06/12/2022
সময় নিয়ে পড়ুন-সঠিক নিয়মে শাস্ত্রচর্চা করুন।
একাদশী ব্রত কি বৈদিক প্রথা নাকি বৈষ্ণব প্রথা?
একাদশী পালন কি বাধ্যতামূলক?
একাদশী একটি চান্দ্র তিথি।প্রতি মাসে কৃষ্ণ ও শুক্ল পক্ষে দুবার একাদশী তিথি পর্যায়ক্রমে আসে। শ্রীচৈতন্যমহাপ্রভু লীলাবিলাসের সময় একাদশী উপবাসের ব্রত প্রবর্তন করেন।
সেদিক থেকে এটি একটি বৈষ্ণব প্রথা। এটা কোন বৈদিক প্রথা নয় যা সনাতনীদের বাধ্যতামূলক পালন করতে হবে। বেদ হচ্ছে সনাতনের মূল প্রামাণ্য গ্রন্থ। সনাতনীদের জীবনধারা বেদের নিয়মকানুন অনুসারে আবর্তিত হয়। বেদে কোথাও এই ধরণের ব্রতের কথা উল্লেখ নাই। গীতাতেও ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতাতে এই বিষয়ে কোন নির্দেশনা দিয়ে যান নি।
একাদশী ব্রত হল ২৪ টা আবার অধিমাস বা মলমাসে আরো ২টা বাড়তি একাদশী ব্রত পালন করা হয়।
বৈষ্ণবরা একাদশী ব্রতের রেফারেন্স হিসেবে পদ্মপুরাণ ও ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ ব্যবহার করেন যে দুইটা পুরাণই অসামঞ্জস্যপূর্ণ গালগল্পে ভরা এবং বিকৃত করা। সুতরাং এইসব বেদবহির্ভূত আচার অনুষ্ঠান দিয়ে সনাতনীদের জীবনকে বিভ্রান্তির পথে নিয়ে যাওয়ার কোন মানে হয় না।
বৈষ্ণবরা ভাগবত পুরাণ ও বিষ্ণুপুরাণকে বেশী মানে। এই দুইটা পুরাণেও একাদশী ব্রতের কথা উল্লেখ নাই। সুতরাং একাদশী ব্রতের পিছনে বৈষ্ণবরা যে যে গল্পগুলো ব্যাখ্যা করে তা মনগড়া ও অর্বাচীন ছাড়া আর কিছু নয়। স্বর্গ ও নরকের ভয় দেখিয়ে মানুষকে সঠিক জীবনপথ হতে সরিয়ে নিয়ে বিভ্রান্তির পথে টেনে নিয়ে যাওয়া ছাড়া এর আর কোন সার্থকতা নাই।
একাদশী ব্রতের নিয়ম হল -দশমীর দিন একাহার,একাদশীর দিন নিরাহার এবং দ্বাদশীর দিন একাহার। মাসে ছয় দিন এই ব্রত পালন করতে চলে যাবে। তাহলে মানুষ কাজ করবে কখন? শিল্প বিপ্লবের যুগে,কঠোর পরিশ্রমের যুগে অনাহারে বা অর্ধাহারে মানুষের শ্রম ক্ষমতা কমে যাবে আবার শ্রমঘন্টাও ব্যহত হবে যা বর্তমান মূল্যস্ফীতির যুগে অসংগতিপূর্ণই মনে হয়। তাও আবার বৈদিক নিয়ম বহির্ভূত নিয়ম।
পঞ্চরবিশস্য ( ধান,গম,ডাল,যব ও তেল) খাওয়া যাবে না। প্রসাধনী ব্যবহার করা যাবে না।ক্ষৌরকর্ম করা যাবে না।
বৈষ্ণবদের যুক্তি হল-প্রতি ১৫ দিন অন্তর অন্তর পঞ্চরবিশস্যে পাপ প্রবেশ করে। তাই ১৫ দিন অন্তর অন্তর পঞ্চরবিশস্য খাওয়া বন্ধ রাখতে হবে একাদশীর দিন।
কিন্তু বেদে এই ধরনের কথা তো উল্লেখ নাই বরং বলা হয়েছে অন্নের মত পবিত্র আর কিছু নাই। পবিত্র অন্ন গ্রহণ করে মানবকুল বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। এই বিষয়টা বেদের সাথে সাংঘর্ষিক। পুরাণের সাথে বেদের কোন বিষয় নিয়ে সাংঘর্ষিক মত সৃষ্টি হলে বেদের নীতিই গ্রহণীয়।
পেট একটি মেশিন সদৃশ তাকে বিশ্রাম দেওয়াই মূল উদ্দেশ্য। এর সঙ্গে এত গালগল্প যুক্ত করা মোটেও সমীচীন নয়।
বৈষ্ণবরা অন্ন বলতে পঞ্চ রবিশস্যকে বুঝান। কিন্তু বেদান্তে অন্ন বলতে চার প্রকার খাদ্যকে বুঝায়।
চার প্রকার অন্ন হচ্ছে-
১)চর্ব্য-যা চিবিয়ে খাওয়া হয়।
