14/04/2026
|| চড়ক ||
এই গোটা চৈত্র মাস ধরে বিভিন্ন যে উপাচার চললো আমাদের সংস্কৃতিতে , সেসবের একদম শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। হাতে আছে একটি দিন, আগামীকাল নববর্ষ। এখন যেকোনো বাংলা মাসের সংক্রান্তি বা শেষ দিনটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ হয়। চৈত্রের ক্ষেত্রে বিষয়টা আরো বেশি গুরুত্ব বহন করে। এই একমাস ধরে চলা সেই বারুণীর সময় থেকে আজ চৈত্র সংক্রান্তি - এই গোটা মাসের সাধনা শেষ হবে চড়ক পূজায় এসে।
আজকের কথা শুরুর আগে বলে রাখি আজকে আলোচনা বহু ভয়াবহ দিক দেখাবে। তাই যারা দুর্বল চিত্তের অথবা ধর্মীয় আচার সম্বন্ধে যাদের অনেক বিরোধিতা, এ বিষয় আপনাদের মনোগ্রাহী হবেনা। ব্যস! সিগারেটের ক্ষতি সম্পর্কে ডিসক্লেইমার দেওয়া হয়ে গেল, এবার কেউ সেবন করলে তার নিজ দায়িত্ব।
প্রথমে বলবো এই "চড়ক" নামটা কি বা কেন? বহু ব্যাখ্যা আছে। এই যে আমাদের জীবন "চক্রবৎ", আমাদের বছরের মাসগুলি চক্রাকারে পরিবর্তন হয়ে আসে, এইভাবেই তো চৈত্র চলে আসে। এই "চক্রাকার আবর্তন" থেকে মনে করা হয় "চড়ক" নামটা এসেছে। আবার আরেকটা মত বলে চণ্ডার্ক (চণ্ড+অর্ক) অর্থাৎ শিব+সূর্য -এর থেকে অপভ্রংশ হয়ে চড়ক-এ দাঁড়িয়েছে শব্দটা। যদিও পূর্বের মতামতটা বেশি গ্রহণযোগ্য।
এখন গাজন জিনিসটাই হয়েছে আসন্ন সময়ে ফসলের ভালো উৎপাদনের কথা মাথায় রেখে ভগবানের উদ্দেশ্যে কৃচ্ছসাধন। কৃষিপ্রধান বাংলায় এ বিষয়টা হওয়া খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু ধর্ম ঠাকুরের গাজন, মনসার গাজনের প্রধান হওয়ার পরিবর্তে শিবের গাজন বেশি প্রধান হয়ে গেছে আস্তে আস্তে। কেনই হবেনা? বাংলার শিব নিজেই কৃষিকাজের সাথে যুক্ত। নিজের অভাব মেটাতে লাঙল ধরেছেন তা তো শিবায়নে আছেই। বাংলায় বুড়োশিব কৃষিপ্রধান দেবতা।
এই সমগ্র গাজনের শেষ ধাপ চড়ক। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল এতে বান ফোঁড়া, চড়ক গাছে পিঠে হুক গেঁথে ঘোরা, চামড়ায় শলাকা গাঁথা এগুলো থাকে।
অধিকাংশ যে লেখা পাবেন, তাতে খুব মিষ্টি করে বানরাজার একটা গল্প ঢোকানো আছে। পুরোটাই লৌকিক, পুরাণগত রেফারেন্স পাওয়া যাবেনা। শ্রীকৃষ্ণের বানাসুর বধকে বানরাজার সাথে যুদ্ধ আর শেষে আহত বানরাজার শিবকে তুষ্ট করার গল্প - এইটা প্রায় "মুখস্থের" মতো গড়গড়িয়ে লিখে যাবে। ঐ লৌকিক গল্পটায় আছে বানরাজার মেয়ে ঊষার সাথে শ্রীকৃষ্ণের পৌত্র অনিরুদ্ধের প্রণয় সম্পর্ক হলে বানরাজা বাধা দিতে আসবে ( মানে ৯০ দশকের বাংলা সিনেমার মেয়ের বাবার মত, তুমি আমার মেয়ের জীবন থেকে ছেড়ে যেতে কত টাকা নেবে? এরকম ধরনের, যদিও তা নয়) । ফিল্ডে আসবেন শ্রীকৃষ্ণ, আর তিনি বানরাজার দুই হাত কেটে দেবেন।
এবার বানরাজার সম্পর্কিত অন্য যে লোককথা টি আছে, সেটি বেশি গ্রহণযোগ্য কারণ এতে গাজন বা চড়কের ধাপগুলির পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা আছে। এতে বাণরাজা মহাদেবকে তুষ্ট করতে কখনো গাছের তলায় আগুন জ্বেলে গাছের ডাল থেকে উল্টো ঝুলে পড়েন। এটা কিন্তু ঝুল-ঝাঁপের সমান। আবার একবার পাহাড় থেকে কাঁটাবনের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েন যেটা কাঁটা-ঝাঁপের সমতূল্য। কিন্তু মহেশ্বরের আশীর্বাদে রক্ষা পান। আবার একবার ধারালো অস্ত্রের ওপর ঝাঁপ দেবেন, সেবারও মহেশ্বরের দয়ায় তিনি রক্ষা পাবেন। (বঁটি ঝাঁপ) আর শেষে গায়ে শলাকা গেঁথে গাছের ডাল থেকে ঝুলে পড়া (চড়ক গাছের ঝুলা) এইবার মহাদেব তার সামনে আসবেন, বাণরাজার ইচ্ছামত কথা দেবেন যে বা যারা এই কৃচ্ছসাধন করবেন, তাদের প্রতি মহেশ্বর প্রীত হয়ে কৃপা করবেন। এখন যদি মানুষটার দু হাত শ্রীকৃষ্ণ ছেদন করতেন, এসব করতে পারতেন কি? তাই প্রথমের লোককথা টি একটুও গ্রাহ্য নয়।
