16/08/2026
অবিদ্যা তৃষ্ণা উপাদান ক্লেশ স্কন্ধ আয়তন ধাতুই দুঃখের কারণ
নির্বাণ যেতে হলে তোমরা স্বামী-স্ত্রী, পুত্র-কন্যা নিয়ে সংসারিক জীবন-যাপন করতে পারবে না। তোমাদের কাজ হল, পুনঃ গৃহী জীবনে ফিরে না যাওয়া এবং যেকোনো রমণীকে স্ত্রীরূপে দর্শন না করা। আবার আমি, আমার, আমিত্ব এধারণা সমুদয়ও ত্যাগ করতে হবে। বৌদ্ধধর্ম মতে আমি বা আত্মবাদ দুঃখমুক্তি নির্বাণ লাভের অন্যতম প্রধান অন্তরায়। আমি বললে মিথ্যাদৃষ্টি উদয় হয়। মিথ্যাদৃষ্টি উদয়ে নির্বাণ সুখকে বিশ্বাস করা যায় না। মনচিত্ত মধ্যে মিথ্যাদৃষ্টি ভাব বিদ্যমান থাকলে মার থাকে। আর মার নির্বাণ গমনের পথে নানাবিধ বাধা-বিপত্তি সৃষ্টি করে দেয়, অন্তরায় ঘটায়। সর্বোপরি যেকোনো উপায় অবলম্বন করেই হোক নির্বাণ লাভ করতে দেয় না। দুঃখমুক্তি নির্বাণ লাভে বাঁধা প্রদান করা, অন্তরায় সৃষ্টি করে দেওয়া মারের কাজ। মার কি বলে জান? কেন নির্বাণ লাভ করবে, সংসারে কত প্রকারই-না ভোগ্য বিষয়ে রয়েছে, সংসারের সেসব ভোগ্য বিষয় পরিভোগ কর। জীবনকে উপভোগ কর। আমোদ প্রমোদে রত হয়ে সুখভোগ না করলে জীবনের মূল্যই বা কোথায়? স্বামী-স্ত্রী, পুত্র-কন্যা, আত্মীয়-স্বজন, ভোগ ঐশ্বর্য, মান সম্মানাদির সহিত সংসারিক জীবন-যাপনে সুখের কোনো তুলনাই হয় না। নির্বাণ লাভের এখনও অনেক সময় রয়েছে, সুতরাং আগে ভোগ সুখে রত থাক। ভোগ সুখ করার শেষে না হয় নির্বাণ লাভের চেষ্টা করবে। এখন নির্বাণ লাভ করলে তো সেসব সুখভোগ করা হতে বঞ্চিত হবে। তোমরা মারের সেসব প্রলোভনে প্রলুব্ধ হওনা। কারণ মারের সেসব সুখের আশ্বাসসমূহ মরুভূমিতে সৃষ্ট মায়া মরীচিকার ন্যায় মিথ্যা আপাত সুখ বলে দৃষ্ট হলেও সে গুলোর পরিনামে সীমাহীন দুঃখ লাভ হয়। তোমাদের মনের মধ্যে অবিদ্যা, তৃষ্ণা, উপাদান, ক্লেশ, স্কন্ধ, আয়তন, ধাতু বিদ্যমান আছে বলে তোমরা দুঃখ পাচ্ছো। সেসব বিদ্যমান না থাকলে কিছুতে দুঃখ পেতে হতো না। দুঃখ কি, দুঃখ সমুদয় কি, দুঃখ নিরোধ কি, দুঃখ নিরোধের উপায় কি তা না জানাই অবিদ্যা। সদ্ধর্মের আস্বাদ না পাওয়া, কোনো বিষয় না জানাই অবিদ্যা। আলম্বনকে ঢেকে রেখে তার যথার্থ স্বভাবকে জানতে, দেখতে, বুঝতে না দেয়া অবিদ্যার কাজ। অবিদ্যা ঠিক চক্ষুছানির মত কালো আবরণ টেনে দিয়ে আলম্বনকে ঢেকে রাখে। অবিদ্যা অনিত্যকে নিত্য, দুঃখকে সুখ, অনাত্মে আত্মাবিশ্বাস জন্মায়। তাই অবিদ্যা জ্ঞানচক্ষুর আবরণ সদৃশ। তবে অকুশল, পাপমূলক কর্ম সম্পাদনে নানা উপায় অবলম্বনে অবিদ্যার শক্তি অত্যন্ত প্রবল। অবিদ্যাই