উপাদান চতুর্বিধ, যথা : কামোপদান, দৃষ্টি-উপাদান, শীলব্রতোপদান, আত্মবাদোপদান। রূপাদি পঞ্চকামগুণ হতে যে সুখভোগের তৃষ্ণা উৎপন্ন হয় সেই তৃষ্ণাকে রক্ষা করত দৃঢ়ভাবে ধরে রাখা কামোপদান। তৃষ্ণা বিষয়কে নিত্য, সুখ, শুভ মনে করা এবং সেই অভিমতকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করাই দৃষ্টি-উপাদান। তৃষ্ণার বিষয় বস্তুকে ভঙ্গুর মনে করে তা স্থায়ীত্বের জন্য ব্রতোপসনাদি পালন করাকে শীলব্রত-উপাদান বলা হয়। পঞ্চস্কন্ধ সম্পর্কে শাশ্বত ধারণা বা আমি, আমার, আমিত্ব এরূপ ধারণাতে একগুয়ে ভাবে দেহ মনের প্রতি দৃঢ় আচ্ছন্ন থাকা অবস্থাকে আত্মবাদোপদান বলা হয়। যা দ্বারা চিত্ত কলুষিত, পীড়িত, ব্যাধিগ্রস্ত, নীচ, হীন ও মলিন হয় তাকে ক্লেশ বলে। ক্লেশ দশ প্রকার, যথা : লোভ, দ্বেষ, মোহ, মান, দৃষ্টি, বিচিকিৎসা, আলস্য, ঔদ্ধত্য, নির্লজ্জতা ও নির্ভয়তা। এ ক্লেশসমূহ জন্ম জন্মান্তরের পরিভ্রমণে সত্ত্বগণকে বিবিধ প্রকারে দুঃখ-কষ্ট প্রদান করে আসতেছে। অন্যদিকে শীল, সমাধি, প্রজ্ঞা তথা কুশলকর্ম সম্পদানে বাধা প্রদান, কষ্ট দেওয়া ক্লেশসমূহের কাজ। স্কন্ধ বলতে রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার, বিজ্ঞান এ পঞ্চস্কন্ধকে বুঝায়। কাণ্ড, শিকড়, ডালপালা, পল্লবাদি সংযোগে স্থিত আকার বিশেষকে বৃক্ষ বলে অভিহিত করা হয়। ঠিক তদ্রূপ রূপের (চতুর্মহাভূত, যথা : পৃথিবী, আপ, তেজ, বায়ু) রাশি, বেদনার (অনুভূতি) রাশি, সংজ্ঞার (হুঁশ বা প্রাথমিক ধারণা) রাশি, সংস্কারের (জানা, যা দ্বারা অমুক হতে সমুককে পৃথক করে জানা যায়) রাশি, বিজ্ঞানের (চিত্ত, মানসিক বৃত্তি নিচয়ের আধার) রাশির সমবায়ে যে জীব বা ব্যক্তি প্রকাশ পায় তাই পঞ্চস্কন্ধ। চক্ষুদ্বারাদি ও রূপাদি আলম্বনের সংযোগে যা সর্বত্র প্রসারিত হয় তাই আয়তন। আয়তন অর্থ উৎপত্তি-স্থান, উৎপত্তি-ভূমি। যেমন-চক্ষু রূপের সমবায়ে চক্ষু-বিজ্ঞানের উৎপত্তি। ঠিক তদ্রূপ শ্রোত্র ও শব্দের সমবায়ে শ্রোত্র-বিজ্ঞান; ঘ্রাণ ও গন্ধের সমবায়ে ঘ্রাণ-বিজ্ঞান; কায় ও স্পৃষ্টব্যের সমবায়ে কায় বিজ্ঞান; মন ও ধর্মের সমবায়ে মন-বিজ্ঞান উৎপত্তি হয়। এভাবে আয়তনের সাহায্যে চক্ষু-ইন্দ্রিয়াদির ও রূপ-আলম্বনাদি সংযোগের বিজ্ঞান উৎপত্তি হয়। চক্ষু, শ্রোত্র, ঘ্রাণ, জিহ্বা, কায়, মন আধ্যাত্মিক আয়তন ও রূপ, শব্দ, গন্ধ, রস, স্পর্শ, বাহ্যিক আয়তন ভেদে আয়তন দ্বাদশ প্রকার। স্ব স্ব স্থানে প্রবর্তিত হয় বলেই ধাতু। অর্থাৎ যা স্বীয় স্বীয় স্বভাব বহন, ধারণ করে তা ধাতু। ধাতু অষ্টাদশ প্রকার, যথা : চক্ষু ধাতু, শ্রোত্র ধাতু, ঘ্রাণ ধাতু, জিহ্বা ধাতু, কায় ধাতু, মন ধাতু, রূপ ধাতু, শব্দ ধাতু, গন্ধ ধাতু, রস ধাতু,স্পর্শ ধাতু, মন ধাতু ও চক্ষু-বিজ্ঞান ধাতু, শ্রোত্র-বিজ্ঞান ধাতু, ঘ্রাণ-বিজ্ঞান ধাতু, জিহ্বা-বিজ্ঞান ধাতু, কায়-বিজ্ঞান ধাতু, মন-বিজ্ঞান ধাতু। এই অষ্টাদশ প্রকার ধাতুর ধর্মে সংসারে দুঃখ ফল ধারণ করে। অবিদ্যা, তৃষ্ণা, উপাদান, ক্লেশ, স্কন্ধ, আয়তন, ধাতু হতে মুক্ত হলে অরহত্ব লাভ হয়। তাতে প্রকৃত সুখের সন্ধান মিলে।

শ্রদ্ধেয় বনভন্তে বলেন, সংসারে সবাই সুখভোগের আকাঙ্ক্ষায় মত্ত। তোমরা সুখভোগ করা হতে বিরত থাক। সুখভোগের ইচ্ছা করলে বিবিধ দুঃখে পতিত হবে। অজ্ঞজনেরা দেখতে পায় না যে, সুখভোগের পিছনে ছুটতে গিয়ে তারা অশেষ প্রকার দুঃখ-কষ্ট ডেকে আনে মাত্র। তাদের সে সুখভোগের আশা আকাঙ্ক্ষা কখনো মঙ্গল বয়ে আনে না। কারণ সুখভোগে মত্ত ব্যক্তি অকুশল, পাপমূলক কর্ম সম্পাদন করতেও পিছ পা হয় না। উপরন্তু সুখভোগে প্রকৃত সুখ লাভ হয় না, এবং ভোগ্যবিষয় প্রকৃত সার, সত্য বস্তুও নয়। বরং ভোগ্য বস্তু সুখভোগের আশা কল্যাণকর পথ রুদ্ধ করে দিয়ে থাকে। অন্যদিকে, সুখভোগের দ্বারা কখনো তৃপ্তি লাভ হয় না। বরঞ্চ ভোগের আকাঙ্ক্ষা শেষ হবার আগেই সত্ত্বদেরকে মৃত্যুবরণ করতে হয়। কিন্তু সুখভোগের চিন্তায় মগ্ন থেকে সত্ত্বগণ মৃত্যুর পদধ্বনি শুনতে পায় না। তবে মৃত্যু যথাসময়ে হাজির হয়ে তার উদ্দেশ্য সিদ্ধ করতে কোনো ভুল করে না। তাই তোমরা সুখভোগ করাকে লজ্জা, ভয় জ্ঞান করে দর্শন করত সুখভোগ ত্যাগ কর। সুখভোগ ত্যাগ করতে পারলে অকুশলকর্ম সম্পাদন করা হতে নিজকে উদ্ধার করতে সক্ষম হবে। সুখভোগ করা হতে নিজকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত রাখতে পারলে নির্বাণ সুখও লাভ হয়। যে সুখলাভ হলে আর কোনো কিছু সুখের প্রয়োজন হয় না। বিমুক্তি সুখের রসে তখন মন-প্রাণ মহা পরিতৃপ্তির অবগাহনে সিক্ত হয়ে যায়। তাই প্রকৃত সুখ লাভ করতে হলে নির্বাণ সুখলাভের কোনো বিকল্প নেই।

