10/07/2026
বিহার দানের ফল
-উ গুণবন্ধন পঞ্ঞা মহাথের (উপ-বিহারাধ্যক্ষ, খিয়ং ওয়া খিয়ং,বান্দরবান)
যা নিঃস্বার্থভাবে ত্যাগ করা হয় তাই দান। সৃষ্টির আদিকাল থেকেই এই একটি কার্য যা বুদ্ধের আর্বিভাবের পূর্ব হতে প্রাকৃতিক নিয়মেই মানুষ করে আসছে। ‘দান’ শুধু আমাদের ধর্মেই নয় প্রত্যেক ধর্মের মধ্যেই দান করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। জগতে সত্যধর্ম বিশ্বাসী নর-নারী প্রত্যেকের ইহ-পরকালের সুখ সমৃদ্ধির জন্য যথাশক্তি দানময় কুশল কর্ম সম্পাদন করা একান্তই কর্তব্য।মহাকারুণিক গৌতম বুদ্ধও মহাত্যাগী সুমেধ তাপস জন্মে দীপঙ্কর সম্যক সম্বুদ্ধের পাদমূলে আত্মত্যাগের মাধ্যমে সর্বজ্ঞতা জ্ঞান লাভের পারমী বীজ বপন করে নিশ্চিত যাত্রা শুরু করেছিলেন। সুতরাং যে কোন সত্ত্ব সংসারাবর্ত্ত দুঃখ হতে মুক্ত হওয়ার ইচ্ছা করলে তাঁকে অবশ্যই প্রথমে দান পারমী পূর্ণ করতে হবে। তাই নিবার্ণকামী সকলের উচিত সঠিক ভাবে দান কর্ম সম্পাদন করে পারমী পূরণ করা।
একদা একদেবতা “কি দানে বলদাতা হন, কি দানে বর্ণদাতা হন, কি দানে সুখদাতা হন, কি দানে চক্ষুদাতা হন এবং কিভাবে সর্বদাতা হওয়া যায়” ভগবান বুদ্ধের কাছে জিজ্ঞাসা করলে- ভগবান বুদ্ধ উত্তরে বললেন, “অন্নদানে বলদাতা, বস্ত্রদানে বর্ণদাতা, যান দানে সুখদাতা এবং দীপদানে চক্ষুদাতা হন। কিন্তু যিনি আবাস বা বিহার দান করেন তিনি সর্বদাতা হন। যিনি ধর্মানুশাসন করেন বা ধর্মোপদেশ দেন তিনি হন অমৃতদাতা”। তাই বিহার দানের ফলে বল, রূপ, সুখ, চক্ষুকে দান করা হয় বলা হয়েছে। ভিক্ষান্নকারী কেউ দুই তিন গ্রাম ঘুরে এক চামচ পরিমাণ ভিক্ষাও না পেয়ে ফিরে এসে শীতল পানিতে স্নান করার পর বিহারে প্রবেশ করে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলে শরীরে কায়িক শক্তি সঞ্চয় হয় বলে বিহার দান করাকে কায়িক বল দান করার মত অনুরূপ বলা হয়েছে।
বিহারের বাইরে বিচরণ করে আসলে ধুলা-বালি মিশ্রিত বাতাস ও সূর্যতাপে মানুষের রূপ-বর্ণ মলিন হয়ে যায়। বিহারে এসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলে নিস্তেজ বিবর্ণ রূপ পরিবর্তন হয়ে রূপ সতেজ ও প্রসন্ন হয়ে আসে বলে বিহার দান করাকে রূপ দানের অনুরূপ বলা হয়েছে।
বিহারের বাইরে মুক্ত স্থানে বিচরণকারীর পায়ে কাঁটা, শামুক, বিষাক্ত পোকা-মাকড়, হিংস্র জীব জন্তুর আক্রমণ, কুয়াশা, প্রচন্ড ঝড়-বৃষ্টি, সূর্য্যোত্তাপ,দুঃসহ শীত-গ্রীষ্মের উপদ্রপ ও চোর-ডাকাত ইত্যাদির উপদ্রপ, অন্তরায় শত্র“ দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। কিন্তু বিহারে অবস্থান করলে সে উপদ্রপ, অন্তরায়, শত্র“ থেকে রক্ষা প্রাপ্ত হয়ে কায়িক সুখ লাভ করে এবং চিত্ত স্থির শান্তভাবে ধর্মচর্চা ও আচরণের মাধ্যমে প্রীতি-সুখ উৎপন্ন হয়ে সুখ লাভ করে। কর্মস্থান ভাবনা- অনুশীলনের মাধ্যমে অকুশল হীন সুখ প্রাপ্ত হওয়া ইত্যাদি গুণ লাভ করার কারণে বিহার দান করা সুখ দানের সাদৃশ্য দান বলা হয়েছে।
