12/12/2021
বৌদ্ধ ধর্ম কী?ডাঃ আলেক্সান্ডার বরজিন বর্ননা দিয়েছেন তার গবেষণায়?
খন্ডঃ এক
বৌদ্ধ ধর্ম হল উপায়ের একটি সমষ্টি যা বাস্তবিকতার সত্য স্বভাবকে বোধ করিয়ে পূর্ণ মানবীয় সুপ্ত শক্তিকে বিকাশ করার জন্য সহযোগিতা করে।
২৫০০ বছর পূর্বে সিদ্ধার্থ গৌতম- বুদ্ধ হিসাবে বেশী পরিচিত- দ্বারা ভারতে স্থাপিত বৌদ্ধ ধর্ম সম্পূর্ণ এশিয়াতে প্রচার হয়েছিল। এটি আজ বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম ধর্ম হয়ে পড়েছে। বুদ্ধ তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় জাগ্রত হওয়ার উপায়গুলির দেশনা করে কাটিয়েছেন, যা কিছু নিজে অনুভব করেছিলেন। এর কারণ হল যাতে অন্যরাও স্বয়ং জ্ঞানদীপ্ত বুদ্ধ হতে পারেন। তিনি দেখেছিলেন যে বুদ্ধ হওয়ার সামর্থ্যের ভিত্তিতে সবাই সমান, কিন্তু পছন্দ, রুচি এবং প্রতিভার ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে অনেক ভেদ আছে। এসবের সম্মান রেখে তিনি প্রত্যেকের সীমাবদ্ধতার অতিক্রম করা এবং নিজের পূর্ণ সুপ্ত শক্তিকে বোধ করার জন্য ব্যাপক ভাবে নানা উপায়ের নির্দেশনা দিয়েছিলেন।
প্রত্যেক সংস্কৃতি, যারা বৌদ্ধ ধর্মকে গ্রহণ করেছিল, তাদের আলাদা দৃষ্টিকোণের উপর জোর দেওয়া হয়েছিল। অতএব যদিও বৌদ্ধ ধর্মের অনেক রূপ আছে, তাসত্ত্বেও তাঁরা সবাই এর মূল উপদেশ শেয়ার করে।
মূল বৌদ্ধ উপদেশ – চারি আর্যসত্য
চারি আর্যসত্যই বুদ্ধের সবথেকে মৌলিক উপদেশ হিসাবে পরিচিত। এগুলি হল চারটি তথ্য এবং অত্যন্ত অনুভবী সত্ত্বগণ এদের সত্য রূপে দ্যাখেন।
প্রথম আর্যসত্য: সত্য সমস্যা (দুঃখ সত্য)
যদিও জীবনে উপভোগ করার অনেক আনন্দ আছে, তাসত্ত্বেও সকল প্রাণী- ক্ষুদ্র প্রাণী থেকে একজন গৃহহীন মানুষ, তারপর একজন অরবপতি- সবাই সমস্যার মুখোমুখি হয়। জন্ম থেকে মৃত্যুর মধ্যে আমরা বৃদ্ধ হই, অসুস্থ হই এবং আমাদের প্রিয়জনের মৃত্যু হয়। আমরা যা কিছু চাই তা পাই না অথবা যা না চাই তার সাক্ষাৎ হয়, এর জন্য ব্যর্থকরণ এবং হতাশার অভিমুখ হই।
দ্বিতীয় আর্যসত্য: সমস্যার সত্য কারণ (সমুদয় সত্য)
আমাদের সমস্যাগুলি উৎপন্ন হয় জটিল কারণ এবং প্রত্যয় থেকে, কিন্তু বুদ্ধ বলেছেন যে বাস্তবিকতার বিষয়ে নিজের অজ্ঞতাই হল তার নিতান্ত কারণ। যা কিছু আমাদের চিত্ত আমাদের উপর, প্রত্যেকের উপর এবং অন্য সবকিছুর উপর নিক্ষেপ করে সেটি হল ভব-এর প্রকৃত পদ্ধতি।
তৃতীয় আর্যসত্য: সমস্যার সত্য নিরোধ (নিরোধ সত্য)
বুদ্ধ দেখলেন যে ঐ সমস্যাগুলির কারণ অর্থাৎ আমাদের নিজ অজ্ঞতাকে নষ্ট করে আমাদের সমস্ত সমস্যা থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব, যাতে আমাদের আর কখনও ঐগুলিকে অনুভব করতে হবে না।
চতুর্থ আর্যসত্য: চিত্তের সত্য মার্গ (মার্গসত্য)
সমস্যার নিরোধ হয় তখন যখন বাস্তবিকতার সঠিক বোধ হওয়ার পর আমরা অজ্ঞতার নিবারণ করি। আমরা এটা তখন করি, যখন আমরা বুঝতে পারি যে আমরা সবাই পরস্পর সংযুক্ত এবং নির্ভরশীল। এর ভিত্তিতে আমরা সকল প্রাণীর প্রতি সমানরুপে মৈত্রী এবং করুণা উৎপন্ন করি। আমরা এবং অন্যরা কী করে জীবিত আছি, এই বোধশক্তি জাগিয়ে যখনই আমরা বিভ্রান্তির নিবারণ করে ফেলি, আমরা নিজের এবং অপরের জন্য হিতকর কার্য করতে সক্ষম হই।
বুদ্ধের উপদেশের প্রসর
দালাই লামা বৌদ্ধ ধর্মকে তিন ভাবে পার্থক্য করেন-
চিত্তের বৌদ্ধ বিজ্ঞান- বিষয়গত অনুভবের দৃষ্টিকোণে বেদনা, চিন্তা এবং আবেগ কী করে কাজ করে।
বৌদ্ধদর্শন- নৈতিকতা এবং প্রমাণ, এবং বাস্তবিকতার বিষয়ে বৌদ্ধ ধর্মের বোধশক্তি।
বৌদ্ধ ধর্ম- পূর্ব এবং অপরজন্ম, কর্ম, বিধি এবং প্রার্থনায় বিশ্বাস।
বৌদ্ধ বিজ্ঞান ইন্দ্রিয়-বেদনা, সমাধি, মনসিকার, মনোযোগ এবং স্মৃতি, আর নেতিবাচক এবং ইতিবাচক, উভয় আবেগ সহ চিত্তের বিভিন্ন চৈতন্য ক্রিয়ার একটি বিশাল মানচিত্র প্রদান ক’রে আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানকে সম্পূরণ করে। স্নায়ু সংক্রান্ত ইতিবাচক পথ গঠনের মাধ্যমে আমরা আমাদের চিত্তের হিতকর সামর্থ্যকে বৃদ্ধি করতে পারি।
বৌদ্ধ চিন্তা-ভাবনা শ্রদ্ধার বদলে পরীক্ষার উপর বেশী নির্ভর করে। অতএব বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলি বৌদ্ধ চিন্তা-ভাবনার জন্য খুবই সহায়ক। - চতুর্দশ দালাই লামা
