ইসলামী জীবন-ধারা

ইসলামী জীবন-ধারা Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from ইসলামী জীবন-ধারা, Religious Center, Kalaroa.

সৌদি আরবের সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের প্রাক্তন সদস্য এবং প্রধান বিচারপতি শাইখ সালিহ আল লুহাইদান রহিমাহুল্লাহ গণতন্ত্র, বর্তম...
30/01/2026

সৌদি আরবের সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের প্রাক্তন সদস্য এবং প্রধান বিচারপতি শাইখ সালিহ আল লুহাইদান রহিমাহুল্লাহ গণতন্ত্র, বর্তমানের কতিপয় ইসলামি রাষ্ট্র (যেখানে গণতন্ত্র প্রচলিত আছে) যেমন: আলজেরিয়া, লিবিয়া ইত্যাদিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচন এবং উক্ত নির্বাচনসমূহে ভোটদান সম্পর্কে আলোচনা করেছেন । এ বিষয়ে উনার মোট ৫ টি ফাতাওয়া আছে, যার মধ্যে ৪ টি ইসলামি রাষ্ট্রের ব্যাপারে আর অবশিষ্ট টি দারুল কুফরে অবস্থানরত সংখ্যালঘু মুসলিম কমিউনিটির ব্যাপারে । নিচে এগুলো ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করা হলো:

১.

উপস্থাপক: প্রশ্নকারী বলছেন: আসসালামু আলাইকুম, সম্মানিত পিতা! গণতন্ত্র কি কুফর? রাজনৈতিক দল গঠন করা ও এরূপ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা কি জায়েয? আর একজন সালাফি কি নির্বাচনে তার ভোট দিতে পারবে?

শাইখের উত্তর: প্রথমে আমাদেরকে বুঝতে হবে, গণতন্ত্রের অর্থ কী। গণতন্ত্র মানে যদি বুঝায় যে - সবকিছু জনগণের হাতে ন্যস্ত করা, এবং জনগণ এর যা ইচ্ছা সেটাকেই আইন হিসেবে নির্ধারণ করবে, যাতে মানুষ সেই অনুযায়ী শাসন পরিচালনা করতে পারে - তাহলে আমি বলবো: নিঃসন্দেহে এটি ইসলামের মধ্যে গ্রহণযোগ্য নয়। মুসলিম রাষ্ট্রে হুকুম প্রণয়নের অধিকার একমাত্র আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবী ﷺ–এর সুন্নাহর জন্য নির্দিষ্ট। অর্থাৎ, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ–এর কথার ভিত্তিতেই শাসন চলবে।

কিন্তু বর্তমানের জটিল পরিস্থিতিতে যদি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় , তাহলে যদি সম্ভব হয় এমন ব্যক্তিকে নির্বাচিত করা উচিত, যে দ্বীন ও দুনিয়ার দিক থেকে দেশের জন্য বেশি উপকারী। অতএব, এরূপ অবস্থায় ভোট দেওয়া জরুরি হয়ে যায়।

আর যদি কাউকে নির্বাচিত করার মাধ্যমে অধিকতর খারাপ অবস্থাকে কমিয়ে আনা যায়, তাহলে একজন মুসলিম ব্যক্তি তার কাজ ও অবস্থান এমনভাবে নির্ধারণ করবে, যাতে সাধ্য অনুযায়ী হককে সম্মানিত করা যায় এবং বাতিলকে কমানো যায়। এটাই মূল কথা।আমরা আল্লাহ তা‘আলার কাছে কায়মনোবাক্যে চাই-তিনি যেন আমাদের সকল বিষয়ে পরিণাম উত্তম করে দেন।

২.

প্রশ্নকারী বলছেন: নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও ভোট দেওয়ার হুকুম কী?

শাইখের উত্তর: নিঃসন্দেহে নির্বাচনের পদ্ধতিটাই এক ধরনের অনিষ্টকর পদ্ধতি; কেননা এতে অনেক সময় এমন লোকের ওপর নির্ভর করা হয়, যাদের ওপর শরীয়তসম্মতভাবে কোনো বিষয়ে নির্ভর করা ঠিক নয়। কোনো প্রার্থী বেশি ভোট পেলে বলা হয়—এই ব্যক্তি ভোট ও নির্বাচনের মাধ্যমে জয়ী হয়েছে। কিন্তু এরপর তারা এমন সব বিষয়ে লিপ্ত হয়, যেগুলোর শরীয়তে কোনো ভিত্তি নেই এবং তারা এসবের ব্যাপারে সচেতনও থাকে না।যদি কোনো ব্যক্তি জানে যে - সে কাউকে মনোনীত করলে বা সমর্থন করলে এবং তার প্রার্থী জয়ী হলে অনিষ্ট সংঘটিত হবে, সেক্ষেত্রে উক্ত ব্যক্তির উচিত এমন পথ অবলম্বন করা যা অনিষ্ট কমায় এবং কল্যাণকে বৃদ্ধি করে। আর হ্যাঁ, মূলনীতি হলো—মন্দকে যতটা সম্ভব কমানো এবং ভালোকে যতটা সম্ভব বাড়ানো।

৩.

প্রশ্নকারী: আল্লাহ আপনাকে বরকত দান করুন, হে শাইখ! আমাদের আলজেরিয়ায় বর্তমানে সংসদীয় নির্বাচন চলছে।শরিয়তের দৃষ্টিতে এগুলো পশ্চিমা ব্যবস্থা, যার সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই—এর হুকুম তো সকলেরই জানা।

শাইখ: হ্যাঁ, জানা আছে। তাহলে সমস্যাটা কী?

প্রশ্নকারী: এখন কিছু দল আছে যারা শাসক দলের বিরোধী এবং তারা ক্ষমতায় আসতে চায়। আমরা যদি ভোট না দিই, তাহলে এমন একটি দল ক্ষমতায় আসতে পারে, যে দল সালাফি দাওয়াতের ক্ষতি করবে। এই অবস্থায় কি আমরা বর্তমান প্রেসিডেন্টের দলের পক্ষে ভোট দিতে পারি?

শাইখ: শোনো, যে দলটি জিতলে তোমাদের ক্ষতি হবে বলে আশঙ্কা করছো সেই দলের বিরুদ্ধে ভোট দাও।

প্রশ্নকারী:প্রেসিডেন্টের দল ইনশাআল্লাহ ভালো।
শাইখ: যদি তা-ই হয়, তাহলে দেখো—সবচেয়ে ভালো দল কোনটি, তার পক্ষেই ভোট দাও।

প্রশ্নকারী: অর্থাৎ প্রেসিডেন্টের দলই ইনশাআল্লাহ?
শাইখ: আল্লাহর কসম! আমি জানি না।তোমরা বিষয়টি বিবেচনা করো, যে দলটি সবচেয়ে ভালো, তার পক্ষেই ভোট দাও। ব্যস ।

৪.

প্রশ্নকারী: শায়খ সালেহ ! আপনি কি ফোনকলে আছেন, শায়খ?
শাইখ: জি,

প্রশ্নকারী: শায়খ সালেহ।
শাইখ: জি , বলছি

প্রশ্নকারী: শায়খ। আমি লিবিয়া থেকে বলছি, শায়খ।
শাইখ: ঠিক আছে, বলুন । আপনার কী প্রশ্ন?

প্রশ্নকারী: শায়খ, আমাদের দেশে সামনে যে নির্বাচন আসছে, সে বিষয়েই আমার প্রশ্ন। এই নির্বাচন, শায়খ—আপনি জানেন—আমাদের এতে কোনো পছন্দই নেই; বরং এটি আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই এটি অনিবার্যভাবেই অনুষ্ঠিত হবেই। আর শায়খ, প্রায় এক মাস পর একটি জাতীয় পরিষদের নির্বাচন হবে, যেখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ২০০ জন নির্বাচিত হবেন। এই ২০০ জন এমন ক্ষমতা পাবে যা—

শাইখ: দেখুন ভাই, আপনারা যাকে দেশের জন্য দ্বীন ও দুনিয়ার দিক থেকে সবচেয়ে উপযোগী মনে করেন—তাকেই নির্বাচিত করুন। জি,নির্বাচনে অংশ নিন।

প্রশ্নকারী: কিন্তু শায়খ, আমাদের এখানে কিছু তালিবুল ইলম আছেন—তারা আমাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন। তারা বলেন, “ভোট দিও না।”

শাইখ: আমি বলছি—আমার কথা শুনুন।
যদি ভোট দিতে যান, তাহলে সেই ব্যক্তিকে দেখুন যাকে আপনি জানেন, অন্যরাও জানে—যে ব্যক্তি দেশের জন্য দ্বীন ও দুনিয়ার দিক থেকে সবচেয়ে উপকারী।
যদি সে প্রার্থী হয়, তাকে ভোট দিন।

প্রশ্নকারী: ঠিক আছে শাইখ, আমাদের এখানে কিছু সেক্যুলার (ধর্মনিরপেক্ষ) লোকও আছে। আমরা সেক্যুলারদের ব্যাপারে মানুষকে সতর্ক করি, শায়খ।আমার কাছে জনসাধারণকে বোঝানোর মতো খুব কথা নেই।

শাইখ: কিন্তু আমি এটুকু বলি—যে ব্যক্তি দেশের জন্য দ্বীন ও দুনিয়ার দিক থেকে সবচেয়ে উপকারী, সে কখনোই সেক্যুলার হতে পারে না। সে কখনোই দ্বীন ও দুনিয়ায় উপকারী হতে পারে না যদি সে সেক্যুলার হয়—কখনোই না।

প্রশ্নকারী: কিন্তু কিছু যুবক ও তালিবুল ইলম বলেন, “সেক্যুলারদের ব্যাপারে সতর্ক করো না, কারণ এতে তোমরা ইখওয়ানদের (মুসলিম ব্রাদারহুড) উত্থান ঘটাবে, আর তারা ক্ষমতায় চলে আসবে।

শাইখ: এ বিষয়ে-আল্লাহর কসম-আমার কাছে কোনো উত্তর নেই। আপনারা লিবিয়ার মানুষ, আপনারাই লিবিয়াকে সবচেয়ে ভালো জানেন। আপনারা কেবল তাকেই নির্বাচিত করুন যাকে আপনারা নিশ্চিতভাবে জানেন—সে দেশের জন্য দ্বীন ও দুনিয়ার দিক থেকে সবচেয়ে উপকারী।এটাকে একটি মূলনীতি বানিয়ে নিন—হ্যাঁ।

প্রশ্নকারী: শাইখ, তাহলে এতে কোনো সমস্যা নেই—আমরা যাকে উপকারী মনে করি তাকে ভোট দেব?
শাইখ: যাকে আপনারা মনে করেন দেশের জন্য দ্বীন ও দুনিয়ার দিক থেকে সবচেয়ে উপকারী তাকেই নির্বাচিত করুন।

প্রশ্নকারী: শাইখ, যারা নির্বাচনে বিশ্বাসই করে না এবং মানুষকে অংশগ্রহণের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করে—তাদের ব্যাপারে আপনার নির্দেশনা কী?

