05/08/2026
শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর এবং তাঁর অন্যতম পরম ভক্ত ও সেবক অশ্বিনী গোসাইকে (অশ্বিনী কুমার) ঘিরে মতুয়া ধর্মে একাধিক অলৌকিক ও ভাবগম্ভীর উপখ্যান প্রচলিত আছে। তার মধ্যে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও হৃদয়স্পর্শী উপখ্যান নিচে দেওয়া হলো:
শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর ও অশ্বিনী গোসাইয়ের উপখ্যান: "ভক্তির পরীক্ষা ও কৃপা"
একদা শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর ওড়াকান্দিতে ভক্তদের নিয়ে হরিনাম সংকীর্তনে মগ্ন ছিলেন। তাঁর চার পাশে শত শত ভক্ত প্রেমানন্দে ভাসছিলেন। সেই ভক্তদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন অশ্বিনী গোসাই। অশ্বিনী গোসাইয়ের হৃদয় হরিচাঁদ ঠাকুরের প্রতি অপার নিষ্ঠা ও ভক্তিতে পূর্ণ ছিল। তিনি সব সময় ঠাকুরের নাম জপ করতেন এবং ভক্তদের মাঝে নামসুধা পরিবেশন করতেন।
একদিন হরিচাঁদ ঠাকুর অশ্বিনী গোসাইয়ের ভক্তির গভীরতা জগৎবাসীকে বোঝানোর জন্য এবং তাঁর মনের অহংকার সম্পূর্ণ নির্মূল করার জন্য এক লীলা রচলেন।
ঠাকুর অশ্বিনী গোসাইকে ডেকে বললেন—
"অশ্বিনী, তুমি তো অহোরহ নাম প্রচার করছ, কিন্তু তোমার মনে কি কোনো কামনা বা সিদ্ধির বাসনা লুকিয়ে আছে? যদি সত্যি নিষ্কাম ভক্তি থেকে থাকে, তবে আজ আমার এক কঠিন আদেশ তোমাকে পালন করতে হবে।"
অশ্বিনী গোসাই বিনীতভাবে হাত জোড় করে বললেন—
"প্রভু, আপনার আদেশই আমার জীবন। আপনি যা বলবেন, আমি তা-ই করব।"
ঠাকুর তখন তাঁকে নির্দেশ দিলেন এক ঘোর অন্ধকার রাতে দূরবর্তী এক জলাশয়ের পাড়ে গিয়ে একা একা হরিনাম করতে এবং সারারাত সেখানে কোনো প্রদীপ বা আলো ছাড়া অবস্থান করতে। সেখানে লোকমুখে রটেছিল এক ভয়াল প্রেতাত্মা ও হিংস্র পশুর ভয় রয়েছে।
অনেকে অশ্বিনী গোসাইকে বারণ করেছিলেন। কিন্তু অশ্বিনী গোসাইয়ের মনে কোনো ভয়ের লেশমাত্র ছিল না। তিনি জানতেন, যাঁর হৃদয়ে হরিচাঁদ ঠাকুর রয়েছেন, তাঁর আবার ভয় কিসের?
তিনি নির্ধারিত স্থানে গিয়ে পদ্মাসনে বসে একমনে বলতে লাগলেন—
“হরি বল, হরি বল, হরিচাঁদ নাম।
যার নামে মুছে যায় সর্ব পাপ-ধাম॥”
রাতের গভীরতা যত বাড়ল, চারপাশের আবহাওয়া তত ভয়াল হতে লাগল। বিকট শব্দ ও ঝড়ের তাণ্ডবে চারপাশ কেঁপে উঠল। কিন্তু অশ্বিনী গোসাই চোখ বন্ধ করে কেবল হরিচাঁদ ঠাকুরের রূপ হৃদয়ে ধ্যান করতে লাগলেন।
রাতের শেষ প্রহরে স্বয়ং হরিচাঁদ ঠাকুর এক বৃদ্ধ পথিকের বেশে সেখানে উপস্থিত হলেন। তিনি অশ্বিনী গোসাইকে পরীক্ষা করার জন্য বললেন—
"হে সাধু, কেন এই জনমানবহীন ভয়ের জায়গায় বসে এক সাধারণ মানুষের নাম জপ করছ? এতে তোমার কী লাভ হবে?"
অশ্বিনী গোসাই চোখ খুলে মৃদু হেসে বললেন—
"প্রভু হরিচাঁদ কোনো সাধারণ মানুষ নন, তিনি সাক্ষাৎ জগৎপতি। তাঁর নামের চেয়ে বড় সিদ্ধি বা লাভ এই সংসারে আর কিছুই হতে পারে না। যদি আমার প্রাণও যায়, তবুও আমি এই নাম ছাড়ব না।"
অশ্বিনী গোসাইয়ের এই নিষ্কাম ও অটল ভক্তি দেখে হরিচাঁদ ঠাকুর তাঁর ছদ্মবেশ ত্যাগ করে নিজ দিব্য রূপ ধারণ করলেন। চারপাশ এক অপূর্ব জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।
ঠাকুর পরম স্নেহে অশ্বিনী গোসাইকে বুকে টেনে নিয়ে বললেন—
"অশ্বিনী, তোমার ভক্তিতে আমি পরম সন্তুষ্ট। জগতে নাম-প্রচারের প্রকৃত অধিকারী তুমিই। তোমার এই ভক্তি যুগ যুগ ধরে মানুষকে পথ দেখাবে।"
অশ্বিনী গোসাই ঠাকুরের চরণে লুটিয়ে পড়লেন এবং অশ্রুসিক্ত নয়নে ঠাকুরের জয়ধ্বনি করতে লাগলেন।
উপখ্যানের শিক্ষা:
এই উপখ্যানের মাধ্যমে মতুয়া দর্শনের মূল শিক্ষা প্রকাশ পায়— ঈশ্বরলাভের জন্য বাহ্যিক আড়ম্বর বা ভয়ের কোনো স্থান নেই; প্রয়োজন কেবল নিষ্কাম ও অটল ভক্তি।