বাইরে উন্মুক্ত স্থানে বিচরণ করলে শরীর থেকে ঘাম বের হয়। চোখ কম্পিত করে রোদ্র স্থান থেকে বিহারে প্রবেশ করলে সাথে সাথে কিছু দেখতে না পেলেও একমুহুর্ত বসার পরে চক্ষু প্রসন্ন হয়ে আসার কারণে বিহার দান করা চক্ষু দানের সাদৃশ্য বলা হয়েছে।
বিহার দানের পুণ্যফলে দাতাগণ নিম্নোক্ত ফলসমূহ লাভ করে।
বিহার দানের ফলসমূহ (সূত্র এবং বিনয় মতে) সাত প্রকার--
১*দেব এবং মনুষ্যলোকে জন্মগ্রহণ করে।
২*ঘরবাড়ি প্রাসাদ অট্টালিকার অধিকারী হয়।
৩*ভয়ে কখনো লোম খাড়া হবেনা, শরীর কম্পিত হবে না, চেহারা বিভৎস হবেনা, ভীতগ্রস্থ হবে না।
৪*সিংহ, বাঘ প্রভৃতি হিংস্রপ্রাণী থেকে রক্ষা পায়। ভূত, প্রেত বিষধর সাপের বিষ, রাক্ষষ, দুষ্ট দেবতা থেকেও রক্ষা প্রাপ্ত হয়।
৫*দুঃস্বপ্ন হীন হয়ে সুখে নিদ্রা যান।
৬*বিক্ষিপ্তহীন চিত্তে দৃঢ়ভাবে স্মৃতিসহকারে ভাবনা কর্ম সুসম্পন্ন করতে পারে।
৭*অনাগত জন্মে অরহত্ব মার্গফল লাভ করতে সক্ষম হয়।
বিহার দানের ফলসমূহ (সব্ব সব সূত্র মতে) নয় প্রকার--
১*শীতকালে তীব্র শীত থেকে রক্ষা প্রাপ্ত হয়।
২* গ্রীষ্মকালে গরম থেকে রক্ষা প্রাপ্ত হয়।
৩*মশা, মাছি প্রভৃতি প্রাণীর উপদ্রব থেকে রক্ষা প্রাপ্ত হয়।
৪*গরম বাতাস থেকে নিজেকে প্রতিরোধ করতে পারে।
৫*সূর্যের খরতাপ থেকে রক্ষা পায় বা প্রতিরোধ করতে পারে।
৬* বিষধর সাপ প্রভৃতি বিষধর প্রাণী থেকে রক্ষা পায়।
৭*বিভিন্ন ঋতু অনুযায়ী উপদ্রব, অন্তরায় থেকে রক্ষা পায়।
৮*চিত্ত প্রসন্নতা করে সুখী হয়।
৯*সমথ-বিদর্শন ভাবনায় রমিত হয়।
বিনয় সেনাসকখন্ধক দেশনায় রাজগৃহের শ্রেষ্ঠী ৬০টি বিহার এবং অনাথপিন্ডিক শ্রেষ্ঠীর জেতবন বিহার দানের(পানি ঢালা) পুণ্য বিতরণের সময় ভগবান বুদ্ধ দেশনায় ১৭ প্রকার দানের ফলের কথা উল্লেখ করেছেন।
১*উভয় দিক থেকে তীব্র শীতে আক্রান্ত অবস্থায় নিজেকে রক্ষা করতে পারে।
২*দাবানল গরম থেকেও রক্ষা প্রাপ্ত হয়।
৩*সিংহ, বাঘ ইত্যাদি হিংস্র প্রাণীর উপদ্রব থেকে রক্ষা পায়।
৪*বিচ্ছিক-কর্কট প্রভৃতি বিষাক্ত প্রাণীর উপদ্রব থেকে রক্ষা পায়।
৫*মশা-মাছির উপদ্রব থেকে রক্ষা পায়।
৬*ঝড়-তুফান থেকে রক্ষা পায়।
৭*মুষলধারার বৃষ্টিকেও থামাতে পারে।
৮*গ্রীষ্মকালের ঘূর্ণিঝড় এবং সূর্যের খড়তাপ থেকে রক্ষা পায়।
৯*কুশল বা ভাল আলম্বনে রমিত থাকে।
১০*বিপদ অন্তরায় থেকে মুক্ত থেকে সুখ শান্তিতে অবস্থান করতে পারে।
১১*সমথ ভাবনার জ্ঞান প্রখর হয়।