শাইখ: আমি বলি—যে ভোট দেয় না, সে তার নিজের ব্যাপারে স্বাধীন। কিন্তু যদি কেউ ভোট দেয় এবং তার মাধ্যমে দেশের উপকার হয়—তাহলে সেটাই সঠিক।

প্রশ্নকারী: জি, শাইখ।আল্লাহ আপনাকে বরকত দিন। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন। আমাদের জন্য দোয়া করবেন শাইখ যেন আমরা সফল হই।

শাইখ: আল্লাহ তাওফিক দিন সেই কাজে, যা তিনি ভালোবাসেন ও পছন্দ করেন।আল্লাহ আপনাকে বরকত দিন। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।

©

প্রশ্ন: গণতন্ত্রে অংশগ্রহণ, পার্লামেন্টে বা গণতান্ত্রিক সরকারের অন্য কোনো স্তরে নেতৃত্বমূলক ভূমিকা পালন করার বিধান কী? গ...
29/01/2026

প্রশ্ন: গণতন্ত্রে অংশগ্রহণ, পার্লামেন্টে বা গণতান্ত্রিক সরকারের অন্য কোনো স্তরে নেতৃত্বমূলক ভূমিকা পালন করার বিধান কী? গণতন্ত্রে কাউকে ভোট দেওয়ার বিধানই বা কী? প্রাচীনকালে ইসলামি রাষ্ট্র কীভাবে সংগঠিত ও পরিচালিত হতো?

​উত্তর: ​সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, এবং দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসুলের ওপর:
​প্রথমত: গণতন্ত্র একটি মানবসৃষ্ট ব্যবস্থা, যার অর্থ হলো জনগণের দ্বারা জনগণের শাসন। সুতরাং এটি ইসলামের পরিপন্থী, কারণ শাসনের অধিকার একমাত্র আল্লাহর, যিনি সর্বোচ্চ ও সর্বশক্তিমান। কোনো মানুষের জন্য আইন প্রণয়নের (Legislative) অধিকার দেওয়া বৈধ নয়, তিনি যেই হোন না কেন।

​'মাওসুয়াত আল-আদিয়ান ওয়াল-মাযাহিব আল-মুয়াসিরাহ' (২/১০৬৬, ১০৬৭)-এ বলা হয়েছে:
নিঃসন্দেহে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আনুগত্য, অনুসরণ বা আইন প্রণয়নের দিক থেকে আধুনিক শিরকের একটি রূপ; যেহেতু এটি স্রষ্টার সার্বভৌমত্ব এবং আইন জারি করার তাঁর নিরঙ্কুশ অধিকারকে অস্বীকার করে এবং সেই অধিকার মানুষের ওপর অর্পণ করে। আল্লাহ বলেন (অর্থের অনুবাদ):

​“তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে কেবল এমন কতগুলো নামের ইবাদত করছ, যা তোমরা ও তোমাদের পূর্বপুরুষেরা রেখেছ, যার কোনো প্রমাণ আল্লাহ অবতীর্ণ করেননি। বিধান দেওয়ার অধিকার কেবল আল্লাহরই। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না; এটাই সঠিক ধর্ম, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।” [ইউসুফ ১২:৪০]

​“ফয়সালা কেবল আল্লাহরই।” [আল-আনআম ৬:৫৭]

​দ্বিতীয়ত: যে ব্যক্তি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রকৃত প্রকৃতি ও এর বিধান বোঝেন, এরপরও তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হন বা অন্য কাউকে মনোনীত করেন—তিনি এই ব্যবস্থাকে অনুমোদন দিচ্ছেন এবং এর সাথে কাজ করছেন। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক, কারণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ইসলামের পরিপন্থী। একে অনুমোদন দেওয়া এবং এতে অংশগ্রহণ করা এমন কাজ যা কুফরি বা ইসলাম থেকে বিচ্যুত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

​তবে যারা এই ব্যবস্থায় নিজেকে বা অন্যকে মনোনীত করেন এই উদ্দেশ্যে যে, পার্লামেন্টে যোগ দিয়ে তারা সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করবেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ (Hujjah) প্রতিষ্ঠা করবেন এবং সাধ্যমতো মন্দ ও ফাসাদ কমিয়ে আনবেন—যাতে দুর্নীতিবাজ ও কাফিররা দেশে বিশৃঙ্খলা ছড়ানোর এবং মানুষের দুনিয়াবি ও ধর্মীয় স্বার্থ নষ্ট করার অবাধ সুযোগ না পায়—তবে এটি একটি ইজতিহাদি বিষয় (গবেষণার অবকাশ রাখে), যা এর মাধ্যমে অর্জিত হতে যাওয়া সম্ভাব্য কল্যাণের ওপর নির্ভরশীল।

​এমনকি কোনো কোনো আলেম মনে করেন এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা ওয়াজিব বা আবশ্যিক।

​শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে উসাইমীন (রহ.)-কে নির্বাচনের বিধান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন: “আমি মনে করি নির্বাচন ওয়াজিব; আমাদের উচিত যাকে আমরা ভালো মনে করি তাকে নিয়োগ দেওয়া। কারণ ভালো মানুষেরা যদি পিছিয়ে থাকে, তবে তাদের জায়গা কারা নেবে? মন্দ লোকেরা তাদের জায়গা দখল করবে, অথবা নিরপেক্ষ লোকেরা—যাদের মধ্যে ভালো-মন্দ কিছুই নেই বরং তারা কেবল হৈচৈকারীদের অনুসরণ করে। তাই আমাদের যোগ্য মনে হয় এমন কাউকে বেছে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।”

​যদি কেউ বলে: “আমরা একজনকে বেছে নিলাম কিন্তু পার্লামেন্টের অধিকাংশ লোক তো তার মতো নয়।”

​আমরা বলব: “তাতে কিছু যায় আসে না। আল্লাহ যদি এই একজন ব্যক্তির ওপর বরকত দান করেন এবং তাকে পার্লামেন্টে সত্য কথা বলার তাওফিক দেন, তবে নিঃসন্দেহে তার প্রভাব থাকবে। কিন্তু আমাদের যা প্রয়োজন তা হলো আল্লাহর প্রতি ইখলাস বা আন্তরিকতা। সমস্যা হলো আমরা জাগতিক উপায়ের ওপর খুব বেশি নির্ভর করি এবং আল্লাহ যা বলেন তা শুনি না। সুতরাং যাকে আপনি ভালো মনে করেন তাকে মনোনীত করুন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন।” [লিক্বা-আত আল-বাব আল-মাফতুহ, নং ২১]

​স্থায়ী কমিটির (Lajnah Da'imah) আলেমদের জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল:

“নির্বাচনে ভোট দেওয়া এবং কাউকে মনোনীত করা কি জায়েজ? উল্লেখ্য যে, আমাদের দেশ আল্লাহর অবতীর্ণ বিধান ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে শাসিত হয়।”

​তারা উত্তর দিয়েছিলেন:“একজন মুসলমানের জন্য এমন কোনো সিস্টেমে নিজেকে মনোনীত করা বৈধ নয় যা আল্লাহর অবতীর্ণ বিধান ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে শাসন করে এবং ইসলামের শরীয়াহ বহির্ভূত পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। কোনো মুসলমানের জন্য নিজেকে বা অন্য কাউকে ভোট দেওয়া বৈধ নয় যারা সেই সরকারে কাজ করবে; যদি না প্রার্থী বা ভোটাররা এই আশা করেন যে, এতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা ব্যবস্থাটিকে ইসলামি শরীয়াহ অনুযায়ী পরিবর্তন করতে পারবেন এবং একে বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে অতিক্রম করার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করবেন। তবে শর্ত হলো, নির্বাচিত হওয়ার পর সেই ব্যক্তি এমন কোনো পদ গ্রহণ করবেন না যা ইসলামি শরীয়াহর পরিপন্থী।” [ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ, ২৩/৪০৬, ৪০৭]

​তাদের আরও জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: “আলজেরিয়ায় আমাদের এখানে তথাকথিত আইনসভা নির্বাচন হয়। সেখানে এমন কিছু দল আছে যারা ইসলামি শাসনের ডাক দেয়, আবার কিছু দল আছে যারা তা চায় না। যে ব্যক্তি নামাজ পড়া সত্ত্বেও ইসলামি শাসন ছাড়া অন্য কিছুর পক্ষে ভোট দেয়, তার বিধান কী?”

