28/10/2023
💠বলি প্রথা কি অশাস্ত্রীয়❓
🚩 সনাতন ধর্মালম্বীরা মূলত পাঁচটি মতে বিভক্ত।তার মধ্যে প্রধানত তিনটি মত শাক্ত, শৈব এবং বৈষ্ণব। এই মতত্রয়েরর মধ্যে বৈষ্ণব বাদ দিলে বাকি মত দুটি বলি সমর্থন করে।
🚩শাক্ত মতের অন্যতম প্রধান গ্রন্থ শ্রীশ্রীচণ্ডীতে দ্বাদশ অধ্যায় (১০,১১) সহ একাধিক স্থানেই দেবীপুজায় পশুবলির কথা বলা আছে। একইভাবে শৈবদের গ্রন্থাবলীতেও পশুবলির বিধান আবশ্যকীয়ভাবে দেয়া আছে।
‘‘শাস্ত্রে দেবোদ্দেশে পশুবধের বিধান থাকলেও বৃথা হিংসার বিধান নেই। কিন্তু ভোগাসক্ত মানুষ এই বিশুদ্ধ ধর্ম জানে না। শাস্ত্রে অনভিজ্ঞ, পণ্ডিতম্মন্য সেই পাপাচারী নিঃশঙ্কচিত্তে পশুবধ করে, কিন্তু পরলোকে সেই নিহত পশুরাই তাদের মাংস খেয়ে থাকে। এইভাবে যারা পশুহিংসা দ্বারা পরদেহের প্রতি হিংসা করে, তারা সেই সর্বান্তর্যামী শ্রীহরিকেই দ্বেষ করে।’’
(শ্রীমদ্ভাগবত : একাদশ স্কন্ধ, ৫ম অধ্যায়, ১৩-১৪)
অর্থাৎ এখানেই স্পষ্টতা পাচ্ছে যে, অযথা জীবহত্যা বা পশু বলি হিংসা। কিন্তু দেবতার উদ্দেশ্যে বলি অহিংসা হিসেবেই বিবেচিত।
📌খাবার নিয়ে ভাগবতের প্রথম স্কন্ধেই আলোচনা করা আছে। বলা হয়েছে, "এই জগতে হস্তবিহীন (হাত নেই) প্রাণীরা মানুষের খাদ্য। চতুষ্পদ পশুদের পক্ষে পদবিহীন এবং তাদের মধ্যেও ক্ষুদ্রদেহী বড় দেহীর খাদ্য। এই ভাবে এক জীব অন্য জীবের আহার।"
(শ্রীমদ্ভাগবত : প্রথম স্কন্ধ, অধ্যায়ঃ ১৩, শ্লোকঃ ৪৭)
📌গায়ত্রীতন্ত্রে বলা হয়েছে, বলিদান ব্যতীত শক্তিপূজা করলে শক্তিহত্যার পাপ হয়, ব্রহ্মহত্যার পাপ হয়!
দেবীপুরাণসহ অনেক গ্রন্থেই পশুবলির বিষয়ে স্পষ্টত পাওয়া যায়।
📌তৈত্তিরীয় সংহিতায় (২/১/১/১) বলা হয়েছে,
‘বায়ুদেব উদ্দেশ্যে শ্বেত ছাগ বলি প্রদান করিবে’।
📌(দেবীপুরাণ: ২১.৪-৫)--
বরঞ্চ সর্বলোকানাং প্রপদৌ ভয়নাশিনী।।
বলিঞ্চ দদ্যুর্ভূতানাং মহিষাজামিষেণ চ।।
অর্থাৎ, "সেই ভয়নাশিনী দেবী সকল লোককেই অভয় প্রদান করলেন। ভূতগণ মধ্যে মহিষ, ছাগ ইত্যাদি বলি দেবীকে প্রদান করলেন।"
📌( দেবীপুরাণ:২১.৯)-
জলদান্তে আশ্বিনে মাসি মহিষারিনিবর্হিণীম্ ।
দেবী সম্পূজয়িত্বা তু অষ্টমী হ্যর্দ্ধরাত্রিষু ।
যে ঘাতয়ন্তি সদা ভক্ত্যা তে ভবন্তি মহাবলাঃ ।।
অর্থাৎ, "বর্ষা প্রভাতে আশ্বিন মাসে অষ্টমী অর্ধরাতে দেবীকে নিষ্ঠার সাথে পূজা করে যারা মহিষ, ছাগ বলি প্রদান করেন, জগতে তাঁরা মহাবলশালী হয়ে থাকেন।"
📌( দেবীপুরাণ: ৫০.৩৮)-
বলিমাংসৌদনাহারাং কৃষ্ণগন্ধস্রজপ্রিয়াম্ ।
তুরুস্কাগুরুহোমেন বিকারিভয়নাশিনীম্ ।।
অর্থাৎ, "বলি, মাংস, অন্ন, নৈবদ্য এই দেবীর খুব প্রিয় । এই দেবীকে কৃষ্ণবর্ণ চন্দন , মালা দিতে হয় । তুরুস্ক , অগুরু ইত্যাদি দ্বারা হোম করলে দেবী সর্বভয় নাশ করেন । "