তোমরা আত্ম বা নিজকে জয় কর। ‘আমি মানুষ’, ‘সে পুরুষ’, ‘সে মহিলা’ এধারণাসমূহকে জয় কর। মারকে অর্থাৎ সুখভোগে আসক্ত হয়ে থাকা মনকে জয় কর। কারণ মনচিত্তের মধ্যে আমি বা আত্মবাদ থাকলে অহংকার উৎপন্ন হয়। আমি ‘মানুষ-পুরুষ-মহিলা’ এ ধারণাসমূহ বিদ্যমান থাকলে অজ্ঞান উৎপন্ন হয়। আর মার বা সুখভোগে আকাঙ্ক্ষিত মন সর্বদা বিবিধ কর্মে নিয়োজিত হয়ে সুখ-দুঃখের আবর্তে আবদ্ধ হয়ে থাকে। সুখভোগের বাসনা দ্বারা সত্ত্বগণ সুখ-দুঃখের খোলস ছেড়ে সার, সত্যকে উপলব্ধি করতে পারে না। বলা যায়, মারের প্রভাবে সত্ত্বগণকে বিবিধ প্রকার দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছে। তাই আত্মজয়, মানুষজয়, মারজয় করে নির্বাণ যেতে হয়। তোমরাও সকল প্রকার দুঃখ-কষ্টের শিকার হওয়ার হাত থেকে মুক্তি লাভের জন্য আত্ম-মানুষ-মার জয় করে নির্বাণ পরম সুখে অবস্থান কর।

স্বামী-স্ত্রী, পুত্র-কন্যা, আত্মীয়-স্বজন, বিপুল ধন-ঐশ্বর্য (যেমন এয়ার কন্ডিশনের বহুতলা ভবন, উন্নত মানের গাড়ী, কোটি কোটি অর্থবিত্তের ছড়াছড়ি), যশ-সম্মান, প্রভাব-প্রতিপত্তির দ্বারা জাগতিক সুখ-স্বাচ্ছন্দে জীবন-যাপন করাকে লৌকিক হীনসুখই বলা যায়। কারণ এ সকল সুখের মধ্যে কখনো পরিতৃপ্তি নেই, প্রকৃত সুখ লাভ হয় না। ভোগ-বিলাস সুখভ্রমে দুঃখই আনয়ন করে থাকে সার। ঐশ্বর্য সুলভ ভোগ-বিলাসে প্রকৃত সুখের লেশমাত্র নেই। একমাত্র ত্যাগের দ্বারাই প্রকৃত সুখের সন্ধান মিলে। তাই-তো বলি, তোমরা ভোগের পিছনে ছুটে হীনসুখের প্রত্যাশা করবে না। লৌকিক হীনসুখের প্রত্যাশী হলে উৎকৃষ্ট লোকোত্তর সুখলাভে সমর্থ হবে না। কারণ হীনপন্থা অবলম্বনে শ্রেষ্ঠ কিছু লাভ হয় না, শ্রেষ্ঠ অবলম্বনেই শ্রেষ্ঠত্ব লাভ হয়। অর্থাৎ হীনত্বই অগ্রত্ব হয় না, অগ্রত্ব দ্বারাই অরহত্ব লাভ হয়। বুদ্ধ বলেছেন ভোগ লাভের পথ এক, আর নির্বাণের পথ অন্য। দুইটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাই নির্বাণ পথের পথিককে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে, ভোগের দিকে যেন তার মন ধাবিত না হয়। ভোগ-বিলাসের পারিপার্শ্বিক প্রলোভনের ফাঁদ হতে দূরে থাকার জন্য তাকে চক্ষু বিদ্যমান থাকা সত্বেও অন্ধ তুল্য, মুক ও বধির না হয়েও মুক, বধির তুল্য এবং শক্তি, প্রাণ (জীবন) বিদ্যমানেও দুর্বল, মৃতবৎ হয়ে থাকতে হয়। তোমরা নির্বাণসুখ প্রত্যক্ষ করার জন্যে; যে মহৎ লাভের উদ্দেশ্যে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেছ তা সফল ও শ্রীবৃদ্ধি করণে অবশ্যই হীন সুখ, হীনতৃষ্ণা, হীনসংস্কার সর্বতোভাবে পরিহার কর। এবং অপ্রমত্বভাবে শ্রেষ্ঠত্ব লাভের সাধনায় আত্মনিয়োগ করতে চেষ্টা শীল হও। মানুষ (অর্থাৎ ‘আমি মানুষ’ এ ধারণা) হীন, তৃষ্ণা (সুখভোগের প্রবল আকাঙ্ক্ষা) হীন, সংস্কার (সর্বদা নানাবিধ কর্মে নিয়োজিত থাকা) হীন। তাই তোমরা হীনমানুষ, হীনতৃষ্ণা, হীনসংস্কার পরিত্যাগ কর। তাহলে মহৎ সদর্থ পরিপূর্ণ হবে।

বনভন্তে বলেন, স্বামী-স্ত্রী হয়ে হীন গৃহী জীবন-যাপন করা বৌদ্ধধর্মের আদর্শ নয়। প্রকৃত বৌদ্ধধর্মের মত কি জান? সাধারণত পুরুষ মহিলাগণ যে পরস্পর পরস্পরকে স্বামী-স্ত্রীরূপে গ্রহণ করে সংসারী জীবনাচারণ করে তা পাপজনক, অকুশলমূলক কর্ম ছাড়া কিছুই নয়। বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে স্বামী-স্ত্রী হবার অর্থ দাঁড়ায় অকুশলকর্ম সম্পাদনের সঙ্গী জুটা। বলা যায়, অধিক পরিমাণে পাপ, অকুশল সম্পাদনে বাধ্য করার জন্য মার তাদেরকে একে অপরকে সঙ্গী সংগ্রহ করে দেয়। কারণ একজনে বা একাই যতটুকু পাপ, অকুশলকর্ম সম্পাদন করা যায় দুইজনে মিলেমিশে করলে তার চেয়ে অনেক বেশি পাপকর্ম সম্পাদিত হয়। বিয়ে করে স্বামী-স্ত্রী হওয়াকে আমি নির্লজ্জতার কাজই বলে থাকি। যাদের পাপের প্রতি লজ্জা নেই এবং যারা দুঃখকে ভয় করে না তারা একে অপরকে স্বামী-স্ত্রীরূপে বরণ করে নেয়। যারা পাপের প্রতি লজ্জাশীল ও সংসার দুঃখের প্রতি ভয়শীল তারা কিছুতেই বিয়ে করতে পারে না। তদুপরি আজকে যাকে নববররূপে প্রাণসম প্রিয় মনে করে বা নববধূরূপে গ্রহণ করতেছে আগামীকাল সে বধূ মৃত্যুবরণ করতে পারে। অথবা তার উল্টো নববরও মারা যেতে পারে। তাহলে কোথায় স্বামীরূপে থাকল? কোথায় বা স্ত্রী? সবই মিথ্যায় পরিণত হয়ে গেল নয় কি। অশ্রুঝরা নয়নে তখন শুধু দুঃখ রয়ে যাবে সার। কাজেই বিয়ে করে একে অপরকে আমার স্বামী, আমার স্ত্রী মনে করা কখনো যুক্তিযুক্ত নয়। এবম্বিধ চিন্তা করেই তো আমি সংসারী জীবন পরিত্যাগ করে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করত নির্বাণ লাভের চেষ্টাশীল হয়েছিলাম। তোমাদেরকেও বলছি- সংসারী হবার দূরের কথা, তোমরা কোনো রমণী কত মনোজ্ঞ, সুশ্রী কিনা সেরূপেও দর্শন করার চেষ্টা করবে না। কারণ মনোজ্ঞ, সুশ্রী নিমিত্ত দর্শনে তা লাভের তৃষ্ণা উৎপন্ন হয়। সে তৃষ্ণা ক্রমান্বয়ে সমস্ত চিত্তকে অধিকার করে বসে। চোর যেমন সুযোগ পেলে গৃহস্থের সব সম্পত্তি চুরি করে নিয়ে যায়, তেমনি কাম-তৃষ্ণাও তোমাদের সমস্ত পুণ্য, জ্ঞানসমূহ অপহরণ করে নিয়ে যাবে। তখন তোমাদের সর্বস্বান্ত হয়ে অতীব দুঃখময় জীবন-যাপন করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। ইন্দ্রিয়াসক্তি বা কাম তৃষ্ণা যাকে একবার অধিকার করে বসে তার জীবনে দুঃখ অনিবার্য। কাম তৃষ্ণায় নিপীড়িত ব্যক্তির চিত্ত সর্বদা দুঃখের মধ্যে অবস্থান করে।