​তারা উত্তর দিয়েছিলেন: “যে দেশ ইসলামি শরীয়াহ অনুযায়ী শাসিত নয়, সেখানকার মুসলমানদের উচিত তাদের সাধ্যমতো সর্বোচ্চ চেষ্টা করা যাতে ইসলামি শরীয়াহ অনুযায়ী শাসন ব্যবস্থা কায়েম হয়। তাদের উচিত সেই দলকে সাহায্য করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়া যারা ইসলামি শরীয়াহ অনুযায়ী শাসন করবে বলে পরিচিত। আর যারা ইসলামি শরীয়াহ বাস্তবায়ন না করার ডাক দেয়, তাদের সমর্থন করা বৈধ নয়; বরং এটি একজন ব্যক্তিকে কুফরি পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে।

কারণ আল্লাহ বলেন (অর্থের অনুবাদ): ​“আর আপনি তাদের মধ্যে আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন সে অনুযায়ী বিচার করুন এবং তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করবেন না... তারা কি তবে জাহেলিয়াতের বিচার চায়? দৃঢ় বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য আল্লাহর চেয়ে উত্তম ফয়সালাকারী আর কে হতে পারে?”
[আল-মায়িদাহ ৫:৪৯-৫০]

​অতএব, যখন আল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে যারা ইসলামি শরীয়াহ অনুযায়ী বিচার করে না তারা কুফরিতে লিপ্ত, তখন তিনি তাদের সাহায্য করা বা তাদের বন্ধু ও মিত্র হিসেবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। তিনি মুমিনদের নির্দেশ দিয়েছেন তাকে ভয় করতে যদি তারা প্রকৃত মুমিন হয়।

আল্লাহ বলেন:
​“হে মুমিনগণ! তোমাদের আগে যাদের কিতাব দেওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে যারা তোমাদের দ্বীনকে উপহাস ও খেল-তামাশার বস্তু হিসেবে গ্রহণ করে তাদেরকে এবং কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না; আর আল্লাহকে ভয় করো যদি তোমরা মুমিন হও।” [আল-মায়িদাহ ৫:৫৭]
​আল্লাহই শক্তির উৎস। আমাদের নবী মুহাম্মদ ﷺ এবং তাঁর পরিবার ও সাহাবীদের ওপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। [ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ, ১/৩৭৩]

​©
​ইসলাম কিউএ (Islam Q&A)
শাইখ মুহাম্মাদ সালিহ আল-মুনাজ্জিদ

নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং ভোটদান সম্পর্কে শাইখ নাসিরুদ্দিন আলবানীর প্রকৃত অবস্থান এবং উনার সবগুলো ফাতাওয়ার সারমর্ম নিম্নে ...
29/01/2026

নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং ভোটদান সম্পর্কে শাইখ নাসিরুদ্দিন আলবানীর প্রকৃত অবস্থান এবং উনার সবগুলো ফাতাওয়ার সারমর্ম নিম্নে ব্যক্ত করা হলো।

শাইখ আল-আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:

“নির্বাচন সম্পর্কে আমাদের দুটি অবস্থান রয়েছে, যা অজ্ঞ মানুষের কাছে—প্রথম দৃষ্টিতেই— পরস্পরবিরোধী মনে হতে পারে; অথচ বাস্তবে এ দুটি অবস্থানের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই।

i) প্রথম অবস্থান:
আমরা কোনো মুসলিমকে —সে ব্যক্তি হোক অথবা কোনো রাজনৈতিক দল হোক—এই ধরনের পার্লামেন্টে নিজেকে প্রার্থী হতে উপদেশ দিই না। এর কারণ আগেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে…

ii) দ্বিতীয় অবস্থান:
আমরা সব মুসলিমকে, তারা যেখানেই থাকুক না কেন , এ কথা বলি—যদি শাসক রাষ্ট্র এই ব্যবস্থা (নির্বাচনী ব্যবস্থা) জনগণের উপর আরোপ করে, এবং বিভিন্ন দল ও মতাদর্শের লোক তাদের প্রার্থী দাঁড় করিয়ে পার্লামেন্টে সর্বাধিক আসন নিশ্চিত করতে প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে, তখন এই পরিস্থিতিতে যদি কিছু মুসলিম ব্যক্তি প্রার্থী হয়, আমরা তাদেরকে এতে অংশগ্রহণ করতে নিরুৎসাহিত করি। তবে এখানে আমাদের আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে।

আমরা বলি: ফিকহের একটি মূলনীতি হলো—“ যদি একজন মুসলিম ব্যক্তি দুটি অনিষ্টের মুখোমুখি হয়, তবে সে অপেক্ষাকৃত কম অনিষ্টটিই বেছে নেবে।”

সব ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও পার্লামেন্ট গঠিত হবেই —মুসলিমরা তা পছন্দ করুক বা না করুক। সম্পূর্ণ অমুসলিমদের নিয়ে গঠিত একটি পার্লামেন্ট এবং সম্পূর্ণ মুসলিমদের নিয়ে গঠিত একটি পার্লামেন্টের মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে।এছাড়াও পার্থক্য রয়েছে সেই পরিস্থিতিতে, যখন সব প্রার্থীই মুসলিম—কিন্তু তাদের মধ্যকার কেউ সৎ, কেউ অসৎ; কেউ ইসলামের কল্যাণে কাজ করে, আর কেউ ইসলামের স্বার্থকে উপেক্ষা করে নিজের স্বার্থ, নিজের দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থে কাজ করে। এ অবস্থায় মুসলিম ভোটারদের জন্য আবশ্যক হলো—ইসলামের জন্য সবচেয়ে উপযোগী ও উপকারী প্রার্থীকে নির্বাচিত করা।

একই সঙ্গে আমরা এ কথাও বলি যে, একজন মুসলিমের জন্য উচিত নয় নিজেকে প্রার্থী করে পার্লামেন্টে যোগদান করা; কারণ এতে আত্মবিনাশ রয়েছে এবং শরিয়তের বিধান লঙ্ঘনের স্বীকৃতি রয়েছে।

কিন্তু যদিও আমাদের এই মতামত শতভাগ সঠিক, আমরা সবাইকে আমাদের এই মতের প্রতি সন্তুষ্ট করতে পারব না ।বাস্তবতা হলো—অনেকেই তাদের নিজস্ব ব্যাখ্যা ও মতামত পেশ করবে, তারা সঠিক হোক বা ভুল, কিংবা তারা ইজতিহাদের যোগ্য হোক বা না হোক।বাস্তবতা হচ্ছে—অনেক সৎ মুসলিমই পার্লামেন্টে প্রার্থী হবে। সেক্ষেত্রে আমরা মুসলিম সমাজকে বলি: “তোমরা অসৎ মুসলিমদের বিরুদ্ধে, এবং কাফিরদের (যেমন কমিউনিস্ট ও অন্যান্যদের) বিরুদ্ধে তাদেরকেই নির্বাচিত করো।কারণ এটি (নির্বাচন বয়কট করে) ঘরে বসে থাকা এবং প্রতিনিধি নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার চেয়ে কম অনিষ্টকর।”

[সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান-নূর” সিরিজের টেপ নং ৩৪৪ থেকে]

©

জুন-জুলাই-আগস্ট মাস গাছ লাগানোর জন্য সবচেয়ে উপযোগি সময়। সাদাকার নিয়তে আপনার সাধ্য মত গাছ লাগান। সেই গাছ থেকে মানুষ, পশু-...
10/07/2025

জুন-জুলাই-আগস্ট মাস গাছ লাগানোর জন্য সবচেয়ে উপযোগি সময়। সাদাকার নিয়তে আপনার সাধ্য মত গাছ লাগান। সেই গাছ থেকে মানুষ, পশু-পাখি যত ভাবে উপকৃত হবে আপনি সাদাকার সওয়াব পাবেন। আপনি কৃষি খামার, বাণিজ্যিক বাগান করলেও সাদাকার নিয়ত রাখুন। অর্থ উপার্জন হবে, সাদাকার সওয়াবও হবে।

নিজে সরাসরি গাছ লাগানোর সুযোগ না পেলে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানে বৃক্ষরোপন তহবিলে দান করতে পারেন। তারা আপনার পক্ষ থেকে কাজটি করে দিবে। কমেন্টে আসসুন্নাহ ফাউন্ডেশনের বৃক্ষরোপন তহবিলে ডোনেট করার লিংক শেয়ার করলাম।

নিজে হাতে গাছ লাগানো কিংবা ডোনেট করা - উভয়ক্ষেত্রেই আপনার সন্তানকে পাশে রাখুন। তার মনের মধ্যেও ভাল কাজ করার চারাগাছ রোপন করার এখনি সময়!

