জীবনে ইসলাম - Islam in Life

জীবনে ইসলাম - Islam in Life Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from জীবনে ইসলাম - Islam in Life, Religious organisation, B-33/F-5, Jahuri Mahalla, Mohammadpur.

 #কুরবানির_হুকুম_কি? ওয়াজিব না সুন্নত? এ বিষয়ে ইমাম ও ফকীহদের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে এবং তাদের দুটো মত রয়েছে।প্রথম মত: কু...
08/07/2021

#কুরবানির_হুকুম_কি? ওয়াজিব না সুন্নত? এ বিষয়ে ইমাম ও ফকীহদের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে এবং তাদের দুটো মত রয়েছে।

প্রথম মত: কুরবানি ওয়াজিব। ইমাম আওযায়ী, ইমাম লাইস, ইমাম আবু হানীফা রহ. প্রমুখের মত এটাই। আর ইমাম মালেক ও ইমাম আহমদ রহ. থেকে একটি মত বর্ণিত আছে যে তারাও ওয়াজিব বলেছেন।

দ্বিতীয় মত: কুরবানি সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। এটি অধিকাংশ আলেমের মত এবং ইমাম মালেক ও শাফেয়ী রহ.-এর প্রসিদ্ধ মত। কিন্তু এ মতের প্রবক্তারা আবার বলেছেন: সামর্থ্য থাকা অবস্থায় কুরবানি পরিত্যাগ করা মাকরূহ। যদি কোনো জনপদের লোকেরা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সম্মিলিতভাবে কুরবানি পরিত্যাগ করে তবে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হবে। কেননা, কুরবানি হল ইসলামের একটি শি‘য়ার বা মহান নিদর্শন।

যারা কুরবানি ওয়াজিব বলেন তাদের দলিল:

[এক] আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিয়েছেন:—

﴿ فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَٱنۡحَرۡ ٢ ﴾ [الكوثر: ٢]

‘তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর এবং (পশু) কুরবানি কর।’ [সূরা কাউছার, আয়াত: ২] আর আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নির্দেশ পালন ওয়াজিব।

[দুই] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:—

«من وجد سعة ولم يضح، فلا يقربن مصلانا ». رواه أحمد وابن ماجه، وصححه الحاكم.

‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহের ধারে না আসে।’[1]

যারা কুরবানি পরিত্যাগ করে তাদের প্রতি এ হাদিস একটি সতর্ক-বাণী। তাই কুরবানি ওয়াজিব।

[তিন] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:—

«يا أيها الناس: إن على كل أهل بيت في كل عام أضحية ». . رواه أحمد وابن ماجه، حسنه الألباني

হে মানব সকল ! প্রত্যেক পরিবারের দায়িত্ব হল প্রতি বছর কুরবানি দেয়া।[2]

আর যারা কুরবানি দেওয়া সুন্নত বলেন তাদের দলিল হচ্ছে:

[এক] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:—

«إذا رأيتم هلال ذي الحجة، وأراد أحدكم أن يضحي، فليمسك عن شعره وأظفاره، حتى يضحي ». رواه مسلم

‘তোমাদের মাঝে যে কুরবানি করতে চায়, যিলহজ মাসের চাঁদ দেখার পর সে যেন কুরবানি সম্পন্ন করার আগে তার কোনো চুল ও নখ না কাটে।’[3]

এ হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ‘যে কুরবানি করতে চায়’ কথা দ্বারা বুঝে আসে এটা ওয়াজিব নয়।

[দুই] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উম্মতের মাঝে যারা কুরবানি করেনি তাদের পক্ষ থেকে কুরবানি করেছেন। তার এ কাজ দ্বারা বুঝে নেয়া যায় যে কুরবানি ওয়াজিব নয়।

শাইখ ইবনে উসাইমীন রহ. উভয় পক্ষের দলিল-প্রমাণ উল্লেখ করার পর বলেন: এ সকল দলিল-প্রমাণ পরস্পর বিরোধী নয় বরং একটা অন্যটার সম্পূরক।

সারকথা হল যারা কুরবানিকে ওয়াজিব বলেছেন তাদের প্রমাণাদি অধিকতর শক্তিশালী। আর ইমাম ইবনে তাইমিয়ার মত এটাই[4] আর বর্তমান কালের শাইখ মুহাম্মাদ ইবন সালেহ উসাইমীন এ মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

কুরবানির ফযিলত

[ক] কুরবানি দাতা নবী ইবরাহিম আ. ও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শ বাস্তবায়ন করে থাকেন।

[খ] পশুর রক্ত প্রবাহিত করার মাধ্যমে কুরবানি দাতা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নৈকট্য অর্জন করেন। যেমন- আল্লাহ তা‘আলা বলেন:—

﴿لَن يَنَالَ ٱللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَآؤُهَا وَلَٰكِن يَنَالُهُ ٱلتَّقۡوَىٰ مِنكُمۡۚ كَذَٰلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمۡ لِتُكَبِّرُواْ ٱللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَىٰكُمۡۗ وَبَشِّرِ ٱلۡمُحۡسِنِينَ ٣٧﴾ [الحج : ٣٧]

‘আল্লাহর নিকট পৌঁছায় না তাদের গোশত এবং রক্ত বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া। এভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এজন্য যে, তিনি তোমাদের পথ-প্রদর্শন করেছেন; সুতরাং আপনি সুসংবাদ দিন মুহসিনদেরকে।’[5]

[গ] পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও অভাবীদের আনন্দ দান। আর এটা অন্য এক ধরনের আনন্দ যা কুরবানির গোশতের পরিমাণ টাকা যদি আপনি তাদের সদকা দিতেন তাতে অর্জিত হত না। কুরবানি না করে তার পরিমাণ টাকা সদকা করে দিলে কুরবানি আদায় হবে না।

কুরবানির শর্তাবলি:

[১] এমন পশু দ্বারা কুরবানি দিতে হবে যা শরিয়ত নির্ধারণ করে দিয়েছে। সেগুলো হল উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা। এ গুলোকে কুরআনের ভাষায় বলা হয় ‘বাহীমাতুল আন‘আম।’ যেমন, আল্লাহ বলেন:—

﴿ وَلِكُلِّ أُمَّةٖ جَعَلۡنَا مَنسَكٗا لِّيَذۡكُرُواْ ٱسۡمَ ٱللَّهِ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّنۢ بَهِيمَةِ ٱلۡأَنۡعَٰمِۗ ٣٤ ﴾ [الحج : ٣٤]

‘আমরা প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কুরবানির নিয়ম করে দিয়েছি; তিনি তাদেরকে জীবনোপকরণ স্বরূপ যে সকল চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছেন, সেগুলোর উপর যেন তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে।’[6] হাদিসে এসেছে:—

عن جابر- رضى الله عنه- قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم:لا تذبحوا إلا مسنة، إلا أن تعسر عليكم، فتذبحوا جذعة من الضأن. [رواه مسلم]

জাবের রা. হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “তোমরা অবশ্যই এক বছরের বয়সের ছাগল কুরবানি করবে। তবে তা তোমাদের জন্য দুষ্কর হলে ছয় মাসের মেষ-শাবক কুরবানি করতে পার”।[7] আর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা ছাড়া অন্য কোনো জন্তু কুরবানি করেননি ও কুরবানি করতেও বলেননি। তাই কুরবানি শুধু এগুলো দিয়েই করতে হবে। ইমাম মালিক রহ.-এর মতে কুরবানির জন্য সর্বোত্তম জন্তু হল শিং ওয়ালা সাদা-কালো দুম্বা। কারণ রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ধরনের দুম্বা কুরবানি করেছেন বলে বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে এসেছে। উট ও গরু-মহিষে সাত ভাগে কুরবানি দেয়া যায়। যেমন হাদিসে এসেছে—

عن جابر- رضى الله عنه- أنه قال: نحرنا بالحديبية مع النبي صلى الله عليه وسلم البدنة عن سبعة، والبقرة عن سبعة.