মিথ্যাদৃষ্টি-সম্পন্ন পুদ্গলেরা পরকাল, কর্মফল, কুশলাকুশল ও চারি আর্যসত্য বুঝতে পারে না। এবং সে-সকল সত্যকে বুঝতে, জানতেও আগ্রহী নয় তারা। তারা নিজের অভিমতকে আঁকড়ে রেখে অন্য সবকিছুকে মিথ্যা বলে বাতাসে উড়িয়ে দেয়। বুদ্ধ বলেছেন, মিথ্যাদৃষ্টির ন্যায় দূষণীয় জগতে দ্বিতীয় আর নেই। যত প্রকার দোষের হেতু একমাত্র মিথ্যাদৃষ্টি। মিথ্যাদৃষ্টি সত্ত্বগণকে দিকভ্রান্ত পুরুষের ন্যায় বিপরীতমার্গে ধাবিত করায়। তাই মিথ্যাদৃষ্টি অতিশয় দূষণীয়। মিথ্যাদৃষ্টি-পরায়ণের কোনো কথায় কর্ণপাত না করা ও বিশ্বাস না করাই উত্তম। মিথ্যাদৃষ্টি-পরায়ণ ব্যক্তি মহাপাপী, তারা শুধু অকুশলকর্মই সম্পাদন করে থাকে। মিথ্যাদৃষ্টির বশীভূত না হয়ে তোমরা সকলে সম্যকদৃষ্টি-সম্পন্ন হও। সম্যক্‌দৃষ্টি অর্থ যথার্থ সত্য, সঠিকভাবে দর্শন। এক কথায়, যে যেমন তাকে তেমনভাবে দর্শন করাই সম্যক্‌দৃষ্টি। অর্থাৎ গাছকে গাছ এবং বাঁশকে বাঁশরূপেই দেখা। সম্যক্‌দৃষ্টি দুই প্রকার, যথা : লৌকিক সম্যক্‌দৃষ্টি ও লোকোত্তর সম্যক্‌দৃষ্টি। পরকাল, কর্মফলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস স্থাপন করাকে লৌকিক সম্যক্‌দৃষ্টি বলে। চারি আর্যসত্য, যথা : দুঃখ, দুঃখ সমুদয়, দুঃখ নিরোধ, দুঃখ নিরোধের উপায় এ চারি প্রকার মহা সত্যে অটল বিশ্বাস স্থাপন করাকে লোকোত্তর সম্যক্‌দৃষ্টি বলে। লৌকিক সম্যক্‌দৃষ্টি পুদ্‌গলেরা মৃত্যুর পর স্বর্গ লাভ করে দিব্যসুখের অধিকারী হয়। লোকোত্তর সম্যক্‌দৃষ্টি পুদ্‌গলেরা আসবক্ষয় করে ইহজন্মে নির্বাণ সুখ প্রত্যক্ষ করে থাকে। যারা বর্তমানে মনুষ্যজীবন লাভ করেও প্রাণিহত্যা, চুরি, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী, মারামারি, কাটাকাটি, ব্যভিচারে রত, মিথ্যা-কটু-ভেদ-বৃথা বাক্য প্রয়োগ, মদ, গাজা, আফিং, হেরোইন গ্রহণ করত নানা অকুশলমূলক, অশান্তিমূলক কর্মাদি সম্পাদনে রত হয় তারা মিথ্যাদৃষ্টি-সম্পন্ন। দেহত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে নিরয়গামী হতে হবে। তারা যদি ন্যূনতম লৌকিক সম্যক্‌দৃষ্টি-সম্পন্ন হতো তাহলে সে সকল অকুশল, পাপ উৎপাদক কর্ম সম্পাদনে বিরত থাকত। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বর্তমানে প্রায় সবাই মিথ্যাদৃষ্টি-সম্পন্ন পুদ্‌গল। তারা পরকাল কি? কর্মফল কি? কুশলাকুশল কি সে সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। এবং দুঃখ কি, দুঃখ-সমুদয় কি, দুঃখ-নিরোধ কি, দুঃখ-নিরোধের উপায় কি? সে সম্বন্ধেও অজ্ঞ। ভ্রান্ত ধারণার বশীভূত হয়ে তারা অসত্য বিষয়ে সত্যান্বেষী, অসার বিষয়ে সারান্বেষী হয়ে পরে থাকে। ফলে মিথ্যার বেড়াজালে হাবুডুবু খেয়ে সার, সত্য ধর্মসমূহ উপলব্ধি করতে পারছে না। আবার কুশলধর্ম ত্যাগ করে অকুশল, পাপধর্মই সম্পাদন করতে বাধ্য হচ্ছে। আমি জ্ঞানযোগে দেখতে পায় যে, বর্তমানের মনুষ্যগণ দেহত্যাগের পর শতকরা সাতানব্বই/আটানব্বই জনই নিরয়গামী হয়। বাকী দুই কি তিনজন মাত্র সদগতি প্রাপ্ত হয়ে থাকে।

পরিশেষে তিনি বলেন, তোমরা কায়-ভাবনা, চিত্ত-ভাবনা কর। ভাবনা অর্থ মনের কাজ, জ্ঞান উৎপাদক চিন্তা। স্বীয় চিত্তকে পরিশুদ্ধ করার্থে নিষ্পাপ, পবিত্র বিষয় স্মরণ করে পাপচেতনা হতে বিরত রেখে প্রজ্ঞা সংরক্ষণ, প্রবৃদ্ধি করণ করাই ভাবনা। দশ অশুভ ও বত্রিশ প্রকার কায়গতানুস্মৃতি অনুযায়ী কায়াকে অশুচি, ঘৃণ্য, দুর্গন্ধরূপে ভাবনা করত দেহের প্রতি লোভ, আসক্তি পরিত্যাগ করাই কায়-ভাবনা। কায় ভাবনা দ্বারা লোভ, তৃষ্ণা, অজ্ঞান, সৌন্দর্য স্পৃহা ধ্বংস হয়ে যায়। কায়-ভাবনা না করলে সেসব দিন দিন বেড়েই চলে। চিত্ত উৎপন্ন মাত্রেই নিরোধ শীল। কোনো চিত্ত আমি নয়, আমার নয় এভাবে সর্ববিধ চিত্তে অনাসক্ত থাকাই চিত্ত ভাবনা।

তোমরা যখন প্রব্রজিত হয়েছ এখন তোমাদের আসল কাজ হচ্ছে অজ্ঞানতামূলক কর্মসমূহ পরিত্যাগ করে জ্ঞান উৎপাদক কর্ম সম্পাদন করা। অজ্ঞান বা অবিদ্যা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হলে সুখের অধিকারী হতে পারবে। অবিদ্যাকে নিরোধ করত বিদ্যা উৎপন্ন করেই নির্বাণ সুখ প্রত্যক্ষ করতে হয়।

সাধু, সাধু, সাধু।

পঞ্চস্কন্ধে আসক্ত হয়ে অবস্থান করো নাতোমরা যদি অজ্ঞান অবস্থায় ‘আমি মানুষ’ এ ধারণা পোষণ কর ও মারের সহিত অবস্থান কর তাহলে প...
13/08/2026

