26/03/2024
ঈমান কীসের নাম, এ মাসআলায় আহলুস সু্ন্নাত ওয়াল জামা‘আত ও অন্যান্যদের অবস্থান:
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত তথা উম্মতের সালাফে সালেহীন, সাহাবায়ে কিরাম, তাবে‘ঈনে ‘ইযাম এবং যারা পথে চলেছেন আর যারা তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন এমন সকলের নিকট ঈমান বলতে যা বুঝায় তা হচ্ছে,
১- ঈমান কথা ও কাজের নাম।
২- ঈমানে মুখের কথা ও অন্তরের কথার সমন্বয় হবে। মুখের কথা হচ্ছে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ উচ্চারণ, আর অন্তরের কথা এটার অর্থ, রুকন ও শর্তসমূহের বিশ্বাস লালন করা।
৩- ঈমান মুখের কাজ, অন্তরের কাজ ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাজের মিশ্রণ। মুখের কাজ যেমন, সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ইত্যাদির যিকির করা। আর অন্তরের কাজ যেমন তাওয়াক্কুল করা, ভয় পাওয়া, আশা করা, ভালোবাসা ইত্যাদি। আর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাজ যেমন, সালাত, সাওম, হজ্জ, যাকাত আদায় ইত্যাদি।
৪- আর ঈমান আনুগত্য করলে বাড়ে, আর অবাধ্যতা করলে কমে যায়।
৫- যাবতীয় আনুগত্যের বিষয় ঈমানের অন্তর্ভুক্ত।
৬- ঈমানে ইনশাআল্লাহ বলা যাবে, কারণ সকল আমল করা সকলের পক্ষে সম্ভব নয়।
ইমাম লালেকাঈ তাঁর সনদসহ ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি হাজার বা তার চেয়ে বেশি আলেম থেকে হাদীস লিখেছি, তবে আমি কেবল তাদের থেকেই হাদীস লিখেছি যারা বলে, ঈমান কথা ও কাজের নাম। তাদের থেকে হাদীস নিইনি যারা বলে ঈমান হচ্ছে কথার নাম। লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই‘তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা‘আহ ৩/৮৮৯, নং ১৫৯৭; ইবন হাজার এ বর্ণনাটিকে সহীহ বলেছেন, দেখুন, ফাতহুল বারী ১/৪৭।
ইমাম ইবনুল জাওযী রাহিমাহুল্লাহ ইমাম আহমাদ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, সত্তর জন তাবে‘ঈ, মুসলিমগণের ইমাম, বিখ্যাত ফকীহগণ এ ব্যাপারে ইজমা‘ বা ঐকমত্য করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে জিনিসের ওপর বিশ্বাস ও আমলের জন্য আমাদেরকে প্রদান করে দুনিয়া থেকে চলে গেছেন তন্মধ্যে রয়েছে, ঈমান কথা ও কাজের নাম, আনুগত্যের মাধ্যমে বৃদ্ধি পায়, আর অবাধ্যতার মাধ্যমে হ্রাস পায়। দেখুন, ইবনুল জাওযী, মানাকিবুল ইমাম আহমাদ পৃ. ১৭৬।
এ ব্যাপারে বাহ্যিক দৃষ্টিতে খারেজী ও মু‘তাযিলারা সালাফে সালেহীনের মতের অনুসরণ করেছে। কারণ তারা বলেছে, ঈমান আকীদা, কথা ও কাজের নাম। কিন্তু বাস্তবে তারা আহলুস সুন্নাত, সালাফে সালেহীনের বিরোধিতা করেছে কয়েকদিক দিয়ে, তা হচ্ছে, তারা বলে,
১- ঈমান একটি জিনিসের নাম। ঈমানের কোনো অঙ্গ বা অংশবিশেষ হয় না।
২- ঈমান বাড়ে না, আর ঈমান কমে না।
৩- ঈমানের কোনো এক অংশ চলে গেলে পুরোটা চলে যায়।
৪- ঈমানের মধ্যে ইনশাআল্লাহ বলা জায়েয নাই।
আর মুরজিয়া মতবাদের লোকদের সাথে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের বাহ্যিকভাবে একটি মিল লক্ষ্য করা যায় যে, তারা উভয়েই কবীরা গুনাহকারীকে কাফির বলে না। কিন্তু বাস্তবে তাদের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য বিদ্যমান, যেমন,
১- ঈমান একটি জিনিসের নাম। ঈমানের কোনো অঙ্গ বা অংশবিশেষ হতে পারে না। যদিও সে একটি জিনিস নির্ধারণের ব্যাপারে তারা প্রচুর মতভেদ করেছে।
কারও কারও কাছে শুধু মা‘রিফাত তথা চেনা জানা (জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়)। এ কথার দাবী অনুযায়ী ফির‘আউন ঈমানদার।
