10/01/2025
√প্রশ্নঃ ধর্ম আর ঈশ্বর যে এক ও অদ্বিতীয় — একথাটি মাথায় ধরে না।
শ্রীশ্রীঠাকুর—- ঈশ্বরের প্রতিটি সৃষ্টিও এক ও অদ্বিতীয়। দুনিয়ায় কারও সাথে কারও হুবহু মিল খুঁজে পাবেন না। তাই, স্বতন্ত্র্যের(unic) প্রয়োজন আছে। বৈশিষ্ট্যওয়ালা বহুর সহযোগের ভিতর দিয়েই প্রত্যেকটি বিশেষ টিকে থাকে। একক কেউ টিকতে পারে না, তাই difference (পার্থক্য) চাই-ই।
Difference (পার্থক্য) না থাকলে কেউ কাউকে feel (অনুভব)-ই করতে পারতাম না। কেবল আমিই যদি থাকি, আমা ছাড়া যদি কিছু না থাকে, তাহ'লে আমিও থাকি না, থাকলেও তা' বোধ করতে পারি না। তবে Divine unity-তে (ভগবত ঐক্যে) যদি আমরা interested (অন্তরাসী) হই, তবে inspite of difference we enjoy one another, we enjoy to grow, and grow to enjoy (পার্থক্য সত্ত্বেও আমরা পরস্পরকে উপভোগ করি, আমরা উপভোগ করি বৃদ্ধি পেতে এবং বৃদ্ধি পাই উপভোগ করতে)।
[আ. প্র. ৭/২৮.১২.১৯৪৫]
ঈশ্বর কী?
শ্রীশ্রীঠাকুর-- সব জানা মানেই ঈশ্বরকে জানা, ধর্ম্মকে জানা।
❝ঈশ্ ধাতুর মানে আধিপত্য,প্রভূত্ব । আধিপত্যের মধ্যে অধি+পতি দুইটি শব্দ রয়েছে। অধি মধ্যে রয়েছে ধৃ ধাতু।মানে হ'ল ধারণ করা। পতি ধাতুর মধ্যে রয়েছে পা ধাতু।মানে পালন করা। অধিপতি শব্দের মধ্যে ঈশ্বরও আছেন, আবার ধর্মও আছেন। ঈশ্বর আর ধর্ম এক ও অনন্য। তাই ঈশ্বর এক,ধর্ম এক, প্রেরিত পুরুষেরা একেরই বার্তাবাহী।
এই বিশাল বিস্তৃতির অধীশ্বর যিনি, তিনিই ঈশ্বর।❞
এই ঈশ্বর বা ধর্ম্ম দুনিয়ার সব-কিছুর মধ্যেই আছে। তাই,সেই এককে জানলেই সব-কিছু জানা হয়। ঈশ্বর কথার মানেই হ'ল আধিপত্য।
আবার আধিপত্য মানে ধারণ-পালন সম্বেগ আছে। যে ধারণপালনী সম্বেগ( আকর্ষণ-বিকর্ষণ- বিরমণ বা,স্থিতি) আমার মধ্যে থাকার জন্য আমি বেঁচে আছি,শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে পারছি,ঐ আমার ঈশ্বর বল,সূরত বল,আর যোগাবেগ বল। তাঁর সাথে কিন্তু বিশ্বদুনিয়ার সব-কিছুর সঙ্গতি আছে। সেই সঙ্গতি খুঁজে বের করা লাগবে। এই বুঝলেন ঈশ্বর--।
আবার দেখেন,ধর্ম্ম মানে যা' ধ'রে রাখে। কী ধরে রাখে? সত্তা ধরে রাখে। এই ধর্ম্ম সবারই আছে,সবটার মধ্যে আছে যার যার মতন করে। ঐ খুঁটিটার ধর্ম্ম আছে,যার জন্য খুঁটিটা খুঁটি হ'য়ে আছে। ঐ মাটি কণার ধর্ম্ম আছে। তার ফলে,মাটিকণা মাটিকণা হ'য়ে আছে। ঐগুলি হয়েছে উপাদানের মধ্য-দিয়ে। এদের মধ্যে যে spirit (জীবনীশক্তি) আছে তা' কিন্তু আমার মধ্যেও আছে আমার রকমে।
❝মা সার্বজনীন❞— একথার সাথে কেহ কেহ একমত নয়— এ বিষয়ে কী বলবেন?