পঞ্চস্কন্ধে আসক্ত হয়ে অবস্থান করো না

তোমরা যদি অজ্ঞান অবস্থায় ‘আমি মানুষ’ এ ধারণা পোষণ কর ও মারের সহিত অবস্থান কর তাহলে প্রব্রজিত জীবনে কি সুখ লাভ হয় তা বুঝতে পারবে না। চারি আর্যসত্য জ্ঞান উদয়, স্থিতি এবং চারি আর্যসত্যকে যথার্থরূপে হৃদয়ঙ্গম করলে প্রকৃত সুখ লাভ হয়। চারি আর্যসত্য জ্ঞান, প্রতীত্যসমুৎপাদ-নীতি জ্ঞান, আসবক্ষয় জ্ঞান লাভ করতে অপারগ হলে প্রব্রজিত জীবন দুর্বিষহ দুঃখের হয়। আর সুষ্ঠুভাবে প্রব্রজিত জীবন-যাপন করা সুকঠিন হয়ে উঠে। তবে প্রব্রজিত হয়ে যদি সুখভোগ হতে বিরত থাকা যায়, ‘আমি মানুষ’, ‘সে পুরুষ’, ‘সে মহিলা’ এ ধারণাসমূহ ত্যাগ এবং আমি, আমার, আমিত্ব পরিত্যাগ করা যায় তাহলে প্রব্রজিত জীবন সুখের হয়। আবার, চারি আর্যসত্য জ্ঞান, প্রতীত্যসমুৎপাদ-নীতি জ্ঞান, আসবক্ষয় জ্ঞান লাভ হলে প্রব্রজিত জীবন সার্থক করত নির্বাণ লাভ করা সহজ হয়। সেই জ্ঞানসমূহ কীরকম? দুঃখে জ্ঞান, দুঃখ-সমুদয়ে জ্ঞান, দুঃখ-নিরোধে জ্ঞান, দুঃখ-নিরোধগামিনী প্রতিপদায় জ্ঞান, এই চারি আর্যসত্য সম্বন্ধে জ্ঞান। অবিদ্যা কারণে সংস্কার, সংস্কারের কারণে বিজ্ঞান, বিজ্ঞানের কারণে নামরূপ, নামরূপের কারণে ষড়ায়তন, ষড়ায়তনের কারণে স্পর্শ, স্পর্শের কারণে বেদনা, বেদনার কারণে তৃষ্ণা, তৃষ্ণার কারণে উপাদান, উপাদানের কারণে ভব, ভবের কারণে জাতি, জাতির কারণে জরা-মরণাদি এই দ্বাদশ নিদান তত্ত্ব বা ভবচক্র সম্বন্ধে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে জ্ঞান। কামাসব, ভবাসব, মিথ্যাদৃষ্টি-আসব, অবিদ্যা-আসব এই চতুর্বিধ আসব সম্বন্ধে জ্ঞান। অন্যদিকে অবিদ্যা, তৃষ্ণা, উপাদানের সহিত বৌদ্ধধর্ম আচরণ করলে দুঃখ পেতে হয়। অবিদ্যা, তৃষ্ণা, উপাদান থাকলে বৌদ্ধধর্ম আচরণ, অনুশীলন প্রতিপালন করা সম্ভব নয়। কারণ প্রকৃত বৌদ্ধধর্মে অবিদ্যা, তৃষ্ণা, উপাদানের কোনো স্থান নেই। বৌদ্ধধর্ম সকল প্রকার অবিদ্যা, তৃষ্ণা, উপাদান হতে মুক্ত।

পঞ্চস্কন্ধ দু’ভাগে বিভক্ত। যথা : ১) যারা মার্গফললাভী তারা পঞ্চস্কন্ধকে অনিত্য, দুঃখ, অনাত্মরূপে দর্শন করে থাকে। তারা পঞ্চস্কন্ধের মধ্যে কোনো প্রকার প্রিয়, প্রেম, ভালোবাসা ভাব উদয় করেন না। এবং পঞ্চস্কন্ধে আসক্ত হয়ে অবস্থান করেন না। তাই তারা পরম সুখে অবস্থান করতে সমর্থ হন। ২) যারা মার্গফললাভী নয় পৃথকজন, তারা পঞ্চস্কন্ধকে নিত্য, সুখ, আত্মরূপে দর্শন করে থাকে। তারা পঞ্চস্কন্ধের মধ্যে প্রিয়, প্রেম, ভালোবাসা ভাব উদয় করত পঞ্চস্কন্ধে আসক্ত হয়ে অবস্থান করে। তাদের সেই মিথ্যা, বিপরীত দর্শনের হেতুতে তারা দুঃখ পেতেই থাকে। তাই বলছি তোমরা পঞ্চস্কন্ধকে অনিত্য, দুঃখ, অনাত্মরূপে দর্শন কর। পঞ্চস্কন্ধের প্রতি কোনো প্রকার প্রিয়, প্রেম, ভালোবাসা ভাব উদয় করবে না। এতে তোমরা পরম সুখে অবস্থান করতে পারবে। অন্যদিকে, তোমরা যদি পঞ্চস্কন্ধকে অনিত্য, দুঃখ, অনাত্মরূপে দর্শন করতে সমর্থ হও তাহলে কোনো রমণীর রূপের মোহে মোহিত হবে না। এবং রমণী দর্শনে সুন্দর, শুচি এরূপ ভাবও উদয় হবে না। অর্থাৎ সাধারণত রমণীরূপে পুরুষের এবং পুরুষের রূপে রমণীর যে একটা দুর্বলতা ভাব থাকে; একে অপরের রূপে মোহিত হয়; আকর্ষণ ভাব উৎপন্ন করে থাকে তা কিছুতে উদয় হবে না। তোমরা যখন প্রব্রজিত হয়েছ এখন তোমাদেরকে সত্বর নির্বাণ লাভের চেষ্টায় তৎপর হতে হবে। তোমরা সর্বদা পঞ্চস্কন্ধকে অনিত্য, দুঃখ, অনাত্মরূপে দর্শন করবে। অনিত্য, দুঃখ, অনাত্ম জ্ঞান করে পঞ্চস্কন্ধকে পরিত্যাগ করবে। পঞ্চস্কন্ধকে পরত্যাগ করতে পারলে দীর্ঘকাল হিতসুখ সাধিত হবে। পঞ্চস্কন্ধে আসক্ত হলে মহাদুঃখ উৎপন্ন হওত অশেষ প্রকারে দুঃখ প্রদান করতে থাকে। তাই বুদ্ধ বলেছেন :

যে পঞ্চস্কন্ধ ভালোবাসে দুঃখকে সে বাসে ভালো,

দুঃখকে যে ভালোবাসে দুঃখ হতে চিরকাল।

মুক্তি কভু নাহি লভে কহে বুদ্ধ ভগবান,

সে কারণে পঞ্চস্কন্ধে প্রেম নাহি করহ ধীমান।

পঞ্চস্কন্ধকে অনিত্য, দুঃখ, অনাত্ম, অশুচিরূপে দর্শন করত সেখানে প্রিয়, প্রেম, ভালোবাসা ভাব উৎপন্ন করবে না। বরঞ্চ পঞ্চস্কন্ধে বীততৃষ্ণা উৎপন্ন করে নির্বাণ লাভে সচেষ্ট হও। পঞ্চস্কন্ধকে ত্যাগ করতে পারলে নির্বাণ লাভ করা যায়। কিন্তু পঞ্চস্কন্ধে আসক্ত থাকলে কিছুতেই নির্বাণ লাভ হয় না।