জাবের রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘আমরা হুদাইবিয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলাম। তখন আমরা উট ও গরু দ্বারা সাত জনের পক্ষ থেকে কুরবানি দিয়েছি।’[8]

গুণগত দিক দিয়ে উত্তম হল কুরবানির পশু হৃষ্টপুষ্ট, অধিক গোশত সম্পন্ন, নিখুঁত, দেখতে সুন্দর হওয়া।

[২] শরিয়তের দৃষ্টিতে কুরবানির পশুর বয়সের দিকটা খেয়াল রাখা জরুরি। উট পাঁচ বছরের হতে হবে। গরু বা মহিষ দু বছরের হতে হবে। ছাগল, ভেড়া, দুম্বা হতে হবে এক বছর বয়সের।

[৩] কুরবানির পশু যাবতীয় দোষ-ত্রুটি মুক্ত হতে হবে। যেমন হাদিসে এসেছে:—

عن البراء بن عازب- رضى الله عنه- قال: قام فينا رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال: «أربع لا تجوز في الأضاحي،- وفي رواية: تجزىء – العوراء البين عورها، والمريضة البين مرضها، والعرجاء البين ضلعها، والكسيرة التي لا تنقى ». [رواه الترمذي وفي رواية النسائي] ذكر [العجفاء] بدل [الكسيرة] وصححه الألباني في صحيح سنن النسائي

সাহাবি আল-বারা ইবনে আযেব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে দাঁড়ালেন তারপর বললেন: চার ধরনের পশু, যা দিয়ে কুরবানি জায়েয হবে না। অন্য বর্ণনায় বলা হয়েছে পরিপূর্ণ হবে না—অন্ধ; যার অন্ধত্ব স্পষ্ট, রোগাক্রান্ত; যার রোগ স্পষ্ট, পঙ্গু; যার পঙ্গুত্ব স্পষ্ট এবং আহত; যার কোনো অঙ্গ ভেঙ্গে গেছে। নাসায়ির বর্ণনায় ‘আহত’ শব্দের স্থলে ‘পাগল’ উল্লেখ আছে।[9]

আবার পশুর এমন কতগুলো ত্রুটি আছে যা থাকলে কুরবানি আদায় হয় কিন্তু মাকরূহ হবে। এ সকল দোষত্রুটি যুক্ত পশু কুরবানি না করা ভাল। সে ত্রুটিগুলো হল শিং ভাঙ্গা, কান কাটা, লেজ কাটা, ওলান কাটা, লিঙ্গ কাটা ইত্যাদি।

[৪] যে পশুটি কুরবানি করা হবে তার উপর কুরবানি দাতার পূর্ণ মালিকানা সত্ত্ব থাকতে হবে। বন্ধকি পশু, কর্জ করা পশু বা পথে পাওয়া পশু দ্বারা কুরবানি আদায় হবে না।

কুরবানির ওয়াক্ত বা সময়:

কুরবানি নির্দিষ্ট সময়ের সাথে সম্পর্কিত একটি ইবাদত। এ সময়ের পূর্বে যেমন কুরবানি আদায় হবে না তেমনি পরে করলেও আদায় হবে না।

যারা ঈদের সালাত আদায় করবেন তাদের জন্য কুরবানির সময় শুরু হবে ঈদের সালাত আদায় করার পর থেকে। যদি ঈদের সালাত আদায়ের পূর্বে কুরবানির পশু যবেহ করা হয় তাহলে কুরবানি আদায় হবে না। যেমন হাদিসে এসেছে—

عن البراء بن عازب -رضى الله عنه- قال: سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يخطب فقال: «إن أول ما نبدأ به من يومنا هذا، أن نصلى ثم نرجع فننحر، فمن فعل هذا فقد أصاب سنتنا، ومن نحر قبل أن يصلي فإنما هو لحم قدمه لأهله، ليس من النسك في شيء ». [رواه البخاري]

আল-বারা ইবনে আযেব রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি শুনেছি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবাতে বলেছেন: এ দিনটি আমরা শুরু করব সালাত দিয়ে। অতঃপর সালাত থেকে ফিরে আমরা কুরবানি করব। যে এমন আমল করবে সে আমাদের আদর্শ সঠিকভাবে অনুসরণ করল। আর যে এর পূর্বে যবেহ করল সে তার পরিবারবর্গের জন্য গোশতের ব্যবস্থা করল। কুরবানির কিছু আদায় হল না।[10]

সালাত শেষ হওয়ার সাথে সাথে কুরবানি পশু যবেহ না করে সালাতের খুতবা দুটি শেষ হওয়ার পর যবেহ করা ভাল। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ রকম করেছেন। হাদিসে এসেছে—

قال جندب بن سفيان البجلي -رضى الله عنه-: صلى النبى صلى الله عليه وسلم يوم النحر، ثم خطب ثم ذبح ... ]رواه البخاري [

সাহাবি জুনদাব ইবনে সুফিয়ান আল-বাজালী রা. বলেছেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানির দিন সালাত আদায় করলেন অতঃপর খুতবা দিলেন তারপর পশু যবেহ করলেন।[11]

عن جندب بن سفيان قال: شهدت النبي صلى الله عليه وسلم يوم النحر قال: «من ذبح قبل أن يصلي فليعد مكانها أخرى، ومن لم يذبح فليذبح.» [رواه البخاري]

জুনদুব ইবনে সুফিয়ান বলেন, আমি কুরবানির দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলাম। তিনি বললেন, যে ব্যক্তি নামাজের পূর্বে যবেহ করেছে সে যেন আবার অন্য স্থানে যবেহ করে। আর যে যবেহ করেনি সে যেন যবেহ করে।[12]

আর কুরবানির সময় শেষ হবে যিলহজ মাসের তেরো তারিখের সূর্যাস্তের সাথে সাথে। অতএব কুরবানির পশু যবেহ করার সময় হল চার দিন। যিলহজ মাসের দশ, এগারো, বার ও তেরো তারিখ। এটাই উলামায়ে কেরামের নিকট সর্বোত্তম মত হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছে। কারণ:

এক. আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন:—

﴿ لِّيَشۡهَدُواْ مَنَٰفِعَ لَهُمۡ وَيَذۡكُرُواْ ٱسۡمَ ٱللَّهِ فِيٓ أَيَّامٖ مَّعۡلُومَٰتٍ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّنۢ بَهِيمَةِ ٱلۡأَنۡعَٰمِۖ ٢٨ ﴾ [الحج : ٢٨]

‘যাতে তারা তাদের কল্যাণময় স্থানগুলোতে উপস্থিত হতে পারে এবং তিনি তাদের চতুষ্পদ জন্তু হতে যা রিজিক হিসেবে দান করেছেন তার উপর নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে পারে।’[13]

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম বুখারি রহ. বলেন: ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: ‘এ আয়াতে নির্দিষ্ট দিনগুলো বলতে বুঝায় কুরবানির দিন ও তার পরবর্তী তিন দিন।’

অতএব এ দিনগুলো আল্লাহ তা‘আলা কুরবানির পশু যবেহ করার জন্য নির্ধারণ করেছেন।

দুই. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:—

كل أيام التشريق ذبح. [رواه أحمد، صححه الألباني في السلسلة الصحيحة]

‘আইয়ামে তাশরীকের প্রতিদিন যবেহ করা যায়।’[14] আইয়ামে তাশরীক বলতে কুরবানির পরবর্তী তিন দিনকে বুঝায়।