দৈহিক স্তরে বৌদ্ধ বিজ্ঞান বাস্তব বুদ্ধি সম্পন্ন চিকিৎসা পদ্ধতিকে অন্তর্ভুক্ত করে যার মধ্যে আসে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা। বাহ্যিক রুপে এটি কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার সঙ্গে সদৃশ্যতা সহ পদার্থ এবং শক্তির উপর একটা বিস্তৃত বিশ্লেষণ প্রস্তুত করে। এটা জগতের উৎস, জীবন এবং অন্ত নিয়ে আলোচনা করে, এবং দাবি করে যে জগতের পূর্ব সন্ততি আছে, আদি নেই।
বৌদ্ধ দর্শন যে বিষয়গুলির সঙ্গে সংলগ্ন থাকে সেগুলি হল পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, আপেক্ষিকতা এবং কারণতা। এটি একটি বিস্তৃত প্রমাণ-পদ্ধতি বা যুক্তি-পদ্ধতি দ্বারা প্রস্তুত করে। এটি সিদ্ধান্ত এবং শাস্ত্রার্থ-এর সমষ্টির উপর আধারিত। এটি চিত্তের ভুল অভিক্ষেপগুলিকে জানতে সহযোগিতা করে।
স্বয়ং এবং পর, উভয়ের ক্ষেত্রে কী হিতকর এবং কী ক্ষতিকর, যা এর প্রভেদ করে, তার উপর বৌদ্ধ শীল বা নৈতিকতা আধারিত।
আমরা আস্তিক হই অথবা নাস্তিক, আমরা দেবতা বা কর্মে বিশ্বাস করি অথবা না করি, সবাই নৈতিক নীতি অনুধাবন করতে পারে।– চতুর্দশ দালাই লামা
ফলস্বরূপ এটা মৌলিক মানবীয় মূল্য রুপী দয়া, সততা, উদারতা এবং ধৈর্য্য-এর প্রশংসা এবং বিকাশ করে। অন্যদিকে যতদূর সম্ভব অন্যের ক্ষতি না করার চেষ্টা করে।
বৌদ্ধ ধর্ম এই বিষয়গুলির সঙ্গে যুক্ত, যেমন- কর্ম, পূর্ব এবং অপর জন্ম, পুনর্জন্ম পদ্ধতি, পুনর্জন্ম থেকে মুক্তি এবং বোধিলাভ। এটি ঐ অনুশীলনগুলিকেও অঙ্গীভুত করে, যেমন- জপ, ধ্যান এবং প্রার্থনা। বৌদ্ধ ধর্মে “বৌদ্ধ বাইবেল” এর মতো একমাত্র পবিত্র ধর্মগ্রন্থ বলে কিছু নেই। তার কারণ হল প্রত্যেকটি পরম্পরার নিজস্ব গ্রন্থ আছে যেগুলি মূল বচনের উপর আধারিত। তিব্বতী পরম্পরার অনেক গ্রন্থ আমাদের ‘মূল গ্রন্থ অনুভাগ’-এ পাওয়া
মানুষ যে কোন সময় যে কোন জায়গায় প্রার্থনা করতে পারে, যদিও অনেকে মন্দিরে অথবা নিজেদের বাড়িতে বেদির সামনে সেটা করতে পছন্দ করে। প্রার্থনা করার উদ্দেশ্য ইচ্ছা-পূরণ হওয়ার জন্য নয়, বরং আমাদের অন্তরের শক্তি, জ্ঞান এবং করুণা জাগানোর জন্য।
ভোজন সংক্রান্ত কোন নিয়ম নেই, তবুও অধিকাংশ আচার্যগণ তাঁর শিষ্যদের যতদূর সম্ভব নিরামিষভোজী হওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন। এছাড়া বুদ্ধও তাঁর শিষ্যদের নির্দেশ দিয়েছেন মদ্যপান বা ঔষধ (নেশাজাতীয়) সেবন না করতে। বৌদ্ধ শিক্ষা হল স্মৃতি এবং আত্ম-শাসন-এর বিকাশের উপর উপলক্ষিত, যেটা আমরা হারিয়ে ফেলি যখন আমরা মত্ত হয়ে যাই বা উচ্চপদস্থ হই।
বৌদ্ধ ধর্মে একটি মঠ-পরম্পরা আছে ভিক্ষু এবং ভিক্ষুণীদের নিয়ে, যারা পূর্ণ ব্রহ্মচর্যা সহ শত-শত সম্বর পালন করেন। তাঁরা মস্তক মুন্ডন করেন, চীবর ধারণ করেন এবং মঠ-সমাজে নিবাস করেন। সেখানে তাঁরা তাদের জীবনটাকে গৃহস্থ সমাজের জন্য অধ্যয়ন, ধ্যান, প্রার্থনা এবং ধার্মিক অনুষ্ঠানের প্রতি উৎসর্গ করে দেন। আজকাল অনেক গৃহস্থ মানুষ বৌদ্ধ কেন্দ্রে বৌদ্ধ ধর্ম অধ্যয়ন এবং অনুশীলন করেন।
বৌদ্ধ ধর্ম সবার জন্য খোলা
আমাদের মতো একজন মানুষ, বুদ্ধ, বাস্তবকে দেখেছিলেন যে আমরা প্রকৃতপক্ষে কেমন করে জীবিত আছি। তিনি সমস্ত ভুলগুলিকে অতিক্রম করেছিলেন এবং নিজের পূর্ণ সুপ্ত শক্তিকে জেনেছেন। বৌদ্ধ ধর্মে এটাকে আমরা ‘বোধি’ বলি।[দ্র. বৌদ্ধত্ব কী] বুদ্ধ কেবল হাত দিয়ে সঙ্কেত ক’রে আমাদের সকল সমস্যার নিবারণ করতে পারেন নাই। এর পরিবর্তে তিনি আমাদের মার্গ প্রদর্শন করেছেন যা আমরা অনুসরণ করতে পারি জীবনের সমস্যাগুলি থেকে নিজেকে মুক্ত করার জন্য এবং বিকাশ করতে পারি আমাদের চিত্তের ভাল গুণের, যেমন- মৈত্রী, করুণা, উদারতা, জ্ঞান এবং আরও অনেক।
এই গুণগুলির বিকাশ কী করে করা যাবে তার জন্য নির্ধারিত উপদেশগুলি সবার জন্য খোলা, কোন সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠভূমি বা ধর্মের উপর আধারিত নয়। বৌদ্ধ ধর্ম দেব বা দেবতাগণের প্রতি শ্রদ্ধায় লিপ্ত থাকে না; কেবল আমাদের উপদেশগুলিকে পরীক্ষা করতে বলে। এটা এরকম যে আমরা যেন সত্যি-সত্যিই একটা মূল্যবান বস্তু কেনা-কাটা করছি। এর ফলে কী হয়, আমরা বৌদ্ধ উপদেশগুলির সারমর্মটার প্রশংসা করতে লাগি- নৈতিকতা, করুণা এবং জ্ঞান। যার ফলে আমরা স্বাভাবিকভাবে ক্ষতিকর কর্মগুলি থেকে বিরত থাকি এবং সক্রিয়ভাবে ইতিবাচক কর্মে যুক্ত হই, যা স্ব এবং পরের জন্য হিতকর হয়ে থাকে। এটাই আমাদের সেখানে পৌঁছে দিতে পারবে, যে জিনিসটার কামনা আমরা প্রত্যেকে সমান ভাবে করি, সেটি হল- সুখ এবং মঙ্গল।
বুদ্ধ কে?