কোন মুসলিমের জন্য অপরের গৃহে বিনা অনুমতিতে সরাসরি প্রবেশ করা বৈধ নয়। যেহেতু আপনি জানেন না যে, বাড়ির ভিতরের লোক কোন্ অবস্...
30/06/2025

কোন মুসলিমের জন্য অপরের গৃহে বিনা অনুমতিতে সরাসরি প্রবেশ করা বৈধ নয়। যেহেতু আপনি জানেন না যে, বাড়ির ভিতরের লোক কোন্ অবস্থায় আছে। গৃহের ভিতর হয়তো আগোছাল ও অপরিচ্ছন্ন আছে। যা দেখে হয়তো আপনার মনে সেই গৃহ ও গৃহবাসীদের প্রতি ঘৃণার দানা বাঁধবে। হয়তো বা আপনার দৃষ্টি এমন জায়গায় পড়বে, যা আপনার জন্য দেখা বৈধ নয় অথবা গৃহবাসী আপনাকে দেখাতে রাযী নয়। আর তার ফলে তাদের মনেও আপনার প্রতি ঘৃণার অঙ্কুর উদ্গত হবে। এই জন্যই মহান আল্লাহর বিধান হল, পরগৃহে প্রবেশের পূর্বে অনুমতি গ্রহণ ফরয এবং বিনা অনুমতিতে পরকীয় গৃহে প্রবেশ নিষেধ।

মহান আল্লাহ বলেন, “ হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের গৃহ ব্যতীত অন্য কারো গৃহে গৃহবাসীদের অনুমতি না নিয়ে ও তাদেরকে সালাম না দিয়ে প্রবেশ করো না। এটিই তোমাদের জন্য শ্রেয়, যাতে তোমরা সতর্ক হও। যদি তোমরা গৃহে কাউকে না পাও তাহলে তোমাদেরকে যতক্ষণ পর্যন্ত অনুমতি না দেওয়া হয় ততক্ষণ ওতে প্রবেশ করবে না। আবার যদি তোমাদেরকে বলা হয়, ‘ফিরে যাও’ তবে তোমরা ফিরে যাবে। এটিই তোমাদের জন্য উত্তম। আর তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত।’’ (সূরা নূর-২৪:২৭-২৮)

১। কারোর বাড়িতে প্রবেশের দরকার হলে অথবা কোন বাড়ির কাউকে ডাকতে হলে অথবা কোন বাড়ির কারোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হলে তার বাড়ির সামনে এসে তার দরজার সোজাসুজি দাঁড়াবেন না। বরং দরজার বাম অথবা ডান পাশে আড়ালে দাঁড়াবেন। যাতে দরজা খোলা থাকলে তার বাড়ির ভিতরে আপনার নজর না যায়। আর এই নজরের জন্যই তো অনুমতি নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মহানবী (ﷺ) এই ভাবেই অন্যের দরজায় দাঁড়াতেন।[1] এবং তাঁর দরজার সামনে কেউ দাঁড়ালে তাকেও ঐ নিয়মে দাঁড়াতে শিক্ষা দিতেন।[2]

২। জেনে রাখুন যে, কারো বিনা অনুমতিতে তার বাড়ির ভিতরে দৃষ্টিপাত করা হারাম। দরজা অথবা জানালা দিয়ে, রাস্তা থেকে অথবা অন্য বাড়ির ছাদ বা জানালা থেকে, গাছ বা গাড়ির উপর থেকে কারো বাড়ির ভিতরে নজর দিলে নজরবাজের চোখ ফুটিয়ে দেওয়া বৈধ করা হয়েছে।
আল্লাহর রাসুল (ﷺ) বলেন, ‘‘যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের গৃহে তাদের অনুমতি না নিয়ে উঁকি মেরে দেখে সে ব্যক্তির চোখে (ঢিল ছুঁড়ে) তাকে কানা করে দেওয়া তাদের জন্য বৈধ হয়ে যায়।’’[3]

এই বৈধতার মানে হল, ঐ দোষে চোখ ফুটিয়ে দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে যদি কোন নজরবাজ ইসলামী আদালতে বিচারপ্রার্থী হয়, তাহলে তার বিচারে কোন প্রকার দণ্ড ও প্রতিশোধমূলক শাস্তি নেই।

৩। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বাড়ির লোকের উদ্দেশ্যে কিছু বলার অথবা প্রবেশের অনুমতি নেওয়ার পূর্বে সালাম দিন। বলুন, ‘আস্সালামু আলাইকুম। অমুক কি বাড়িতে আছেন’ বা ‘আমি কি ভিতরে আসতে পারি?’[4]

৪। সালাম ও কথা বলার পর যদি কোন সাড়া না পান, তাহলে তিনবার একই রূপ বলুন। তাতে যদি কোন সাড়া বা অনুমতি না পান, তাহলে সেখান হতে ফিরে যান। খবরদার সে বাড়িতে প্রবেশ করবেন না।যেহেতু আল্লাহর রাসুল (ﷺ) বলেন, ‘‘যখন তোমাদের মধ্যে কেউ তিন তিনবার (কারো বাড়ি প্রবেশের) অনুমতি নেয় এবং তাকে অনুমতি না দেওয়া হয়, তাহলে সে যেন ফিরে যায়।’’[5]

অবশ্য যদি সুনিশ্চিত হন যে, বাড়ির লোক আপনার আওয়াজ শুনতে পায়নি, তাহলে সে ক্ষেত্রে ৩ বারের অধিক ডাকাহাঁকা করাতে দোষ নেই।[6]

৫। আপনার ডাকে বাড়ির ভিতর থেকে ‘কে?’ প্রশ্ন এলে উত্তরে আপনি আপনার সুপরিচিত নাম ও পরিচয় বলুন। নচেৎ উত্তরে কেবল ‘আমি’ বলবেন না। অবশ্য নিজ নাম নিয়ে ‘আমি অমুক’ বা ‘অমুকের আব্বা’ বলতে পারেন।[7]

৬। দরজায় আঘাত করে আওয়াজ দেওয়ার দরকার হলে মৃদু আঘাত করুন। করাঘাত নয়; বরং নখাঘাত করুন। মহানবী (ﷺ) এর দরজায় নখাঘাতই করা হত।[8]
অবশ্য বাড়ির ভিতরে বসবাসের কক্ষ দূরে হলে সেই অনুযায়ী সজোরে আঘাত করা দূষণীয় নয়। তবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, যাতে সেই আঘাতে বাড়ি-ওয়ালা বিরক্ত না হয়ে যায়।[9] অথবা বাড়ির লোক ঘাবড়ে ও শিশুরা ভয় খেয়ে না যায়।

অনুরূপ খেয়াল রাখা দরকার কলিং বেল মারার সময়। কোন জবাব না আসার আগে একটানা বার বার রিং করে যাওয়া বেআদবের পরিচয়।

৭। বাড়ির লোক যদি বলে, ‘এখন ফিরে যান’ অথবা ‘পরে আসুন’ তাহলে মনের মধ্যে কোন প্রকার দ্বিধা, কুধারণা বা বিরক্তি না নিয়েই ফিরে যান। এটাই আল্লাহর আদেশ।

৮। বাড়ির মধ্যে কেউ না থাকলেও প্রবেশ করবেন না। কারণ, পরের বাড়িতে তার অনুপস্থিতিতে প্রবেশ করলে আপনার প্রতি কুধারণা জন্মাতে পারে। মহান আল্লাহ বলেন,“যদি তোমরা গৃহে কাউকে না পাও তাহলে তোমাদেরকে যতক্ষণ পর্যন্ত অনুমতি না দেওয়া হয় ততক্ষণ ওতে প্রবেশ করবে না। আবার যদি তোমাদেরকে বলা হয়, ‘ফিরে যাও’ তবে তোমরা ফিরে যাবে। এটিই তোমাদের জন্য উত্তম। আর তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত।’’ (সূরা নূর-২৪:২৭-২৮)

৯। কেউ যদি আপনাকে ডেকে পাঠায় এবং আপনি তার সাথে বাড়ি প্রবেশ করেন, তাহলে পৃথক অনুমতির দরকার নেই। যেহেতু ডেকে পাঠানোটাই আপনার জন্য অনুমতি।[10]

তবে পাঠানো লোকের সাথে না এসে যদি একাকী আসেন, তাহলে বাড়ি প্রবেশের পূর্বে অবশ্যই অনুমতি লাগবে।

১০। আপনি কোন মজলিস, মিটিং বা পরামর্শ-সভায় থাকলে আমীরের নিকট অনুমতি না নিয়ে কোন প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে উঠে যাবেন না। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেন,“ তারাই হল প্রকৃত মু’মিন, যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি ঈমান রাখে এবং রসূলের সঙ্গে সমষ্টিগত ব্যাপারে একত্রিত হলে তার অনুমতি ব্যতীত সরে পড়ে না। যারা তোমার অনুমতি প্রার্থনা করে তারাই আসলে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি ঈমান রাখে। সুতরাং তারা তাদের কোন ব্যক্তিগত কাজে বাইরে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তাদের মধ্যে যাদেরকে ইচ্ছা তাদেরকে তুমি অনুমতি দাও এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা নূর-২৪:৬২)

আর রাসুল (ﷺ) বলেন, ‘‘যখন তোমাদের কেউ তার ভায়ের সাক্ষাতে গিয়ে তার নিকট বসবে, তখন সে যেন তার অনুমতি ছাড়া অবশ্যই না ওঠে।’’[11]

১১। ঘরে কেবল মা-বোন থাকলেও ঘরে প্রবেশ হওয়ার পূর্বে অনুমতি নিন। কারণ ঘরের ভিতর তারা এমন অবস্থায় থাকতে পারে, যে অবস্থায় আপনি তাদেরকে দেখতে পছন্দ করেন না।[12]

১২। ঘরে কেবল স্ত্রী থাকলেও ঘরে প্রবেশ হওয়ার পূর্বে অনুমতি নিন। কারণ ঘরের ভিতর সে এমন অবস্থায় থাকতে পারে, যে অবস্থায় আপনি তাকে দেখতে অপছন্দ করেন। অবশ্য এ ক্ষেত্রে জুতোর শব্দ অথবা গলা সাড়া দিলেও চলে।[13]