📌( দেবীপুরাণ: ৯৭/৩-৫)--
ব্রহ্মোবাচ-
যজ্ঞার্থে পশবঃ সৃষ্টা যজ্ঞেম্বেষাং বধঃ স্মৃতঃ ।
অন্যত্র ঘাতনাদ্দোষো বাঙ্মনঃকায়কর্ম্মভিঃ ।।
দেবার্থে পিতৃকার্যেষু মনুষ্যর্থে পুরন্দর ।
বধয়ন্ ন ভবেদেন অন্যথা মহাকিল্বিষী ।।
নবকৃষরপূপাণি পায়সং মধুসর্পিষী।
বৃথামাংসঞ্চ নাশ্নীয়াদ্দেবপিতৃ অহোমিতম্।।
অর্থাৎ, "ব্রহ্মা বললেন, হে পুরন্দর ! যজ্ঞের জন্যই পশুর সৃষ্টি । যজ্ঞে তাদের বধ শাস্ত্রে বিহিত রয়েছে । যজ্ঞের কার্য্যে , বাক্য , মন , কায় ও কর্ম ছাড়া বাকী কর্মে পশুঘাত করলে পাপ হয়। দেবকার্য্যে, পিতৃকার্য্যে ও মনুষ্যকৃত্যে পশুবধ করলে পাপ হয় না। এর বিপরীতে করলে বরং পাপ হয় । দেবতা ও পিতৃগণকে নিবেদিন না করে নূতন কৃষর, পিঠা, পায়স, মধু, ঘৃত ও দেবতাকে অনিবেদিত বৃথামাংস ভক্ষণ করবে না।"
📌(ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ: প্রকৃতিখণ্ড, ৪৪.১৫-১৯)--
পূজয়ামাস তাং শক্তিং দেবীং মঙ্গলচণ্ডিকাম্ ॥ পাদ্যার্ঘ্যাচমনীয়ৈশ্চ বলিভির্বিবিধৈরপি ।
পুষ্প-চন্দন-নৈবেদ্যৈৰ্ভক্ত্যা নানাবিধধৈর্ম্মুনে ॥ ছাগৈৰ্ম্মেষৈশ্চ মহিষৈর্গণ্ডৈৰ্মায়াতিভিস্তথা ।
বস্ত্রালঙ্কারমাল্যৈশ্চ পায়সৈঃ পিষ্টকৈরপি ৷৷
মধুভিশ্চ সুধাভিশ্চ পক্বৈনানাবিধৈঃ ফলৈঃ । সঙ্গীতৈর্নত্তনৈর্বাদ্যেরুৎসবৈঃ কৃষ্ণকীৰ্ত্তনৈঃ ॥
ধ্যাত্বা মধ্যন্দিনোক্তেন ধ্যানেন ভক্তিপূর্বকম্ ।
দদৌ দ্রব্যাণি মূলেন মন্ত্রেণৈব চ নারদ ॥
অর্থাৎ, "পাদ্য, অৰ্ঘ্য, আচমনীয়, নানাপ্রকার পূজোপহার, পুষ্প, চন্দন, ভক্তিপূর্বক দত্ত নানাপ্রকার নৈবেদ্য, ছাগ, মেষ, মহিষ প্রভৃতি পশুবলিসহ; বস্ত্র, অলঙ্কার, মাল্য, পায়স, পিষ্টক, মধু, সুধা, নানাপ্রকার সুপক্ক ফল, সংকীর্তন, বাদ্য, আনন্দপূর্বক কৃষ্ণনাম কীৰ্ত্তন প্রভৃতি দ্বারা মঙ্গলচণ্ডী দেবীর পূজা করেছিলেন। যজুর্বেদীয় মধ্যন্দিনোক্ত মন্ত্রদ্বারা ভক্তিপূর্বক ধ্যান করেছিলেন এবং দেবীর মূলমন্ত্র উচ্চারণ পূর্বক দেবীর উদ্দেশ্যে দ্রব্যাদি প্রদান করেছিলেন।"
📌(মনুসংহিতা:৩.৮৯)--
উচ্ছীর্ষকে শ্রিয়ৈ কুর্য্যাদ্ভদ্রকাল্যৈ চ পাদতঃ। ব্রহ্মবাস্তোষ্পতিভ্যাক্ত বাস্তুমধ্যে বলিং হরেৎ।।
অর্থাৎ, "উচ্ছীর্ষক অর্থাৎ প্রসিদ্ধ দেবগৃহের শীর্ষস্থানে বা গৃহস্থের শয়নগৃহের ঊর্দ্ধভাগে উত্তর বা পূর্বদিকে লক্ষ্মীর উদ্দেশ্যে ‘শ্রিয়ৈ নমঃ’ মন্ত্রোচ্চারণ পূর্বক বলি প্রদান করবে এবং ভদ্রকালীর উদ্দেশ্যে ‘ভদ্রকাল্যৈ নমঃ' মন্ত্রোচ্চারণপূর্বক বলি প্রদান করবে। গৃহমধ্যে ব্রহ্মার উদ্দেশ্যে ‘ব্রহ্মণে নমঃ’ ও বাস্তুদেবতার উদ্দেশ্যে ‘বাস্তোষ্পতয়ে নমঃ' মন্ত্রোচ্চারণ করে বলি প্রদান করবে।"