দ্বিতীয় তেনশব সেরকোঙ্ রিনপোছে, ম্যাট লিন্ডেন
আমরা সকলেই মহান আধ্যাত্মিক শিক্ষক বুদ্ধের কথা শুনেছি, যিনি প্রায় ২৫০০ বছর পূর্বে ভারতে বাস করতেন এবং শিক্ষা দান করতেন। কিন্তু ঐতিহাসিক বুদ্ধ, যিনি শাক্যমুনি বুদ্ধ নামে পরিচিত, তিনিই একমাত্র বুদ্ধ নন। বৌদ্ধধর্মে অসংখ্য বুদ্ধের উল্লেখ আছে এবং প্রকৃতপক্ষে বৌদ্ধধর্মের একটি মূল শিক্ষা হল যে, প্রতিটি মানুষের মধ্যেই বুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
ঐতিহাসিক বুদ্ধ
অধিকাংশ পরম্পরাগত জীবনী অনুযায়ী, যে ব্যক্তি পরবর্তীতে বুদ্ধ হবেন, তিনি খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতাব্দীতে উত্তর ভারতের অভিজাত শাক্যবংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁকে সিদ্ধার্থ গৌতম নাম দেওয়া হয়েছিল। তাঁর জন্ম উদ্যাপনে, অসিত নামক একজন জ্ঞানী সন্ন্যাসী ঘোষণা করেছিলেন যে, তরুণ শিশুটি হয় একজন মহান রাজা হবেন‚ তা না হলে হবেন একজন মহান ধর্মীয় শিক্ষক। সিদ্ধার্থের পিতা শুদ্ধোধন, শাক্যবংশের প্রধান ছিলেন এবং তাঁর পুত্রকে তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করার জন্য মরিয়া হয়ে তিনি তাঁর পুত্রকে এমন কিছু থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছিলেন যা তাঁকে মহান রাজা হওয়া থেকে বিপথগমন করতে পারে।
তরুণ সিদ্ধার্থকে পারিবারিক প্রাসাদে বিচ্ছিন্ন ক’রে রাখা হয়েছিল এবং তার জন্য সম্ভাব্য সমস্ত বিলাসিতার ব্যবস্থা করা হয়েছিলঃ মূল্যবান রত্ন এবং সুন্দরী নারী, পদ্ম পুকুর এবং আনন্দদায়ক মেনজারী (বন্যপ্রাণী সংগ্রহ) ইত্যাদি। তিনি যেকোন ধরনের দুঃখ-দুর্দশা থেকে সুরক্ষিত ছিলেন কারণ অসুস্থ ও বয়স্কদের রাজপ্রাসাদে প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। সময়ের সাথে–সাথে, সিদ্ধার্থ তার পড়াশোনা এবং খেলাধূলায় পারদর্শী হন এবং যশোধরাকে বিবাহ করেন, যার ফলে তার একটা পুত্র, রাহুল জন্মগ্রহণ করে।
কিন্তু রাজপ্রাসাদের দেওয়ালের বাইরে কী থাকতে পারে সেটার বিষয়ে ক্রমবর্ধমান কৌতুহল নিয়ে, প্রায় ৩০ বছর সিদ্ধার্থ বিলাসবহুল জীবনযাপন করেছিলেন। তিনি ভাবলেন, “যদি এই জায়গাটা আমার হয়”, “তাহলে অবশ্যই আমাকে এই জায়গার এবং এখানকার মানুষদের দেখা উচিত?” অবশেষে, শুদ্ধোধন তাঁর পুত্রকে প্রাসাদের বাইরে বেড়াতে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। রাস্তা পরিষ্কার করা হয়, অসুস্থ এবং বৃদ্ধ লোকেদের দূরে লুকিয়ে রাখা হয়। সিদ্ধার্থের সারথি ছন্ন রাস্তা দিয়ে তাঁর রথ চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। যখন স্থানীয় লোকেরা তাকে দেখে হেসে–হেসে হাত নাড়াচ্ছিল তখন ভিড়ের মধ্যে সিদ্ধার্থ রাস্তার ধারে একজন ঝুঁকে যাওয়া এবং চামড়া কুঁচকে যাওয়া মানুষকে লক্ষ্য করেন। উভয়েই বিস্মিত এবং হতবাক হলেন। তিনি ছন্নকে জিজ্ঞেস করলেন এই বেচারা প্রাণীটির কী হয়েছে? ছন্ন উত্তর দিল, “আপনি আপনার সামনে যাকে দেখতে পাচ্ছেন তিনি একজন বৃদ্ধ ব্যক্তি, এটা একটা ভাগ্য যা আমাদের সকলের জন্যই অপেক্ষা করছে,”। তারপর, সিদ্ধার্থ একজন অসুস্থ ব্যক্তি এবং একটা মৃতদেহের সম্মুখীন হন, উভয়ই অনিবার্য- তবুও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক- জীবনের কিছু অংশ যা তাকেও একদিন স্পর্শ করবে।
অবশেষে, তিনি একজন পবিত্র মানুষের মুখোমুখি হন, যিনি দুঃখ থেকে মুক্তির খোঁজ করছিলেন। এই প্রথম তিনটি দৃশ্য তাকে উপলব্ধি করিয়েছিল যে, তিনি প্রাসাদে তার জীবন দ্বারা প্রতারিত হয়েছেন এবং সমস্ত দুঃখ-কষ্ট থেকে রক্ষা পেয়ে এসেছেন। পবিত্র মানুষটির দৃষ্টি তাকে দুঃখ থেকে মুক্তির উপায় খোঁজের সম্ভাবনার প্রতি জাগ্রত করেছিল।
