08/04/2020
খুবই আশ্চর্যের বিষয়!
আমরা কোনো একটি দিন বা রাত মাহফিলের তারিখ নির্ধারণ করে আলোকসজ্জা করি, বিভিন্ন পদ্ধতিতে আল কুরআনের তিলাওয়াত করি, হাদিসের আলোকে আলোচনা করি ও শুনি, সিরাতুন নাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে নির্ধারিত অংশের উপর বক্তব্যের আয়োজন করি, বিভিন্ন মাসয়ালা নিয়ে আলোচনার ব্যবস্থা করি, বিশেষকরে সমকালীন বিষয়ে গুরুত্বসহকারে আলোচনা করি, সে দিন বা মাসের কোনো ফাদাইল থাকলে সেটা সাধারণ মুসলিমদের জানানোর ব্যবস্থা করি, বিভিন্ন কণ্ঠশিল্পী বা শিল্পীগোষ্ঠীর মাধ্যমে ইসলামি সংগীতের আয়োজন করি, খুবই মনোমুগ্ধকর ছন্দের তালে তালে সুরের মূর্ছনায় বিভোর হয়ে সবাই মিলে আবৃত্তি করি, মাহফিল উপলক্ষে অনেকের দেখা হয় ফলে তাদেরকে বিভিন্ন প্রকার সুমিষ্টখাদ্য দিয়ে আপ্যায়ন করি।
এসব কিছুই আমরা স্বাভাবিকভাবেই করে থাকি। ভুলেও আমরা এসব কাজ বিদআত হবে বলে ভাবনায়ও আনি না কিংবা ভাবনাতে আসেও না । নির্ধারিত দিন বা রাতের বিষয়ে কোনো ফাদাইল না থাকলেও আমরা সে দিন বা রাত নিজেরাই নির্ধারণ করি। এরপর এসব কাজ করে থাকি।
অথচ আমাদের কিছু ভাই তারা শারিয়া নির্ধারিত ফাদাইলের রাত বা দিনে এসব কাজ করলেই বিদআতের ফাতওয়া দিয়ে সাধারণ মুসলিম জনতাকে "বেদাতী" সাব্যস্ত করেন। এটা খুবই অবিবেচনাপ্রসূত বলেই মনে হচ্ছে। অথচ বড়ই আফসোসের বিষয় যে সাধারণ মানুষেরা তো দূরের কথা আমাদের সমাজে তথা বাংলাদেশের জনসমাজে বক্তা, ইসলামি নেতা, পীর, শাইখ, আলিম, আমির হিসেবে স্বীকৃত অনেকই আল কুরআন ও সুন্নাতের আলোকে এসব দিন বা রাতের প্রকৃত গুরুত্ব, তাৎপর্য, মহত্ব, আমাল সম্পর্কে ওয়াকিফহাল নন। তাদেরসহ সাধারণ মুসলিমের অবশ্যই সেসব ফাদাইল জানা বুঝার প্রয়োজন রয়েছে। এজন্য উক্ত দিন বা রাতে মাহফিল আয়োজন করাকে বিদআত আখ্যা দেয়া একপ্রকার বাড়াবাড়ি বৈ কিছু নয়।
এ মুহুর্তে আমরা লাইলাতুন নিসফি মিন শা'বান তথা আমাদের দেশে শবে বরাত নামে প্রসিদ্ধ একটি ফাদাইলপূর্ণ রাত অতিক্রম করছি। শবে বরাত নামে প্রসিদ্ধ হলেও এ নামটি বর্জন করে হাদিসে বর্ণিত নামই বলা উচিত। এরাতে আল্লাহ মুশরিক তথা তাঁর ওয়াহদানিয়্যাতের সাথে অংশীদারিত্ব স্থাপনকারী ও মুশাহিন তথা হিংসুক ব্যতীত সব তাওবাকারী মুসলিমকে ক্ষমা করে দেন। সুতরাং এরাতে আমাদের বেশি বেশি তাওবা -ইস্তিগফার করাই উত্তম আমাল। এরাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ অনুসারে কবর বা মাযার তথা যিয়ারতের স্থানে যেয়ে যিয়ারত করা যেতে পারে। কেননা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরাতে কবর যিয়ারত করলেও কোনো সাহাবি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে তা করতে নির্দেশ দিয়েছেন বলে বর্ণনা আমরা পাচ্ছি না। সালাতুন নাওয়াফিল ও সালাতুত তাহাজ্জুদ প্রতি রাতেই আমরা আমাল করতে পারি। বেশি বেশি তাহলিল, তাসবিহ, তাকবির, ইস্তিগফার, দুয়া, আস সালাত ওয়াস সালাম আলান নাবি আমরা পড়তে পারি। আমাদের দেশে কিছু সনদবিহীন হাদিসের আলোকে এরাত উপলক্ষে বারো রাকায়াত বিশেষ সালাত প্রচলিত রয়েছে। তো আমরা এ নির্দিষ্ট বারো রাকায়াতের পরিবর্তে ইচ্ছেমতো নাওয়াফিল সালাত পড়বো ইন শা আল্লাহ। আর প্রচলিত বলেই কোনো আমালকে এরাতের জন্য নির্দিষ্ট বলে ধারণা করা থেকে দূরে থাকা উচিত। সুন্নাতের আলোকে ইবাদত করতে আমরা সচেষ্ট থাকবো।