যদিও এসম্পর্কে যা কিছু কাহিনি আছে, সবই লোককথা। পুরাণ রেফারেন্স সেরকম নেই। তবে গ্রামবাংলায় লোককথার জোর অনেক বেশি।
চড়কের নিয়মমতো প্রথমে চড়কগাছ স্থাপন করা হয়। এই গাছ বলতে নিম বা শাল কাঠের গুঁড়ি, যা প্রতিবার চড়কের পর জলাশয়ে নিমজ্জিত থাকে। এতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা থাকে যার জন্য অনেকে মনে করে জলাশয়ে এই কাঠ জীবন্ত থাকে। চড়কের আগের দিন মন্ত্র সহকারে এই কাঠের জাগরণ করানো হবে। গ্রামের নির্দিষ্ট জায়গায় মাটি খনন করে তা পোঁতা হবে। এই গুঁড়ি বা কাঠটিকে বলে "ভোক/ভক লিঙ্গ" । হ্যাঁ লিঙ্গ, কারণ এটিকে শিবের মতোই লিঙ্গ রূপে ধরা হয়। আর মাটিতে বসানো হচ্ছে, এখানে মাটি হল "মা" স্বয়ং। অর্থাৎ শিব ও শক্তির মিলন, যার উপরেই সৃষ্টি নির্ভর। শ্রাবণ মাসেও এই ধারণা অনেকটা পোষণ করা হয়। আর এই গাজন-চরকের সময় পূজিত ঠাকুর অনেকক্ষেত্রে দেখবেন "অর্ধনারীশ্বর"। আবার শিব-শক্তির মিলন। ইহা ছাড়া সৃষ্টি অসম্ভব। তাই গরম কেটে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত এসে ফসল উৎপাদনের যাতে সহায়ক হয় ,সেই কথা মাথায় রেখে এই গাজন ও চড়ক পালন।
এক্ষেত্রে বলে রাখি গাজনের যারা প্রধান সন্ন্যাসী, তারা কেউই উচ্চস্তরের ব্রাহ্মণ নয়। সমাজের নিম্নস্তরের মানুষেরা একান্ত নিজের যোগ্যতায় সন্ন্যাসী হন, অন্যদের গাজন পালনের সহায়ক হন। বাবার এই যে সমাজের উচ্চস্তর থেকে নিম্নস্তর- সমস্ত স্তরের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা এটাই বাবাকে সব দেবতার থেকে আলাদা করে। যেমন কৈলাসে উনি দেবতা ও অসুর - উভয়ের কাছেই পিতৃসম।
এখন ভয়াবহ জিনিসগুলো কি? আপনি দেখতে পাবেন বড় বড় দা দিয়ে জিভের ওপর চালিয়ে দিলেও জিভ কাটছেনা, কাঁটা ঝাড়ে ঝাঁপ দিচ্ছে , জিভে শলাকা গেঁথে দিচ্ছে, পিঠে হুক গেঁথে চড়ক গাছে বনবন করে ঘুরছে, কয়েকজন বলছে কিছুই কষ্ট হচ্ছেনা। আমি আজ পর্যন্ত এর কোনো ব্যাখ্যা পাইনি!
চড়কগাছে হুক গাঁথা অবস্থায় বনবন করে ঘোরা দেখলে মনে হবে গাছের চারদিকে পাখি ঘুরছে। ঐ অবস্থায় ওরা বাতাসা ছুঁড়বে, হাতে পায়রা রেখে তাকে ছেদন করবে । যদিও শেষটি এখন আর তেমন দেখা যায়না, অত্যন্ত ভয়াবহ। কিন্তু আমার দেখা বহু আগে এগুলি ছিল।
এর পাশাপাশি হবে সঙ সাজা, পালাগান। ব্রিটিশ আমলে মাঝে একবার এই চড়ক প্রথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল কারণ বহু মানুষের তখন ক্ষত থেকে মৃত্যু হত। কিন্তু পরে আবার চালু হয়, তবে আজকের দিনে একদম গ্রামাঞ্চল ছাড়া এ জিনিস দেখা যাবেনা।
পাটস্নান থেকে চড়ক এই সমগ্র বিষয়টি গোটা চৈত্র মাসকে আলাদা করেছে অন্য মাস গুলির থেকে। আরাধ্যের জন্য ঠিক কতটা এগোনো যায় এসব না দেখলে বিশ্বাস হয়না। আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে। এখন অনেকেই বলবেন এসব না থাকাই ভালো। কিন্তু লৌকিক আচার হারিয়ে যেতে দিতে নেই, এগুলো নৃশংস অবশ্যই, কিন্তু এগুলো আদিম। বাংলার নিজস্ব সম্পত্তি। এসবের বাইরেও চড়ক হোক বা গাজন - সবটাই আগামীতে যাতে ফসল উৎকৃষ্ট হয়, যাতে তেনাদের উপদ্রবে ক্ষতি না হয় সেই কথা ভেবেই উৎসব করা।
আমার বাবা-মা ছাড়া এ সংসার অচল, দুজনের এক হওয়াতেই জগতের কল্যাণ...
হর হর মহাদেব! জয় মা! আপনাদের কল্যাণ হোক। সকলে ভালো থাকুক।