শ্রদ্ধেয় বনভন্তে আরো বলেন, তোমরা যদি মারভুবনে অবস্থান করতে চাও তাহলে নির্বাণ সুখ লাভ হবে না। অমারভুবনে অবস্থান করতে পারলে তবেই নির্বাণ সুখ লাভ হয়। একসময় জনৈক তালুকাদার বাবু অগ্রবংশ ভন্তের সমীপে জিজ্ঞাসা করেছিল- ভন্তে, নির্বাণ সুখ কোথায় অনুভব হয়? সেদিন ভিক্ষুসঙ্ঘ হতে কেহ উত্তর প্রদান করতে সমর্থ হয়নি। নির্বাণ সুখ কোথায় অনুভব হয় তার উত্তরে বলতে হবে মনচিত্ত যদি অমারভুবনে অবস্থান করে তাহলে নির্বাণ সুখ অনুভব হয়। একমাত্র অমারভুবনেই নির্বাণ সুখ অনুভব করা সম্ভব। অর্থাৎ মারভুবনে মনচিত্ত থাকলে কিছুতেই নির্বাণ লাভ করা সম্ভবপর নয়। মনচিত্তকে মারভুবন থেকে অমারভুবনে নিয়ে যেতে পারলে নির্বাণ সুখ উপলব্ধি করা যায়। তাই ভগবান বুদ্ধ মনচিত্তকে অমারভুবনে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিদর্শন ভাবনা করতে উপদেশ দিয়েছিলেন। মনচিত্তকে মারভুবন হতে অমারভুবনে নিয়ে যাওয়ার একমাত্র উপায় হল এ বিদর্শন ভাবনা। বিদর্শন ভাবনা করা অর্থ জ্ঞানের সহিত আপন কাজ করা। মনচিত্ত যদি মারভুবনে অবস্থান করে তাহলে খুব দুঃখ পেতে হয়। মারভুবনে যে সব ধর্ম, কর্ম সম্পাদন করা হয় তা সবই পাপ, অকুশল। তোমরা ধর্ম, কর্ম উভয় ত্যাগ করে নির্বাণ লাভে সচেষ্ট থাক। কারণ নির্বাণ লাভ বা অমারভুবনে ধর্ম সম্পাদনেরও প্রয়োজন নেই, কর্ম সম্পাদনেরও প্রয়োজন নেই। মারভুবনে যে সমস্ত ধর্ম, কর্ম করা হয় তা সবই পরধর্ম, পরকাজ। পরধর্ম, পরকাজ সম্পাদন করলে নির্বাণ লাভ করা সম্ভবপর হয়ে উঠে না। তোমরা পরধর্ম, পরকাজ ত্যাগ করে সদ্ধর্ম অনুশীলন কর। সদ্ধর্ম অনুশীলনের মাধ্যমে নির্বাণ লাভ হয়। সদ্ধর্ম অর্থ আপন কাজ, আপন ধর্মকে করা বুঝায়। চারি আর্যসত্য জ্ঞান, প্রতীত্যসমুৎপাদ-নীতি জ্ঞান, আসবক্ষয় জ্ঞান লাভের প্রচেষ্টা করাকে আপন কাজ বলে। এক কথায়, সদ্ধর্ম জ্ঞান লাভ করার প্রচেষ্টাই আপন কাজ। নির্বাণসুখ প্রত্যক্ষ করতে সদ্ধর্ম লাভ করাকে আপন ধর্ম বলে। পরধর্ম, পরকাজ সর্বদা পরিত্যাজ্য। কারণ সেসবই মারভুবন। তোমাদের মনচিত্ত মারভুবনে অবস্থান করলে যে কাজ করো না কেন দুঃখই পাবে সার। যেহেতু মারভুবনে মার্গফল নির্বাণ সুখ কিছুতে লাভ হয় না। উপরন্তু প্রকৃত বৌদ্ধধর্ম আচরণ করাও সম্ভব হয় না। তখন বৌদ্ধধর্ম আচরণ করতে সুখও অনুভব হয় না। বলা যায়, মারভুবন বৌদ্ধধর্ম আচরণের অনুকুল অবস্থা নয়।

‘আমি মানুষ’ এ ধারণা, ‘সে পুরুষ’ এ ধারণা, ‘সে মহিলা’ এ ধারণা নিয়ে সুখভোগে রত থাকলে, পাপধর্ম আচরণের মাধ্যমে সুখ আকাঙ্ক্ষা করলে মাররাজ্যের মধ্যে অধীন হয়ে থাকতে হয়। তাই তোমরা ‘আমি মানুষ’, ‘সে পুরুষ’, ‘সে মহিলা’ এ ধারণাসমূহ ত্যাগ কর। তাহলে মাররাজ্য ত্যাগ করে নির্বাণরাজ্যে পৌঁছতে সক্ষম হবে। নির্বাণরাজ্যে ‘আমি মানুষ’, ‘সে পুরুষ’, ‘সে মহিলা’ এ ধারণাসমূহ নেই। আর সেসব ধারণাসমূহ মনচিত্ত হতে বিদূরিত হলে প্রকৃত বৌদ্ধধর্মের রসাস্বাদন বা নির্বাণ লাভ হয়। তোমরা বৌদ্ধধর্মের প্রকৃত রসাস্বাদন করত নির্বাণ লাভের চেষ্টাশীল হও।

তিনি বলেন, অবিদ্যাচ্ছন্ন বা অজ্ঞান হয়ে অবস্থান করো না। অজ্ঞান হয়ে অবস্থান করলে সংসারের প্রতি তৃষ্ণা উৎপন্ন হয়ে দুঃখ পেতে হবে। তখন জীবন দুর্বিষহ দুঃখে হাহাকার হয়ে উঠবে। তোমরা সর্বদা জ্ঞানের সহিত অবস্থান কর। বুদ্ধের উপদেশ হল চক্ষু থাকতে অন্ধের ন্যায়, কর্ণ থাকতে বধিরের ন্যায়, জ্ঞান থাকতে বোবার ন্যায়, শক্তি থাকতে দুর্বলের ন্যায়, প্রাণ থাকতে মৃতের ন্যায় হয়ে অবস্থান করা। এরূপে অবস্থান করতে সক্ষম হলে নির্বাণ লাভ হয়। যেকোনো দৃশ্যমান আলম্বন চক্ষু-ইন্দ্রিয়ে দৃষ্টিগোচর হলেও অন্ধের ন্যায় তা দর্শন হতে বিরত থাকতে পারাই জ্ঞান। অনুরূপভাবে কোনো শব্দ কর্ণগোচরে প্রবিষ্ট হবার আগে তা ত্যাগ করণ; শক্তি প্রয়োগ করতে উদ্যত হবার পূর্বে তা প্রশোমন করণ এবং মৃত ব্যক্তির ন্যায় সর্ববিধ কার্যাদিতে বিরত থাকাই জ্ঞান। তোমরা এভাবে অন্ধ, বধির, বোবা, দুর্বল, মৃতের ন্যায় হয়ে অবস্থান কর। অবস্থান করতে পারবে তো? যদি পার তাহলে তোমরা জ্ঞানী বলে জানবে। তেমন জ্ঞানীদের পক্ষে সবসময় সংযমতা ভাব রক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু অজ্ঞানীরা সংযম রক্ষা করতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়। বুদ্ধ বলেছেন, জ্ঞানী ব্যক্তি স্বল্প সুখ পরিত্যাগ হেতু যদি বিপুল সুখে সম্ভাবনা দেখে তাহলে জ্ঞানী ব্যক্তি অবশ্যই স্বল্প সুখ ত্যাগ করে থাকে। লৌকিক সুখ হল স্বল্প সুখ আর লোকোত্তরসুখ হল বিপুল সুখ। জ্ঞানী ব্যক্তিরা স্বল্প সুখের প্রলোভনে প্রলুব্ধ হয়ে বিপুল সুখকে হাতছাড়া করে না। তারা স্বল্প সুখকে থুথুবৎ ত্যাগ করে বিপুল সুখের অধিকারী হয়। কিন্তু অজ্ঞানীরা স্বল্প সুখকে ত্যাগ করতে অক্ষম। তাই তারা বিপুল সুখ কখনো লাভ করতে পারে না। তবে ইহা ঠিক যে, স্বল্প সুখ সহজে লাভ হয়, পক্ষান্তরে বিপুল সুখের জন্য প্রয়োজন দৃঢ় পরাক্রম। কাজেই তোমরা লৌকিক সুখ ত্যাগ করে লোকোত্তর সুখ লাভের জন্য দৃঢ় পরাক্রম উৎপন্ন কর। স্বামী-স্ত্রী, পুত্র-কন্যা, ধন-সম্পদ, মানযশাদি দ্বারা সাংসারিক জীবনের সুখকে লৌকিক সুখ বলে। এবম্বিধ লৌকিক সুখের মধ্যে শতকরা নিরানব্বই ভাগই দুঃখ থাকে, বাকি একভাগ মাত্র সুখ। মার্গফল লাভের ফলে অনুভূত অনবদ্য সুখকে লোকোত্তর সুখ বলে। লোকোত্তর সুখে শতভাগ পুরোই সুখ থাকে। সেখানে কোনো দুঃখ সংমিশ্রিত থাকতে পারে না। লৌকিক সুখ কলুষিত, কলঙ্কিত; কিন্তু লোকোত্তর সুখ পবিত্র, নিষ্কলঙ্ক এবং বিশুদ্ধ।