এটা অসম্ভাব্য যে সিদ্ধার্থ এর আগে কখনও বৃদ্ধ বা অসুস্থ ব্যক্তিদের মুখোমুখি হননি, তবে এটা প্রতীকীভাবে দর্শায় যে কীভাবে তিনি এবং আমরা সকলেই সাধারণতঃ দুঃখ-কষ্ট উপেক্ষা ক’রে জীবনযাপন করি। প্রাসাদে ফিরে সিদ্ধার্থ ভীষণ অস্বস্তি অনুভব করলেন। তিনি তার প্রিয়জন দ্বারা বেষ্টিত একটা স্বাচ্ছন্দ্যের জীবনযাপন করছিলেন, কিন্তু তিনি কীভাবে এটা উপভোগ করবেন বা এই জ্ঞানের সাথে আরাম করবেন যে, একদিন তিনি এবং সকলেই বৃদ্ধ হবেন, অসুস্থ হবেন এবং মারা যাবেন? সকলের জন্য একটা উপায় বের করার জন্য মরিয়া হয়ে, একজন প্রব্রজিত তপস্বীর জীবনযাপনের জন্য তিনি একদিন রাতে প্রাসাদ থেকে পলায়ন করলেন।
সিদ্ধার্থ অনেক মহান শিক্ষকের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন, যদিও তাদের নির্দেশনায় তিনি ধ্যান-সাধনার মাধ্যমে খুব উচ্চস্তরের সমাধি অর্জন করেছিলেন, তবুও তিনি তাতে সন্তুষ্ট হননি, কারণ এই ধ্যানমূলক অবস্থাগুলি দুঃখের অবসান ঘটাতে পারেনি। তিনি তপশ্চর্যার দিকে অভিমুখ করেছিলেন, আর শরীরকে অন্ন ও সমস্ত শারীরিক আরাম থেকে বঞ্চিত করেছিলেন এবং তার বেশিরভাগ সময়ই ধ্যান অনুশীলনে কাটিয়ে ছিলেন। ছয় বছর ধরে এইধরণের অনুশীলনে যুক্ত থাকার ফলে, তার শরীর এতটাই রোগা হয়ে গিয়েছিল যে তিনি ত্বকের সবচেয়ে পাতলা স্তরে আবৃত একটা কঙ্কালের মত হয়ে গিয়েছিলেন।
একদিন, নদীর ধারে বসে, তিনি একজন শিক্ষককে একটা তরুণ শিশুকে বাদ্য বাজানো শেখানোর কথা শুনেছিলেনঃ “তারগুলি খুব ঢিলা হলে চলবে না, তাহলে তুমি বাদ্যটা বাজাতে পারবে না। একইভাবে, তারগুলি খুব আঁটসাঁট হলেও চলবে না, তাহলে সেটা ছিঁড়ে যাবে”। এর মাধ্যমে, সিদ্ধার্থ বুঝতে পেরেছিলেন যে তার বছরের পর বছর ধরে করে যাওয়া তপশ্চর্যা কোন কাজে আসেনি। রাজপ্রাসাদে তার বিলাসবহুল জীবনের মত, তপশ্চর্যাগুলি চরম পর্যায়ে ছিল যা দুঃখকে জয় করতে পারেনি। তিনি ভেবেছিলেন যে এই চরম পর্যায় দুটির (দ্বয় অন্ত) মধ্যবর্তী পথটি অবশ্যই এর উত্তর হবে।
সেই মুহুর্তে, সুজাতা নামক একজন তরুণী পাশ দিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছিল, সে সিদ্ধার্থকে ক্ষীর অর্পন করেছিল।এটাই ছিল বিগত ছয় বছরের মধ্যে তার উপযুক্ত অন্ন। তার সহগামী তপস্বী বন্ধুদের তিনি সেটা গ্রহণ ক’রে হতবাক করে দেন এবং তারপর একটি ডুমুর গাছের নীচে বসে পড়েন। তিনি তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নেন, “আমি পূর্ণ বোধিলাভ না করা পর্যন্ত এই আসন থেকে উঠব না”। এই গাছের নীচেই বুদ্ধ পূর্ণ জ্ঞান লাভ করেন, যা বোধিবৃক্ষ নামে পরিচিত এবং বুদ্ধ, প্রবুদ্ধ নামে পরিচিত হন।
তাঁর বোধিলাভের পরপরই, বুদ্ধ চার আর্যসত্য এবং অষ্টাঙ্গিক মার্গের উপর শিক্ষা প্রদান করেন। পরবর্তী ৪০ বছর ধরে তিনি উত্তর ভারতীয় সমতলভূমি জুড়ে ভ্রমণ করেন এবং তিনি যা উপলব্ধি করেছিলেন সেটা সকলকে প্রদান করেন। তিনি সংঘ নামে পরিচিত ভিক্ষুদের নিয়ে একটি গোষ্ঠী স্থাপন করেন, যারা ভারত জুড়ে এবং এশিয়া ও বিশ্বজুড়ে বুদ্ধের শিক্ষাকে প্রচার করেন।
আনুমানিক ৮০ বছর বয়সে কুশিনগরে বুদ্ধ দেহত্যাগ করেন। এটা করার আগে তিনি সংঘকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, তাদের মধ্যে কোন সন্দেহ আছে কিনা বা শিক্ষার মধ্যে এমন কিছু আছে যা স্পষ্টীকরণের প্রয়োজন আছে। ধর্ম ও নৈতিক স্ব-শৃঙ্খলার উপর নির্ভর করার জন্য তাঁর অনুযায়ীদের পরামর্শ দিয়ে, তিনি তাঁর শেষ কথাগুলি বলেছিলেনঃ “দেখুন, হে ভিক্ষুগণ, এটাই আপনাদের জন্য আমার শেষ উপদেশ। পৃথিবীর সমস্ত সংস্কৃত বস্তু পরিবর্তনশীল। সেগুলি স্থায়ী নয়, আপনারা নিজেদের মুক্তিলাভের জন্য কঠোর পরিশ্রম করুন”। এর সাথে-সাথে তিনি তাঁর ডানদিকে কাত হয়ে দেহত্যাগ করলেন।
বুদ্ধ কী?