কারও কারও নিকট অন্তরের বিশ্বাস (মুরজিয়া, আশআরী ও মাতুরিদী ফির্কা)। এ কথার দাবী অনুযায়ী ইবলিস ঈমানদার।
কারও কারও নিকট শুধু মৌখিক স্বীকৃতি (কাররামিয়্যাহ সম্প্রদায়)। এ কথার দাবী অনুযায়ী মুনাফিকরা ঈমানদার।
২- ঈমান বাড়েও না কমেও না।
৩- আমল বা কর্ম কখনো ঈমানের অংশ নয়।
৪- ঈমানের কোনো অংশ চলে যেতে পারে না।
৫- গুনাহ ঈমানের কোনো ক্ষতি করবে না। কেউ ঈমান নিয়ে মারা গেলে তার জন্য জান্নাত অবধারিত।
৬- মূল ঈমানের দিক থেকে মানুষরা সকলেই সমান।
৭- ঈমানের ব্যাপারে ইনশাআল্লাহ বলা জায়েয নাই।
এর বাইরে আরেকটি গোষ্ঠী রয়েছে, যাদের অবস্থান আহলুস সুন্নাতের অভ্যন্তরে ধরা হয়, তারা হচ্ছেন ‘মুরজিয়াতুল ফুক্বাহা’ বা ফকীহগণের মাঝে যারা ‘ইরজা’ মতবাদে বিশ্বাসী। ইমাম আবু হানীফা ও তার অনুসারীদেরকে এ গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ধরা হয়। তাদের মতে,
১- ঈমান আকীদা ও কথার নাম।
২- ঈমান বাড়েও না কমেও না।
৩- আমল ঈমানের মূল রুকন নয়, তবে তা শর্ত বা অতিরিক্ত রুকন।
৪- মূল ঈমানে মানুষরা সকলেই সমান।
৫- ঈমানে কোনো ইস্তেসনা ইনশাআল্লাহ বলা চলবে না।
ইবন আবিল ইয্য বলেন, ‘আমাদের অনেক আলেমের মত হচ্ছে তাই যা ইমাম ত্বাহাওয়ী বলেছেন, তা হচ্ছে ঈমান মুখের স্বীকৃতি ও অন্তরের বিশ্বাসের নাম। ইবন আবিল ইয্য আল-হানাফী, শারহুল আকীদাতিত ত্বাহাওয়িয়্যাহ ২/৪৫৯।
আবুল লাইস আস-সামারকান্দী আল-মাতুরিদী বলেন, “সুতরাং যে কেউ দৃঢ়ভাবে তা অন্তরে গ্রহণ করবে, আর তার স্বীকৃতি দিবে, সেই মুমিন। কারণ সে সঠিকটির উপর দৃঢ়তা অবলম্বন করেছে। কেননা ঈমান তো মুখের স্বীকৃতি ও অন্তরের বিশ্বাসেরই নাম। সুতরাং যে কেউ অন্তর দিয়ে সত্যায়ন করবে, মুখে স্বীকৃতি দিবে সেই মুমিন। দেখুন, আবুল লাইস আস-সামারকান্দী আল-মাতুরিদী, শারহুল ফিকহিল আকবার, পৃ. ৯; আরও দেখুন, আবু মানসূর আল-মাতুরিদী, আত-তাওহীদ পৃ. ৩৭৩-৩৮১।
এ হচ্ছে ঈমানের ব্যাপারে মানুষদের মূল মতাদর্শ। আলেমগণ এ ব্যাপারে প্রচুর গ্রন্থ লিপিবদ্ধ করেছেন। যেমন,
১- ইবন আবী শাইবাহ, আল-ঈমান।
২- আবু উবাইদ, আল-ঈমান।
৩- ইবন আবি আমর আল-আদনী, আল-ঈমান।
৪- আবু ইয়া‘লা, মাসায়িলুল ঈমান।
৫- শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, আল-ঈমান, আল-ঈমান আওসাত্ব, আল-ঈমান আল-আসগার।
ঈমানের ব্যাপারে বিভন্ন ফির্কার মতভেদ বিস্তারিত জানতে দেখুন,
-ইবন বাত্তাহ, আল-ইবানাহ ২/৭৬০-৮৮১।
-আল-খাল্লাল, আস-সুন্নাহ ১/৫৬২।
-লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই‘তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা‘আহ ৩/৮০৯-৮৩০।
-আজুররী, আশ-শরী‘আহ পৃ. ১১১-১৩৬।
-সাবূনী, আকীদাতুস সালাফ পৃ. ৬৭-৭১।
-বাইহাক্বী, আল-ই‘তিক্বাদ ৭৯-৮৫।
-আল-বাকেল্লানী, আত-তামহীদ, পৃ. ৩৮৮-৩৯০।
-আল-বাকেল্লানী, আল-ইনসাফ পৃ. ৮৪-৮৯।
-আবু সা‘ঈদ আন-নাইসাপূরী, আল-গুনইয়াতু ফী উসূলিদদীন, পৃ. ১৭৩-১৭৫।
-বাগদাদী, উসূলিদ-দীন পৃ. ২৫২-২৫৩।
-ইবন হাযম, আল-উসূল ওয়াল ফুরূ‘ পৃ. ৮-১৫।
-ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ‘আতুর রাসায়িল ওয়াল মাসায়িল ৩/৮।
-ইবন আবিল ইয্য আল-হানাফী, শারহুল আকীদাতিত ত্বাহাওয়িয়্যাহ ২/৪৫৯-৪৮৭।
-ইবন হাজার, ফাতহুল বারী ১/৪৬-৪৭।
-আইনী, উমদাতুল কারী ১/১০২-১১১।
-সাফারীনী, লাওয়ামি‘উল আনওয়ার ১/৪০৩-৪২৬।
- আল-হাফেয আল-হেকামী, মা‘আরিজুল কবুল ২/১৭, ৪৫০-৪০৮।
🎙️✍️ Professor Dr. Abubakar Muhammad Zakaria