02/09/2026
ছবিতে কে আছেন, আপনারা কি তাঁকে চেনেন?
তিনি হলেন শাইখ ড. সাঈদ ইবনু আলী ইবনু ওয়াহফ আল-কাহতানী রাহিমাহুল্লাহ—বিখ্যাত গ্রন্থ ‘হিসনুল মুসলিম’ (حصن المسلم)-এর লেখক।
এটি এমন একটি বরকতময় গ্রন্থ, যার মাধ্যমে পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিমের অসংখ্য মুসলিম উপকৃত হয়েছেন। কারণ এতে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে প্রমাণিত বিভিন্ন যিকির ও দুআ সংকলন করা হয়েছে। তিনি রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন জ্ঞান, দাওয়াত ও গ্রন্থ রচনায় নিবেদিত একজন আলেম। তিনি এমন এক উত্তম ও কল্যাণময় অবদান রেখে গেছেন, যার প্রভাব আজও মুসলিমদের ঘরে ঘরে বিদ্যমান।
হিসনুল মুসলিম গ্রন্থের প্রণেতা শাইখ ড. সাঈদ ইবনু ওয়াহফ আল-কাহতানী রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন সমকালীন সৌদি আরবের একজন বিশিষ্ট আলেম, দাঈ, লেখক ও ইবাদতগুজার ব্যক্তি। তাঁর রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ «حِصْنُ الْمُسْلِمِ» (হিসনুল মুসলিম) বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুসলমানদের মাঝে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। কুরআন-সুন্নাহ থেকে সংকলিত দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন দোয়া ও যিকিরের এই গ্রন্থটি বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং এর বিপুলসংখ্যক কপি প্রকাশিত হয়েছে।
জন্ম ও শৈশব:
শাইখ সাঈদ ইবনু ওয়াহফ আল-কাহতানী রাহিমাহুল্লাহ আসির অঞ্চলের আল-আরীন এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি জ্ঞানার্জন ও দ্বীনি জীবনের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। জীবনের এক পর্যায়ে তিনি সামরিক বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। এরপর তিনি প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় মনোনিবেশ করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে মাস্টার্স ও ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।
কুরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক:
তাঁর জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল পবিত্র কুরআনের প্রতি গভীর ভালোবাসা। মাস্টার্স সম্পন্ন করার পর তিনি প্রায় দুই বছর পড়াশোনা থেকে বিরতি নিয়ে কুরআন হিফজ সম্পন্ন করার জন্য নিজেকে নিয়োজিত করেন। পরবর্তীতে প্রায় চল্লিশ বছর বয়সে তিনি সম্পূর্ণ কুরআন হিফজ করেন। তিনি কুরআনের হাফস ‘আন আসিম রেওয়ায়েতে তিনটি ইজাযাহ লাভ করেন। শুধু নিজের হিফজের মধ্যেই তিনি সীমাবদ্ধ ছিলেন না; সন্তানদেরও কুরআন হিফজের প্রতি উৎসাহিত করতেন। তাঁর সন্তানদের অধিকাংশই অল্প বয়সেই কুরআন হিফজ সম্পন্ন করেছিল।
ইলম ও আলেমদের সাহচর্য:
ইলম অর্জনের প্রতি তাঁর ছিল অসাধারণ আগ্রহ। তিনি দীর্ঘদিন সৌদি আরবের অন্যতম প্রখ্যাত আলেম শাইখ আব্দুল আজিজ ইবনু বায রাহিমাহুল্লাহ-এর সাহচর্যে ছিলেন এবং প্রায় দুই দশক তাঁর কাছ থেকে উপকৃত হন। এছাড়াও তিনি শাইখ সালিহ ইবনু ফাওযান আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ)-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখতেন। ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ)-এর প্রতি তাঁর বিশেষ শ্রদ্ধা ছিল এবং তিনি তাঁকে “বাকিয়াতুস সালাফ” অর্থাৎ সালাফের অবশিষ্ট উত্তরসূরি বলে উল্লেখ করতেন।