তিন. কুরবানির পরবর্তী তিন দিনে সওম পালন জায়েয নয়। এ দ্বারা বুঝে নেয়া যায় যে এ তিন দিনে কুরবানি করা যাবে।

চার. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘আইয়ামে তাশরীক হল খাওয়া, পান করা ও আল্লাহর জিকির করার দিন।’

এ দ্বারা বুঝে নিতে পারি যে, যে দিনগুলো আল্লাহ খাওয়ার জন্য নির্ধারণ করেছেন সে দিনগুলোতে কুরবানির পশু যবেহ করা যেতে পারে।

পাঁচ. সাহাবায়ে কেরামের আমল দ্বারা প্রমাণিত হয়, কুরবানির পরবর্তী তিনদিন কুরবানির পশু যবেহ করা যায়।

ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন: আলী ইবনে আবি তালেব রা. বলেছেন: ‘কুরবানির দিন হল ঈদুল আজহার দিন ও তার পরবর্তী তিন দিন।’ অধিকাংশ ইমাম ও আলেমদের এটাই মত। যারা বলেন, কুরবানির দিন হল মোট তিন দিন; যিলহজ মাসের দশ, এগারো ও বার তারিখ, বার তারিখের পর যবেহ করলে কুরবানি হবে না, তাদের কথার সমর্থনে কোনো প্রমাণ নেই ও মুসলিমদের ঐক্যমত্য [ইজমা] প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

মৃত ব্যক্তির পক্ষে কুরবানি

মূলত কুরবানির প্রচলন জীবিত ব্যক্তিদের জন্য। যেমন আমরা দেখি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবিগণ নিজেদের পক্ষে কুরবানি করেছেন। অনেকের ধারণা কুরবানি শুধু মৃত ব্যক্তিদের জন্য করা হবে। এ ধারণা মোটেই ঠিক নয়। তবে মৃত ব্যক্তিদের জন্য কুরবানি করা জায়েয ও একটি সওয়াবের কাজ। কুরবানি একটি সদকা। আর মৃত ব্যক্তির নামে যেমন সদকা করা যায় তেমনি তার নামে কুরবানিও দেয়া যায়।

যেমন মৃত ব্যক্তির জন্য সদকার বিষয়ে হাদিসে এসেছে—

عن عائشة- رضى الله عنها- أن رجلا أتى النبى صلى الله عليه وسلم فقال يا رسول الله: إن أمي افتلتت نفسها ولم توصى، وأظنها لو تكلمت تصدقت، أفلها أجر إن تصدقت عنها ؟ قال: « نعم » . [رواه البخاري ومسلم]

আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত: এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করল—হে রাসূল! আমার মা হঠাৎ মারা গেছেন। কোনো অসিয়ত করে যেতে পারেন নি। আমার মনে হয় তিনি কোনো কথা বলতে পারলে অসিয়ত করে যেতেন। আমি যদি এখন তার পক্ষ থেকে সদকা করি তাতে কি তার সওয়াব হবে ? তিনি উত্তর দিলেন: হ্যাঁ।[15]

মৃত ব্যক্তির জন্য এ ধরনের সদকা ও কল্যাণমূলক কাজের যেমন যথেষ্ট প্রয়োজন ও তেমনি তা তাঁর জন্য উপকারী।

এমনিভাবে একাধিক মৃত ব্যক্তির জন্য সওয়াব প্রেরণের উদ্দেশ্যে একটি কুরবানি করা জায়েয আছে। অবশ্য যদি কোনো কারণে মৃত ব্যক্তির জন্য কুরবানি ওয়াজিব হয়ে থাকে তাহলে তার জন্য পূর্ণ একটি কুরবানি করতে হবে।

অনেক সময় দেখা যায়, ব্যক্তি নিজেকে বাদ দিয়ে মৃত ব্যক্তির জন্য কুরবানি করেন। এটা মোটেই ঠিক নয়। ভাল কাজ নিজেকে দিয়ে শুরু করতে হয় তারপর অন্যান্য জীবিত ও মৃত ব্যক্তির জন্য করা যেতে পারে। যেমন হাদিসে এসেছে—

عن عائشة وأبي هريرة -رضى الله عنهما- أن رسول الله صلى الله عليه وسلم كان إذا أراد أن يضحي، اشترى كبشين عظيمين سمينين أقرنين أملحين موجوئين، [مخصيين] فذبح أحدهما عن أمته، لمن شهد لله بالتوحيد، وشهد له بالبلاغ، وذبح آخر عن محمد، وعن آل محمد- صلى الله عليه وسلم- . [صحيح ابن ماجة [صححه الألباني]

আয়েশা রা. ও আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কুরবানি দিতে ইচ্ছা করলেন তখন দুটো দুম্বা ক্রয় করলেন। যা ছিল বড়, হৃষ্টপুষ্ট, শিং ওয়ালা, সাদা-কালো বর্ণের এবং খাসি। একটি তিনি তার ঐ সকল উম্মতের জন্য কুরবানি করলেন; যারা আল্লাহর একত্ববাদ ও তার রাসূলের রিসালাতের সাক্ষ্য দিয়েছে, অন্যটি তার নিজের ও পরিবার বর্গের জন্য কুরবানি করেছেন।[16]

মৃত ব্যক্তি যদি তার সম্পদ থেকে কুরবানি করার অসিয়ত করে যান তবে তার জন্য কুরবানি করা ওয়াজিব হয়ে যাবে।

অংশীদারির ভিত্তিতে কুরবানি করা কুরবানি:

যাকে ‘শরীকে কুরবানি দেয়া’ বলা হয়।

ভেড়া, দুম্বা, ছাগল দ্বারা এক ব্যক্তি একটা কুরবানি করতে পারবেন। আর উট, গরু, মহিষ দ্বারা সাত জনের পক্ষ থেকে সাতটি কুরবানি করা যাবে। ইতোপূর্বে জাবের রা. কর্তৃক বর্ণিত হাদিস দ্বারা এটা প্রমাণিত হয়েছে।

অংশীদারি ভিত্তিতে কুরবানি করার দুটি পদ্ধতি হতে পারে:

[এক] সওয়াবের ক্ষেত্রে অংশীদার হওয়া। যেমন কয়েক জন মুসলিম মিলে একটি বকরি ক্রয় করল। অতঃপর একজনকে ঐ বকরির মালিক বানিয়ে দিল। বকরির মালিক বকরিটি কুরবানি করল। যে কজন মিলে বকরি খরিদ করেছিল সকলে সওয়াবের অংশীদার হল।

[দুই] মালিকানার অংশীদারির ভিত্তিতে কুরবানি। দু জন বা ততোধিক ব্যক্তি একটি বকরি কিনে সকলেই মালিকানার অংশীদার হিসেবে কুরবানি করল। এ অবস্থায় কুরবানি শুদ্ধ হবে না। অবশ্য উট, গরু ও মহিষের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি জায়েয আছে।

মনে রাখতে হবে কুরবানি হল একটি ইবাদত ও আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নৈকট্য লাভের উপায়। তাই তা আদায় করতে হবে সময়, সংখ্যা ও পদ্ধতিগত দিক দিয়ে শরিয়ত অনুমোদিত নিয়মাবলী অনুসরণ করে। কুরবানির উদ্দেশ্য শুধু গোশত খাওয়া নয়, শুধু মানুষের উপকার করা নয় বা শুধু সদকা [দান] নয়। কুরবানির উদ্দেশ্য হল আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের একটি মহান নিদর্শন তার রাসূলের নির্দেশিত পদ্ধতিতে আদায় করা।

তাই, আমরা দেখলাম কীভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোশতের বকরি ও কুরবানির বকরির মাঝে পার্থক্য নির্দেশ করলেন। তিনি বললেন যা সালাতের পূর্বে যবেহ হল তা বকরির গোশত আর যা সালাতের পরে যবেহ হল তা কুরবানির গোশত।

কুরবানি দাতা যে সকল কাজ থেকে দূরে থাকবেন:

যখন কেউ কুরবানি পেশ করার ইচ্ছা করে আর যিলহজ মাস প্রবেশ করে। তার জন্য চুল, নখ অথবা চামড়ার কোনো অংশ কাটা থেকে বিরত থাকবে, যতক্ষণ না কুরবানি করবে।

হাদিসে এসেছে—

عن أم سلمة- رضى الله عنها- أن النبي- صلى الله عليه وسلم- قال: « إذا رأيتم هلال ذي الحجة، وأراد أحدكم أن يضحي، فليمسك عن شعره وأظفاره» . [رواه مسلم] وفي رواية له: « فلا يمس من شعره وبشره شيئا » ، وفي رواية: حتى يضحي.