আমরা দেখেছি ঐতিহাসিক বুদ্ধ কে ছিলেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বুদ্ধ হওয়ার অর্থ কী?
সহজভাবে বলতে গেলে, একজন বুদ্ধ হলেন তিনি, যিনি প্রবুদ্ধ হয়েছেন। বুদ্ধরা গভীর নিদ্রা থেকে জাগ্রত হয়েছেন। এটা সেই ধরণের গভীর নিদ্রা নয় যা আমরা সারারাত পার্টি করার পর নিদ্রামগ্ন হই, বরং এটা হল বিভ্রান্তির নিদ্রা আমাদের জীবনের প্রতিটা মূহুর্তে ব্যপ্ত থাকে; বিভ্রান্তি হল আমরা প্রকৃতপক্ষে কীভাবে অস্তিমান বা বাস্তবে সবকিছু কীভাবে অস্তিমান, সেই বিষয়ে বিভ্রান্তি।
বুদ্ধরা দেবতা নন এবং তাঁরা সৃষ্টিকর্তাও নন। সমস্ত বুদ্ধই বিভ্রান্তি, অশান্তকারী আবেগ এবং বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত আমাদের মত অবস্থা থেকেই শুরু করেন। কিন্তু ধীরে-ধীরে করুণা এবং প্রজ্ঞার পথ অনুসরণ ক’রে এবং এই দুটি ইতিবাচক গুণ বিকাশের জন্য কঠোর পরিশ্রম ক’রে, নিজের জন্য বোধিলাভ করা সম্ভব।
বুদ্ধদের তিনটি প্রধান গুণ থাকেঃ
প্রজ্ঞা- একজন বুদ্ধের মধ্যে কোন মানসিক অবরোধ থাকে না, তাই তাঁরা সম্পূর্ণভাবে ও সঠিকভাবে সব কিছুই বুঝতে পারেন, বিশেষ ক’রে কীভাবে অন্যদের সাহায্য করা যায়।
করুণা- উপরোক্ত প্রজ্ঞার ভিত্তিতে তাঁরা দেখতে পান যে, আমরা সকলেই একে-অপরের সাথে সংযুক্ত। যেহেতু, বুদ্ধদের মধ্যে মহান করুণা থাকে, তাই তাঁরা বোঝেন যে তাঁরা প্রত্যেককে সাহায্য করতে সক্ষম। করুণা ছাড়া প্রজ্ঞা হয়তো কোন ব্যক্তিকে শিক্ষিত বানায়, কিন্তু তারা সমাজের জন্য খুব বেশী কাজে আসে না। করুণা হল যা তাদের অন্যদের কল্যাণার্থে কাজ করতে প্রেরণা জোগায়। এই কারণেই বুদ্ধ আমাদের সকলের সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য এই দ্বিতীয় গুণটি উৎপন্ন করেন।
ক্ষমতা- কীভাবে দুঃখ দূর করতে হয় এবং অপরকে সাহায্য করার দৃঢ় ইচ্ছা থাকার কারণে বুদ্ধরা প্রকৃতপক্ষে অপরের কল্যাণ করার জন্য আসল বল এবং ক্ষমতা সম্পন্ন এবং সেটা তাঁরা করেন বিভিন্ন উপায় কৌশলের মাধ্যমে আমাদের বোধিলাভের পথ প্রদর্শন ক’রে।
বুদ্ধরা বোঝেন যে তাঁরা যেমন দুঃখ ভোগ করতে চান না, তেমনি অন্যকেউই সমস্যায় পীড়িত হতে চায় না। সবাই সুখী হতে চায়। সুতরাং, বুদ্ধরা কাজ করেন শুধুমাত্র তাদের নিজেদের জন্য নয়, বরং জগতের জন্য। তাঁরা নিজেদের জন্য যতটা যত্নশীল অন্যদের জন্যও ততটাই যত্নশীল।
তাঁরা অবিশ্বাস্যভাবে শক্তিশালী করুণায় অনুপ্রাণিত হয়ে সমস্ত দুঃখ-কষ্ট দূর করার সমাধান শেখায়, যাকে বলা হয় প্রজ্ঞা অর্থাৎ বাস্তবতা এবং কল্পকাহিনীর মধ্যে সঠিকভাবে প্রভেদ করার জন্য মনের স্বচ্ছতা। এই প্রজ্ঞার সাহায্যে আমরা সবরকম নেতিবাচক জিনিস থেকে মুক্তি পেতে পারিঃ সমস্ত বিভ্রান্তি, স্বার্থপরতা এবং নেতিবাচক আবেগ। আমরা বিশুদ্ধ বুদ্ধ হতে পারি এবং সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ শান্তি অনুভব করতে পারি।
ধর্ম কী?