পরিশেষে তিনি বলেন, তোমরা সুখভোগ ত্যাগ কর। সুখভোগে রত থাকলে দুঃখের মধ্যে পতিত হতে হয়। মনে মনে সুখভোগের আকাঙ্ক্ষা করলে চিত্ত ভোগ্যবিষয় অনুসন্ধানে রত হয়ে সীমাহীন দুঃখ পেতে থাকে। তোমরা বুদ্ধের উপদেশ মত ভোগই দুঃখ, ত্যাগেই সুখ এই নীতি অনুসরণ করে অবস্থান করে। মনে রাখবে বুদ্ধের উপদেশেই নির্বাণ লাভ হয়। সংসারে কাম্য সুখের আশা-আকাঙ্ক্ষায় তৃষ্ণা বৃদ্ধি পায়-তৃষ্ণার পরিসমাপ্তি ঘটে না। বুদ্ধের উপদেশ, বুদ্ধের শিক্ষা, বুদ্ধের জ্ঞান লাভ ব্যতীত নির্বাণ লাভ করা সম্ভব নয়। বুদ্ধগুরুর উপদেশ, শিক্ষা ব্যতীত অন্য কারো উপদেশের মাধ্যমে নির্বাণ লাভ হয় না। নির্বাণ লাভের জন্য বুদ্ধের শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। নির্বাণ লাভেচ্ছুকদেরকে অবশ্যই বুদ্ধের শিক্ষা, উপদেশ মত পরিচালিত হতে হবে। তোমরা বুদ্ধের শিক্ষা, উপদেশ মত পরিচালিত হয়ে নির্বাণ পরম সুখে অবস্থান কর।

সাধু, সাধু, সাধু।

অসাধারণ জ্ঞান লাভ করতে চেষ্টাশীল হওভিক্ষুদের যতদিন চারি আর্যসত্য জ্ঞান লাভ না হয় ততদিন তারা আপত্তিগ্রস্ত হবে। আপত্তি ভেদ...
11/08/2026

অসাধারণ জ্ঞান লাভ করতে চেষ্টাশীল হও

ভিক্ষুদের যতদিন চারি আর্যসত্য জ্ঞান লাভ না হয় ততদিন তারা আপত্তিগ্রস্ত হবে। আপত্তি ভেদে নানাবিধ বিনয়কর্মও করতে হয় তাদেরকে। মনে রাখবে, পাপকর্মের মধ্যে মনচিত্ত থাকলে এবং পাপকে সুখ বলে মনে করলে আপত্তিগ্রস্ত হতে হয়। মনচিত্তে যদি অকুশল, ক্লেশচেতনা না থাকে তাহলে আপত্তিমুক্ত হওয়া যায়। আবার, নিত্য আপত্তিগ্রস্ত হলে তার প্রতিকার স্বরূপ বিনয় করতে করতেই তো জীবন শেষ হয়ে যাবে। তাই তোমরা চারি আর্যসত্য জ্ঞান জানতে, হৃদয়ঙ্গম করতে চেষ্টাশীল হও। তাহলে আপত্তিগ্রস্ত হবে না এবং তার প্রতিকার স্বরূপ নিত্য বিনয় কর্মও করতে হবে না। এটাই যথাযথ নিরাপদ ব্যবস্থা। আর এভাবে প্রকৃত সুখ লাভ হয়। আপত্তিগ্রস্ত হওয়াকে দুঃখ বলে জানবে। অতিসত্বর সে দুঃখ ত্যাগ করতে চেষ্টাশীল হও। বুদ্ধ ভিক্ষুসঙ্ঘকে কামসুখ ও আত্মপীড়ন অনুশীলন না করে শীল-সমাধি-প্রজ্ঞা বা মধ্যম পথ অবলম্বন করে অবস্থান করতে শিক্ষা দিয়েছেন। কামসুখ, আত্মপীড়ন হীন, দুঃখ, অনার্য, পাপজনক এবং সত্য জ্ঞান লাভের প্রতিকুল অবস্থা। তাই বলা হয়েছে কামসুখ, আত্মপীড়নের দ্বারা পাপই উৎপন্ন হয়, দুঃখ সৃষ্টি হয়, এবং অজ্ঞানতা বৃদ্ধি পায়। কামসুখ, আত্মপীড়ন ত্যাগ করতে না পারলে দিন দিন অবিদ্যা, তৃষ্ণা বৃদ্ধি পাবে। আর সে অবিদ্যা, তৃষ্ণার কারণে অজ্ঞান, অকুশলমূলক কর্মের দিকে মনচিত্ত ধাবিত হয়। তাই কামসুখ, আত্মপীড়ন দুঃখমুক্তি নির্বাণ লাভের প্রধান অন্তরায়। পক্ষান্তরে সে দুই অন্ত অনুশীলন না করলে পুণ্য-সুখ বৃদ্ধি পায়, ভ্রান্তধারণা দূর হয়ে জ্ঞান ভাবিত, বর্ধিত, বাহুলীকৃত হয় এবং দুঃখমুক্তি নির্বাণ লাভ করা সম্ভব হয়।

তোমরা কামসুখ ত্যাগ করত নিষ্পাপ ব্রহ্মচর্য আচরণ কর। নিষ্পাপ ব্রহ্মচর্য আচরণ দ্বারা অনবদ্য সুখলাভ হয়ে থাকে। কখনো শিথিলভাবে ব্রহ্মচর্য আচরণ করবে না। শিথিলভাবে ব্রহ্মচর্য আচরণ করলে সুফলের পরিবর্তে কুফলই প্রদান করবে। দুগ্রহীত কুশতৃণ যেমন হস্তকে কর্তন করে তেমনি শিথিলভাবে আচরিত ব্রহ্মচর্য জীবনকে অধিকতর কলঙ্কিত করে। আর এটা স্বতঃসিদ্ধ যে, পৃথিবীতে কোনো কলুষিত ব্রতই মহৎ ফলপ্রসূ হয় না। তাই শিথিলভাবে আচরিত ব্রহ্মচর্য আসক্তি প্রবৃত্তির দিকে বেশি আকর্ষণ করে থাকে।

‘আমি মানুষ’ এ ধারণা, ‘সে পুরুষ’ এ ধারণা, ‘সে মহিলা’ এ ধারণা পোষণ করে অবস্থান করো না। এ ধারণাসমূহ সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভ্রান্ত দর্শন মাত্র। পঞ্চস্কন্ধকে (শরীর) যদি বিভেদ করে দর্শন করা হয়, তাহলে সেখানে কোনো ‘মানুষ-পুরুষ-মহিলা’ বা কোনো সত্ত্বের অস্তিত্ব মিলে না। তাই ‘মানুষ-পুরুষ-মহিলা’ এ ধারণাসমূহের অস্তিত্ব খোঁজাকে অজ্ঞানতাবশত মিথ্যা ধারণা বলা যায়। এতে শুধুমাত্র অজ্ঞান, মিথ্যাদৃষ্টি উদয় হয় ও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে থাকে। অজ্ঞান, মিথ্যাদৃষ্টি হতে বিবিধ দুঃখের উৎপত্তি। তোমাদের মনচিত্তে যদি অজ্ঞান, মিথ্যাদৃষ্টি উদয় হয়ে থাকে, তাহলে তোমাদেরকে দুঃখই পেতে হবে। তোমরা ‘আমি মানুষ’, ‘সে পুরুষ’, ‘সে মহিলা’ এ ধারণাসমূহ ত্যাগ করত অজ্ঞান, মিথ্যাদৃষ্টি বিদূরীত করে প্রকৃত সদ্ধর্ম অনুশীলন কর।

শ্রদ্ধেয় বনভন্তে বলেন, সদ্ধর্ম আচরণ করত পরধর্ম ত্যাগ কর। এবং পরকাজ ত্যাগ করে নিজকাজে প্রতিষ্ঠিত থাক। সেই সদ্ধর্ম কি? মার্গফল নির্বাণসাক্ষাৎ করাকে সদ্ধর্ম বলে। আর স্বর্গ, ব্রহ্ম লাভ করার তাগিদে যে-সমস্ত পুণ্যকাজ করা হয় তা পরধর্ম বলে জানবে। মার্গফল নির্বাণ ব্যতীত অন্যান্য ধর্ম পুণ্য করাকে পরধর্মের মধ্যে অন্তর্গত করা যায়। জ্ঞানের সহিত অবস্থান করাকে নিজকাজ, অজ্ঞানের বশীভূত হয়ে অবস্থান করাকে পরকাজ বলে। অজ্ঞানীরা সবসময় পরধর্ম, পরকাজসমূহ করে থাকে, কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তিগণ সদ্ধর্ম অনুশীলন ও নিজকাজ সম্পাদন করে থাকে। আমি তো দেখতেছি যে, বর্তমানে প্রায় সবাই পরধর্ম, পরকাজ করতেই ব্যস্ত। পরকাজ, পরধর্মের মধ্যে তারা সুখ, আনন্দ, উল্লাসের মধ্যে দিনাতিপাত করছে। কিন্তু তাদের সে সুখ, আনন্দ, উল্লাস একদিন মিথ্যা হয়ে যাবে। তাদেরকে পরকাজ, পরধর্ম করার মাশুল দিতে হবে-দুঃখ, কষ্টে ভরা হাহাকার হৃদয়ে। পরধর্ম, পরকাজ সম্পাদনের মাধ্যমে প্রকৃত লাভ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। যদিও মরুভূমিতে সৃষ্ট মরীচিকা জালের ন্যায় সুখভ্রম দৃষ্ট হয়ে যায়। তোমরা সাধারণ জ্ঞান বাদ দিয়ে অসাধারণ জ্ঞান অর্জন করতে চেষ্টাশীল হও। সে অসাধারণ জ্ঞান হল চারি আর্যসত্য জ্ঞান, প্রতীত্যসমুৎপাদ-নীতি জ্ঞান, আসবক্ষয় জ্ঞান। এসব জ্ঞানের দ্বারা পরধর্ম, পরকাজ করা বন্ধ হয়ে যায়, প্রকৃত সুখ লাভ হয়।

