25/05/2026
গভীর রাত। চারিপাশে এক থমথমে নিস্তব্ধতা। কেবল দূর থেকে ভেসে আসা ব্যাঙের অবিশ্রান্ত ডাক সেই নীরবতাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। যখন চরাচরের সকল মানুষ ঘুমের দেশে বিভোর, তখন কিছু প্রাণ হাতে ইটের পর ইট তুলে নিয়ে হেঁটে চলেছে এক পরম পবিত্র স্বপ্নের অভিমুখে। কাঁধে জমেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম, শরীরে অবর্ণনীয় ক্লান্তি; অথচ তাদের অবয়ব জুড়ে এক অলৌকিক তৃপ্তির আভা। তারা তো কেবল মাটির ইট বইছে না, তারা গড়ে তুলছে পরম জননীর আপন আলয়, তাদের বিশ্বাসের চিরন্তন ঠিকানা, আগামী প্রজন্মের এক পবিত্র আশ্রয়স্থল। একটি ইট, দুটি ইট, শত শত ইট, প্রতিটি ইটের পরতে পরতে লেপ্টে আছে মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা, আত্মত্যাগ আর সুগভীর ভক্তি। নিবিড় অন্ধকারের বুক চিরে ইটের সারি যখন ধীরে ধীরে মন্দিরের চত্বরে এসে পৌঁছায়, তখন মনে হয় যেন প্রতিটি জড় প্রাণও জীবন্ত হয়ে ফিসফিসিয়ে বলছে, “আমিও এই মহৎ পুণ্যকাজের এক পংক্তি।”
কারও হাতের তালুতে পড়েছে যন্ত্রণার ফোসকা, কারও চোখে অনিদ্রার ক্লান্তি, কারো ঘামে জবজবে শরীর, কারো ছিড়েছে শার্ট, কারও শরীরে সারা দিনের হাড়ভাঙা খাটুনির অবসাদ। কিন্তু মন্দির নির্মাণের এই পরম আনন্দ যেন মুহূর্তে সব কষ্টকে সুধায় রূপান্তর করেছে। কারণ এই শ্রম তো কেবল শরীরের ঘাম ঝরানো নয়; এ যেন এক একটি নীরব প্রার্থনা, এক একটি নিঃশব্দ সেবা, এক একটি অমর আত্মনিবেদন।
তবে এই যজ্ঞের পেছনে কেবল প্রকাশ্য শ্রমই নয়, মিশে আছে কিছু অন্তরালবর্তী মানুষের বিনিদ্র মস্তিষ্ক আর নিঃশ্বাসের স্পন্দন। ধূলিকণা থেকে ইটের দেয়াল হয়ে ওঠার এই যে দীর্ঘ পথ, তার সূচনা হয়েছিল অদম্য পরিকল্পনা আর দু:সাহসী বাজেটের ছকে। এক বুক অনিশ্চয়তা নিয়ে যারা ফান্ডের ব্যবস্থা করতে ছুটে বেরিয়েছেন, ভেন্ডর আর সাপ্লায়ারদের সাথে দিন রাত এক করে দরদাম করেছেন, এমনকি বিশ্বাসের জোরে ক্রেডিটে নির্মাণ সামগ্রীর জোগান নিশ্চিত করেছেন, তাদের অবদান এই মন্দিরের অদৃশ্য ভিত্তিপ্রস্তর।
সোশ্যাল মিডিয়ার দেয়াল থেকে শুরু করে অফলাইনের আঙিনা পর্যন্ত, প্রতিদিনের কাজের পুঙ্খানুপুঙ্খ আপডেট, জনসংযোগ আর যোগাযোগের সেতুটি যারা অক্লান্তভাবে সচল রেখেছেন, তারা এই কর্মযজ্ঞকে পৌঁছে দিয়েছেন মানুষের হৃদয়ে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে আইনি জটিলতার চুলচেরা বিশ্লেষণ, স্থায়ী মন্দিরের নিয়মনীতি আর বিধিবিধানের নিখুঁত রূপরেখা প্রণয়নের গুরুভার, এমনকি যখন প্রকৃতির রুদ্ররূপে অতি বৃষ্টিতে পুকুর উপচে বিঘ্ন ঘটেছে নির্মাণে, তখন গভীর রাতে সেচযন্ত্রের ব্যবস্থা করতে আর তার বৈদ্যুতিক সংযোগ মেলাতে গিয়ে যাদের চোখের পাতা এক হয়নি, সেই বিনিদ্র রাতগুলোর হিসাব কোনো খাতা রাখেনি।