আমাদের দেশে তো বটেই বিশ্বের অনেক মুসলিম দেশে প্রচলিত হালুয়া-রুটি নিয়ে একধরণের পক্ষপাতদুষ্ট চিন্তাধারা আমাদের মধ্যে রয়েছে। যেহেতু একজন ইমাম এরাত উপলক্ষে এসব আয়োজনকে বিদআত বলেছেন! কিন্ত আমরা হাদিস থেকে জানতে পেরেছি হালুয়া ও রুটি সুন্নাহসম্মত হালাল খাবার। বিশেষকরে হালুয়া তো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয় খাবার। আর রুটি আবহমানকাল ধরেই প্রচলিত। তো এসব খাবার দিয়ে জনসাধারণকে আপ্যায়ন করা ইসলামের অন্যতম একটি উত্তম কাজ হবে বলেই আমরা হাদিস থেকে শিক্ষা পাই। কিন্ত এরাত উপলক্ষে এরকম করতেই হবে বলে জরুরি মনে করাটা ঠিক নয়। আবার কেউ করলেই আমরা বিদআতের ফাতওয়া দিবো না। কোনো ইমাম বলেছেন বলেই সেটা গ্রহণযোগ্য মত হয় না। যেহেতু আমরা হাদিসে এর বিপরীত পেয়েছি। বিশেষকরে এখন করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের ফলে আমরা সবাই লকডাউনে। এমুহুর্তে আমরা একান্ত প্রয়জোন না হলে আপ্যায়নের আমাল করবো না ইন শা আল্লাহ।
এরাত উপলক্ষে মসজিদে যাওয়ার কোনো নির্দেশনা আমরা সুন্নাহতে পাই না। যদিও তাবিয়িদের কেউ কেউ খালিদ ইবন মা'দান সহ অন্যান্যরা মসজিদে গিয়েছেন কিন্ত অসংখ্য তাবিয়ি, সাহাবি কেউই এরাত উপলক্ষে মসজিদে যান নি। তাই বলে অন্যরা তাঁদেরকে "বেদাতী " আখ্যাও দেন নি। তাই প্রচলিত মাহফিল উপলক্ষে আমালগুলো মুবাহ হবে। যেমন তিলাওয়াতের প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠান করা মুবাহ। কিন্ত প্রত্যেক তিলাওয়াতকারী, শ্রবণকারী যার যার তিলাওয়াত ও সামা' অনুযায়ী ছাওয়াব পাবেন। ঠিক তেমনিভাবে এরাত উপলক্ষে মাহফিলে আলোচিত বক্তব্য ও অন্যান্য কার্যক্রম অনুসারে বক্তা ও শ্রোতা সবাই ছাওয়াব পাবেন। আমাদের কেউ যদি এসব মাহফিল কিছুই না করে কেবল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত অনুযায়ী কিছু আমাল করে কিংবা তিনি নির্দেশ দেন নি ভেবে কবর যিয়ারত না করে কেবল ইস্তিগফার করে তাহলে আমরা তাকে এরাত অস্বীকারকারী বলবো না। সে আমাদের ভাই। আর কেউ মাহফিল করছে বলেই আমরা বিদআত ফাতওয়া দিয়ে গুলু তথা বাড়াবাড়ি করবো না।
এরাতের কিয়াম ও পরদিনের সিয়াম নিয়ে আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে দয়িফ হাদিস রয়েছে। কিন্ত এক্ষেত্রে আইয়ামে বীযের তিন দিন সাওম পালন করাটাই অধিক সুন্নাহসম্মত আমল। তাছাড়া রামাদানের পরে এ মাসে অধিক সাওম পালন করাই সুন্নাহ। শাওয়ালের ছয়দিনের সাওম থেকে এমাসে অধিক পরিমাণ সাওম পালন করা প্রয়োজন।
আমরা সমস্ত পাপাচার, মদপান সহ কাবিরাগুনাহ থেকে তাওবা করবো, দূরে থাকবো। কাউকেই হিংসা করবো না। আল্লাহর সাথে ভুলেও শিরক করবো না। সন্ধ্যায় গোসল করা থেকে বিরত থাকবো। কেননা এসম্পর্কে হাদিস নেই, আছে জাল হাদিস। এটা বিদআত। তবে জানাবাত, ক্লান্তি, উষ্ণতা কিংবা একাগ্রচিত্তে ইবাদতের জন্য সন্ধ্যায় গোসল করতে বাঁধা নেই। একান্ত প্রয়োজন না হলে বিদআতের বিরোধীতায় গোসল বর্জন কারাই কর্তব্য। আল্লাহ আমাদের সবাইকে ইতিসাম বি হাবলিল্লাহ এর উপরে আমাল করার তাওফিক দিন। সবাইকেই সাহিহ ফিকহ দান করুক। আমিন।
আলহামদুলিল্লাহ ওয়াস সালাতু ওয়াস সাল্লামু আলা রাসুলিল্লাহ।
লিখেছেন - দরবার শরিফের সাহেবজাদা শাহ মুহাম্মাদ ছফিউল্লাহ ইবন হাসান আল মাছউদী।