১৩। নাবালক শিশু অথবা ক্রীতদাসের জন্যও তিন সময়ে অনুমতি নেওয়া জরুরী। এ ব্যাপারে কুরআন কারীমে স্পষ্ট বিবৃতি এসেছে। মহান আল্লাহ বলেন, “ হে ঈমানদারগণ! তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীগণ এবং তোমাদের মধ্যে যারা বয়ঃপ্রাপ্ত হয়নি (নাবালক) তারা যেন তোমাদের কক্ষে প্রবেশ করতে তিনটি সময়ে অনুমতি গ্রহণ করে, ফজরের নামাযের পূর্বে, দ্বিপ্রহরে যখন তোমরা বিশ্রামের উদ্দেশ্যে বস্ত্র শিথিল কর (বাহ্যাবরণ খুলে রাখ) তখন এবং এশার নামাযের পর, এ তিন সময় তোমাদের গোপনীয়তা অবলম্বনের সময়। (যেহেতু তারা বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করলে তাদের নজর তোমাদের এমন অঙ্গে পড়তে পারে, যেখানে নজর দেওয়া অনুচিত।) তবে এ তিন সময় ব্যতীত অন্য সময়ে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করলে তোমাদের জন্য এবং তাদের জন্য কোন দোষ নেই। তোমাদের এককে অপরের নিকট তো সর্বদা যাতায়াত করতেই হয়। এভাবে আল্লাহ তোমাদের নিকট তাঁর নির্দেশ সুস্পষ্টভাবে বিবৃত করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়। আর তোমাদের সন্তান-সন্ততি বয়ঃপ্রাপ্ত হলে তারাও যেন তাদের বয়োজ্যে‘দের মত (সর্বদা) অনুমতি প্রার্থনা করে। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তার আয়াত সুস্পষ্টভাবে বিবৃত করেন এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়। (সূরা নূর-২৪:৫৮-৫৯)

আল্লাহর বিধান পালনে সমাজ ও সংসারে রয়েছে যাবতীয় শান্তি ও নিরাপত্তা। অবশ্য এই বিধান মানার সাথে সাথে পর্দার বিধানও ঘাড় পেতে মেনে নিতে হবে। নচেৎ যে বাড়ি নিহাতই খোলামেলা এবং অবারিত-দ্বার; প্রাচীর বা ঘেড়া-বেড়া থাকলেও যে বাড়িতে প্রবেশে কোন প্রকার বাধা নেই অথবা প্রাচীর ও অন্তরাল না থাকার ফলে ইচ্ছা না থাকলেও বাহির থেকে ভিতরের হেরেম দেখা যায়, যে গৃহে সরকারী ভাবী ও বোনদের সাধে অবাধে দেখা-সাক্ষাৎ ও কথাবার্তা ছাড়াও হুড়াহুড়ি করার সুযোগ আছে, সে বাড়ি ও সে গৃহে প্রবেশের পূর্বে অনুমতি চাওয়ার কথা বলা মানে কাউকে বাম হাতে মদ খেতে দেখে ডান হাতে খেতে বলা নয় কি? নৈতিক অবক্ষয়প্রাপ্ত এই সমাজকে আল্লাহ সুমতি দিন।

আমীন।

___________________________________

[1]. মুসনাদে আহমাদ আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/ ১৭২৩৯, আবূ দাঊদ হা/৫১৮৬

[2]. আবূ দাঊদ হা/৫১৭৪

[3]. বুখারী তাওহীদ পাবঃ হা/ ৬৮৮৮, মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা হা/২১৫৮, আবূ দাউদ, নাসাঈ

[4]. দলীল স্বরূপ দেখুনঃ মুসনাদে আহমাদ আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/ ১৪৯৯৯, ২২৬১৭, আবূ দাঊদ হা/৫১৭৬, ৫১৭৭, তিরমিযী হা/২৭১০, সহীহুল আদাবিল মুফরাদ ৪২০পৃঃ

[5]. বুখারী তাওহীদ পাবঃ হা/৬২৪১, মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা হা/২১৫৬

[6]. ফাতহুল বারী ১১/২৯, তামহীদ ইবনে আব্দুল বার্র ৩/১৯২

[7]. লীল স্বরূপ দেখুনঃ বুখারী তাওহীদ পাবঃ হা/৬২৫০, মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা হা/২১৫৫, আল-আদাবুল মুফরাদ ১০৮৭

[8]. আল-আদাবুল মুফরাদ ১০৮০

[9]. ফাতহুল বারী ১১/৩৮

[10]. আবূ দাঊদ হা/৫১৮৯-৫১৯০

[11]. সিলসিলাহ সহীহাহ আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/১৮২

[12]. আল-আদাবুল মুফরাদ ১০৫৯, ১০৬৩, তামহীদ ১৬/২২৯

[13]. তাফসীর ইবনে কাসীর ৩/২৮০, আল-আদাবুশ শারইয়্যাহ ১/৪২৪-৪২৫

20/03/2025

❝ আল্লাহুম্মা সাল্লি ওয়া সাল্লিম আ’লা নাবিয়্যিনা মুহা’ম্মাদ।❞

20/03/2025
সারা বিশ্বে একই দিনে ছিয়াম ও ঈদ পালন নিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে একশ্রেণীর মানুষের মধ্যে ব্যাপক তোলপাড় লক্ষ্য...
13/03/2025

সারা বিশ্বে একই দিনে ছিয়াম ও ঈদ পালন নিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে একশ্রেণীর মানুষের মধ্যে ব্যাপক তোলপাড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইতিপূর্বে ১৯৮৬ সালের ১১-১৬ অক্টোবর ওআইসির অঙ্গ সংগঠন ‘ইসলামী ফিকহ একাডেমী’ জর্ডানের রাজধানী আম্মানে এ ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেও এখনও পর্যন্ত ওআইসি কার্যকরী কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেনি। কারণ এ বিতর্কিত সিদ্ধান্তটি ছিল কেবলই যুক্তিনির্ভর; শরী‘আত কিংবা বাস্তবতার নিরিখে এর কোন ভিত্তি নেই। তবুও সাধারণ মানুষের মধ্যে যেহেতু এ নিয়ে গুঞ্জরণ সৃষ্টি হয়েছে, তাই শারঈ দৃষ্টিকোণ এবং বাস্তবতার নিরিখে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

মূলতঃ শারঈ দৃষ্টিকোণ থেকে যদি আমরা লক্ষ্য করি তাহলে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, কুরআন ও হাদীছে মাস গণনার জন্য চাঁদ দেখার যে নির্দেশনা এসেছে তা স্থানিক তথা একটি নির্দিষ্ট জনসমষ্টির জন্য প্রযোজ্য, যাদের উপর চন্দ্র উদিত হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস (রামাযান) পাবে, সে যেন ছিয়াম রাখে’ (বাকারাহ ২/১৮৫)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘তোমরা চাঁদ দেখে ছিয়াম রাখ এবং চাঁদ দেখে ছিয়াম ভঙ্গ কর’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/১৯৭০)। যদি হাদীছে বর্ণিত এই নির্দেশটি স্থানিক না হয়ে সমগ্র বিশ্বের জন্য প্রযোজ্য হ’ত, তাহ’লে চাঁদের সর্বপশ্চিমের উদয়স্থল তথা বর্তমান আমেরিকা মহাদেশকে অথবা পৃথিবীর মধ্যস্থল হিসাবে সঊদীআরবকে শরী‘আতে মানদন্ড হিসাবে গ্রহণ করা হ’ত এবং সেখানে চাঁদ দেখা মাত্রই সমগ্র বিশ্বে একই সাথে ছিয়াম ও ঈদ পালনের জন্য নির্দেশ দেয়া হত। কিন্তু কুরআন ও হাদীছের কোথাও এর প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং তাৎপর্যপূর্ণভাবে কুরআনের ভাষাটি এসেছে এভাবে যে, ‘যারা এ মাস পাবে’ অর্থাৎ সকলেই নয়, বরং তারাই যারা চাঁদ দেখতে পাবে (হাদীছের ব্যাখ্যা থেকে যা আরো সুস্পষ্ট হয়)। অতএব রামাযানে ছিয়াম রাখা ও রামাযান শেষে ঈদ পালন করার সাথে ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমষ্টির চাঁদ দেখা শর্ত। এটাই আরবী মাস বা চন্দ্রমাস নির্ণয়ের চিরাচরিত ও স্বতঃসিদ্ধ পদ্ধতি। আধুনিক যুগে স্যাটেলাইট আবিষ্কারের পূর্বে এ নিয়ে কখনও সেভাবে প্রশ্ন উঠেনি। মূলতঃ চন্দ্র ও সূর্য একই নিয়মে পৃথিবীর চতুর্পার্শ্বে ঘূর্ণায়মান। চন্দ্র হ’ল মাসের সময় নির্ধারক, আর সূর্য হল দিনের সময় নির্ধারক। কোন স্থানে সূর্য উদয়ের সাথে সাথে যেমন দিনের শুরু হয়, তেমনি অমাবস্যার পর চন্দ্র উদয়ের সাথে সাথে মাসের শুরু হয়। এটাই স্বতঃসিদ্ধ প্রাকৃতিক রীতি। এভাবেই চন্দ্র ও সূর্য প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এক্ষণে ছিয়াম ও ঈদ পালনে এই প্রাকৃতিক চক্রকে (Natural cycle) অস্বীকার করা যেমন অবৈজ্ঞানিক, তেমনই অজ্ঞতার পরিচায়ক। নিম্নে এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণকারীদের কিছু প্রমাণ ও যুক্তি খন্ডন করা হ’ল-