উম্মে সালামাহ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: তোমাদের মাঝে যে কুরবানি করার ইচ্ছে করে সে যেন যিলহজ মাসের চাঁদ দেখার পর থেকে চুল ও নখ কাটা থেকে বিরত থাকে। ইমাম মুসলিম হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। তার অন্য একটি বর্ণনায় আছে—‘সে যেন চুল ও চামড়া থেকে কোনো কিছু স্পর্শ না করে। অন্য বর্ণনায় আছে ‘কুরবানির পশু যবেহ করার পূর্ব পর্যন্ত এ অবস্থায় থাকবে।’[17]

কুরবানি দাতার পরিবারের লোক জনের নখ, চুল ইত্যাদি কাঁটাতে কোনো সমস্যা নেই।

কোন কুরবানি দাতা যদি তার চুল, নখ অথবা চামড়ার কোনো অংশ কেটে ফেলে তার জন্য উচিৎ তাওবা করা, পুনরাবৃত্তি না করা, তবে এ জন্য কোনো কাফফারা নেই এবং এ জন্য কুরবানিতে কোনো সমস্যা হবে না। আর যদি ভুলে, অথবা না জানার কারণে অথবা অনিচ্ছাসত্বে কোনো চুল পড়ে যায়, তার কোনো গুনাহ হবে না। আর যদি সে কোনো কারণে তা করতে বাধ্য হয়, তাও তার জন্য জায়েয, এ জন্য তার কোনো কিছু প্রদান করতে হবে না। যেমন নখ ভেঙ্গে গেল, ভাঙ্গা নখ তাকে কষ্ট দিচ্ছে সে তা কর্তন করতে পারবে, তদ্রূপ কারো চুল লম্বা হয়ে চোখের উপর চলে আসছে সেও চুল কাটতে পারবে অথবা কোনো চিকিৎসার জন্যও চুল ফেলতে পারবে।

কুরবানি দাতা চুল ও নখ না কাটার নির্দেশে কি হিকমত রয়েছে এ বিষয়ে উলামায়ে কেরাম অনেক কথা বলেছেন। অনেকে বলেছেন: কুরবানি দাতা হজ করার জন্য যারা এহরাম অবস্থায় রয়েছেন তাদের আমলে যেন শরিক হতে পারেন, তাদের সাথে একাত্মতা বজায় রাখতে পারেন।

ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেছেন: ‘কুরবানি দাতা চুল ও নখ বড় করে তা যেন পশু কুরবানি করার সাথে সাথে নিজের কিছু অংশ আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কুরবানি [ত্যাগ] করায় অভ্যস্ত হতে পারেন এজন্য এ নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’ যদি কেউ যিলহজ মাসের প্রথম দিকে কুরবানি করার ইচ্ছা না করে বরং কয়েকদিন অতিবাহিত হওয়ার পর কুরবানির নিয়ত করল সে কি করবে? সে নিয়ত করার পর থেকে কুরবানির পশু যবেহ পর্যন্ত চুল ও নখ কাটা থেকে বিরত থাকবে।

[1] আহমদ, ইবনু মাজাহ: ৩৫১৬

[2] ইবনু মাজাহ: ৩১২৫

[3] মুসলিম: ১৯৭৭

[4] মাজমূ ফাতাওয়া ৩২/১৬২-১৬৪।

[5] সূরা হজ, আয়াত: ৩৭

[6] সূরা হজ, আয়াত: ৩৪

[7] মুসলিম, হাদিস: ১৯৩৬

[8] ইবনে মাজাহ্‌: ৩১৩২

[9] তিরমিযি, হাদিস: ১৫৪৬, নাসায়ী: ৪৩৭১

[10] বুখারি: ৯৬৫

[11] বুখারি, হাদিস: ৯৮৫

[12] বুখারি, হাদিস: ৫৫৬২

[13] সূরা আল-হজ, আয়াত: ২৮

[14] বর্ণনায় আহমদ, হাদিস: ৪/৮২

[15] বুখারি: ১৩৩৮,২৭৬০, মুসলিম: ১০৪।

[16] ইবনে মাজা, হাদিস: ২৫৩১

[17] মুসলিম: ১৯৭৭

 #যিলহজ_মাসের_১ম_দশ_দিনের_ফযিলতঃ১. যিলহজ মাসের ১ম মাসের প্রথম দশদিন আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুবর্ণ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পরকা...
06/07/2021

#যিলহজ_মাসের_১ম_দশ_দিনের_ফযিলতঃ

১. যিলহজ মাসের ১ম মাসের প্রথম দশদিন আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুবর্ণ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পরকালের পুঁজি সঞ্চয় করা যেতে পারে। এ দিনগুলো গুরুত্ব সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ وَٱلۡفَجۡرِ ١ وَلَيَالٍ عَشۡرٖ ٢ ﴾ [الفجر: ١، ٢]

“কসম ভোরবেলার। কসম দশ রাতের”।[1] ইবনে কাসীর রাহিমাহুল্লাহ বলেন: এর দ্বারা উদ্দেশ্য যিলহজ মাসের দশ দিন।

২. আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ لِّيَشۡهَدُواْ مَنَٰفِعَ لَهُمۡ وَيَذۡكُرُواْ ٱسۡمَ ٱللَّهِ فِيٓ أَيَّامٖ مَّعۡلُومَٰتٍ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّنۢ بَهِيمَةِ ٱلۡأَنۡعَٰمِۖ ٢٨ ﴾ [الحج : ٢٨]

‘যাতে তারা তাদের কল্যাণময় স্থানগুলোতে উপস্থিত হতে পারে এবং তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু হতে যা রিজিক হিসেবে দান করেছেন তার উপর নির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে।[2]‌’

এ আয়াতে নির্দিষ্ট দিনসমূহ বলতে কোনো দিনগুলোকে বুঝানো হয়েছে সে সম্পর্কে ইমাম বুখারি রহ. বলেন,

قال ابن عباس: أيام العشر

“ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: ‘নির্দিষ্ট দিনসমূহ দ্বারা উদ্দেশ্য যিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন”। বিশিষ্ট সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

«ما من أيام العمل الصالح فيهن أحب إلى الله من هذه الأيام العشر، فقالوا يا رسول الله، ولا الجهاد في سبيل الله ؟ فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم-: ولا الجهاد في سبيل الله، إلا رجل خرج بنفسه وماله فلم يرجع من ذلك بشيء. [رواه البخاري، والترمذي واللفظ له]

যিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনে নেক আমল করার মত অধিক প্রিয় আল্লাহর নিকট আর কোনো আমল নেই। তারা প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর পথে জিহাদ করাও কি তার চেয়ে প্রিয় নয়? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: না, আল্লাহর পথে জিহাদও নয়। তবে ঐ ব্যক্তির কথা আলাদা যে তার জান-মাল নিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদে বের হয়ে গেল অতঃপর তার প্রাণ ও সম্পদের কিছুই ফিরে এলো না।[3]

৪. ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর নিকট কোনো দিন অধিক প্রিয় নয়, আর না তাতে আমল করা, এ দিনের তুলনায়। সুতরাং, তাতে তোমরা বেশি করে তাহলীল, তাকবীর ও তাহমীদ পাঠ কর।[4]

৫. সাঈদ ইবনে জুবায়ের রাহিমাহুল্লাহর অভ্যাস ছিল, যিনি পূর্বে বর্ণিত ইবনে আব্বাসরে হাদিস বর্ণনা করেছেন: যখন যিলহজ মাসরে ১ম দশ দিন প্রবেশ করত, তখন তিনি খুব মুজাহাদা করতেন, যেন তার উপর তিনি শক্তি হারিয়ে ফেলবেন।[5]

৬. ইবনে হাজার রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: যিলহজ মাসের দশ দিনের ফযিলতের তাৎপর্যের ক্ষেত্রে যা স্পষ্ট, তা হচ্ছে এখানে মূল ইবাদতগুলোর সমন্বয় ঘটছে। অর্থাৎ সালাত, সিয়াম, সদকা ও হজ, যা অন্যান্য সময় আদায় করা হয় না।[6]

৭. উলামায়ে কেরাম বলেছেন: যিলহজ মাসরে ১ম দশদিন সর্বোত্তম দিন, আর রমযান মাসের শেষ দশ রাত, সব চেয়ে উত্তম রাত।

[1] সূরা ফাজর, আয়াত: ১-২

[2] সূরা হজ, আয়াত: ২৮

[3] বুখারি: ৯৬৯, তিরমিযি: ৭৫৭

[4] তাবরানী ফীল মুজামিল কাবীর

[5] দারামী: ২৫৬৪ হাসান সনদে

[6] ফাতহুল বারী ১/২৬৩

29/05/2021

😢 রোযা কাযা রেখে মারা গেলে

যে ব্যক্তি নামায কাযা রেখে মারা যায়, সে ব্যক্তির অভিভাবক বা অন্য কেউ তার পক্ষ থেকে সে নামায আদায় করে দিতে পারে না। আর তার জন্য কোন কাফ্ফারা বা কোন ফিদ্য়্যাহ-জরিমানা নেই। তদনুরূপ যে ব্যক্তি রোযা রাখতে অক্ষম, সে ব্যক্তির তরফ থেকে তার জীবনে কেউ তার সেই রোযা রেখে দিতে পারে না। মহান আল্লাহ বলেন,

(وَأَنْ لَّيْسَ لِلإِنْسَانِ إِلاَّ مَا سَعَى)

অর্থাৎ, আর এই যে, মানুষ যা চেষ্টা করে, তাই সে পেয়ে থাকে। (কুরআনুল কারীম ৫৩/৩৯)

যদি কোন ব্যক্তি রমাযান মাস চলা অবস্থায় মারা যায়, তাহলে মাসের অবশিষ্ট দিনগুলির ব্যাপারে তার উপরে অথবা তার অভিভাবকের উপরে কোন কিছু ওয়াজেব নয়।[1]

কিন্তু কোন রোগী রোগে থাকা অবস্থায় (কিছু বা সম্পূর্ণ) রমাযান পার হয়ে মারা গেলে তার ব্যাপারে বিস্তারিত বিবরণ আছেঃ-

১। যে রোগীর আরোগ্যের আশা আছে, আরোগ্য পর্যন্ত তার উপর রোযা ওয়াজেব থাকবে। কিন্তু রোগ যদি থেকেই যায় এবং কাযা করার সুযোগ হওয়ার আগেই সে মারা যায়, তাহলে তার উপর কিছুই ওয়াজেব নয়। কারণ, তার উপর ওয়াজেব ছিল কাযা, আর তা করতে সে সুযোগই পায় নি।

২। এমন রোগী যার আরোগ্যের কোন আশা নেই। তার তরফ থেকে শুরু থেকেই মিসকীন খাওয়ানো ওয়াজেব; রোযা কাযার পরিবর্তে নয়। সে মারা গেলে তার তরফ থেকে প্রত্যেক রোযার বিনিময়ে একটি করে মিসকীন খাইয়ে দিলেই ওয়াজেব আদায় হয়ে যাবে। যেহেতু যার ওযর দূর হওয়ার মত নয় -যেমন, অথর্ব বৃদ্ধ এবং চিররোগা, তার তরফ থেকে ১টি রোযার বদলে ১টি মিসকীন খাওয়ানোই ওয়াজেব।

৩। এমন রোগী যার আরোগ্যের আশা ছিল, অতঃপর রমাযান পরে সে সুস্থও হয়েছে এবং কাযা করার সুযোগও পেয়েছে। কিন্তু কাযা করার আগেই সে মারা গেছে। এমন রোগীর তরফ থেকে তার নিকটাত্মীয় প্রত্যেক রোযার পরিবর্তে একটি করে মিসকীনকে খাদ্য দান করবে।[2]

অবশ্য যদি ঐ মৃতব্যক্তির কোন আত্মীয় তার তরফ থেকে রোযাগুলি কাযা রেখে দিতে চায়, তাহলে তাও কিছু উলামার নিকট শুদ্ধ হয়ে যাবে।[3] যেহেতু মা আয়েশা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘‘যে ব্যক্তি নিজের দায়িত্বে রোযা থাকা অবস্থায় মারা যাবে, তার তরফ থেকে তার অভিভাবক (ওয়ারেস) রোযা রাখবে।’’[4]

অন্য কিছু উলামা এই মতকে প্রাধান্য দেন যে, উক্ত হাদীস নযরের রোযার ব্যাপারে বিবৃত হয়েছে। পক্ষান্তরে রমাযানের ফরয রোযা বাকী রাখা অবস্থায় মারা গেলে, তার তরফ থেকে কারো রোযা রাখা চলবে না। বরং তার অভিভাবক বা ওয়ারেস তার তরফ থেকে প্রত্যেক দিনের পরিবর্তে ১টি করে মিসকীনকে খাদ্য দান করবে।[5] যেহেতু আমরাহ কর্তৃক বর্ণিত, তাঁর আম্মা রমাযানের রোযা বাকী রাখা অবস্থায় মারা যান। তিনি আয়েশা (রাঃ)কে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমি কি তাঁর তরফ থেকে কাযা রেখে দেব?’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘না। বরং তাঁর তরফ থেকে প্রত্যেক দিনের পরিবর্তে ১টি করে মিসকীনকে অর্ধ সা’ (মোটামুটি সওয়া ১ কিলো) খাদ্য দান কর।’[6]

ইবনে আববাস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত যে, এক মহিলা আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট এসে জিজ্ঞাসা করল, ‘হে আল্লাহর রসূল! আমার মা মারা গেছেন। কিন্তু তাঁর যিম্মায় নযরের রোযা বাকী আছে। এখন আমি কি তাঁর তরফ থেকে রোযা রেখে দোব?’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘‘তোমার মায়ের যিম্মায় কোন ঋণ বাকী থাকলে তা কি তুমি পরিশোধ করতে? তা কি তার তরফ থেকে আদায় করা হত?’’ মহিলাটি বলল, ‘জী হ্যাঁ।’ তিনি বললেন, ‘‘অতএব তুমি তোমার মায়ের তরফ থেকে রোযা রেখে দাও।’’[7]

ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, ‘যদি কোন লোক রমাযানে ব্যাধিগ্রস্ত হয়, অতঃপর সে মারা যায় এবং রোযা (কাযা করার সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও) রোযা না রেখে থাকে, তাহলে তার তরফ থেকে মিসকীন খাইয়ে দিতে হবে; তার জন্য রোযা কাযা নেই। কিন্তু যদি সে নযরের রোযা না রেখে মারা যায়, তাহলে তার অভিভাবক (বা ওয়ারেস) তার তরফ থেকে সেই রোযা কাযা করে দেবে।’[8]

বলা বাহুল্য, যে ব্যক্তি নযরের রোযা না রেখে মারা যাবে, তার তরফ থেকে তার ওয়ারেস রোযা রেখে দেবে। আর এই রোযা রেখে দেওয়ার মান হল মুস্তাহাব। কারণ, মহান আল্লাহ বলেন,

(وَلاَ تَزِرُ وَازِرَةٌ وِّزْرَ أُخْرَى)

অর্থাৎ, কেউ অপরের ভার বহন করবে না। (কুরআনুল কারীম ৬/১৬৪)

মৃতব্যক্তির তরফ থেকে রোযা রাখার সময় একাধিক রোযা হলে ওয়ারেসরা যদি আপোসে ভাগ করে রাখে, তাহলে তা বৈধ। কিন্তু এই ভাগাভাগি ‘যিহার’ কিংবা রমাযানের দিনে সঙ্গম করার কাফ্ফারার রোযায় চলবে না। কারণ, তাতে লাগাতার রোযা হওয়ার শর্ত আছে। আর ভাগাভাগি করে রাখলে নিরবচ্ছিন্নতা থাকে না। অতএব হয় মাত্র একজনই লাগাতার ৬০ রোযা রেখে দেবে। নতুবা ৬০টি মিসকীন খাইয়ে দেবে।[9]

[1] (সাবঊনা মাসআলাহ ফিস্-সিয়াম ১৪নং, তাযকীরু ইবাদির রাহমান, ফীমা অরাদা বিসিয়ামি শাহরি রামাযান ৪৯পৃঃ)

[2] (আশ্শারহুল মুমতে’ ৬/৪৫২-৪৫৩)

[3] (আশ্শারহুল মুমতে’ ৬/৪৫৫-৪৫৬, সাবঊনা মাসআলাহ ফিস্-সিয়াম ২৯নং)

[4] (বুখারী ১৯৫২, মুসলিম ১১৪৭নং, প্রমুখ)

[5] (আহকামুল জানায়েয, আলবানী ১৭০পৃঃ, তামামুল মিন্নাহ, আল্লামা আলবানী ৪২৭-৪২৮পৃঃ দ্রঃ)

[6] (ত্বাহাবী, ইবনে হায্ম, আহকামুল জানায়েয, আলবানী ১৭০পৃঃ দ্রঃ)

[7] (আহমাদ, মুসনাদ ২/২১৬, বুখারী ১৯৫৩, মুসলিম ১১৪৮, আবূ দাঊদ ৩৩০৮নং প্রমুখ)

[8] (সহীহ আবূ দাঊদ ২১০১নং প্রমুখ)

[9] (আশ্শারহুল মুমতে’ ৬/৪৫৭-৪৫৮)

29/05/2021

❓ কাযা রোযা রাখার পূর্বে কি নফল রাখা চলবে ?

রমাযানের কাযা রোযা রাখার জন্য সময় সংকীর্ণ না হলে তার পূর্বে নফল রোযা রাখা বৈধ ও শুদ্ধ। অতএব সময় যথেষ্ট থাকলে ফরয রোযা কাযা করার আগে মুসলিম নফল রোযা রাখতে পারে। যেমন ফরয নামায আদায় করার আগে নফল নামায পড়তে পারে। আর এতে কোন গোনাহ নেই। উভয়ের মধ্যে অনুমিতির কথা সুস্পষ্ট। তবে উত্তম হল প্রথমে ফরয রোযা কাযা রেখে নেওয়া। এমন কি যুলহজ্জের প্রথম ৮ দিন, আরাফার দিন, আশূরার দিন এসে উপস্থিত হলে সে দিনগুলিতেও কাযা রোযা রাখবে। সম্ভবতঃ তাতে কাযা রাখার সওয়াব ও ঐ দিনগুলির ফযীলত উভয়ই লাভ করবে। আর যদি ধরে নেওয়াই যায় যে, কাযা রাখলে ঐ দিনগুলির ফযীলত পাবে না, তাহলেও নফল রাখা থেকে ফরয কাযা করার গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য অধিক।[1] তা ছাড়া কিছু সংখ্যক উলামা রমাযানের রোযা কাযা রাখার পূর্বে নফল রোযা রাখা মকরূহ মনে করেছেন।[2]

পক্ষান্তরে শওয়ালের ছয় রোযা রমাযানের রোযা কাযা করার আগে রাখা যাবে না। রাখলে তা সাধারণ নফলের মান পাবে; শওয়ালের রোযার ফযীলত পাওয়া যাবে না। কেননা, মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘‘যে ব্যক্তি রমাযানের রোযা রাখার পর পর শওয়ালের ছয়টি রোযা রাখে, সে ব্যক্তির সারা বছর রোযা রাখা হয়।’’[3] কিন্তু যার রমাযানের রোযা অবশিষ্ট থাকবে, তার ব্যাপারে এ কথা যথাযথ হবে না যে, সে রমাযানের রোযা রেখেছে।[4]

[1] (আশ্শারহুল মুমতে’ ৬/৪৪৮)

[2] (ইবনে আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ ২/৩০৬ দ্রঃ)

[3] (মুসলিম ১১৬৪, আবূ দাঊদ ২৪৩৩, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ ১৭১৬নং, দারেমী, প্রমুখ)

[4] (আশ্শারহুল মুমতে’ ৬/৪৪৯, ফইঃ ২/১৬৬)

29/05/2021

❤ শওয়ালের ছয় রোযা

যে ব্যক্তির রমাযানের রোযা পূর্ণ হয়ে যাবে, তার জন্য শওয়াল মাসের ৬টি রোযা রাখা মুস্তাহাব। আর এতে তার জন্য রয়েছে বৃহৎ সওয়াব। মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘‘যে ব্যক্তি রমাযানের রোযা রাখার পরে-পরেই শওয়াল মাসে ছয়টি রোযা পালন করে সে ব্যক্তির পূর্ণ বৎসরের রোযা রাখার সমতুল্য সওয়াব লাভ হয়।’’[1]

এই সওয়াব এই জন্য হবে যে, আল্লাহর অনুগ্রহে ১টি কাজের সওয়াব ১০টি করে পাওয়া যায়। অতএব সেই ভিত্তিতে ১ মাসের (৩০ দিনের) রোযা ১০ মাসের (৩০০ দিনের) সমান এবং ৬ দিনের রোযা ২ মাসের (৬০ দিনের) সমান; সর্বমোট ১২ মাস (৩৬০ দিন) বা এক বছরের সওয়াব লাভ হয়ে থাকে। আর এই ভাবে সেই রোযাদারের জীবনের প্রত্যেকটি দিন রোযা রাখা হয়! দয়াময় আল্লাহ বলেন,

(مَنْ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا)

অর্থাৎ, কেউ কোন ভাল কাজ করলে, সে তার ১০ গুণ প্রতিদান পাবে। (কুরআনুল কারীম ৬/১৬০)