সর্ব অকুশলের মূল। যেখানে পাপ অকুশল সেখানেই অবিদ্যা। লাভের ইচ্ছা, উপভোগের ইচ্ছাকে তৃষ্ণা বলে। তৃষ্ণা আকাঙ্ক্ষিত বিষয়ে পুনঃপুন তৃষিত করে। সেই আকাঙ্ক্ষিত তৃষ্ণার কোনো শেষ নেই, একটি শেষ হতে না হতে অন্য একটি তৃষ্ণার জন্ম হয়। জল-পিপাসা নিবারণ করতে কেহ যদি লবণার্থ জল পান করে তার তৃষ্ণা যেমন আরো বর্ধিত হয় তৃষ্ণাও ঠিক সেইরূপ। তৃষ্ণা তিন প্রকার, যথা : কাম-তৃষ্ণা, ভব-তৃষ্ণা, বিভব-তৃষ্ণা। পঞ্চকামগুণ (রূপ, শব্দ, গন্ধ, রস, স্পর্শ) বিষয়ে মুগ্ধ হয়ে কামনা লিপ্তাবস্থায় সংসারে সুখভোগের ইচ্ছাই কাম-তৃষ্ণা। পুনঃপুন উন্নত জন্মধারণ করে ভব-ভবান্তরে ভোগসুখে লালায়িত হওয়ার ইচ্ছাকে ভব-তৃষ্ণা বলে। উচ্ছেদবাদী ভোগ-তৃষ্ণা অর্থাৎ উচ্ছেদ জনিত বীততৃষ্ণাকে বিভব-তৃষ্ণা বলে। বর্তমান দুঃখগ্রস্ত অবস্থা হতে ত্রাণ লাভের জন্য আত্মহনন ইচ্ছা বা আত্মহত্যাও বিভব-তৃষ্ণার অন্তর্গত। আসক্তি, দৃঢ় গ্রহণ করাকে উপাদান বলে। তৃষিত বিষয়কে দৃঢ়ভাবে গ্রহণ করে ধরে রাখা উপাদানের কাজ। সাপ যেমন ভেক অনুসন্ধান করে ধৃত ভেককে দৃঢ়ভাবে মুখে ধারণ করে রাখে। উপাদান চতুর্বিধ, যথা : কামোপদান, দৃষ্টি-উপাদান, শীলব্রতোপদান, আত্মবাদোপদান। রূপাদি পঞ্চকামগুণ হতে যে সুখভোগের তৃষ্ণা উৎপন্ন হয় সেই তৃষ্ণাকে রক্ষা করত দৃঢ়ভাবে ধরে রাখা কামোপদান। তৃষ্ণা বিষয়কে নিত্য, সুখ, শুভ মনে করা এবং সেই অভিমতকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করাই দৃষ্টি-উপাদান। তৃষ্ণার বিষয় বস্তুকে ভঙ্গুর মনে করে তা স্থায়ীত্বের জন্য ব্রতোপসনাদি পালন করাকে শীলব্রত-উপাদান বলা হয়। পঞ্চস্কন্ধ সম্পর্কে শাশ্বত ধারণা বা আমি, আমার, আমিত্ব এরূপ ধারণাতে একগুয়ে ভাবে দেহ মনের প্রতি দৃঢ় আচ্ছন্ন থাকা অবস্থাকে আত্মবাদোপদান বলা হয়। যা দ্বারা চিত্ত কলুষিত, পীড়িত, ব্যাধিগ্রস্ত, নীচ, হীন ও মলিন হয় তাকে ক্লেশ বলে। ক্লেশ দশ প্রকার, যথা : লোভ, দ্বেষ, মোহ, মান, দৃষ্টি, বিচিকিৎসা, আলস্য, ঔদ্ধত্য, নির্লজ্জতা ও নির্ভয়তা। এ ক্লেশসমূহ জন্ম জন্মান্তরের পরিভ্রমণে সত্ত্বগণকে বিবিধ প্রকারে দুঃখ-কষ্ট প্রদান করে আসতেছে। অন্যদিকে শীল, সমাধি, প্রজ্ঞা তথা কুশলকর্ম সম্পদানে বাধা প্রদান, কষ্ট দেওয়া ক্লেশসমূহের কাজ। স্কন্ধ বলতে রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার, বিজ্ঞান এ পঞ্চস্কন্ধকে বুঝায়। কাণ্ড, শিকড়, ডালপালা, পল্লবাদি সংযোগে স্থিত আকার বিশেষকে বৃক্ষ বলে অভিহিত করা হয়। ঠিক তদ্রূপ রূপের (চতুর্মহাভূত, যথা : পৃথিবী, আপ, তেজ, বায়ু) রাশি, বেদনার (অনুভূতি) রাশি, সংজ্ঞার (হুঁশ বা প্রাথমিক ধারণা) রাশি, সংস্কারের (জানা, যা দ্বারা অমুক হতে সমুককে পৃথক করে জানা যায়) রাশি, বিজ্ঞানের (চিত্ত, মানসিক বৃত্তি নিচয়ের আধার) রাশির সমবায়ে যে জীব বা ব্যক্তি প্রকাশ পায় তাই পঞ্চস্কন্ধ। চক্ষুদ্বারাদি ও রূপাদি আলম্বনের সংযোগে যা সর্বত্র প্রসারিত হয় তাই আয়তন। আয়তন অর্থ উৎপত্তি-স্থান, উৎপত্তি-ভূমি। যেমন-চক্ষু রূপের সমবায়ে চক্ষু-বিজ্ঞানের উৎপত্তি। ঠিক তদ্রূপ শ্রোত্র ও শব্দের সমবায়ে শ্রোত্র-বিজ্ঞান; ঘ্রাণ ও গন্ধের সমবায়ে ঘ্রাণ-বিজ্ঞান; কায় ও স্পৃষ্টব্যের সমবায়ে কায় বিজ্ঞান; মন ও ধর্মের সমবায়ে মন-বিজ্ঞান উৎপত্তি হয়। এভাবে আয়তনের সাহায্যে চক্ষু-ইন্দ্রিয়াদির ও রূপ-আলম্বনাদি সংযোগের বিজ্ঞান উৎপত্তি হয়। চক্ষু, শ্রোত্র, ঘ্রাণ, জিহ্বা, কায়, মন আধ্যাত্মিক আয়তন ও রূপ, শব্দ, গন্ধ, রস, স্পর্শ, বাহ্যিক আয়তন ভেদে আয়তন দ্বাদশ প্রকার। স্ব স্ব স্থানে প্রবর্তিত হয় বলেই ধাতু। অর্থাৎ যা স্বীয় স্বীয় স্বভাব বহন, ধারণ করে তা ধাতু। ধাতু অষ্টাদশ প্রকার, যথা : চক্ষু ধাতু, শ্রোত্র ধাতু, ঘ্রাণ ধাতু, জিহ্বা ধাতু, কায় ধাতু, মন ধাতু, রূপ ধাতু, শব্দ ধাতু, গন্ধ ধাতু, রস ধাতু,স্পর্শ ধাতু, মন ধাতু ও চক্ষু-বিজ্ঞান ধাতু, শ্রোত্র-বিজ্ঞান ধাতু, ঘ্রাণ-বিজ্ঞান ধাতু, জিহ্বা-বিজ্ঞান ধাতু, কায়-বিজ্ঞান ধাতু, মন-বিজ্ঞান ধাতু। এই অষ্টাদশ প্রকার ধাতুর ধর্মে সংসারে দুঃখ ফল ধারণ করে। অবিদ্যা, তৃষ্ণা, উপাদান, ক্লেশ, স্কন্ধ, আয়তন, ধাতু হতে মুক্ত হলে অরহত্ব লাভ হয়। তাতে প্রকৃত সুখের সন্ধান মিলে।
শ্রদ্ধেয় বনভন্তে বলেন, সংসারে সবাই সুখভোগের আকাঙ্ক্ষায় মত্ত। তোমরা সুখভোগ করা হতে বিরত থাক। সুখভোগের ইচ্ছা করলে বিবিধ দুঃখে পতিত হবে। অজ্ঞজনেরা দেখতে পায় না যে, সুখভোগের পিছনে ছুটতে গিয়ে তারা অশেষ প্রকার দুঃখ-কষ্ট ডেকে আনে মাত্র। তাদের সে সুখভোগের আশা আকাঙ্ক্ষা কখনো মঙ্গল বয়ে আনে না। কারণ সুখভোগে মত্ত ব্যক্তি অকুশল, পাপমূলক কর্ম সম্পাদন করতেও পিছ পা হয় না। উপরন্তু সুখভোগে প্রকৃত সুখ লাভ হয় না, এবং ভোগ্যবিষয় প্রকৃত সার, সত্য বস্তুও নয়। বরং ভোগ্য বস্তু সুখভোগের আশা কল্যাণকর পথ রুদ্ধ করে দিয়ে থাকে। অন্যদিকে, সুখভোগের দ্বারা কখনো তৃপ্তি লাভ হয় না। বরঞ্চ ভোগের আকাঙ্ক্ষা শেষ হবার আগেই সত্ত্বদেরকে মৃত্যুবরণ করতে হয়। কিন্তু সুখভোগের চিন্তায় মগ্ন থেকে সত্ত্বগণ মৃত্যুর পদধ্বনি