বৌদ্ধধর্ম মতে বি.এ. পাশ, এম.এ. পাশ, ডক্টরেট ডিগ্রীধারীদেরকে প্রকৃত শিক্ষিত বলা চলে না। যারা সপ্তত্রিংশ বোধিপক্ষীয় ধর্ম সম্বন্ধে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে জ্ঞান লাভ করেছেন একমাত্র তারাই প্রকৃত শিক্ষিত। সে বোধিপক্ষীয় ধর্মসমূহ কি? চারি স্মৃতিপ্রস্থান, চারি সম্যকপ্রধান, চারি ঋদ্ধিপাদ, পঞ্চেন্দ্রিয়, পঞ্চ বল, সপ্ত বোধ্যঙ্গ, আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ। এ সকল বোধিপক্ষীয় ধর্মসমূহ জানতে, বুঝতে সক্ষম হলে অসাধারণ জ্ঞান অর্জন হয়। এসব ধর্ম সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ হলে অজ্ঞান বিদ্যমান থাকতে পারে না। অজ্ঞান বিদ্যমান না থাকলে প্রব্রজিত জীবন সুখে, শান্তিতে অতিবাহিত করা যায়। কিন্তু বোধিপক্ষীয় ধর্মসমূহ সম্বন্ধে অজ্ঞান হলে প্রব্রজিত জীবন দুর্বিষহ দুঃখে ভরে উঠে। এমন কি প্রব্রজিত জীবন ত্যাগ করতে বাধ্য হতে হয়। আমি অনেক ভিক্ষুকে বলতে শুনেছি- ‘খুব কষ্ট পাচ্ছি, মরে যেতে পারতাম ভালো হতো।’ এটা থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলে যে, বর্তমানে অনেক ভিক্ষু বোধিপক্ষীয়ধর্ম সম্বন্ধে অজ্ঞ। যেমন, বৃক্ষজিৎ, অক্ষরানন্দ তারাও বোধিপক্ষীয় ধর্ম সম্বন্ধে অজ্ঞ ছিল বিধায় বর্তমানে সংসারী হয়েছে। বর্তমান ভিক্ষুদিগের আচার-আচরণ অনুসারে আমি তিনভাগে ভাগ করে থাকি। যথা : ১) কেহ প্রব্রজ্যা ত্যাগ করে বিয়ে করত সাধারণ সংসারী হয়ে যায়। ২) কেহ প্রব্রজিত অবস্থায় নারীর সাথে প্রেম করত সে নারীকে নিয়ে অন্যত্র পালিয়ে যায়। আর শেষে প্রব্রজ্যা ত্যাগ করে। ৩) কেহ প্রব্রজিত জীবন ত্যাগ করে না, কিন্তু নারীর সহিত ব্যভিচারে রত হয়ে কলঙ্কিত, কলুষিত জীবন-যাপন করে। যারা সোজা প্রব্রজ্যা ত্যাগ করে গৃহী হয়ে সংসারী হয় তাদেরকে অন্য দু’ধরনের চেয়ে একটু ভালো বলা চলে। কারণ প্রব্রজিত করে থাকার জ্ঞানটুকু যখন তাদের নেই সে জীবন ত্যাগ করাই উত্তম কাজ। কিন্তু জ্ঞানবিহীন অবস্থায় প্রব্রজিত হয়ে অবস্থান করত পাপকর্মে রত হওয়া মহা অন্যায়। সেরূপ কলঙ্কিত প্রব্রজিত জীবন নিরয়গামী করে দেবে মাত্র। এতে নিজের প্রব্রজিত জীবন যেমন বিনষ্ট হয়ে যায় তেমনি ধর্মের উপরও মিথ্যা কলঙ্কের দাগ পড়ে। তারা পবিত্র বুদ্ধ শাসনে বিষধর কীট সদৃশ। ভিক্ষুদের এরূপ অবস্থা দেখে আমি তোমাদেরকে তাদের সঙ্গ ত্যাগ করতে উপদেশ দিয়ে থাকি। তোমরা যদি তাদের সংস্পর্শে থাক তাহলে তোমাদেরকেও সে তিন প্রকার কাজ করতে হবে। পঁচা আর ভালো বেগুন এক ঝুড়িতে রাখলে যেমন ভালো বেগুনগুলোও পঁচে যায় বা পঁচা দরে বিক্রি হয় তেমনি দুঃশীল ভিক্ষুদের সাথে থাকলে শীলবানও মর্যাদা পায় না।

তোমরা বুদ্ধ প্রমুখ শারীপুত্র, মৌদ্গল্যায়ন, মহাকাশ্যপ, আনন্দ প্রমুখ মহাজ্ঞানীগণের আচরিত রীতি-নীতি, পথ অনুসরণ কর। বর্তমান প্রায় ভিক্ষুদের আচরিত রীতি-নীতি সঠিক নয়, তারা ভুলপথের পথিক। তাই আবারো বলছি বুদ্ধ প্রমুখ শারীপুত্র, মৌদ্গল্যায়ন, মহাকাশ্যপ, আনন্দ প্রমুখ মহাজ্ঞানীদের আচরিত পথেই একমাত্র নির্বাণ লাভ করা সম্ভব। তাই বলি :

মহাজ্ঞানী আর্যগণ, যে পথে করেছে গমন,

লভিয়াছে সম্যক দর্শন।

সেই পথ লক্ষ্য করে, আচরিবে ধৈর্য ধরে,

সার্থক কর এই মানব জীবন।

শ্রদ্ধেয় বনভন্তে বলেন, বৌদ্ধধর্মের চরম ও পরম লক্ষ্য স্বর্গ, ব্রহ্মলোক লাভ নয়। বরঞ্চ এ ধর্মে স্বর্গ, ব্রহ্মলোকে জন্ম ধারণ করাকেও দুঃখ বলা হয়। সকল প্রকার লোভ, তৃষ্ণা ক্ষয়সাধন করে নির্বাণ সুখ করাই বৌদ্ধধর্মের চরম ও পরম লক্ষ্য। তাই একমাত্র বৌদ্ধধর্ম অনুশীলনের মাধ্যমে নির্বাণ সুখলাভ করা সম্ভব। অন্যান্য ধর্মের নীতি বা পথ অনুশীলনে স্বর্গ, ব্রহ্মলোক পর্যন্ত লাভ করা যায়। নির্বাণ লাভ করা সম্ভবপর হয়ে উঠে না। বৌদ্ধধর্ম ব্যতীত অবৌদ্ধদের আচরিত নীতিদ্বারা দুঃখ হতে মুক্তি লাভ করতে পারব বলে বিশ্বাস করাকে শীলব্রত-পরামর্শ বলে। এ শীলব্রত-পরামর্শ মহাপাপ। দুঃখ আনয়নকারী, সত্যের বিপরীত মিথ্যার বদ্ধমূল ধারণা। স্রোতাপত্তি মার্গফল লাভ হলে শীলব্রত পরামর্শ ধ্বংস হয়। আবার, স্রোতাপত্তি লাভীগণের সৎকায় দৃষ্টি, বিচিকিৎসা, শীলব্রত পরামর্শ, ঈর্ষা, মাৎসর্য সমূলে ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। তারা সৎপুরুষের সহচর্য, সদ্ধর্ম শ্রবণ, জ্ঞানযোগে চিন্তা, সত্যধর্মের অনুশীলন করে থাকে। স্রোতাপত্তি এ চারি অঙ্গ সর্বদা রক্ষা করে সযত্নে। জীবনের বিনিময়েও তারা অসৎপুরুষের সহচর্য গ্রহণ করে না, পরধর্ম শ্রবণ করে না, অজ্ঞানের সহিত মনন করে না, পরধর্ম অনুশীলন করে না। চিত্তের নির্মলতা এবং উচ্চাঙ্ক্ষাই শ্রদ্ধার লক্ষণ। তীক্ষ্ণ শ্রদ্ধার দ্বারা স্রোতাপত্তি মার্গফল লাভ করা সম্ভব। বুদ্ধেরকালীন মহাউপাসিকা বিশাখাও তীক্ষ্ণ শ্রদ্ধার দ্বারা স্রোতাপত্তি মার্গফল লাভ করেছিলেন।