(১) যারা বর্তমানে একই দিনে ছিয়াম ও ঈদ পালনের দাবী তুলেছেন তারা একটি হাদীছ প্রমাণ হিসাবে পেশ করতে চান যে, দু’জন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি চাঁদ দেখার সাক্ষী দিলে রাসূল (ছাঃ) ছিয়াম পালন ও তা ভঙ্গ করার নির্দেশ দিয়েছেন।[1] অতএব আধুনিক মিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্বের কোন স্থানে চাঁদ দেখার খবর পেলেই তা সমগ্র বিশ্বের জন্য প্রযোজ্য হবে। এক্ষণে উক্ত সাক্ষ্য দুনিয়ার সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য হবে কি-না? এ ব্যাপারে মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত যুক্তিকে পদদলিত করে ছাহাবায়ে কেরামের আমলকে অগ্রাধিকার দেয়াই যথার্থ হবে। কুরাইব (রাঃ) বর্ণিত আছারে এসেছে যে, তিনি সিরিয়ায় রামাযানের ছিয়াম রেখে মাস শেষে মদীনায় ফিরে এখানকার ছিয়ামের সাথে এক দিন কমবেশ দেখতে পান। এ বিষয়ে ইবনু আববাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হ’লে তিনি বলেন যে, সিরিয়ার আমীর মু‘আবিয়া (রাঃ)-এর গৃহীত ছিয়ামের তারিখ মদীনায় প্রযোজ্য নয়। কেননা ওখানে তোমরা শুক্রবার সন্ধ্যায় চাঁদ দেখেছ। অতএব আমরা ছিয়াম চালিয়ে যাব, যতক্ষণ না ঈদের চাঁদ দেখতে পাব’। অন্য বর্ণনায় এসেছে, আমরা ৩০ দিন পূর্ণ করব। তাঁকে বলা হ’ল: মু‘আবিয়ার চাঁদ দেখা ও ছিয়াম রাখা কি আপনার জন্য যথেষ্ট নয়? তিনি বললেন, না। এভাবেই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদেরকে নির্দেশ দান করেছেন।[2] ইমাম নববী বলেন, এ হাদীছ স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, এক শহরের চন্দ্র দর্শন অন্য শহরে প্রযোজ্য নয় অধিক দূরত্বের কারণে।[3]

উল্লেখ্য যে, সিরিয়া মদীনা থেকে উত্তর-পশ্চিমে এক মাসের পথ এবং প্রায় ৭০০ মাইল দুরত্বে অবস্থিত। সময়ের পার্থক্য ১৪ মিনিট ৪০ সেকেন্ড। সম্ভবতঃ সে কারণেই সেখানে মদীনার একদিন পূর্বে চাঁদ দেখা গিয়েছিল। মিশকাতের ভাষ্যকার ওবায়দুল্লাহ মুবারকপুরী (১৩২২-১৪১৪ হিঃ/ ১৯০৪-১৯৯৪ খৃঃ) বলেন, ‘পশ্চিম দিগন্তে ভূপৃষ্ঠ থেকে নবচন্দ্রের উদয়কালের উচ্চতার আধুনিক হিসাব মতে পশ্চিম অঞ্চলে চাঁদ দেখা গেলে পশ্চিমাঞ্চলসহ সেখান থেকে অন্যূন ৫৬০ মাইল দূরত্বে পূর্বাঞ্চলের অধিবাসীদের জন্য ঐ চাঁদ গণ্য হবে। আর যদি পূর্বাঞ্চলে চাঁদ দেখা যায়, তাহ’লে পশ্চিমাঞ্চলের অনুরূপ দূরত্বের অধিবাসীদের জন্য উক্ত চাঁদ গণ্য হবে’।[4] সর্বাধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের উক্ত হিসাব মতে মক্কা শরীফে চাঁদ দেখা অঞ্চলের দেশসমূহের ৫৬০ মাইল পর্যন্ত উক্ত চাঁদ দেখা যাওয়া সম্ভব এবং উক্ত দূরত্বের অধিবাসীগণ উক্ত চাঁদের হিসাবে ছিয়াম ও ঈদ পালন করতে পারেন। উল্লেখ্য যে, এই মাইলের হিসাব সরাসরি আকাশ পথের মাইল, সড়ক পথের মাইল নয়।

অতএব বুঝা গেল, দু’জন মুসলিমের সাক্ষ্য ঐ অঞ্চলের মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ যে অঞ্চলে একই দিনে চাঁদ দেখা সম্ভব। যারা উক্ত ছহীহ আছারকে উপেক্ষা করে দু’জন মুসলিমের সাক্ষীকে দুনিয়ার সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য মনে করেন, তাদের উদ্দেশ্যে বলব, সঊদী আরবের পশ্চিমেও তো অনেক দেশ রয়েছে, যে দেশগুলোতে সঊদী আরবের পূর্বে চাঁদ দেখা যায়। যেমন এ বছর (২০১৩ইং) উত্তর আমেরিকাতে ৮ জুলাই দিবাগত রাতে চাঁদ দেখা গেছে এবং ৯ জুলাই (মঙ্গলবার) প্রথম ছিয়াম পালিত হয়েছে। তাহ’লে সঊদী আরবকে কেন আপনারা মানদন্ড হিসাবে গণ্য করছেন? চাঁদ তো পশ্চিমে সর্বপ্রথম উদিত হয় আমেরিকা মহাদেশে? আপনাদের এই দ্বিমুখী নীতিই কি আপনাদের দাবীর অসারতা প্রমাণে যথেষ্ট নয়?

(২) ‘রাসূল (ছাঃ)-এর আমল’ শিরোনাম দিয়ে কয়েকটি হাদীছ উপস্থাপন করা হয়ে থাকে যে, রাসূল (ছাঃ) মধ্যাহ্নের পর কয়েকজন মরুবাসী বেদুঈনের কাছে শাওয়ালের চাঁদ দেখার সংবাদ পেলেন এবং তৎক্ষণাৎ ছাহাবীদেরকে ছিয়াম ভঙ্গ করতে বললেন ও পরদিন ঈদের ছালাত আদায়ের নির্দেশ দিলেন।[5] কিন্তু এই হাদীছগুলিতে সারাবিশ্বে একদিনে ছিয়াম ও ঈদ পালনের পক্ষে দলীল গ্রহণের সুযোগ কোথায়? কেননা রাসূল (ছাঃ) যাদের কাছে সংবাদ পেয়েছিলেন তারা দূরবর্তী কোন স্থান থেকে আগমন করে নি; বরং মদীনা বা মদীনার পার্শ্ববর্তী কোন স্থান থেকেই এসেছিল। কেননা মাত্র একদিনের ব্যবধানে কোন ব্যক্তি বা কাফেলার জন্য খুব বেশী দূরত্ব থেকে আগমন করা সম্ভব ছিল না। অতএব এই হাদীছগুলির বাস্তবতা এটাই যে, মদীনার লোকালয়ে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকার কারণে রাসূল (ছাঃ) ও ছাহাবীরা চাঁদ দেখতে পাননি। কিন্তু পার্শ্ববর্তী মরুভূমির মানুষ আকাশ পরিষ্কার থাকায় তা দেখতে পেয়েছিল। তাই তাদের সংবাদ রাসূল (ছাঃ) আমলে নিয়েছিলেন এবং ছিয়াম ভঙ্গ করেছিলেন। এ বিষয়টি ইবনে মাজাহর হাদীছেও স্পষ্টভাবে এসেছে। যেমন আনাস বিন মালেক (রাঃ) তাঁর আনসারী ছাহাবী চাচাদের উদ্ধৃত করে বর্ণনা করেছেন যে, أُغْمِيَ عَلَيْنَا هِلاَلُ شَوَّالٍ فَأَصْبَحْنَا صِيَامًا فَجَاءَ رَكْبٌ অর্থাৎ আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় চাঁদ আমাদের কাছে অস্পষ্ট ছিল। তাই আমরা ছিয়াম রেখেছিলাম। অতঃপর একটি কাফেলা আগমন করল...।[6]

সুতরাং রাসূল (ছাঃ)-এর এই আমল একই দিনে ছিয়াম ও ঈদ পালনের পক্ষে কোনই প্রমাণ বহন করে না।

(৩) ছিয়াম ফরযের আয়াতটি বর্ণনার পরই আল্লাহ যেমন বলেছেন, فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস (রামাযান) পাবে, সে যেন ছিয়াম রাখে’ (বাকারাহ ২/১৮৫)। তেমনিভাবে দু’টি আয়াত পরেই বলেছেন, وَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الْأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الْأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ ثُمَّ أَتِمُّوا الصِّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ ‘তোমরা পানাহার কর যতক্ষণ রাত্রির কৃষ্ণরেখা হতে উষার শুভ্র রেখা প্রতিভাত না হয়। অতঃপর তোমরা রাত্রি পর্যন্ত ছিয়াম পূর্ণ কর’ (বাকারাহ ২/১৮৭)। উপরোক্ত আয়াতদ্বয়ের প্রথম আয়াতটি চন্দ্রের সাথে সম্পৃক্ত, আর পরেরটি সূর্যের সাথে। এক্ষণে প্রথমটি অনুসরণ করা হবে আন্তর্জাতিক সময় অনুযায়ী, আর পরেরটি অনুসরণ করা হবে স্থানীয় সময় মোতাবেক, এটা কি স্পষ্টতই দ্বিমুখিতা নয়?