বৌদ্ধদের জন্য, “ধর্ম” শব্দটি বুদ্ধের শিক্ষাকে বোঝাতে ব্যবহার করা হয়, যেটা আমাদের বর্তমান বিভ্রান্তি এবং দুঃখের অবস্থা থেকে সচেতনতা ও আনন্দের অবস্থায় যেতে সাহায্য করে। যেমন- ইংরেজি শব্দ “রিলিজিয়ান (ধর্ম)” ল্যাটিন শব্দ “একত্রে আবদ্ধ করা” থেকে এসেছে, তেমনই ধর্ম শব্দটি সংস্কৃত “ধৃ” শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ দৃঢ়ভাবে ধারণ করা বা আশ্রয় প্রদান করা। মূলতঃ, ধর্ম আমাদেরকে দৃঢ়ভাবে আশ্রয় প্রদান করে, আমাদের অপায় বা দুর্গতিতে পতিত হওয়া থেকে প্রতিরোধ ক’রে, যেখানে আমাদের দীর্ঘকাল ধরে অনিয়ন্ত্রিত দুঃখ ভোগ করতে হয়।
বুদ্ধের প্রথম ধর্মোপদেশ
২৫০০ বছরেরও বেশী পূর্বে বুদ্ধ যখন বুদ্ধগয়াতে বোধিলাভ করেছিলেন, তখন তিনি প্রথমে ধর্মোপদেশ দিতে দ্বিধাবোধ করেছিলেন এই ভয়ে যে, এটা খুব গভীর এবং বোঝা অত্যন্ত কঠিন, অথবা পার্থিব ভোগ-বিলাসে প্রমত্ত মানুষ এর প্রতি আগ্রহী হবে না। প্রাচীন গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, ব্রহ্মা জগতের স্রষ্টা, যিনি বুদ্ধের সামনে উপস্থিত হয়েছিলেন এবং প্রাণীদের কল্যাণের জন্য তাকে ধর্মোপদেশ দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন, কারণ নিশ্চিতভাবে এমন কিছু মানুষ ছিলেন যারা বোধিলাভ প্রাপ্ত করতে সক্ষম হবেন। তদনুরূপ, বুদ্ধ চার আর্যসত্যের উপর মৃগদাভে নিজের প্রথম ধর্মোপদেশ দিয়েছিলেন। এটাই সমগ্র বৌদ্ধ পথের কাঠামো এবং আজও বিশ্বের সমস্ত বৌদ্ধ পরম্পরার ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
বুদ্ধ যে প্রথম সত্যটার উপর উপদেশ দিয়েছিলেন, সেটা হল জীবন সর্বদা অসন্তোষজনক। আমরা যেকোন সময়ে যতই সুখী অনুভব করি না কেন, এই সুখের অবস্থা অস্থির এবং অস্থায়ী। এটা হল সার্বজনীন- আমরা সকলেই নিজের জীবনে এটা অনুভব করি। আমাদের কাছে যে সুখ আছে, সেটা চিরকালের জন্য স্থায়ী হয়ে থাকে না এবং সেটা যেকোন সময় দুঃখে পরিবর্তন হতে পারে। দ্বিতীয় সত্যটি হ’ল যে আমাদের দুঃখ বাস্তবে বহিরাগত নয়, বরং আমাদের নিজেদের আসক্তি থেকে উৎপন্ন হয়, অর্থাৎ আমরা যেটা চাই সেটা প্রাপ্ত করার আসক্তি, আর সর্বোপরি সব কিছু বাস্তবে কীভাবে অস্তিমান আমাদের এই অনভিজ্ঞতা থেকে। তৃতীয় সত্য বিবৃত করে যে, সব দুঃখ এবং সমস্যা থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব, আর চতুর্থটি হল একটি মার্গ বর্ণনা করে, যেটা পালনের মাধ্যমে আমরা সকলেই সমস্যাগুলি থেকে চিরতরে মুক্তি পেতে পারি।
বুদ্ধের শিক্ষাগুলির উদ্দেশ্য হল দুঃখকে দূর করা
বুদ্ধের সময়ে, সমস্ত ধর্মীয় উপদেশগুলি মৌখিকরূপে দেওয়া হয়েছিল, আর সেগুলি স্মৃতির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। এগুলি পান্ডুলিপিতে সংকলিত হওয়ার পূর্বে বেশ কয়েক প্রজন্ম ধরে এইভাবেই চলে এসেছিল। আজ, আমাদের কাছে শত শত সূত্র আছে, বুদ্ধের প্রব্রজিত অনুযায়ীদের জন্য বিনয় সম্পর্কিত নিয়মাবলী যুক্ত গ্রন্থ এবং দার্শনিক প্রবচন, যেটা একসাথে ত্রিপিটকরূপে সুপরিচিত। পরম্পরা অনুসারে, কখনও-কখনও বলা হয় যে, বুদ্ধ মোট ৮৪,০০০ টি ধর্ম উপদেশ দিয়েছিলেন, যেগুলি আমাদের ৮৪,০০০ অশান্তকারী আবেগ (ক্লেশ) কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করে। যদিও সংখ্যাটি অযৌক্তিক হতে পারে, তবে এটা কেবল সহজভাবে দেখানোর একটা উপায় যে, আমাদের কত সমস্যা, হতাশা এবং কত প্রকারের দুঃখ সহ্য করতে হয় এবং বুদ্ধ এই সব কিছুর মোকাবিলা করার জন্য উপদেশের বিশাল শ্রেণীবিন্যাস প্রদান করেছিলেন।
প্রকৃতপক্ষে, বুদ্ধের সমস্ত শিক্ষাই দুঃখ-কষ্টকে জয় করার বিষয়ের উপর আধারিত। বুদ্ধ অধিবিদ্যামূলক ভাবনাচিন্তায় আগ্রহী ছিলেন না, এমনকি আত্মা এবং জগৎ সম্পর্কিত কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতেও অস্বীকার করেছিলেন কারণ এই বিষয়গুলি নিয়ে চিন্তা করলে আমাদের মুক্তির কাছাকাছি নিয়ে যায় না। বুদ্ধ মানবের পরিস্থিতির দিকে তাকিয়েছিলেন এবং দেখেছিলেন যে আমরা সবাই পীড়িত এবং তাই তার সমাধান খুঁজেছিলেন। এই কারণেই বুদ্ধের তুলনা প্রায়শই একজন চিকিৎসকের সাথে করা হয়, আর তাঁর ধর্মোপদেশগুলির তুলনা করা হয় ঔষধের সাথে। ধর্মরূপী এই ঔষধ আমাদের সব সমস্যাগুলিকে সবসময় সমাধান করতে সাহায্য করে।