শ্রীশ্রীঠাকুর—❝--আমি তাই কই। আমরা আধ্যাত্মিকভাবে যত উন্নতি করব, জাগতিকভাবেও আমাদের অন্তদৃষ্টি বাড়বে ততই। শেষটা দেখতে পাব spiritual prosperity (আধ্যাত্মিক ঐশ্বর্য্য) বাদ দিয়ে কোনও prosperity-ই (ঐশ্বর্য্যই) হয় না।
প্রকৃত প্রস্তাবে spiritual এবং material (আধ্যাত্মিক ও জাগতিক), এ দুটো আলাদা নয়।matter (বস্তু)-এর পিছনেই আছে spirit (আত্মা)। আত্মার প্রকাশই বস্তুতে।❞
এজন্য মাটিকে মা বলি। মা চিন্ময়ী বা চৈতন্যময়ী। মা- মাটি, মানুষে প্রভেদ নেইকো। মাটির প্রতি-মা প্রতিজনের মা,সবার মা। মা সার্বজনীন।
❝Energy in condensed from is matter(শক্তির ঘনীভূত রূপই পদার্থ)। Energy (শক্তি)-র পিছনে আছে vibration (স্পন্দন)।❞
আছে সূর্য্য,চন্দ্র,গ্রহ,তারার মধ্যেও।
এই spirit-এর flow (জীবনীশক্তির প্রবহমানতা) যতখানি perverted (বিকৃত) হ'য়ে যাবে,আমি ততখানি বৃদ্ধ হ'য়ে যাব,যে energetic volition (উদ্যমী ইচ্ছাশক্তি) আমার ছিল,তা' নষ্ট হ'য়ে যাবে।
ওটা যদি constant (নিরন্তর) রাখতে হয়, তাহলে ঐ flow (প্রবহমানতা) ঠিক রাখা লাগবে —যা'তে বড় হ'য়েও আমরা young (যুবক) থাকতে পারি। এইতো মোকথা কথা।★
❝জড় শক্তি, চৈতন্যশক্তির ভেদ নাই। ভেদ করলে বেকুব হয়ে যাব, পাগল হয়ে যাব। জড়েরই চৈতন্য, আবার চৈতন্যেরই জড়। জড় চৈতন্য হয় আবার চৈতন্যই জড় হয়। Mother-এর মধ্যে মাতর আছে।মা ভিন্ন ভিন্ন মনে হলেও মাতৃত্ব এক। মাতর মানে Mother। প্রতিটি সৃষ্টির পরিমাপণী শক্তি এক ও অন্যন্য। তাই একটা mataer (পদার্থ) থেকে আবার নতুন সৃষ্টি হয়। মা এর সৌন্দর্য তাঁর মাতৃত্ব। মাতৃভক্তি অটুট যত, সেই সন্তান কৃতি তত। (অনুশ্রুতি)
মাতৃপ্রণাম মন্ত্রে উল্লেখ রয়েছে—
❝মাতা ধরিত্রী জননী দয়া ব্রহ্মাময়ী সতী।
দেবী তু রমনী শ্রেষ্ঠা নির্দ্দোষা সর্ব্বোদুঃখহা।।
আরাধ্যা পরমা মায়া তুষ্টি শান্তি ক্ষমাগতিঃ।
স্বহা-স্বধা চ গৌরী মা পদ্মা চ বিজয়াজয়া।।❞
এই এক মন্ত্রেই মা-মাটি- মানুষকে শ্রদ্ধা করতে শিখিয়ে।
মন্ত্র দ্বারা মা'কে স্মরণ করতে হবে?
শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন— পিতা-মাতার পিতৃত্বটুকু হ'ল দিব্যধাম হতে আগত। পিতামাতা জীবন্ত গৃহ দেবদেবী। আমরা হলাম তাঁদের দেব সন্তান। সৃষ্টির উল্লাসে যোগ মুহুর্তে মায়ের ভাবভূমির উপর সন্তানের উপর বর্তায়।
সৃষ্টির উল্লাসে মন(bundle of complex)—প্রবৃত্তিরূপ ইচ্ছা থেকে আমাদের সৃষ্টি। তাই পিতামাতার পিতৃত্ব ও মাতৃত্বটুকু স্মরণ মননে প্রবৃত্তিরূপ মনকে ত্রাণ করাকে মন্ত্র বলা হয়। এককথায়— ❝যা' উচ্চারণে মনের গ্লানি ত্রাণ হয়,তাই মন্ত্র।❞
চৈতন্য পুরুষ সর্বত্রই আছেন, সবসময়। আর সেই পুরুষের মধ্যে আছে attraction, repulsion and stagnation (আকর্ষণ, বিকর্ষণ ও বিরমণ)। কখনও extremely contracted (চরম সংকুচিত) হয়ে পড়ে, কখনও হয়ে পড়ে extremely expanded (চরম প্রসারিত)। আবার কখনও stagnation (বিরমণ প্রাপ্ত)। এমনি করতে করতেই সৃষ্টি হয়ে চলে। 'রা' হল vibration (কম্পন); 'ধা' cessation (বিরতি)। এর মধ্যেই আকর্ষণ-বিকর্ষণ ও বিরমণের ক্রিয়া হয়ে চলেছে। আর 'স্বা' হল out going force (বহির্গামিণী শক্তি) এবং 'মী' in going force (অন্তর্গামিণী শক্তি)। এইটা আছে বলেই সম্ভব হয়েছে।
এখন যদি ইলেক্ট্রন,প্রোটন,নিউটন, প্রোটপ্লাজম বিজ্ঞানের এই সব বড় বড় শব্দ সবই কিন্তু সেই পরমপুরুষের কথা। যত আমি তাঁর দিকে নিষ্ঠা ও প্রীতি নিয়ে এগিয়ে যাব, ততই ওগুলি আমার মধ্যে gradually (ক্রমশঃ) exposed (প্রকাশিত) হয়ে উঠবে। কথাগুলি তোমার ম'ত ক'রে সাজিয়ে নিয়ে এমনভাবে পরিবেশন করা লাগবে,যেন তা' religio- scientific (ধর্ম্ম ও বিজ্ঞান-সম্মত) হয়। লেখার মধ্যে আবার emotion-ও (ভাবাবেগও) থাকা চাই,sentiment-ও (ভাবানুকম্পিতাও) থাকা চাই। দুটো একসাথে না থাকলে একটা বিষয় ঠিকমত feel-ই (বোধই) করা যায় না। যেমন, বঙ্কিমবাবুর ঐ গান 'বন্দে মাতরম্'। ওতে কি-রকম emotion (ভাবাবেগ) আর sentiment (ভাবানুকম্পিতা)। আছে না?
আবার materialisation-এর (বাস্তবায়নের) সহায়তা করবে। Materialisation (চরিত্রগত করা) তো চাই-ই,একশ' বার। আর একটা কথা। ঈশ্বর সম্বন্ধে কত কথা চালিত আছে। কিন্তু ঐ যে আছে তিনি নিরাকার চৈতন্যস্বরূপ,এই বোধ এত চারায়ে গেছে যে তা' আর কওয়ার না। মানুষ যেন ভুলেই গেছে ❝কৃষ্ণের যতেক লীলা সর্ব্বোত্তম নরলীলা নবরূপ তাঁহার স্বরূপ❞।
[(★ইং ১৩/১২/১৯৫৮)।। দীপরক্ষী ৪র্থ খণ্ড।।
এবং (বাং ১৬ই আশ্বিন,বৃহস্পতিবার,১৩৬৫) (ইং ২/১০/১৯৫৮)।। দীপরক্ষী ৪র্থ খণ্ড।।]
© সংগৃহীত: P Das
তাঁর পথে