16/04/2025
শিশুকে হিফজ পড়ানো ও কিছু পরামর্শ🌻🌻
● হিফজে ভর্তি করাব কোন বয়সে?
আমার মনে হয় এর চেয়েও প্রথম প্রশ্ন হলো হিফজে ভর্তি হওয়ার সাধারণ যোগ্যতা কী? সাধারণ যোগ্যতা হলো: তাজবীদ ঠিক রেখে কুরআন শরীফের যে কোন জায়গা থেকে দ্রুতগতিতে পড়তে পারা। মাদরাসার পরিসরে একে বলা হয় নাজেরা ঠিক করা। নাজেরাটা ভালোভাবে ঠিক না করলে শিশুর জন্য হিফজ জিনিসটা কঠিন হয়ে যায়। আমি যখন হিফজ পড়ি, দুই হাজার সালের কাছাকাছি সময়ে, তখন সম্ভবত সর্বত্র নূরানীর এতোটা প্রচলন ছিল না। মক্তবে নাজেরা শুরু করে হিফজখানায় গিয়ে বাকিটা ঠিক করা হতো। এবং খুব সম্ভব এখনের মতো নাজেরায় এতো ফাস্ট হওয়াও জরুরী ছিল না। মোটামুটি পড়তে পারলেই হিফজের সবক দিয়ে দেওয়া হতো। অন্তত আমাদের ক্ষেত্রে তাই হয়েছিল। হিফজ পড়তে পড়তে দিনে দিনে নাজেরাটাও চালু হয়ে যেত।
● কোনটা ভালো?
আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো, প্রথমটা। নাজেরাটা ভালোভাবে ঠিক করে যাওয়া দরকার। কারণ, হিফজের জীবনটা বেশ কঠিন, নানা দিক থেকে। রাতদিন লম্বা সময় পড়তে হয়, সূক্ষ্ম একটা রুটিন মেনে চলতে হয়, ছুটি কম থাকে। সব মিলিয়ে বন্দি জীবন। অপরদিকে মুখস্থ করতে হয়, পেছনের পড়া মুখস্থ রাখতে হয়। এই ছোট বয়সে এতো চাপ সামলানো এমনিতেই কঠিন। এর মধ্যে যদি আবার নাজেরার কারণে ধুঁকতে হয়, তাহলে জিনিসটা আরো বেশি জটিল হয়ে যায়। কিন্তু নাজেরাটা যদি সুন্দরভাবে চালু থাকে, তাহলে হিফজটা তুলনামূলক সহজে সম্পন্ন করা সম্ভব।
তবে, এখানে দরকার হলো ভারসাম্য। নাজেরা কোনরকম হলেই যেমন হিফজে নেওয়া ঠিক না, তেমনি নাজেরা ঠিক করার নামে কোন ছেলেকে বছরের পর বছর নাজেরাখানায় ফেলে রাখাও সঙ্গত না। এতে সেই শিক্ষার্থী ও অভিভাবক উভয়েরই হতোদ্যম হওয়ার আশংকা আছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীটা ভিতরে ভিতরে ভেঙ্গে পড়তে পারে।
● নাজেরা শেখার পদ্ধতি কী?
এ প্রশ্নটির সাথে আরো একটি প্রশ্ন যোগ করা যাক—হিফজে যাওয়ার আগে জেনারেল বিষয়সহ অন্যান্য বিষয়ে কী পরিমাণ পড়াশোনা করবে? বা আদৌ অন্য কিছু পড়া দরকার কি না?
আমার ব্যক্তিগত মত হলো: অন্যান্য বিষয় কিছুটা পড়িয়ে নেওয়া ভালো। বলতে পারি আবশ্যক। এর পরিমাণ কী হবে এ নিয়ে নানাজনের নানা মত থাকতে পারে। আমার খেয়াল হলো: ইংরেজি অক্ষরজ্ঞান, সহজ সহজ শব্দ পড়তে পারা। যেমন cat, car ইত্যাদি। অংকে সহজ যোগ বিয়োগ ভাগ পূরণ। বাংলায় রিডিং পড়তে পারা। উর্দুতে উর্দু কায়দা, পেহলি। পাশাপাশি তালিমুল ইসলাম ১-২, ছোট বয়সের উপযোগী প্রয়োজনীয় দোয়া দুরুদ, মাসআলা। মিনিমাম পর্যায়ের বাংলা, ইংরেজি, আরবি হাতের লেখা।
● শুধু নাজেরা পড়িয়ে হিফজে দেওয়া
এখানে কারো কারো চিন্তা থাকে এসব না পড়িয়ে যথাসম্ভব দ্রুত নাজেরা শেষ করে হিফজ পড়িয়ে ফেলা। নয় বছরের ভিতরে হিফজটা শেষ করে আসলে এরপর আরামসে এসব শিখতে পারবে।
এ জায়গাটায় আমার একটু আপত্তিমতো আছে। কয়েকটা কারণে:
১. বয়স অনুযায়ী শিক্ষার একটা দাবি আছে। যে বয়সে তার যে ধরণের দোয়া দুরুদ, ঈমান আকীদা বিষয়ক শিক্ষা, অক্ষরজ্ঞান ইত্যাদি হওয়ার কথা, সে বয়সে তা না দিলে শিক্ষার সঠিক প্রভাবটা পাওয়া যায় না। এতে মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতা থেকে যেতে পারে।
২. হিফজ একটা জটিল প্রক্রিয়া। কেউ কেউ সহজে দ্রুত সময়ে শেষ করে আসতে পারে। কারো কারো ক্ষেত্রে সময় বেশি লেগে যায় এবং সে বড় হয়ে যায়। তের চৌদ্দ বছর বয়সে একটা হাফেজ ছেলে সম্পূর্ণ নিরক্ষর অবস্থায় কিতাব বিভাগে যাওয়াটা তার জন্য সুখকর নয়। এ বয়সে না সে প্রথম শ্রেণীতে গিয়ে ভর্তি হতে পারবে, না পঞ্চম বা বিশেষ শ্রেণীতে গিয়ে অন্যদের সাথে তাল মিলাতে পারবে। ফলে এই দুর্বলতা ও পিছুটান পুরো শিক্ষাজীবনের উপর নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করবে। সে ভালো আলেম হতে পারবে না।
৩. তাছাড়া অন্যান্য বিষয় না পড়িয়ে শুধু নাজেরা পড়ানো বর্তমানে আপনার জন্য কঠিন হতে পারে। হয়তো আপনি নিজে ঘরে পড়াবেন। এটা যদি ভালোভাবে সম্ভব হয়, তাহলে তো সমস্যা নেই। আর না হয় তাকে নাজেরা পড়ার জন্য কোন হিফজখানায় দিয়ে দিতে হবে। কিন্তু হিফজ সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি প্রোগ্রাম। সেখানে নাজেরা নিয়ে সিস্টেমগতভাবেই সে অবহেলায় পড়বে। নাজেরা ঠিক না করে হিফজে চলে যাওয়ার কারণে অনেক ছেলেই শেষ পর্যন্ত হাফেজ হতে পারে না। অবশ্য যদি নাজেরার আলাদা ব্যবস্থা থাকে, তাহলে ভিন্ন কথা। দিতে পারেন। কিন্তু সতর্ক থাকতে হবে উপরে বলা বাকি দুইটা সমস্যায় যেন সে আক্রান্ত না হয়।
● স্বাভাবিক প্রসেস কী?