শুনতে পায় না। তবে মৃত্যু যথাসময়ে হাজির হয়ে তার উদ্দেশ্য সিদ্ধ করতে কোনো ভুল করে না। তাই তোমরা সুখভোগ করাকে লজ্জা, ভয় জ্ঞান করে দর্শন করত সুখভোগ ত্যাগ কর। সুখভোগ ত্যাগ করতে পারলে অকুশলকর্ম সম্পাদন করা হতে নিজকে উদ্ধার করতে সক্ষম হবে। সুখভোগ করা হতে নিজকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত রাখতে পারলে নির্বাণ সুখও লাভ হয়। যে সুখলাভ হলে আর কোনো কিছু সুখের প্রয়োজন হয় না। বিমুক্তি সুখের রসে তখন মন-প্রাণ মহা পরিতৃপ্তির অবগাহনে সিক্ত হয়ে যায়। তাই প্রকৃত সুখ লাভ করতে হলে নির্বাণ সুখলাভের কোনো বিকল্প নেই।
তোমরা আত্ম বা নিজকে জয় কর। ‘আমি মানুষ’, ‘সে পুরুষ’, ‘সে মহিলা’ এধারণাসমূহকে জয় কর। মারকে অর্থাৎ সুখভোগে আসক্ত হয়ে থাকা মনকে জয় কর। কারণ মনচিত্তের মধ্যে আমি বা আত্মবাদ থাকলে অহংকার উৎপন্ন হয়। আমি ‘মানুষ-পুরুষ-মহিলা’ এ ধারণাসমূহ বিদ্যমান থাকলে অজ্ঞান উৎপন্ন হয়। আর মার বা সুখভোগে আকাঙ্ক্ষিত মন সর্বদা বিবিধ কর্মে নিয়োজিত হয়ে সুখ-দুঃখের আবর্তে আবদ্ধ হয়ে থাকে। সুখভোগের বাসনা দ্বারা সত্ত্বগণ সুখ-দুঃখের খোলস ছেড়ে সার, সত্যকে উপলব্ধি করতে পারে না। বলা যায়, মারের প্রভাবে সত্ত্বগণকে বিবিধ প্রকার দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছে। তাই আত্মজয়, মানুষজয়, মারজয় করে নির্বাণ যেতে হয়। তোমরাও সকল প্রকার দুঃখ-কষ্টের শিকার হওয়ার হাত থেকে মুক্তি লাভের জন্য আত্ম-মানুষ-মার জয় করে নির্বাণ পরম সুখে অবস্থান কর।
স্বামী-স্ত্রী, পুত্র-কন্যা, আত্মীয়-স্বজন, বিপুল ধন-ঐশ্বর্য (যেমন এয়ার কন্ডিশনের বহুতলা ভবন, উন্নত মানের গাড়ী, কোটি কোটি অর্থবিত্তের ছড়াছড়ি), যশ-সম্মান, প্রভাব-প্রতিপত্তির দ্বারা জাগতিক সুখ-স্বাচ্ছন্দে জীবন-যাপন করাকে লৌকিক হীনসুখই বলা যায়। কারণ এ সকল সুখের মধ্যে কখনো পরিতৃপ্তি নেই, প্রকৃত সুখ লাভ হয় না। ভোগ-বিলাস সুখভ্রমে দুঃখই আনয়ন করে থাকে সার। ঐশ্বর্য সুলভ ভোগ-বিলাসে প্রকৃত সুখের লেশমাত্র নেই। একমাত্র ত্যাগের দ্বারাই প্রকৃত সুখের সন্ধান মিলে। তাই-তো বলি, তোমরা ভোগের পিছনে ছুটে হীনসুখের প্রত্যাশা করবে না। লৌকিক হীনসুখের প্রত্যাশী হলে উৎকৃষ্ট লোকোত্তর সুখলাভে সমর্থ হবে না। কারণ হীনপন্থা অবলম্বনে শ্রেষ্ঠ কিছু লাভ হয় না, শ্রেষ্ঠ অবলম্বনেই শ্রেষ্ঠত্ব লাভ হয়। অর্থাৎ হীনত্বই অগ্রত্ব হয় না, অগ্রত্ব দ্বারাই অরহত্ব লাভ হয়। বুদ্ধ বলেছেন ভোগ লাভের পথ এক, আর নির্বাণের পথ অন্য। দুইটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাই নির্বাণ পথের পথিককে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে, ভোগের দিকে যেন তার মন ধাবিত না হয়। ভোগ-বিলাসের পারিপার্শ্বিক প্রলোভনের ফাঁদ হতে দূরে থাকার জন্য তাকে চক্ষু বিদ্যমান থাকা সত্বেও অন্ধ তুল্য, মুক ও বধির না হয়েও মুক, বধির তুল্য এবং শক্তি, প্রাণ (জীবন) বিদ্যমানেও দুর্বল, মৃতবৎ হয়ে থাকতে হয়। তোমরা নির্বাণসুখ প্রত্যক্ষ করার জন্যে; যে মহৎ লাভের উদ্দেশ্যে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেছ তা সফল ও শ্রীবৃদ্ধি করণে অবশ্যই হীন সুখ, হীনতৃষ্ণা, হীনসংস্কার সর্বতোভাবে পরিহার কর। এবং অপ্রমত্বভাবে শ্রেষ্ঠত্ব লাভের সাধনায় আত্মনিয়োগ করতে চেষ্টা শীল হও। মানুষ (অর্থাৎ ‘আমি মানুষ’ এ ধারণা) হীন, তৃষ্ণা (সুখভোগের প্রবল আকাঙ্ক্ষা) হীন, সংস্কার (সর্বদা নানাবিধ কর্মে নিয়োজিত থাকা) হীন। তাই তোমরা হীনমানুষ, হীনতৃষ্ণা, হীনসংস্কার পরিত্যাগ কর। তাহলে মহৎ সদর্থ পরিপূর্ণ হবে।
বনভন্তে বলেন, স্বামী-স্ত্রী হয়ে হীন গৃহী জীবন-যাপন করা বৌদ্ধধর্মের আদর্শ নয়। প্রকৃত বৌদ্ধধর্মের মত কি জান? সাধারণত পুরুষ মহিলাগণ যে পরস্পর পরস্পরকে স্বামী-স্ত্রীরূপে গ্রহণ করে সংসারী জীবনাচারণ করে তা পাপজনক, অকুশলমূলক কর্ম ছাড়া কিছুই নয়। বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে স্বামী-স্ত্রী হবার অর্থ দাঁড়ায় অকুশলকর্ম সম্পাদনের সঙ্গী জুটা। বলা যায়, অধিক পরিমাণে পাপ, অকুশল সম্পাদনে বাধ্য করার জন্য মার তাদেরকে একে অপরকে সঙ্গী সংগ্রহ করে দেয়। কারণ একজনে বা একাই যতটুকু পাপ, অকুশলকর্ম সম্পাদন করা যায় দুইজনে মিলেমিশে করলে তার চেয়ে অনেক বেশি পাপকর্ম সম্পাদিত হয়। বিয়ে করে স্বামী-স্ত্রী হওয়াকে আমি নির্লজ্জতার কাজই বলে থাকি। যাদের পাপের প্রতি লজ্জা নেই এবং যারা দুঃখকে ভয় করে না তারা একে অপরকে স্বামী-স্ত্রীরূপে বরণ করে নেয়। যারা পাপের প্রতি লজ্জাশীল ও সংসার দুঃখের প্রতি ভয়শীল তারা কিছুতেই বিয়ে করতে পারে না। তদুপরি আজকে যাকে নববররূপে প্রাণসম প্রিয় মনে করে বা নববধূরূপে গ্রহণ করতেছে আগামীকাল সে বধূ মৃত্যুবরণ করতে পারে। অথবা তার উল্টো নববরও মারা যেতে পারে। তাহলে কোথায় স্বামীরূপে থাকল? কোথায় বা স্ত্রী? সবই মিথ্যায় পরিণত হয়ে গেল নয় কি। অশ্রুঝরা নয়নে তখন শুধু দুঃখ রয়ে যাবে সার। কাজেই বিয়ে করে একে অপরকে আমার স্বামী, আমার স্ত্রী মনে করা কখনো যুক্তিযুক্ত