যখন শরণের জন্য তিনটি রত্ন রয়েছে- বুদ্ধ, ধর্ম এবং সংঘ- এদের মধ্যে ধর্মই হল প্রকৃত শরণ। যখন বুদ্ধগণ ধর্মোপদেশ দেন, তারা আলৌকিকভাবে তুড়ি মেরে আমাদের দুঃখ দূর করতে পারেন না। আর সংঘ আমাদের সমর্থন এবং অনুপ্রেরণা প্রদান করতে পারেন, তারা আমাদের ধর্মের অনুশীলন করার জন্য জোর করতে পারেন না। বাস্তবে আমাদের নিজেদেরকেই ধর্মের অধ্যয়ন করতে হবে এবং তার অনুশীলনে যুক্ত হতে হবেঃ দুঃখ থেকে মুক্তির এটাই একমাত্র পথ। বাস্তবে, আমরাই হলাম আমাদের নাথ।
ধর্মের গুণাবলী
ধর্মের অসংখ্য গুণ আছে, কিন্তু আমরা বলতে পারি যে প্রধান গুণগুলি হল, যেমন-
১ঃধর্ম অনেক বৈচিত্রময় এবং বিভিন্ন স্বভাবের জন্য অনুকূল। যদিও বৌদ্ধধর্ম থাইল্যান্ড, তিব্বত, শ্রীলঙ্কা, জাপান ইত্যাদির মতো স্থানে উল্লেখযোগ্যভাবে বিভিন্ন রূপ ধারণ ক’রে আছে, তবুও সব পরম্পরাগুলি মূল বৌদ্ধশিক্ষাগুলি ধারণ ক’রে আছে আর তার উদ্দেশ্য হল মুক্তি প্রাপ্ত করা।
২ঃধর্ম যুক্তির উপর ভিত্তি ক’রে আছে। এটা আমাদের নিজের মন এবং সব বস্তুকে বাস্তবিকরূপে অনুভব ক’রে দেখতে বলে। এটা মতবাদ সংক্রান্ত নয় যে কোন দেবতা অথবা দেবীতে বিশ্বাসের প্রয়োজন, বরং আমাদেরকে সব কিছু যুক্তি দিয়ে প্রশ্ন করতে বলে। পরম পূজ্য দালাই লামা অনেক বছর ধরে বৈজ্ঞানিকদের সাথে চেতনা (বিজ্ঞান) এবং মনের মতো মূল বৌদ্ধ ধারণাগুলিকে পরীক্ষা করার জন্য কাজ করছেন, আর বৌদ্ধ এবং বৈজ্ঞানিকরা সমানভাবে একে-অপরের কাছ থেকে অধ্যয়ন করছেন।
৩ঃধর্ম কেবল একটা সমস্যার দিকে নির্দেশিত নয়, এর উদ্দেশ্য সব সমস্যাগুলির মূলের প্রতি লক্ষ্য সন্ধান করা। যদি আমাদের নিয়মিতভাবে প্রতিদিন ভয়ানক মাথাব্যথা করতে থাকে, তাহলে আমরা অ্যাসপিরিন নিতে পারি। অবশ্যই, এটা অল্প সময়ের জন্য সাহায্য করবে, কিন্তু আবার ফিরে আসবে। যদি এমন কোন বড়ি থাকত যেটা আমাদের মাথাব্যথা থেকে স্থায়ীভাবে রেহাই দিতে পারত, তাহলে আমরা অবশ্যই সেটা গ্রহণ করতাম। ধর্মও হল এইরকমই, কারণ এটা কেবল মাথাব্যথা নয়, বরং সমস্ত সমস্যা এবং দুঃখ থেকে স্থায়ী মুক্তি দেয়।
সারাংশ
বুদ্ধ হলেন একজন অত্যন্ত দক্ষ ডাক্তারের মতো যিনি আমাদের দুঃখ-কষ্ট নির্ণয় করেন এবং আমাদের সর্বোত্তম সম্ভাব্য ঔষধরূপী ধর্ম প্রদান করেন। কিন্তু ঔষধ খাওয়া- অথবা ধর্মচর্চায় যুক্ত হওয়া হল- আমাদের নিজেদের বিষয়। কেউ আমাদের সেটা করার জন্য বাধ্য করতে পারে না। তবে আমরা যখন সত্যিই দেখি যে ধর্ম সেই লাভগুলি ও মনের শান্তি নিয়ে আসে, আর কীভাবে এটা বাস্তবে আমাদের সব সমস্যা, হতাশা এবং দুঃখকে দূর করতে সহায়তা করে, তখন আমরা নিজেদের এবং অন্য সকলের কল্যাণার্থে আনন্দের সাথে ধর্ম অনুশীলন করব।
সংঘ কী?
“সংঘ” শব্দটি একটি সংস্কৃত শব্দাবলী যার অর্থ হল “সমুদয় বা সম্প্রদায়”। এটি মূলতঃ বুদ্ধের প্রব্রজিত শিষ্যদেরকে বোঝায়, যারা ভিক্ষু এবং ভিক্ষুণী নামে পরিচিত। বর্তমানে, যেহেতু বৌদ্ধধর্ম সমগ্র পাশ্চাত্য জগতে প্রচারিত হচ্ছে, তাই এটা সামগ্রিকভাবে বৌদ্ধ সমুদয়ের জন্য বা একটা ধর্মকেন্দ্রে সাধারণ অনুযায়ীদের একটা ছোট দল ও একটা সংঘ গঠনের জন্য খুবই সাধারণ হয়ে উঠেছে।
সংঘের উৎপত্তি
‘ধর্মচক্রপ্রবর্তনসূত্র’ ব্যাখ্যা করে যে বুদ্ধত্ব লাভ করার পর বুদ্ধ তাঁর পাঁচজন প্রাক্তন বন্ধু, যাদের সাথে তিনি কয়েক বছর ধরে তপশ্চর্যা করেছিলেন, চার আর্যসত্যের উপর তাঁর প্রথম উপদেশ বা শিক্ষা প্রদান করেছিলেন। ঐ উপদেশের সময় ঐ পাঁচজন তপস্বীই তাঁর শিষ্য হয়েছিলেন এবং তাদের মধ্যে কৌন্ডিণ্য অর্হত অর্থাৎ মুক্ত সত্তার অবস্থা লাভ করেছিলেন। কিছুদিন পরে আত্ম-শূন্যতার উপর উপদেশ দেওয়ার সময় অথবা কীভাবে অসম্ভব উপায়ে আত্মার অস্তিত্ব থাকতে পারে না, তার উপর উপদেশ দেওয়ার সময় অন্য সব তপস্বীরাও অর্হত্ব লাভ করেছিলেন। এইভাবে এই পাঁচজন শিষ্যই সংঘের প্রথম সদস্য বা প্রথম বৌদ্ধ ভিক্ষু হন।
তারপর বুদ্ধ তাঁর অবশিষ্ট জীবন- মোট প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে- তিনি যে ধর্মের খোঁজ করেছিলেন, তার প্রচার করার জন্য উত্তর ভারতের সমতল জুড়ে গ্রাম ও শহরে ভ্রমণ করেছিলেন। শীঘ্রই, বুদ্ধ সামাজিক ধারা জুড়ে অনেক অনুযায়ীদের আকৃষ্ট করেছিলেনঃ অন্যান্য আধ্যাত্মিক গুরু, রাজা এবং রাণী, কৃষক এবং কষাই ইত্যাদি আরও অনেক। যদিও বেশিরভাগ শিষ্যরা পার্থিব বা সাংসারিক জীবন ত্যাগ করতে চাননি, তবুও যারা গৃহস্থ জীবন ত্যাগ ক’রে সংঘে যোগদান করতে চেয়েছিলেন তাদের স্বাগত জানানো হয়েছিল। সাধারণ গৃহস্থ শিষ্যগণ, যারা বৈবাহিক জীবনে যুক্ত থেকে কাজকর্ম চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, তারা সংঘকে অন্ন এবং বস্ত্র দিয়ে সমর্থন করেছিলেন।