কারো কারো চিন্তা থাকে সন্তানকে স্কুলে ফোর বা ফাইভ পর্যন্ত আগে পড়িয়ে নেওয়া আর মক্তব বা প্রাইভেটে নাজেরাটা পড়ানো। আমার মনে হয় এ চিন্তা ভুল। ভালো সমাধান হলো নূরানী। নূরানীতে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত প্রয়োজনীয় দোয়া দুরূদ, হাতের লেখা ও জেনারেল বিষয়গুলো ভালোভাবেই শিখানো হয়। সেই সাথে তাজবীদসহ কুরআন নাজেরা। নূরানী প্রোগ্রামটা হলো শিশু শ্রেণী থেকে। যেটাকে আমরা নার্সারি বলি। মোট চারটি ক্লাস। সাড়ে চার বা পাঁচ বছর বয়সে যদি নার্সারিতে ভর্তি হয়, তাহলে তৃতীয় শ্রেণী শেষ করবে নয় বছর বয়সে। এরপর নিয়মতান্ত্রিক পড়াশোনা করলে তিন বছরে হিফজ শেষ করা সম্ভব। বয়স হবে বারো। এরপর চতুর্থ শ্রেণী থেকে দাওরায়ে হাদীস পর্যন্ত দশ বছর। সে সময় তার বয়স হবে বাইশ। হিফজে যদি আরো এক বছর বেশিও লাগে তবু সমস্যা নেই। এর চেয়েও কম বয়সে কম বয়সে কিতাবখানার পড়াশোনা বুঝে উঠা সম্ভবত মুশকিল হবে।
এখানে একটা বিষয় বলে রাখি—নূরানী তৃতীয় শ্রেণী পড়ার পর অনেকের হিফজ উপযোগী নাজেরাটা চালু হয় না। সে ক্ষেত্রে তাকে এক বছর বা ছয় মাস নাজেরা বিভাগে আলাদা করে পড়াতে হবে। এবং অস্থির না হয়ে কর্তৃপক্ষের সাথে সবসময় যোগাযোগ রাখা ও তাদের পরামর্শগুলো আমলে নিয়ে সামনে চলা উত্তম।
● নূরানী ও আমার ব্যক্তিগত অবজার্ভেশন
এ জায়গাটায় নূরানী পদ্ধতির ব্যাপারে আমার একটা অবজার্ভেশন বলে রাখি: নূরানী সারাদেশে শিক্ষার ক্ষেত্রে যে অবদান রেখে চলেছে, তা অতুলনীয়। জাতিগঠনে তাদের এ পরিশ্রম কৃতজ্ঞতার দাবিদার। দুটো জায়গায় বিশেষভাবে নজর দেওয়া দরকার মনে করছি:
১. নাজেরায় জোর কম দেওয়া হয়।
২. উর্দুর জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয় না।
এর বিপরীতে হাতের লেখার উপর অনাবশ্যক জোর দেওয়া হয়। প্রথম শ্রেণীর একটা ছেলে সাতটা সূরা মুখস্থ লেখতে পারার কোন প্রয়োজন নেই। পাশাপাশি তাদের নিজেদের পদ্ধতি মেইনটেইন করতে গিয়েও অনেক সময় খরচ করে ফেলা হয়। এবং এমন কিছু পদ্ধতি আছে, যেগুলো ‘বয়স্ক শিক্ষার জন্য উপযোগী’; শিশু শিক্ষার জন্য নয়। যেমন, তামীযের হরফ ধরণের পদ্ধতিগুলো। এগুলোতে জোর কমিয়ে নাজেরাকে মূল ফোকাসে নিয়ে আসা জরুরী মনে করি। যেন তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত হিফজের উপযোগী নাজেরা ঠিক হয়ে যায়। অবশ্য নূরানী অনেকগুলো বোর্ড আছে। আমি চিটাগাংসহ কয়েকটা বোর্ডের মধ্যে এই সমস্যাটা দেখেছি।
● সবশেষে
আপনার সন্তানকে আপনিই খেয়াল করতে হবে। সিস্টেম একটা পরিমাণ পর্যন্ত তাকে এগিয়ে দিবে; কিন্তু সে স্পেশাল হতে পারল কি না তা নির্ভর করছে আপনি তার খোঁজখবর কেমন নিচ্ছেন, উস্তাদগণের সাথে আলাপ আলোচনা কেমন করছেন, তার রেগুরালিটি ধরে রাখতে পারছেন কি না, মানসিকভাবে তাকে সবসময় স্বতঃস্ফুর্ত রাখতে পারছেন কি না তার উপর। একটা রোগীকে সবচেয়ে উন্নত হাসপাতালে সবচেয়ে দক্ষ ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেও আপনি যদি তৎপর না হন তাহলে সবচেয়ে ভালো চিকিৎসাটা উঠিয়ে আনতে পারবেন না।
সাবের চৌধুরী