সম্মতি-সংঘ ও পরমার্থ-সংঘ ভেদে সংঘকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। মার্গফললাভী অর্থাৎ স্রোতাপত্তি, সকৃদাগামী, অনাগামী, অর্হত্ত্বমার্গফললাভী সংঘদিগকে পরমার্থ-সংঘ বলে। যারা মার্গফললাভী নয়, পৃথকজন অবস্থায় শুধুমাত্র উপসম্পদা লাভ করে সংঘ কর্তৃক স্বীকৃতি প্রাপ্ত তাদেরকে সম্মতি-সংঘ বলে। থের তিন প্রকার, যথা : জাতি-থের, ধর্ম (পরমার্থ)-থের, সম্মতি-থের। যারা বয়োবৃদ্ধ তাদেরকে জাতি-থের; মার্গফল লাভীদেরকে পরমার্থ-থের; যারা ভিক্ষু বয়সে দশ বৎসর হয়ে সংঘ কর্তৃক থের বলে স্বীকৃতি লাভ করে তাদেরকে সম্মতি-থের বলে। থের শব্দের অর্থ বৃদ্ধ, বুড়ো হওয়া। কেহ বয়সে বুড়ো, কেহ পরমার্থ জ্ঞান লাভে বুড়ো, কেহ ভিক্ষু বয়সে বুড়ো এ তিন প্রকার বুড়োকে বৌদ্ধধর্মের পরে ভাষায় থের বলা হয়। জাতি-থের আর সম্মতি-থের, অবিদ্যা তৃষ্ণা ক্ষয়সাধন করে সকল প্রকার দুঃখ হতে মুক্ত হতে পারেনি। তাই তারা সুখ, দুঃখের অধীন। পরমার্থ-থের অবিদ্যা, তৃষ্ণা, উপাদান হতে সম্পূর্ণ মুক্ত এবং সকল প্রকার দুঃখ ক্ষয়সাধন করে নির্বাণ পরম সুখে অবস্থান করে থাকেন। তাহলে দেখা যায় যে, ভিক্ষু বা থের অন্যজনের কাছ হতে স্বীকৃতি লাভ করা যায়। কিন্তু নির্বাণ লাভ করতে হলে নিজেকে উদ্যোগ নিতে হয়। অর্থাৎ আপন দুঃখমুক্তি নির্বাণ আপনাকে লাভ করতে হয়-কেহ নির্বাণ লাভ করায়ে দিতে পারে না। বুদ্ধ বলেছেন, আমি কেবল উপদেষ্টা মাত্র, উদ্যম তোমাদেরকে করতে হবে। বুদ্ধ নির্বাণ গমনের রাস্তা আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুশীলনের উপদেশ, অনুপ্রেরণা দিয়েছেন মাত্র। যারা নির্বাণ গমনের ইচ্ছুক তাদেরকে সে রাস্তা ধরে হেঁটে যেতে হবে। হেঁটে না গেলে আপন অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা সম্ভব হবে না। যেমন ধর, আমি তোমাদেরকে প্রব্রজ্যা, উপসম্পদা প্রদান করেছি। কিন্তু দুঃখমুক্তি নির্বাণ লাভ তোমাদেরকে অর্জন করতে হবে। আমি তোমাদেকে দুঃখমুক্তি নির্বাণ প্রদান করতে পারব না। একজন যদি অন্যজনকে নির্বাণ প্রদান করতে সক্ষম হতো তাহলে বুদ্ধ সবাইকে নির্বাণ প্রদান করতেন। কেহকে সংসার দুঃখে পতিত হতে হতো না। আবার, গুরু নির্বাণ লাভ করলে শিষ্য সেই নির্বাণ সুখের ভাগীদের হতে পারে না। এবং শিষ্য নির্বাণ লাভ করলে গুরুও নির্বাণ সুখের অধিকারী হতে পারে না। মনে রাখবে, একজন নির্বাণ সুখ লাভ করলে অন্য অপরজন কিছুতেই সে নির্বাণ সুখের অংশিদারী হতে পারে না। নির্বাণ সঙ্ঘাটি, পাত্র, চীবরের ন্যায় কেহকে প্রদান করার মতন বস্তু নয়। তাই দুঃখমুক্তি নির্বাণ লাভ করা স্বীয় প্রচেষ্টার উপর নির্ভর করে। যদি দৃঢ় বীর্যের সহিত আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ সঠিকভাবে অনুশীলন করে জ্ঞানার্জন করা যায়, তবেই নির্বাণ লাভ হয়।

পরিশেষে তিনি বলেন, ত্রিপিটক শাস্ত্রে আমরা বুদ্ধের শিক্ষা, উপদেশসমূহ লিপিবদ্ধ আকারে লাভ করি। বুদ্ধের জীবদ্দশায় তাঁর সকাশে এই শিক্ষা উপদেশসমূহ গ্রহণ করা যেত। কিন্তু বর্তমানে ত্রিপিটক শাস্ত্র ব্যতীত অন্য কোথাও হতে বুদ্ধের শিক্ষা উপদেশসমূহ লাভ হয় না। তাই আমি এখন ত্রিপিটকের খণ্ডসমূহ সংরক্ষণে একটু বেশি মূল্য দিই। তবে ত্রিপিটকের সে শিক্ষা, উপদেশসমূহ যথাযথভাবে আচরণ না করলে জ্ঞান লাভ হবে না। জ্ঞান লাভের জন্য চায় ত্রিপিটকে সংরক্ষিত বুদ্ধের সে উপদেশ শিক্ষাসমূহ যথাযথ অনুশীলন করা। চারি আর্যসত্য সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করা, চারি আর্যসত্যকে যথাযথরূপে জানা, বুঝাই ত্রিপিটকে উল্লেখিত সে শিক্ষা উপদেশ সমূহের মূল উদ্দেশ্য। কারণ চারি আর্যসত্য সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ হলে, চারি আর্যসত্যকে হৃদয়ঙ্গম করতে পারলে দুঃখমুক্তি নির্বাণ লাভ হয়। আর দুঃখমুক্তি নির্বাণ লাভ করাই-তো বৌদ্ধধর্মের চরম ও পরম লক্ষ্য। সেই চারি আর্যসত্য সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ কি? পঞ্চস্কন্ধ দুঃখ আর্যসত্য অভিজ্ঞা দ্বারা জ্ঞাত হওয়া; অবিদ্যা, তৃষ্ণা সমুদয় আর্যসত্য অভিজ্ঞা দ্বারা পরিহার করা; নির্বাণ নিরোধ আর্যসত্য অভিজ্ঞা দ্বারা প্রত্যক্ষ করা; শমথ-বিদর্শন মার্গসত্য অভিজ্ঞা দ্বারা গঠন বা ভাবনা করা। এসব জ্ঞান লাভ হলে বৌদ্ধধর্মের চরম ও পরম লক্ষ্য নির্বাণ সুখ লাভ হয়। এবং তখনই ত্রিপিটক শাস্ত্রে লিপিবদ্ধ কৃত বুদ্ধের শিক্ষা উপদেশসমূহ অধ্যয়ন করার সার্থকতা অর্জিত হয়।

সাধু, সাধু, সাধু।

Address

Rangamati

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Most Ven. Sadhanananda Mahathera posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share