ইমামতি ও দাওয়াতি জীবন:
শাইখ ইবনু ওয়াহফ রাহিমাহুল্লাহ দীর্ঘ ৩৮ বছর মানুষের ইমামতি করেছেন। পাশাপাশি তিনি দীর্ঘ সময় ধরে হজের মৌসুমে হাজিদের মাঝে দাওয়াত ও তা'লীমের কাজ করেছেন। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, তিনি প্রায় ৩৪ বছর হজের সময় দাওয়াতি কাজে অংশগ্রহণ করেন এবং জীবনে দীর্ঘ সময় নিয়মিত হজ পালন করেছেন। তাঁর দাওয়াতের মূল বিষয় ছিল তাওহিদ, সুন্নাহ ও কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক দ্বীনের শিক্ষা। মানুষের মাঝে ইসলামের সঠিক আকীদা ও আমল ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন।
ইবাদত ও তাকওয়া:
ইবাদতের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত যত্নশীল। তাঁর সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি নিয়মিতভাবে কুরআন তিলাওয়াত করতেন এবং কখনো কখনো প্রতি তিন রাতে একবার কুরআন খতম করতেন। তিনি নিয়মিত নফল রোজার প্রতিও যত্নবান ছিলেন। বিশেষ করে সোমবার ও বৃহস্পতিবারের রোজা, মুহাররম ও শাবান মাসের নফল রোজা এবং শাওয়ালের ছয় রোজা আদায়ের ব্যাপারে তিনি যত্নশীল ছিলেন অবশ্য কোনো ওজর থাকলে তা ভিন্ন বিষয়।
লেখালেখি ও দাওয়াত:
শাইখ সাঈদ ইবনু ওয়াহফ আল-কাহতানী (রহ.)-এর জীবন ছিল ইলম, ইবাদত, দাওয়াত ও লেখালেখির সমন্বিত এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ১৩০টি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর সর্বাধিক প্রসিদ্ধ গ্রন্থ «حِصْنُ الْمُسْلِمِ» (হিসনুল মুসলিম)। কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ থেকে নির্বাচিত দোয়া, যিকির ও আমলসমূহ সহজভাবে একত্রিত করার কারণে বইটি বিশ্বের মুসলমানদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এটি ৪৪টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং এর ২০ কোটিরও বেশি কপি মুদ্রিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। তাঁর দাওয়াতি জীবনের একটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা হলো অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাকালেও তিনি একজন খ্রিস্টান নারীকে ইসলামের দিকে আহ্বান করেন। আল্লাহর ইচ্ছায় সেই নারী ইসলাম গ্রহণ করেন। এ ঘটনা তাঁর দাওয়াতের প্রতি গভীর নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য:
শাইখ ইবনু ওয়াহফ (রহ.)-এর জীবনে ইখলাস, সত্যবাদিতা, বিনয়, ধৈর্য ও মানুষের কল্যাণের প্রতি গভীর আগ্রহ বিশেষভাবে লক্ষণীয় ছিল। তাঁর সম্পর্কে এমনও উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি কারও গীবত করার জন্য পরিচিত ছিলেন না। তিনি জ্ঞান অর্জন করেছেন, তা অনুযায়ী আমল করেছেন, মানুষকে দ্বীনের দিকে আহ্বান করেছেন এবং লেখনীর মাধ্যমে তাঁর ইলমকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করে গেছেন।
ইন্তেকাল:
দীর্ঘ ইলম, ইবাদত, দাওয়াত ও লেখালেখিতে পরিপূর্ণ জীবন শেষে শাইখ ড. সাঈদ ইবনু ওয়াহফ আল-কাহতানী (রহ.) ১৪৪০ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল প্রায় ৬৮ বছর। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি অশেষ রহমত বর্ষণ করুন, তাঁর ইলম ও দাওয়াতকে কবুল করুন এবং তাঁর রচিত উপকারী গ্রন্থসমূহকে কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের হিদায়াত ও কল্যাণের মাধ্যম বানিয়ে দিন। আমীন।
✍️গাইডেন্স ভিশন Guidance Vision অনুবাদ ও গবেষণা পর্ষদ