🚩মনুসংহিতাও ভাগবতের মতই পশুবলিকে ঘৃণ্য দৃষ্টিতেই দেখা হয়েছে। কিন্তু দেবতার উদ্দেশ্য নিয়ে বলিকে অহিংসাই বলা হয়েছে।
"যেই পশুমাংস দান করা হয় দেবতা ও পিতৃলোকের তৃপ্তি সম্পাদনের জন্য, সেই অবশিষ্ট মাংস ভোজন করিলে দোষ হয় না।’
📌(মনুসংহিতাঃ ৫/৩২)
‘যজ্ঞ সিদ্ধির নিমিত্ত প্রজাপতি স্বয়ংই পশু সমুদর সৃষ্টি করিয়াছেন।... অতএব যজ্ঞে যে পশুবধ তাহা বধ নয়; কেননা, তাহাকে বধ করায় পাপ নেই’।
📌(মনুসংহিতাঃ ৫/৩৯)
‘যে সকল মাংস ভোজনের বিধিনিষেধ নাই, তাহা ভক্ষণে দোষ নাই।’
📌(মনুসংহিতাঃ ৫/৫৬)
🚩দেবী ভাগবতেও একই সুরে বলা হয়েছে-
"দেবীর সন্মুখে যে সকল পশু নিহত হয়, তাহারা অক্ষয় স্বর্গ লাভ করে এবং দেবীর প্রীত্যর্থে উৎসর্গপূর্ব্বক নিহত পশুগনের নিশ্চিত স্বর্গগতি হয় বলিয়া প্রকৃতপক্ষে তাহাদিগের পরম উপকার করা হয়; এই জন্যই যজ্ঞীয় হিংসা যে হিংসার মধ্যে গণ্য নহে, ইহা সমুদয় শাস্ত্রেই নির্ণীয় হইয়াছে।।’
📌(দেবীভাগবতঃ ৩/২৬/৩৩,৩৪)
🚩শুধুমাত্র বৈষ্ণবীয় শাস্ত্রাবলিতে পশুবলির আবশ্যকতা খুব একটা পাওয়া যায় না। এর অন্যতম কারণ বৈষ্ণব শাস্ত্রাদিতে ও উপাসনায় অহিংসা তত্ত্বের প্রভাব এবং শ্রীরামানুজাচার্য, শ্রীমধ্বাচার্য, শ্রীবল্লভাচার্য, শ্রীনিম্বার্কাচার্য এই প্রধান চার বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের প্রধান আচার্যবৃন্দ সকলেই দক্ষিণ ভারতের। আর বলার অপেক্ষা রাখে না, দক্ষিণ ভারতে ঐতিহাসিকভাবেই নিরামিষাশী প্রভাব প্রবল। সেখানে বহু মুসলিম এবং খ্রিস্টানরাও নিরামিষাশী।এই নিরামিষ খাদ্যাভ্যাসেরই সরাসরি প্রভাব পরেছে বৈষ্ণব সম্প্রদায়গুলোর উপরে।
🚩ব্রহ্ম কি উদ্ভিদ কি প্রাণী! বেদানুযায়ী-" সর্বং খ্বলিদং ব্রহ্ম"। এক জীব হত্যা করেই অন্য জীব বেঁচে থাকে এটাই বিজ্ঞানের খাদ্যশৃঙ্খল। একচামচ দই এ লক্ষাধিক ব্যাকটেরিয়া কিলবিল কিলবিল করছে। ভাত খেতে হলেও গাছটি কেটে আনতে হয়। শাক খেতে হলেও শাকটি কেটে আনতে হয়। প্রকৃত ব্রহ্মদর্শী ব্যক্তির নিকট সব সমান।
🚩প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীতে নিরামীষ কোন খাবার নেই। প্রত্যেকটা খাবারেই আমিষ আছে। শ্রীমদ্ভগবদগীতার ১৭তম অধ্যায়ে ভগবান খাবার বিষয়ক আলোচনা করেছেন। সাত্ত্বিক, রাজসিক, তামসিক এই তিনপ্রকারের খাবার হয়।
🚩আমরা মান্য করি বা না করি বলি যে শাস্ত্র সমর্থন করে তা উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্টত বোঝা যায়। শাস্ত্র মান্য করা আমাদের কর্তব্য।
🙏মা মহাশক্তির কৃপা বর্ষিত হোক সর্ব জীবের উপর।
🙏জয় মা মহাশক্তি🙏
উৎসঃ SVS & GOOGLE
সংগ্রহাকঃ Shuvo Banarjee