সময়ের সাথে-সাথে, যত বেশি সংখ্যক মানুষ আনুষ্ঠানিকভাবে বুদ্ধের সাথে যোগদান করলেন একটা সম্প্রীত আধ্যাত্মিক সমুদয় তৈরী করার উদ্দেশ্যে, শিষ্যদের মেনে চলার জন্য নিয়ম তৈরী করার প্রয়োজন হয়ে পড়ল। সংঘের মধ্যে ঘটিত অনাকাঙ্খিত ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসাবে যখন নিয়ম গঠন করার প্রয়োজন হয়েছিল তখন সেটাকে বিচার ও ত্রুটির মাধ্যমে প্রণয়ন করা হয়েছিল। বুদ্ধের জীবনের শেষ দিকে ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীদের জন্য কয়েক শত নিয়ম নির্ধারিত ছিল।
স্ত্রীদের দীক্ষা
শুরুতে বুদ্ধ শুধুমাত্র পুরুষদের বৌদ্ধ সংঘে দীক্ষিত করেছিলেন। বৌদ্ধসংঘের প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছর পর বুদ্ধের মাসি মহাপ্রজাপতি গৌতমী বুদ্ধকে অনুরোধ করেছিলেন তাকে ভিক্ষুণী হিসাবে দীক্ষিত করার জন্য, কিন্তু তিনি সেটা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তা সত্ত্বেও মহাপ্রজাপতি নির্ভীক হয়েছিলেন এবং পাঁচশজন অন্য স্ত্রীদের সাথে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে তারা তাদের মস্তক মুন্ডন করবেন এবং পীত বস্ত্র ধারণ ক’রে বুদ্ধকে অনুসরণ করবেন।
মহাপ্রজাপতি বুদ্ধের কাছে আরও দুটি অনুরোধ করেছিলেন এবং প্রত্যেক বারই বুদ্ধ তাদের দীক্ষিত করতে অস্বীকার করেছিলেন। চতুর্থবার বুদ্ধের কাকাতো ভাই আনন্দ প্রজাপতির হয়ে মধ্যস্থ করেছিলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে স্ত্রীদের মধ্যে আধ্যাত্মিক পথে এগিয়ে যাওয়া এবং জ্ঞানলাভের ক্ষমতা পুরুষদের সমান আছে কিনা। বুদ্ধ ইতিবাচকভাবে তার উত্তর দিয়েছিলেন। আনন্দ তখন পরামর্শ দিয়েছিলেন যে তাহলে তো স্ত্রীদের ক্ষেত্রে ভীক্ষুণী হওয়া ভালো হবে। আর তাই বুদ্ধ পরে স্ত্রী শিষ্যদের দীক্ষিত হওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন।
ব্যবহারিক সংঘ এবং আর্য সংঘ
সাধারণতঃ, সংঘ শব্দটি ভিক্ষু এবং ভিক্ষুণীদের এই দুটি সমুদয়, যারা বুদ্ধের শিক্ষা অনুসরণ করে, তাদের বোঝানোর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। ভিক্ষু শব্দের প্রকৃত অর্থ হল “ভিক্ষুক বা ভিখারী” এবং এটা এই কারণে ব্যবহার করতে হয়েছিল যে, দীক্ষিত সমুদয়কে অধিকাংশ বস্তুগত ত্যাগ ক’রে আহারের জন্য অন্যের উপর নির্ভর ক’রে জায়গায় জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হতো। একটা সংঘ গঠনের জন্য নুন্যতম চারজন পূর্ণ ভিক্ষু অথবা শ্রামণের বা শ্রামণেরিকা থাকার প্রয়োজন হতো, তাতে তাদের উপলব্ধির সচেতনতার স্তর যাই হোক না কেন। এছাড়াও একটা আর্য সংঘ আছে, যা ব্যক্তি দীক্ষিত অথবা অদীক্ষিত উভয়কে বোঝায় কিন্তু তাদের প্রকৃতপক্ষে ধর্মীয় পথের কিছু উপলব্ধি অর্জন করতে হতো।
ব্যবহারিক বা প্রচলিত সংঘ এবং আর্য সংঘের মধ্যে পার্থক্য করা গুরুত্বপূর্ণ। যদিও সংঘের মধ্যে অনেক উৎকৃষ্ট সর্বজনীন ভিক্ষু এবং ভিক্ষুণী আছেন, তবে এমনও হতে পারে তাদের মধ্যে কিছু এমন আছেন আমাদের মতোই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এবং তাই এটা আমাদের মধ্যে প্রশ্ন জাগাতে পারে যে আমরা কেন তাদের শরণে যাব। বস্তুতঃ তারা এমনই একজন যারা আমাদের সঠিক পথে যেতে সহযোগিতা করে।
সংঘের গুণাবলী
তাহলে, সংঘের মধ্যে কী ধরণের গুণ থাকে যা আমরা নিজেদের মধ্যে বিকাশ করতে চাই?
১। তাঁরা যখন শিক্ষা দান করেন তখন তাঁরা গ্রন্থ থেকে যা শিখেছেন তার পুনরাবৃত্তি করেন না। তাঁরা তাদের নিজস্ব বিশুদ্ধ অভিজ্ঞতা থেকে কথা বলেন এবং এটা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।
২। তাঁদের একমাত্র ইচ্ছা অন্যদের সহযোগিতা করা আর তাঁরা যে বিষয়ে শিক্ষা দান করেন তাঁরা তার অনুশীলনও করেন। একজন ধূমপায়ীর পক্ষ থেকে ধূমপানের বিপদ সম্পর্কে আমাদের তিরষ্কার করার কথা ভাবুন, আমরা সত্যিই ভাবব আমাদেরকে কেন তার পরামর্শ অনুসরণ করা উচিত, তাই না? এই কারণে, সংঘ সবসময় তাঁরা যা করেন সেই বিষয়ে তাঁরা আন্তরিক থাকেন, তাই আমরা সত্যিই তাদের বিশ্বাস করতে পারি।
৩। আমরা যখন খারাপ সঙ্গের সাথে সময় কাটাই আমরা বুঝতেই পারি না তাদের কতটা খারাপ গুণ নিজেরা গ্রহণ করে ফেলি। একইভাবে আমরা যদি ভাল বন্ধু-বান্ধবের সাথে আড্ডায় যুক্ত হয়ে যাই, এমনকি খুব বেশি পরিশ্রম না ক’রেও, আমরা শীঘ্রই ভাল গুণগুলি অর্জন ক’রে ফেলি। অতএব, আমাদের ধর্ম-চর্চার উন্নতির জন্য সংঘের দিক থেকে আমাদের উপর খুব ভাল প্রভাব ফেলে।
সংঘের গুরুত্ব
প্রায় দু-হাজার পাঁচশ বছর আগে বুদ্ধ পরলোক গমণ করেছেন আর আমাদের জন্য রেখে গেছেন তাঁর ধর্মরূপী শিক্ষার অনুশীলন এবং এটাই হল সেই বৌদ্ধধর্ম। কিন্