(৪) এ বিষয়ে আরো যুক্তি দাঁড় করানো হয় যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রামাযানের শেষ দশকের বিজোড় রাত্রিতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করতে বলেছেন। অতএব একই দিনে ছিয়াম আরম্ভ না করলে দেখা যাবে, যেদিন সঊদী আরবে বেজোড় রাত, সেদিন বাংলাদেশে জোড় রাত। এক্ষণে লাইলাতুল কদর কোন দেশের বেজোড় রাত অনুযায়ী হবে? উত্তরে বলব, হে বিবেকবান মুসলিম ভাই! যদি আপনার যুক্তি মেনে নেয়া হয়, তাহ’লে আমরা যখন সঊদী আরবের অনুসরণে লাইলাতুল কদর পালন করব, তখন কিছু দেশে যেমন রাত থাকবে, তেমন কিছু দেশে দিনও থাকবে। তাহ’লে কি তারা সে সময় লাইলাতুল কদর (কদরের রাত) পালন না করে নাহারুল কদর (কদরের দিন) পালন করবে? বেজোড় রাত্রিতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান সম্পর্কিত হাদীছটির ব্যাখ্যা যদি এভাবেই করা হয়, তাহলে এই হাদীছের ব্যাখ্যা কি হবে? যেখানে বলা হয়েছে, يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الآخِرُ يَقُولُ مَنْ يَدْعُونِى فَأَسْتَجِيبَ لَهُ مَنْ يَسْأَلُنِى فَأُعْطِيَهُ مَنْ يَسْتَغْفِرُنِى فَأَغْفِرَ لَهُ ‘আল্লাহ প্রতি রাতের তৃতীয় প্রহরে নিম্ন আকাশে অবতরণ করেন এবং ফজর পর্যন্ত বান্দাদের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, আছ কি কোন আহবানকারী, আমি তার আহবানে সাড়া দেব। আছ কি কেউ সাহায্য প্রার্থনাকারী, আমি তাকে তা দিব। আছ কি কেউ ক্ষমা প্রার্থনাকারী, আমি তাকে ক্ষমা করব’।[7] কেননা বিশ্বপরিমন্ডলের ভৌগলিক অবস্থান লক্ষ্য করলে দেখা যাবে ২৪ ঘণ্টার প্রতিটি মুহূর্তেই কোন না কোন দেশে শেষ রাত্রি উপস্থিত হচ্ছে। তার অর্থ কি এই যে আল্লাহ সর্বদাই দুনিয়ার আসমানে অবস্থান করছেন? বর্তমানে লাইলাতুল কদরের ব্যাখ্যা যেভাবে করা হচ্ছে, অত্র হাদীছের অনুরূপ ব্যাখ্যা দাঁড় করালে আল্লাহ তা‘আলার জন্য সর্বদা দুনিয়াবী আসমানে অবস্থান করাই কি অপরিহার্য হয়ে যায় না? (নাউযুবিল্লাহি) মূলতঃ আল্লাহ তা‘আলা দিন-রাত্রির দুনিয়াবী হিসাবের ঊর্ধ্বে। তাই হাদীছটির বাস্তবতা সম্পর্কে একমাত্র তিনিই জানেন। এ নিয়ে প্রশ্ন তোলা শুধুই মূর্খতা। আমরা কেবল শরী‘আতের নির্দেশ পালনে আদিষ্ট।

(৫) এছাড়াও আরো একটি যুক্তি পেশ করা হয় যে, সঊদী আরবের সাথে বাংলাদেশের মাত্র ৩ ঘণ্টা সময়ের পার্থক্য থাকার কারণে পূর্ণ এক দিন পার্থক্য হবে কেন? উত্তরে বলব, ৩ ঘণ্টা কেন, ৩ সেকেন্ডের আগ-পিছের কারণেও তো একটি দিনের ব্যবধান হতে পারে। যেমন একই সময়ে দু’টি শিশু জন্মগ্রহণ করল, একটি বাংলাদেশে এবং অপরটি সঊদী আরবে। বাংলাদেশে সময় তখন সন্ধ্যা ৭টা এবং আর সঊদী আরবে সময় তখন বিকাল ৪টা। এখন প্রশণ হ'ল, একই সময়ে জন্মগ্রহণ করা শিশু দু’টির আক্বীকা কি একই দিনে হবে, না দুই দিনে হবে? এর উত্তর হ’ল, অবশ্যই দুই দিনে। কারণ সঊদী আরবে বিকেল ৪টায় জন্ম গ্রহণ করা শিশুর ৭ম দিন আর বাংলাদেশে সন্ধ্যা ৭টায় জন্ম গ্রহণ করা শিশুর ৭ম দিন একই দিনে হবে না। বরং সঊদী শিশুর ৭ম দিন হবে বাংলাদেশী শিশুর ৬ষ্ঠ দিন। এক্ষণে একই সময়ে জন্মগ্রহণ করা দুই শিশুর আক্বীকা যদি দু’দিনে হ’তে পারে, তাহলে ৩ ঘণ্টা সময়ের পার্থক্যের কারণে ১ দিন কি পার্থক্য হতে পারে না? এই সমাধান বের করার জন্য কেবল সুস্থ বিবেকই যথেষ্ট। আল্লাহ সকলকে বুঝার তাওফীক দান করুন। আমীন!

(৬) বর্তমানে বেশকিছু দেশ ছিয়াম পালন করে সঊদী আরবে উদিত চাঁদের অনুসরণে। আমাদের দেশের দক্ষিণাঞ্চলেও অনেক আগে থেকে কিছু কিছু গ্রামে সঊদী আরবকে অনুসরণ করা হয়। এখন প্রশ্ন হ’ল, শরীআতে এমন কোন ইঙ্গিত কি রয়েছে যে, সঊদী আরবের চাঁদই সারাবিশ্বের জন্য মানদন্ড হবে? তাহলে কিসের ভিত্তিতে সঊদী আরবকে মানদন্ড হিসাবে গ্রহণ করা হল? ‘চাঁদ দেখে ছিয়াম রাখ, চাঁদ দেখে ছিয়াম ছাড়’ হাদীছটির দূরবর্তী ব্যাখ্যা দাঁড় করালেও তো সঊদী আরব নয়; বরং সর্বপশ্চিমের ভূখন্ড আমেরিকার আলাস্কা প্রদেশকে অনুসরণ করতে হয়।

সর্বোপরি ইসলাম একটি সহজ-সরল প্রাকৃতিক ধর্ম। সর্বযুগে সর্বাবস্থায় এর বিধান সমানভাবে কার্যকর। বর্তমানে স্যাটেলাইটের যুগ আসার কারণে একই দিনে একই সময়ে ছিয়াম ও ঈদ পালনের কথাটি জোরেশোরে উঠছে। কিন্তু একশত বছর পূর্বেও যখন স্যাটেলাইট ছিল না, তখনকার অনারব মুসলিম সমাজ কি তাহ’লে লাইলাতুল কদরের মর্যাদা লাভে বঞ্চিত হয়েছিল? তারা কি বিগত ১৩০০ বছর ধরে ছিয়াম নিষিদ্ধের দিন তথা ঈদের দিনে ছিয়াম রাখতে বাধ্য হয়েছিল কেবলমাত্র প্রযুক্তি জ্ঞানের অভাবে? স্বাভাবিক যুক্তিবোধ কি এটা কোনক্রমে সায় দেয়? এমনকি আধুনিক স্যাটেলাইটের যুগেও কি সর্বত্র সঠিক সময়ে সংবাদ পাওয়া সম্ভব? এর সাথে জড়িত সমস্যাগুলো চিন্তা করলে আদৌ সম্ভব নয়। যেমন-

ক. আমেরিকায় (জিএমটি-৬) চাঁদ উঠেছে কি না তা জানতে কোরিয়ার (জিএমটি+৯) মুসলমানদের অপেক্ষা করতে হবে অন্ততঃ ১৫ ঘণ্টা। অর্থাৎ আমেরিকায় সন্ধ্যা ৬-টায় উদিত হওয়া চাঁদের সংবাদ কোরিয়ার মুসলমানরা পাবে স্থানীয় সময় পরদিন দুপুর ১১টায়। এমতাবস্থায় তারা ‘একই দিনে ছিয়াম ও ঈদ’ উদযাপনের মূলনীতি অনুসারে উক্ত ছিয়ামটি আদায় করবে কিভাবে, আর কিভাবেই বা সেদিনের তারাবীহ পড়বে? আরও পূর্বের দেশ নিউজিল্যান্ডের সাথে আমেরিকার সর্বপশ্চিম তথা আলাস্কার সময়ের পার্থক্য প্রায় ২৪ ঘণ্টা। তাহ’লে আমেরিকার চাঁদ ওঠার খবর নিউজিল্যান্ডবাসী পাবে পরদিন রাতে। তাহলে তাদের উপায় কি হবে? এমনকি বাংলাদেশেও আমেরিকার চাঁদ উঠার সংবাদ জানতে অপেক্ষা করতে হবে পরদিন ভোর ৬টা পর্যন্ত। অর্থাৎ সেই একই ঘটনা। তারা সেদিনের ছিয়ামও পাবে না, তারাবীহও পাবে না।

খ. ধরা যাক বাংলাদেশের চট্টগ্রামে সাহারীর ৫ মিনিট পূর্বে খবর আসল যে, আমেরিকায় চাঁদ উঠেছে। এমতাবস্থায় চট্টগ্রামবাসী কোনক্রমে হয়ত সাহারী সম্পন্ন করল, কিন্তু রাজশাহীবাসী যাদের ব্যবধান চট্টগ্রাম থেকে ১৩ মিনিট তারা কি করবে? একই দেশে অবস্থান করেও তারা আর ছিয়াম রাখতে পারবে না। তাহলে একই দেশে কিছু লোক ছিয়াম রাখবে, কিছু লোক রাখবে না-ভাবুন তো কেমন বিদঘুটে অবস্থা তৈরী হবে?