১২*রুপ-নামের সংস্কার ধর্ম তথা অনিত্য, দুঃখ, অনাত্বকে বিদর্শন ভাবনার মাধ্যমে উপলব্ধি করতে পারে।
১৩*ভোজন আহারাদি এবং ঔষধ পানীয় প্রয়োজন অনুসারে লাভ করে।
১৪*চতুর প্রত্যয় লাভ করে।
১৫*রুপ-নাম এবং চতুরার্য সত্যকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারে।
১৬*শ্রবণকৃত দেশনার প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করে ধর্মজ্ঞান বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়।
১৭*আসবক্ষয় করে অরহত হয়ে নির্বাণ দর্শন করতে পারে।বিহার দানের বিখ্যাত ব্যক্তিগণ
অনাথ পিন্ডিক শ্রেষ্ঠী ৫৪কোটি স্বর্ণমুদ্রা ব্যয় করে জেতবন মহাবিহার নির্মাণ করে বুদ্ধকে দান করেছিলেন। বিহারের জায়গা ক্রয় করেন ১৮কোটি স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে, নির্মাণ ব্যয় হয় ১৮কোটি স্বর্ণমুদ্রা, বিহার উৎর্সগ অনুষ্ঠানে ব্যয় হয় ১৮কোটি স্বর্ণমুদ্রা। সর্বমোট ৫৪কোটি স্বর্ণমুদ্রা ব্যয় করে বিহার দান করেন।
মহাউপাসিকা বিশাখা ২৭কোটি স্বর্ণমুদ্রা ব্যয় করে পূর্বারাম বিহার নির্মাণ করে বুদ্ধকে দান করেছিলেন। বিহারের জায়গা ক্রয় করেন ৯কোটি স্বর্ণমুদ্রা, নির্মাণ ব্যয় করেন ৯কোটি স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে এবং বিহার উৎর্সগ অনুষ্ঠানে ব্যয় হয় ৯কোটি স্বর্ণমুদ্রা। সর্বমোট ২৭কোটি স্বর্ণমুদ্রা ব্যয় করে বিহার দান করেন।
শ্রী ধম্মাশোক রাজা নিগ্রোধ শ্রমণের দেশনা শ্রবণ করে শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা-বিশ্বাস স্থাপন করে অশোকারাম বিহার নির্মাণ করে সংঘ উদ্দেশ্যে দান করেছিলেন। ত্রিপিটকে ৮৪ হাজার ধর্মস্কন্ধ আছে তিনি জ্ঞাত হয়ে ধর্মকে পুজা করার জন্য ৮৪ হাজার চৈত্য, বিহার নির্মাণ করে দান করেছিলেন।
পরিশেষে, কেউ একটি বিহার বা কিয়ং দান করতে সক্ষম না হলেও কমপক্ষে দীর্ঘ-প্রস্থে পাচঁহাত বিহার বা পর্ণকুটীর নির্মাণ করে দান করলে আর্যশ্রাবক স্রোতাপন্নদের ন্যায় গতি নির্দ্দিষ্ট হবে অর্থাৎ চারি অপায়ের দ্বার রুদ্ধ হবে। তাই নির্বানকামী সকলের উচিত বিহার দানের ফলকে অনুধাবন করে বিহার নির্মাণ করা বা বিহার নির্মাণে সহযোগীতা করে নির্বাণের পথ প্রশস্ত করা।
🙏
মাইসছড়ি এিরত্ন বৌদ্ধ বিহারের সম্মানিত উপদেষ্টা চট্টগ্রামে বসবাসরত শ্রদ্ধেয় রিপন বড়ুয়া কেন্দ্রীয় মৈত্রী বৌদ্ধ বিহার, খাগড়াছড়ি সদর এর চলমান কাজে ১০০০০/= হাজার টাকা শ্রদ্ধাদান দিয়েছেন। আমরা তাহার শতবর্ষের কাছাকাছি মায়ের সুসাস্হ্য কামনা সহ পারিবারিক সুখ শান্তি কামনায় পুণ্য রাশি দান করছি।
তাহার আন্তরিক সহযোগীতায় বিহার পরিচালনা কমিটির পক্ষ হতে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।