নয়। এবম্বিধ চিন্তা করেই তো আমি সংসারী জীবন পরিত্যাগ করে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করত নির্বাণ লাভের চেষ্টাশীল হয়েছিলাম। তোমাদেরকেও বলছি- সংসারী হবার দূরের কথা, তোমরা কোনো রমণী কত মনোজ্ঞ, সুশ্রী কিনা সেরূপেও দর্শন করার চেষ্টা করবে না। কারণ মনোজ্ঞ, সুশ্রী নিমিত্ত দর্শনে তা লাভের তৃষ্ণা উৎপন্ন হয়। সে তৃষ্ণা ক্রমান্বয়ে সমস্ত চিত্তকে অধিকার করে বসে। চোর যেমন সুযোগ পেলে গৃহস্থের সব সম্পত্তি চুরি করে নিয়ে যায়, তেমনি কাম-তৃষ্ণাও তোমাদের সমস্ত পুণ্য, জ্ঞানসমূহ অপহরণ করে নিয়ে যাবে। তখন তোমাদের সর্বস্বান্ত হয়ে অতীব দুঃখময় জীবন-যাপন করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। ইন্দ্রিয়াসক্তি বা কাম তৃষ্ণা যাকে একবার অধিকার করে বসে তার জীবনে দুঃখ অনিবার্য। কাম তৃষ্ণায় নিপীড়িত ব্যক্তির চিত্ত সর্বদা দুঃখের মধ্যে অবস্থান করে।
মিথ্যাদৃষ্টি-সম্পন্ন পুদ্গলেরা পরকাল, কর্মফল, কুশলাকুশল ও চারি আর্যসত্য বুঝতে পারে না। এবং সে-সকল সত্যকে বুঝতে, জানতেও আগ্রহী নয় তারা। তারা নিজের অভিমতকে আঁকড়ে রেখে অন্য সবকিছুকে মিথ্যা বলে বাতাসে উড়িয়ে দেয়। বুদ্ধ বলেছেন, মিথ্যাদৃষ্টির ন্যায় দূষণীয় জগতে দ্বিতীয় আর নেই। যত প্রকার দোষের হেতু একমাত্র মিথ্যাদৃষ্টি। মিথ্যাদৃষ্টি সত্ত্বগণকে দিকভ্রান্ত পুরুষের ন্যায় বিপরীতমার্গে ধাবিত করায়। তাই মিথ্যাদৃষ্টি অতিশয় দূষণীয়। মিথ্যাদৃষ্টি-পরায়ণের কোনো কথায় কর্ণপাত না করা ও বিশ্বাস না করাই উত্তম। মিথ্যাদৃষ্টি-পরায়ণ ব্যক্তি মহাপাপী, তারা শুধু অকুশলকর্মই সম্পাদন করে থাকে। মিথ্যাদৃষ্টির বশীভূত না হয়ে তোমরা সকলে সম্যকদৃষ্টি-সম্পন্ন হও। সম্যক্দৃষ্টি অর্থ যথার্থ সত্য, সঠিকভাবে দর্শন। এক কথায়, যে যেমন তাকে তেমনভাবে দর্শন করাই সম্যক্দৃষ্টি। অর্থাৎ গাছকে গাছ এবং বাঁশকে বাঁশরূপেই দেখা। সম্যক্দৃষ্টি দুই প্রকার, যথা : লৌকিক সম্যক্দৃষ্টি ও লোকোত্তর সম্যক্দৃষ্টি। পরকাল, কর্মফলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস স্থাপন করাকে লৌকিক সম্যক্দৃষ্টি বলে। চারি আর্যসত্য, যথা : দুঃখ, দুঃখ সমুদয়, দুঃখ নিরোধ, দুঃখ নিরোধের উপায় এ চারি প্রকার মহা সত্যে অটল বিশ্বাস স্থাপন করাকে লোকোত্তর সম্যক্দৃষ্টি বলে। লৌকিক সম্যক্দৃষ্টি পুদ্গলেরা মৃত্যুর পর স্বর্গ লাভ করে দিব্যসুখের অধিকারী হয়। লোকোত্তর সম্যক্দৃষ্টি পুদ্গলেরা আসবক্ষয় করে ইহজন্মে নির্বাণ সুখ প্রত্যক্ষ করে