সবশেষে, আঙুলের কর গুনে ফেলা যায় এমন হাতে গোনা কয়েকজন মানুষই সমস্ত প্রতিকূলতার মুখে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। চারপাশ থেকে ধেয়ে আসা তীব্র সমালোচনা, সংশয় আর সুতীব্র কটু কথা নীরবে হজম করেও তারা এক কদমও পিছিয়ে যাননি। সব ঝড়-ঝাপটা সয়ে তারা এগিয়ে চলেছেন অটল বিশ্বাসে; বিন্দু বিন্দু ঘামে আর শ্রমে এঁকে চলেছেন এক অসীম স্বপ্নের সীমানা প্রাচীর। সকল নিন্দার ঊর্ধ্বে উঠে, অটুট বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে তারা গড়ে তুলছেন "মাষ্টারপাড়া পূজা উদযাপন পরিষদ" এর স্থায়ী মন্দির, পরম আবেগের "দেবালয়"।
বছরের পর বছর ধরে বুকে লালন করা স্বপ্ন আজ তিল তিল করে মূর্ত হয়ে উঠছে। এই মন্দিরের প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি স্তম্ভ, প্রতিটি ধূলিকণা সাক্ষী হয়ে থাকবে সেইসব পুণ্যাত্মাদের, যারা রাতের পর রাত জেগে, নিজের জীবন, নিজের জীবিকা, ছোটো থেকে কায়িক শ্রমে অনভ্যস্ততা রাতের আরাম ও মাটি আর ধুলায় আচ্ছন্ন না হওয়ার আভিজাত্যপূর্ণ অহংকার বিসর্জন দিয়ে, সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে এই মহতী যজ্ঞে শামিল হয়েছেন।
হয়তো কোনো এক ভোরে মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি চারদিকের আকাশ-বাতাসে মায়াবী সুরে ছড়িয়ে পড়বে। সেদিন হয়তো কেউ মনে রাখবে না,কে কত রাত জেগেছিল, কার হাত ধরে কতশত ইট এখানে এসেছিল, কিংবা কারা পর্দার আড়ালে থেকে এই মহীরুহ গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু জগৎজননী মায়ের অন্তরে তা চিরকাল অক্ষয় থাকবে। আর এই পবিত্র কর্মের পুণ্যফল চিরন্তন আশীর্বাদ হয়ে জড়িয়ে থাকবে তাদের জীবনে কিংবা মূহুরী পুকুর, পিচঢালা রাস্তা বা সমালোচনা আর সমালোচকের ঠোঁটে কিংবা ঈর্ষার বুকপকেটে।
মায়ের ঘর গড়ার এই অনন্য মহাযজ্ঞে পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন, তহবিল থেকে তদারকি, আর রাতের আঁধারে ইট টেনে যারা এই ‘দেবালয়’ বিনির্মাণে নিজেদের উৎসর্গ করেছেন, তাদের সকলের চরণে বিনম্র কৃতজ্ঞতা ও সাষ্টাঙ্গ প্রণাম, কৃতজ্ঞতা সেই সব সমালোচকদের যাদের সমালোচনায় আমরা সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি খুজে পাই, ভুল শুধরে এগিয়ে যাই। - ARN/AR.