এই রোযা বিধিবদ্ধ হওয়ার কারণ -আর আল্লাহই ভাল জানেন - তা হল ফরয নামাযের পর সুন্নাতে মুআক্কাদার মত। যা ফরয নামাযের উপকারিতা ও তার অসম্পূর্ণতা সম্পূর্ণ করে। অনুরূপ এই ছয় রোযা রমাযানের ফরয রোযার অসম্পূর্ণতা সম্পূর্ণ করে এবং তাতে কোন ত্রুটি ঘটে থাকলে তা দূর করে থাকে। সে অসম্পূর্ণতা ও ত্রুটির কথা রোযাদার জানতে পারুক অথবা না পারুক।[2]

তা ছাড়া রমাযানের ফরয রোযা রাখার পর পুনরায় রোযা রাখা রমাযানের রোযা কবুল হওয়ার একটি লক্ষণ। যেহেতু মহান আল্লাহ যখন কোন বান্দার নেক আমল কবুল করেন, তখন তার পরেই তাকে আরো নেক আমল করার তওফীক দান করে থাকেন। যেমন উলামাগণ বলে থাকেন, ‘নেক কাজের সওয়াব হল, তার পরে পুনঃ নেক কাজ করা।’[3]

এই রোযার উত্তম সময় হল, ঈদের সরাসরি পরের ৬ দিন। কারণ, তাতেই রয়েছে নেক আমলের দিকে সত্বর ধাবমান হওয়ার দলীল। আর এ কথা মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর এই উক্তি ‘‘যে ব্যক্তি রমাযানের রোযা রাখার পরে-পরেই শওয়াল মাসে ছয়টি রোযা পালন করে---’’ থেকে বুঝা যায়।

তদনুরূপ উত্তম হল, উক্ত ছয় রোযাকে লাগাতার রাখা। কেননা, এমনটি করা রমাযানের অভ্যাস অনুযায়ী সহজসাধ্য। আর তাতে হবে বিধিবদ্ধ নেক আমল করার প্রতি সাগ্রহে ধাবমান হওয়ার পরিচয়।

অবশ্য তা লাগাতার না রেখে বিচ্ছিন্নভাবেও রাখা চলে। যেহেতু হাদীসের অর্থ ব্যাপক। কিন্তু শওয়াল মাস অতিবাহিত হয়ে গেলে তা কাযা করা বিধেয় নয়। যেহেতু তা সুন্নত এবং তার যথাসময় পার হয়ে গেছে। তাতে তা কোন ওযরের ফলে পার হোক অথবা বিনা ওযরে।[4]

রমাযানের রোযা কাযা না করে শওয়ালের রোযা রাখা বিধেয় নয়। যেমন কাফ্ফারার রোযা থাকলে তা না রেখে শওয়ালের রোযা রাখা চলে না। আর শওয়াল মাসে রমাযানের কাযা রাখলে তাই শওয়ালের রোযা বলে যথেষ্ট হবে না।[5]

[1] (মুসলিম ১১৬৪নং, সুনানে আরবাআহ; আবূ দাঊদ, তিরমিযী, নাসাঈ ও ইবনে মাজাহ)

[2] (ফাইযুর রাহীমির রাহমান, ফী আহকামি অমাওয়াইযি রামাযান ৭৬পৃঃ)

[3] (ইতহাফু আহলিল ইসলাম বিআহকামিস সিয়াম ৯২পৃঃ)

[4] (ইবনে বায : ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ ২/১৬৫-১৬৬)

[5] (ইবনে জিবরীন, ফাসিঃ ১০৭পৃঃ)

29/05/2021

📯 আগামী রমাযান পর্যন্ত কাযা রোযা রাখতে না পারলে

কোন ওযর ব্যতীত রমাযানের কাযা রোযা না রেখে পরবর্তী রমাযান পার করে দেওয়া বৈধ নয়। কার্যক্ষেত্রে কাযা পালন না করতে পারা অবস্থায় দ্বিতীয় রমাযান এসে উপস্থিত হলে বর্তমান রমাযানের রোযা পালন করতে হবে। তারপর (প্রথম সুযোগে) ঐ কাযা রোযা রেখে নিতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে কোন ফিদ্য়্যাহ বা দন্ড-জরিমানা নেই।[1]

পক্ষান্তরে বিনা ওযরে কাযা না তুলে পরবর্তী রমাযান পার করে দিলে গোনাহগার হতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে কাযা করার সাথে সাথে প্রত্যেক দিনের বিনিময়ে একটি করে মিসকীনকে খানা দান করতে হবে। এই মত হল কিছু উলামার।[2] যেহেতু এই মত পোষণ করতেন সাহাবী আবূ হুরাইরা ও ইবনে আববাস (রাযি.)।[3]

অন্য দিকে অন্য কিছু উলামা বলেন যে, কেবল কাযাই করতে হবে; মিসকীনকে খাদ্য দান করতে হবে না। আর উভয় সাহাবী থেকে যে আসার বর্ণনা করা হয়েছে, তা উক্ত দাবীর দলীল নয়। কারণ, অকাট্য দলীল কেবল কিতাব ও সুন্নাহ থেকেই গৃহীত হবে। পক্ষান্তরে সাহাবাগণের উক্তি দলীল হওয়ার ব্যাপারটা বিবেচনাধীন; বিশেষ করে যখন তাঁদের কথা কুরআনের বাহ্যিক উক্তির প্রতিকূল হয়। আর এখানে কাযা রাখার সাথে মিসকীনকে খানা দান করা ওয়াজেব করার বিধান কুরআনের বাহ্যিক উক্তির বিরোধী। যেহেতু মহান আল্লাহ ভিন্ন দিনে কাযা করা ছাড়া অন্য কিছু ওয়াজেব করেন নি। অতএব এই যুক্তিতে আমরা আল্লাহর বান্দাদেরকে সেই জিনিস পালন করতে বাধ্য করতে পারি না, যে জিনিস পালন করতে তিনি তাদেরকে বাধ্য করেন নি। অবশ্য এ বিষয়ে যদি কোন দায়মুক্তকারী দলীল থাকত, তাহলে সে কথা ভিন্ন ছিল।

পক্ষান্তরে আবূ হুরাইরা ও ইবনে আববাস (রাযি.) কর্তৃক যে উক্তি বর্ণিত হয়েছে, সে ব্যাপারে বলা যেতে পারে যে, কাযা রাখার সাথে সাথে একটি করে মিসকীন খাইয়ে দেওয়া উত্তম; ওয়াজেব নয়। সুতরাং এ ব্যাপারে সঠিক মত এই যে, পরবর্তী রমাযান অতিবাহিত করে কাযা রাখলে রোযা ছাড়া অন্য কিছু ওয়াজেব নয়। তবে এ কথা ঠিক যে, এই দেরী করার জন্য সে গোনাহগার হবে।[4]

গত কয়েক বছরের হলেও রমাযানের রোযা কাযা করা ওয়াজেব। সুতরাং কেউ যদি ২০ বছর বয়সে রোযা রাখতে শুরু করে, তাহলে তাকে সাবালক হওয়ার পর থেকে ৫ বছরের ছাড়া রোযা কাযা করতে হবে। আর সেই সাথে তাকে লজ্জিত হয়ে তওবাও করতে হবে এবং এই সংকল্পবদ্ধ হতে হবে যে, জীবনে পুনঃ কোন দিন রোযা ছাড়বে না।[5]

মা আয়েশা (রাঃ) বলেন, ‘আমরা রোযা কাযা করতে আদিষ্ট হতাম এবং নামায কাযা করতে আদিষ্ট হতাম না।’[6]

[1] (ফিকহুস সুন্নাহ ১/৪১৬)

[2] (ফাসিঃ মুসনিদ, ৮২পৃঃ, আহকামুস সাওমি অল-ই’তিকাফ, আবূ সারী মঃ আব্দুল হাদী ৯৯পৃঃ)

