02/05/2025
এটা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়- যে ধর্মে নারীরা 'দেবী' রূপে যুগযুগান্তর ব্যাপি পূজিত, সেই ধর্মের অনুসারী হয়েও আজ 'নারীর সম্মান' নিয়ে আলোচনা করতে হচ্ছে! আমাদের অজ্ঞতা, অজ্ঞানতা ও স্বধর্মের অনুশাসনের প্রতি অবজ্ঞাই আজ আমাদেরকে এই অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। সনাতনীরা নিজেদের শিকড় নিজেরাই কেটে চলছে নানান বর্ণ-উপবর্ণে বিভক্ত হয়ে। তার উপর গেঁড়ে বসেছে ব্রহ্মণ্যবাদ, গুরুবাদ আর তথাকথিত আধুনিকতাবাদ- যা পরস্পরকে পরস্পর হইতে বরাবর বিচ্ছিন্ন করছে যুগযুগ ধরে। এবং এই অশাস্ত্রসুলভ মতবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রত্যক্ষ শিকারে পরিণত হচ্ছে সনাতনী নারীসমাজ! এখনই যদি সনাতনী সমাজ নিজেরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে রুখে না দাঁড়ায় তবে অদূরেই কালসর্প ফনা তুলে দংশনের অপেক্ষায়!
প্রাচীনতম গ্রন্থ মনুস্মৃতিতে বলা হয়েছে – “যেখানে নারীদের পূজা করা হয়, সেখানে দেবতারা বাস করেন।” আমাদের ধর্মে নারীর অবস্থান বলার জন্য এটাই যথেষ্ট।
নারী সম্পর্কে স্বামী বিবেকানন্দ উক্তি করেছিলেন - “ব্রহ্মচারি যদি হয় তবে ব্রহ্মচারিণী হবে না কেন?”
“যে দেশে, যে জাতে মেয়েদের পূজা নেই, সে দেশ, সে জাত কখনও বড় হতে পারেনি, কস্নিন কালে পারবেও না। তোদের জাতের যে এত অধঃপতন ঘটেছে, তার প্রধান কারণ এইসব শক্তিমূর্তির অবমাননা করা।”
মনুস্মৃতি (৩।৫৬) বলেছেন-
যত্র নার্যসত্ত পূজ্যন্তে রমস্তে তত্র দেবতাঃ ।
যতৈতাস্ত্ত ন পূজ্যন্তে সর্বাস্তত্রাফলা ক্রিয়া । ।
অর্থাৎ,
যে সমাজে নারীদের যথাযথ শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করা হয়, সেই সমাজ দিব্য গুণ তথা দিব্য ভোগ (উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি) লাভ করে। আর যারা নারীদের যোগ্য সম্মান করে না, তারা যতই মহৎ কর্ম করুক না কেন, তার সবই নিষ্ফল হয়ে যায়।
সনাতন শাস্ত্রাদি ও বেদসকল নারীর সম্মান ও মর্যাদা এবং নারীশক্তির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
শ্রীশ্রী চণ্ডীতে একাদশ অধ্যায়ে নারায়ণী স্তুতিতে সকল দেবতাগণ নারীবন্দনায় ছিলেন মুখর। অধ্যায়ের ৬ সংখ্যক শ্লোকে দেবতারা স্তুতি করেছেন এভাবে-
"বিদ্যাঃ সমস্তাস্তব দেবি ভেদাঃ
স্ত্রিয়ঃ সমস্তাঃ সকলা জগৎসু।
ত্বয়ৈকয়া পূরিতমম্বয়ৈতৎ
কা তে স্তুতিঃ স্তব্যপরাপরক্তিঃ ।।" ৬
অর্থাৎ, -হে দেবি, বেদাদি অষ্টাদশ বিদ্যা আপনারই অংশ। চতুঃষষ্টি-কলাযুক্তা এবং পাতিব্রত্য, সৌন্দর্য ও তারুণ্যাদি গুণান্বিতা সকল নারীই আপনার বিগ্রহ। আপনি জননীরূপা এবং একাকিনীই এই জগতের অন্তরে ও বাহিরে পরিব্যাপ্ত হইয়া আছেন। স্তবনীয় বিষয়ে মুখ্য ও গৌণ উক্তির নাম স্তুতি। যখন আপনি স্বয়ং সেইসকল উক্তিরূপা, তখন আপনার এইরূপ স্তুতি আর কি হইতে পারে?