থাকে। যারা বর্তমানে মনুষ্যজীবন লাভ করেও প্রাণিহত্যা, চুরি, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী, মারামারি, কাটাকাটি, ব্যভিচারে রত, মিথ্যা-কটু-ভেদ-বৃথা বাক্য প্রয়োগ, মদ, গাজা, আফিং, হেরোইন গ্রহণ করত নানা অকুশলমূলক, অশান্তিমূলক কর্মাদি সম্পাদনে রত হয় তারা মিথ্যাদৃষ্টি-সম্পন্ন। দেহত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে নিরয়গামী হতে হবে। তারা যদি ন্যূনতম লৌকিক সম্যক্দৃষ্টি-সম্পন্ন হতো তাহলে সে সকল অকুশল, পাপ উৎপাদক কর্ম সম্পাদনে বিরত থাকত। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বর্তমানে প্রায় সবাই মিথ্যাদৃষ্টি-সম্পন্ন পুদ্গল। তারা পরকাল কি? কর্মফল কি? কুশলাকুশল কি সে সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। এবং দুঃখ কি, দুঃখ-সমুদয় কি, দুঃখ-নিরোধ কি, দুঃখ-নিরোধের উপায় কি? সে সম্বন্ধেও অজ্ঞ। ভ্রান্ত ধারণার বশীভূত হয়ে তারা অসত্য বিষয়ে সত্যান্বেষী, অসার বিষয়ে সারান্বেষী হয়ে পরে থাকে। ফলে মিথ্যার বেড়াজালে হাবুডুবু খেয়ে সার, সত্য ধর্মসমূহ উপলব্ধি করতে পারছে না। আবার কুশলধর্ম ত্যাগ করে অকুশল, পাপধর্মই সম্পাদন করতে বাধ্য হচ্ছে। আমি জ্ঞানযোগে দেখতে পায় যে, বর্তমানের মনুষ্যগণ দেহত্যাগের পর শতকরা সাতানব্বই/আটানব্বই জনই নিরয়গামী হয়। বাকী দুই কি তিনজন মাত্র সদগতি প্রাপ্ত হয়ে থাকে।
পরিশেষে তিনি বলেন, তোমরা কায়-ভাবনা, চিত্ত-ভাবনা কর। ভাবনা অর্থ মনের কাজ, জ্ঞান উৎপাদক চিন্তা। স্বীয় চিত্তকে পরিশুদ্ধ করার্থে নিষ্পাপ, পবিত্র বিষয় স্মরণ করে পাপচেতনা হতে বিরত রেখে প্রজ্ঞা সংরক্ষণ, প্রবৃদ্ধি করণ করাই ভাবনা। দশ অশুভ ও বত্রিশ প্রকার কায়গতানুস্মৃতি অনুযায়ী কায়াকে অশুচি, ঘৃণ্য, দুর্গন্ধরূপে ভাবনা করত দেহের প্রতি লোভ, আসক্তি পরিত্যাগ করাই কায়-ভাবনা। কায় ভাবনা দ্বারা লোভ, তৃষ্ণা, অজ্ঞান, সৌন্দর্য স্পৃহা ধ্বংস হয়ে যায়। কায়-ভাবনা না করলে সেসব দিন দিন বেড়েই চলে। চিত্ত উৎপন্ন মাত্রেই নিরোধ শীল। কোনো চিত্ত আমি নয়, আমার নয় এভাবে সর্ববিধ চিত্তে অনাসক্ত থাকাই চিত্ত ভাবনা।
তোমরা যখন প্রব্রজিত হয়েছ এখন তোমাদের আসল কাজ হচ্ছে অজ্ঞানতামূলক কর্মসমূহ পরিত্যাগ করে জ্ঞান উৎপাদক কর্ম সম্পাদন করা। অজ্ঞান বা অবিদ্যা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হলে সুখের অধিকারী হতে পারবে। অবিদ্যাকে নিরোধ করত বিদ্যা উৎপন্ন করেই নির্বাণ সুখ প্রত্যক্ষ করতে হয়।
সাধু, সাধু, সাধু।