২) চোষ্য- যা চুষে খাওয়া হয়।
৩) লেহ্য- যা চেটে খাওয়া হয়।
৪) পেয়- যা পান করা হয়।
শ্রীমদভাগবতগীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ের ১৪ নং শ্লোকে চার প্রকার খাদ্যের বা অন্নের কথা বলা আছে।
অহং বৈশ্বানরো ভূত্বা প্রাণিনাং দেহমাশ্রিতমঃ।
প্রাণাপ্রাণসমাযুক্তঃ পচাম্যান্নং চতুর্বিধম।।
অর্থ্যাৎ আমিই প্রাণিগনের উদরে বৈশ্বানর বা অগ্নিরূপে স্থিত হয়ে প্রাণ ও আপন বায়ুর সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে চর্ব্য,চোষ্য,লেহ্য ও পেয় এ চতুর্বিধ অন্নকে পরিপাক করি।
সুতরাং চার প্রকার খাদ্যই যদি অন্ন হয় তবে কিছুই তো খাওয়া যাবে না।
একাদশীর অন্যতম উদ্দেশ্য হল সারাদিন ভগবানের গুনগান করা। আমরা জানি,ভগবানের নাম করতে হয় বা ভগবানের নামে ব্রত করতে হয় কামনা বাসনা শুন্য হয়ে। কিন্তু একাদশী মানে হল কামনা বাসনার আঁতুরঘর। একাদশীর নাম ও উদ্দেশ্যগুলো দেখলে বুঝা যায় একথা যথার্থ কিনা।
যেমন-ধনদা(ধন সম্পদ কামনায়), পুত্রদা(পুত্র সন্তান কামনায়), সফলা( সফলতা কামনায়), কামদা( কামনা লাভের উদ্দেশ্যে)। এভাবে প্রত্যেকটা একাদশীর পেছনে এই ধরনের আসক্তি বর্তমান। সুতরাং কোন কামনা বাসনা নিয়ে বা স্বার্থ নিয়ে ভগবানের সেবা করা যায় না। এটা কোন সাত্ত্বিক ধর্ম নিয়ম হতে পারে না।
মাসে ৬ দিন যদি অর্ধাহারে বা অনাহারে থাকতে হয় তাহলে খেটে খাওয়া মানুষ কাজ করবে কি করে? তারা না খেয়ে একাদশীর উপবাস থেকে স্বর্গের খোঁজ করবে নাকি খেয়ে দেয়ে সংসারের কাজ করবে। যে নিয়ম বর্তমানের শ্রমবিভাগের সাথে সাংঘর্ষিক তা কোন সনাতনী সর্বজনীন নিয়ম হতে পারে না।
পেটভরে খেয়ে একাদশী করার চেয়ে না করাই ভাল। তাতে একাদশীর মূল উদ্দেশ্যই ব্যহত হয়ে যায়।
একাদশী ব্রত নিয়ে এর পিছনে যে গল্পগুলো রসভরে এবং পাপপূণ্যের বা নরকের শাস্তির অর্বাচিন গল্প বলা হয় তা না বলে বাস্তবভাবে বলাই উচিত। আর একাদশীর সাথে মোটেই স্বর্গ নরকের কোন সম্পর্ক নেই। পাপ বা পূণ্যের সম্পর্ক নাই।পাপ নাশ হবে আপনার মনকে সৎচিন্তায় নিমগ্ন করলে,সৎকর্ম করলে,সত্যের পথে চললে, মা বাবার সেবা করলে,জীবসেবা করলে, মানুষের প্রকৃত উপকার করলে, মানবতার কাজ করলে।
বৈষ্ণবরা বলেন, একাদশী করলে সব পাপ ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাবে। তাহলে সেটা পাপীদের উৎসাহিত করে। পাপ করব আর একাদশী করে নিব পাপীরা এটাই ভাববে। একবার একাদশী করলে যদি সব পাপ ধুয়ে যায় তাহলে বৈষ্ণবদের এত একাদশী করার দরকার কি? তাদের ব্রতের উপর কি বিশ্বাস নাই?মানুষকে সঠিক ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত। কর্ম ছেড়ে সারাদিন মালা জপলে যেমন ধর্ম হবে না, সংসার চলবে না তেমনি ধর্মীয় অনুশীলন যেমন ধ্যান ও প্রার্থনা সময়মত করতে হবে।
আসুন যুগধর্ম অনুসরণ করি। সঠিক সনাতনী নিয়ম কানুন পালন করি। দীক্ষা,প্রার্থনা,জপ,ধ্যান,ধর্মানুশীলন,জ্ঞান,সেবা, বিনয়,কর্ম এবং সহানুভূতি দিয়ে জীবন গড়ি। সঠিক সনাতনী পথ অনুসরন করি। জয় সনাতন।।