নারীর সম্মান রক্ষার জন্য আমাদের ইতিহাসের দুটি মহান যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল- রাবণ সীতাকে হরণ করেছিলেন। সেই অপরাধে রামের বধ্য হন এবং মহাভারতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ হয়েছিল দ্রৌপদীর সম্মান রক্ষার জন্য।
আমাদের ধর্মীয় গ্রন্থে অনেক জায়গায় নারীদের যজ্ঞ ও পূজার উল্লেখ আছে যেমন রামায়ণে কৌশল্যা তার পুত্র রামের জন্য করেছিলেন এবং তারা তার স্বামী বালির জন্য করেছিলেন কিন্তু পুরুষরা স্ত্রী ছাড়া যজ্ঞ করতে পারে না।
অনাদিকাল থেকে ভারতীয় সংস্কৃতিতে, নারীশক্তি কেবল সম্মানিতই হননি, দৈবশক্তি নিয়েও জন্মেছিলেন। আবির্ভূত হয়েছেন ত্রিশক্তি রূপে, সাবিত্রীরূপে। গায়ত্রী- যিনি ত্রিজগৎ প্রসবিনী 'ব্রহ্ম'! মহাকালীস্বরূপে তিনিই কাল (সময়) গ্রাসকারিনী! দশ মহাবিদ্যা স্বরূপে ত্রিজগতের রক্ষক যে তুমি নারীশক্তিই!
সনাতন বা বৈদিক ধর্মই পৃথিবীর একমাত্র ধর্ম যার প্রধান ধর্মগ্রন্থ 'বেদ' চতুষ্টয়ে মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষিদের মধ্যে রয়েছেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী ঋষি।
যেমন — ১)ঘোষা, ২)লোপামুদ্রা, ৩)মৈত্রেয়ী, ৪) গার্গী, ৫)পৌলমি, ৬)রোমশা, ৬)অপালা, ৭)বাক, ৮)অপত, ৯)কক্র, ১০)বিশ্ববর, ১১)জুহু, ১২)ভগষ্ট্ৰীনি, ১৩)যরিতা, ১৪)শ্ৰদ্ধা, ১৫)উর্বশী, ১৬)স্বর্ণগা, ১৭)ইন্দ্ৰানী, ১৮)সাবিত্রী, ১৯)দেবায়নী, ২০)নোধা, ২১)আকৃভাষা, ২২)শীকাতনবাবরি, ২৩)গল্পায়নী, ২৪)মন্ধত্রী, ২৫)গোধ, ২৬)কক্ষিবতী, ২৭)দক্ষিণা, ২৮)অদিতি, ২৯)রাত্রি, ৩০)শ্রীলক্ষ্য উল্লেখযোগ্য।
অন্য কোন ধর্ম বা ধর্মগ্রন্থে নারীদের এমন ভূমিকায় দেখা গেছে বলে জানা নেই।
ঋগ্বেদ-এ নারীদের যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করারও সাক্ষ্য আছে। তাই আমরা শুনি, মুদ্-গলিনীর যুদ্ধ জয়ের বৃত্তান্ত। বিশ্পলা যুদ্ধে একটি পা এবং বধ্রিমতী একটি হাত হারান। বধ্রিমতী এবং শশীয়সী তাঁদের বীরত্বের জন্য উল্লিখিত হয়েছেন। ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসেও অসংখ্য বীরাঙ্গনার কথা জানতে পারি, যেমন — ১) রানী লক্ষ্মী বাঈ, ২) রানী দুর্গাবতী, ৩) ঝালকারি বাঈ, ৪) রানী তারাবাঈ, ৫) রানী আব্বাক্কা, ৬) রানী ভেলু নাছিয়ার, ৭) রানী অবন্তীবাঈ, ৮) কেলাদি চেন্নাম্মা, ৯) কিত্তুর চেন্নাম্মা, ১০) উদা দেবী, ১১) লক্ষ্মী সহগল; প্রমুখ।
সনাতন সংস্কৃতি আমাদের জন্য গর্বের বিষয় এবং এর হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে যতটা সম্ভব অবদান রাখা আমাদের দায়িত্ব।
স্বধর্মের মহিমা ও মর্যাদা সমুন্নত রাখতে নারীর প্রতি সনাতনী পুরুষদের হতে হবে পরম শ্রদ্ধাশীল, দায়িত্ব ও কর্তব্যপরায়ণ। একটি নারীও যদি পরধর্ম নির্বাসিত হয়, তবে এর দ্বায় অবশ্যই সনাতনী পুরুষের রয়েছে। তাই, ধর্মরক্ষার এই যুদ্ধে শাস্ত্রজ্ঞানে বিকশিত হয়ে নারীশক্তির প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে পুরুষদিগকেই এগিয়ে আসতে হবে!
সত্যমেব জয়তু 🙏
হরচণ্ডী সেবাশ্রম
শিববাড়ী, দেবীপুর।
রাজনগর, মৌলভীবাজার, সিলেট।
বাংলাদেশ।