03/06/2026
ঠাকুর-যাঁরা গুণগ্রাহী এবং সাধু প্রকৃতির লোক, তাঁরা যে বিষয় যে অর্থে গ্রহণ করেন, আবার মন্দ লোক সেই বিষয় তার বিপরীত মন্দ অর্থে গ্রহণ করে। কিছুদিন পূর্বে বরিশালে একটি লোক আসিয়াছিল; তাকে দেখিতে শুনিতে সাধুর মত, কিন্তু হরিনাম শুনিলে ভয়ানক ক্ষেপিয়া উঠিত। ছেলেপিলে তাহাকে দেখিলে হাতে তালি দিয়া হরিবোল হরিবোল বলিত, আর সেই লোকটি যেন তেলে বেগুনে জ্বলিয়া উঠিত। সেই লোকটি যতই ক্ষেপিত-ছেলের দল আরও বেশী করিয়া হরিবোল হরিবোল বলিত। লোকটি হরিনাম শুনিলে এমন ভাব দেখাইত যেন তাকে ঝাঁটা দিয়া কেউ পিটাচ্ছে। লোকটি হরিনাম শুনিলে ক্ষেপিত বলিয়া ছেলের দল তাকে ক্ষেপাইতে খুব আমোদ পেত এবং উৎসাহিত হইয়াই হরি বলিত। কিছুদিন পর স্থানীয় লোকেরা অশ্বিনীবাবুর (অশ্বিনীকুমার দত্ত) নিকট গিয়ে বলিল,
"কিছুদিন হইল শহরে একটি অদ্ভুত লোক আসিয়াছে, সে হরিনাম শুনিলে ক্ষেপিয়া উঠে; হরিনাম শুনিলে ক্ষেপিয়া উঠে-এমন পাষণ্ড তো আর দেখি নাই! অথচ লোকটি দেখিতে শুনিতে সাধুর মত।"
অশ্বিনীবাবু শুনিয়া বলিলেন, "তিনি পাষণ্ড নন, তিনি আতি মহৎ লোক, তিনি প্রকৃত সাধু; তাঁকে তোমরা চিনিতে পার নাই এবং তাঁর উদ্দেশ্যও বুঝিতে পার নাই-তাই তাঁকে পাষণ্ড বলিতেছ। তিনি হরিনাম শুনিলে যে ক্ষেপার ভাব দেখান, ও তাঁর ভান মাত্র। তিনি হরিনাম শুনিতে খুব ভালবাসেন তিনি হরিনামের সাধক, তাই তিনি ঐরূপ ক্ষেপার ভাব দেখান। তিনি নিজে তো লক্ষ লক্ষ হরিনাম শুনিতেছেন, অধিকন্তু শত শত লোকের দ্বারা লক্ষ লক্ষ হরিনাম বলাইতেছেন। তিনি যদি ক্ষেপার ভাব না দেখাইতেন, তা হইলে কি তোমরা ঐরূপভাবে হরিনাম বলিতে? কখনই নয়। তিনি যদি তোমাদের কাছে গিয়ে বলিতেন, বাপু! আমাকে দুটা হরিনাম শুনাও না? তোমরা কি তা হইলে তাঁকে হরিনাম শুনাইতে? কস্মিকালেও না। বরং তোমরা তাঁকে পাগল মনে করিয়া উপহাস করিতে। তিনি খুব চতুর সাধু, তাই হরিনাম শুনিবার এবং হরিনাম লোককে দিয়া বলাইবার অভিনব উপায় অবলম্বন করিয়াছেন। আমি সেই সাধুকে পুনঃ পুনঃ নমস্কার করি।"
অশ্বিনীবাবু সৎলোক এবং সাধু প্রকৃতির, তাই তিনি এমন মধুর ব্যাখ্যা করিলেন। আর যত দুষ্ট লোক তারা সাধুকে নানাপ্রকার বিদ্রূপাত্মক বাক্যবাণ বর্ষণ করিতে লাগিল। অশ্বিনীবাবুর মত নিঃস্বার্থ স্বদেশ নেতা খুব বিরল।
—শ্রী শ্রী ১০৮ স্বামী নিগমানন্দ সরস্বতী পরমহংসদেব
সংগৃহীত :- শ্রী শ্রী নিগমানন্দ-কথামৃত
সদ্-গুরু নিগমানন্দ পরমহংসদেব