[3] (দারাকুত্বনী, সুনান ২৩১৮, ২৩১৯, ২৩২২নং, বাইহাকী ৪/২৫৩)

[4] (আশ্শারহুল মুমতে’ ৬/৪৫১)

[5] (মাজাল্লাতুল বুহূসিল ইসলামিয়্যাহ ৩০/১০৯)

[6] (মুসলিম ৩৩৫নং)

29/05/2021

⏰ রমাযানের রোযা কাযা করার বিবরণ

কারো রমাযান মাসের রোযা ছুটে গেলে তা সত্বর কাযা করা ওয়াজেব নয়। বরং এ ব্যাপারে প্রশস্ততা আছে; সুযোগ ও সময় মত তা কাযা করতে পারা যায়। তদনুরূপ কাফ্ফারাও সত্বর আদায় করা ওয়াজেব নয়। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেন,

(فَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ مَرِيْضاً أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَر)

অর্থাৎ, কিন্তু তোমাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ বা মুসাফির হলে সে অপর কোন দিন গণনা করবে। (কুরআনুল কারীম ২/১৮৪)

অর্থাৎ, সে অপর কোন দিনে রোযা রেখে নেবে। এখানে মহান আল্লাহ লাগাতার বা সাথে সাথে রাখার শর্ত আরোপ করেন নি। সে শর্তের কথা উল্লেখ থাকলে অবশ্যই তা সত্বর পালনীয় হত। অতএব বুঝা গেল যে, এ ব্যাপারে প্রশস্ততা আছে।[1] বলা বাহুল্য, যদি কেউ তার ছুটে যাওয়া রোযা পিছিয়ে দিয়ে শীতের ছোট ছোট দিনে রাখে, তাহলে তাও তার জন্য বৈধ এবং যথেষ্ট। তাতেও মহান আল্লাহর ঐ ঋণ পরিশোধ হয়ে যাবে।[2]

তবে ঈদের পরে ওজর দূর হয়ে গেলে সুযোগ হওয়ার সাথে সাথে সত্বর কাযা রেখে নেওয়াই উচিত। কারণ, তাতে সত্বর দায়িত্ব পালন হয়ে যায় এবং পূর্বসতর্কতামূলক কর্ম সম্পাদন করা হয়।[3]

মা আয়েশা (রাঃ) বলেন, ‘আমার রমাযানের রোযা কাযা থাকত। কিন্তু সে রোযা শা’বান ছাড়া তার আগে কাযা করতে সক্ষম হতাম না।’ এই কথার এক বর্ণনাকারী ইয়াহয়্যা বিন সাঈদ বলেন, ‘এর কারণ এই যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর খিদমত তাঁকে ব্যস্ত করে রাখত। আর তাঁর কাছে তাঁর পৃথক মর্যাদাও ছিল।’[4]

এখানে মা আয়েশার বাহ্যিক উক্তি এই কথাই দাবী করে যে, তাঁর ব্যস্ততা না থাকলে ছুটে যাওয়া রোযা সত্বরই কাযা করতেন। এ থেকে বুঝা যায় যে, যার কোন ওজর-অসুবিধা নেই, তার জন্য দেরী না করে সত্বর কাযা রেখে নেওয়াই উচিত।[5]

কাযা রোযা ছুটে যাওয়া রোযার মতই। অর্থাৎ, যত দিনকার রোযা ছুটে গেছে, ঠিক তত দিনকারই কাযা করবে; তার বেশী নয়। অবশ্য উভয়ের মাঝে পার্থক্য এই যে, কাযা রোযা লাগাতার রাখা জরুরী নয়। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেন,

(فَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ مَرِيضاً أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِنْ أَيَّامٍ أُخَرَ)

‘‘কিন্তু তোমাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ বা মুসাফির হলে সে অপর কোন দিন গণনা করবে।’’ (কুরআনুল কারীম ২/১৮৪)

অর্থাৎ, যে দিনের রোযা সে ছেড়ে দিয়েছে, সেই দিনগুলোই যেন অন্য দিনে কাযা করে নেয়; নিরবচ্ছিন্নভাবে অথবা বিচ্ছিন্নভাবে। যেহেতু মহান আল্লাহ এখানে রোযা কাযা করার কথাই বলেছেন এবং তার সাথে কোন ধরনের শর্ত আরোপ করেন নি।[6]

পক্ষান্তরে কাযা রোযাসমূহকে ছেড়ে ছেড়ে অথবা লাগাতার রাখার ব্যাপারে কোন মরফূ’ হাদীস বিশুদ্ধরূপে বর্ণিত হয় নি। সঠিক হল, উভয় প্রকার বৈধ। যেমন আবূ হুরাইরা (রাঃ) বলেন, ‘ইচ্ছা করলে একটানা রাখবে।’[7]

অবশ্য এতে কোন সন্দেহ নেই যে, তিনটি কারণে কাযা রোযাগুলিকে একটানা -অর্থাৎ মাঝে এক দিনও বাদ না দিয়ে- রেখে নেওয়াই উত্তমঃ-

প্রথমতঃ একটানা রোযা কাযা রাখাটা আসল রোযার সাথে অধিকতর সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ, আসল রোযা একটানাই রাখতে হয়।

দ্বিতীয়তঃ লাগাতার রাখলে অতি সত্বর দায়িত্ব পালন হয়ে যায়। যেহেতু একদিন রোযা রেখে মাঝে ২/১ দিন বাদ দিয়ে আবার রাখলে কাযা পূর্ণ করতে বিলম্ব হয়ে যায়। অথচ লাগাতার রেখে নিলে তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়।

তৃতীয়তঃ একটানা রোযা রেখে নেওয়াটাই পূর্বসতর্কতামূলক কর্ম। কারণ, মানুষ জানে না যে, আগামীতে তার কি ঘটবে। আজ সুস্থ আছে, কিন্তু কাল হয়তো অসুস্থ হয়ে পড়বে। আজ জীবিত আছে, কিন্তু কাল হয়তো মরণের আহবানে সাড়া দিতে হবে।[8]

অনুরূপভাবে আসল রোযা থেকে কাযা রোযার একটি পার্থক্য এই যে, কাযা রোযা রাখা অবস্থায় দিনের বেলায় সঙ্গম করে ফেললে কোন কাফ্ফারা লাগে না। যেহেতু সেটা রমাযান মাসের বাইরে ঘটে তাই।[9]

[1] (আশ্শারহুল মুমতে’ ৬/৪৪৯)

[2] (ফাসিঃ মুসনিদ ৮১পৃঃ)

[3] (আশ্শারহুল মুমতে’ ৬/৪৪৬)

[4] (বুখারী ১৯৫০, মুসলিম ১১৪৬, আবূ দাঊদ ২৩৯৯, ইবনে মাজাহ ১৬৬৯, ইবনে খুযাইমাহ, সহীহ ২০৪৬-২০৪৮নং, বাইহাকী ৪/২৫২)

[5] (তামামুল মিন্নাহ, আল্লামা আলবানী ৪২২পৃঃ দ্রঃ)

[6] (ফিকহুস সুন্নাহ ১/৪১৬)

[7] (ইরওয়াউল গালীল, আলবানী ৪/৯৪-৯৭, তামামুল মিন্নাহ, আল্লামা আলবানী ৪২৪পৃঃ)

[8] (আশ্শারহুল মুমতে’ ৬/৪৪৬)

[9] (ঐ ৬/৪১৩)

Address

B-33/F-5, Jahuri Mahalla
Mohammadpur
1207

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when জীবনে ইসলাম - Islam in Life posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Place Of Worship

Send a message to জীবনে ইসলাম - Islam in Life:

Share