গ. কেবল চাঁদ দেখাই তো শেষ কথা নয়, প্রকৃতই চাঁদ দেখা গেছে কিনা তা সাব্যস্ত হতে হবে একটি দায়িত্বশীল কমিটির মাধ্যমে। এটাও যথেষ্ট জটিল ও সময়সাপেক্ষ কাজ। যেমন বাংলাদেশে কয়েক বছর পূর্বে হাতিয়ার একটি চরে কেউ একজন চাঁদ দেখতে পেলে সারা দেশে প্রচার হ’ল, অথচ চাঁদ দেখা কমিটি তা গ্রহণযোগ্য মনে না করায় চাঁদ দেখা যায়নি বলে রেডিও-টিভিতে ঘোষণা করা হয়েছিল। এ নিয়ে যথেষ্ট সমস্যা তৈরী হয়েছিল সে বছর। বাংলাদেশের মত ছোট দেশে যদি চাঁদ দেখা নিয়ে সমন্বয়ের এমন অভাব হয়, তবে সারা বিশ্ব পরিসরে বিষয়টি কত জটিল হতে পারে চিন্তা করা যায়?

সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে স্বভাবধর্ম ইসলামে কি এইরূপ জটিলতার কোন অবকাশ আছে? ইসলাম কি এমন বাস্তবতাবিবর্জিত ধর্ম? কখনই নয়; বরং এই অযৌক্তিক বিতর্ক একশ্রেণীর কল্পনাবিলাসী মস্তিষ্কের অপরিপক্ক চিন্তাধারা বৈ কিছুই নয়। এটুকু বোঝার জন্য বড়মাপের বিশেষজ্ঞ হওয়ারও প্রয়োজন নেই। তাই অর্থহীন যুক্তি পরিত্যাগ করে কুরআন ও হাদীছের সহজ-সরল জীবন পদ্ধতি অনুসরণ করাই কাম্য। সূর্য, চন্দ্র উভয়কেই সৃষ্টি করা হয়েছে বিশেষ উদ্দেশ্যে, যার অন্যতম হ’ল সময় ও দিনের হিসাব গণনা। প্রত্যেক এলাকার মানুষ স্ব স্ব স্থানীয় সময় মোতাবেক চন্দ্র মাস গণনা শুরু করবে- এটাই অনাদিকাল থেকে সুপরিচিত বিষয়, যেমনভাবে সৌরদিন সূর্যের স্থানীয় অবস্থান মোতাবেক নির্ধারিত হয়। এর বাইরে মানুষকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত কিছুই চাপিয়ে দেয়া হয় নি। আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই সূর্যকে করেছেন দীপ্তিময় এবং চন্দ্রকে আলোকময় এবং তার জন্য নির্ধারণ করেছেন বিভিন্ন মনযিল, যাতে তোমরা জানতে পার বছরের গণনা এবং (সময়ের) হিসাব। আল্লাহ এগুলো অবশ্যই যথার্থভাবে সৃষ্টি করেছেন। জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য তিনি আয়াতসমূহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন’ (ইউনুস ৫)। সুতরাং এ নিয়ে বিতর্কের কোন অবকাশ নেই।

পরিশেষে এ ব্যাপারে শায়খ উছায়মীন (রহঃ)-এর বক্তব্য এবং রাবেতা আলমে ইসলামীর ‘ইসলামী ফিকহ একাডেমী’র ফৎওয়া উদ্ধৃত করে এ আলোচনা শেষ করছি। শায়খ উছায়মীন (রহঃ) বলেন, ‘ভৌগলিক হিসাবে এটা অসম্ভব। কেননা ভূগোলবিদদের নিকট চাঁদের উদয়স্থল বিভিন্ন হয়, যেমনটি ইবনে তায়মিয়া উল্লেখ করেছেন। যুক্তির নিরিখে এই বিভিন্নতা থেকেই স্পষ্ট প্রতিভাত হয় যে, প্রতিটি শহরের জন্য হুকুম ভিন্ন ভিন্ন হবে।

আর এ ব্যাপারে শারঈ দলীল হ’ল আল্লাহ বলেন, فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস (রামাযান) পাবে, সে যেন ছিয়াম রাখে’ (বাকারাহ ২/১৮৫)। যদি দেখা যায় পৃথিবীর প্রান্ত সীমানার দেশগুলো এ মাস পায়নি অথচ মক্কাবাসীরা ইতিমধ্যেই পেয়ে গেছে, এমতাবস্থায় আয়াতের হুকুমটি কিভাবে তাদের উপর আরোপ করা যেতে পারে, যারা এখনও পর্যন্ত মাসটি পায়নি? রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, صُومُوا لِرُؤْيَتِهِ وَأَفْطِرُوا لِرُؤْيَتِهِ[8] সুতরাং উদাহরণস্বরূপ যদি মক্কাবাসীরা চাঁদ দেখে, তবে তার ভিত্তিতে কিভাবে আমরা পাকিস্তানবাসী কিংবা তার পূর্বদিকের রাষ্ট্রসমূহের অধিবাসীদের উপর ছিয়াম চাপিয়ে দিতে পারি, অথচ আমরা জানি যে তাদের আকাশে আদতে চাঁদ উদিতই হয়নি? অথচ রাসূল (ছাঃ) চাঁদ দেখাকে ছিয়ামের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন।

আর যুক্তিভিত্তিক দলীল হ’ল, আমরা জানি যে ভূপৃষ্ঠের পশ্চিম প্রান্তের আগে পূর্ব প্রান্তে প্রভাতরেখা উদিত হয়। সুতরাং প্রাচ্যের আকাশে প্রভাতরেখা উদিত হলেই কি আমরা পশ্চিম প্রান্তের মানুষ সাহারী ছেড়ে দেব, অথচ পশ্চিমে এখনও রাত অবশিষ্ট আছে? এর উত্তর হ’ল, না। তেমনিভাবে প্রাচ্যের আকাশে যখন সূর্য অস্তগামী হয়, তখন কি আমরা ইফতার করা শুরু করব, অথচ আমরা তখনও দিবাভাগেই রয়েছি? এর উত্তর হ’ল, না। সুতরাং হুকুমের ক্ষেত্রে চাঁদ ও সূর্য সম্পূর্ণ একই। চন্দ্রের হিসাব হয় মাসিক, আর সূর্যের হিসাব হয় দৈনিক।...অতএব যুক্তি ও দলীলের নিরীখে ছিয়াম ও ইফতারের ক্ষেত্রে প্রত্যেক স্থানের জন্য আলাদা বিধান হবে। যার সম্পর্ক হবে বাহ্যিক আলামত বা চিহ্ন দ্বারা, যা আল্লাহ্‌ তা‘আলা কুরআনে এবং নবী (ছাঃ) তাঁর সুন্নাতে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আর তা হচ্ছে চাঁদ প্রত্যক্ষ করা এবং সূর্য বা ফজর প্রত্যক্ষ করা। মানুষ যে এলাকায় থাকবে সে এলাকায় চাঁদ দেখার উপর নির্ভর করে ছিয়াম ভঙ্গ করবে।[9]

‘রাবেতা আলমে ইসলামী’র ‘ইসলামী ফিকহ একাডেমী’ ১৯৮১ সালে তাদের প্রকাশিত এক ফৎওয়ায় উল্লেখ করেছে যে, ‘ইবনে উমর (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, ‘তোমরা চাঁদ না দেখা পর্যন্ত ছিয়াম রেখ না এবং চাঁদ না দেখে ছিয়াম ভঙ্গ করো না। আর যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে তাহলে গণনা করে (ত্রিশ দিন) পূর্ণ কর’।[10]

এই হাদীছটির সাথে একটি সাবাব (কারণ) সংযুক্ত করা হয়েছে অর্থাৎ চন্দ্র দর্শন। সুতরাং হতে পারে যে মক্কা, মদীনায় চাঁদ দেখা গেলেও অন্য দেশে তা দেখা যায় নি। সেক্ষেত্রে অন্য দেশের অধিবাসীদেরকে দিনের আলো অবশিষ্ট থাকা অবস্থায় তৎক্ষণাৎ কিভাবে ছিয়াম পালন বা ছিয়াম ভঙ্গের নির্দেশ দেয়া যেতে পারে? প্রত্যেক মাযহাবের আলেমরাই বলেছেন যে, উদয়স্থলের বিভিন্নতা বহু আলেমের নিকট গ্রহণযোগ্য। ইবনে আব্দিল বার এ ব্যাপারে ইজমা‘ উল্লেখ করেছেন যে, দূরবর্তী শহরসমূহ থেকে একই সময়ে চাঁদ দেখা যায় না; যেমন খোরাসান ও স্পেনের মধ্যকার দূরত্ব। তাই প্রতিটি দেশ বা শহরের জন্য ভিন্ন ভিন্ন হুকুম। তাছাড়া চার মাযহাবের বহু কিতাবে শারঈ দলীলের ভিত্তিতে উদয়স্থলের ভিন্নতাকে গ্রহণযোগ্য বলা হয়েছে।

আর যুক্তির ক্ষেত্রে বলা যায় যে, উদয়স্থলের বিভিন্নতার ব্যাপারে কোন আলেমের মধ্যেই মতানৈক্য নেই। কেননা এটা একটা দৃশ্যমান ব্যাপার। ছালাতের নির্ধারিত সময়সহ শরীআতের অনেক হুকুম এর আলোকেই নির্ধারিত হয়েছে। তাই সার্বিক পর্যবেক্ষণে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারি যে, উদয়স্থলের বিভিন্নতা একটি বাস্তব বিষয়। সুতরাং এর আলোকে ‘ইসলামী ফিকহ কমিটি’ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে যে, সারাবিশ্বব্যাপী একই দিনে ছিয়াম ও ঈদ পালনের আহবান জানানোর কোন প্রয়োজন নেই। কেননা এই ঐক্যের উপর মুসলিম উম্মাহর ঐক্য নির্ভর করে না, যেমনটি কোন কোন প্রস্তাবক দাবী করে থাকেন। বরং মুসলিম দেশসমূহের দারুল ইফতা ও বিচার বিভাগের উপরই চাঁদ দেখার বিষয়টি ছেড়ে দেয়া উত্তম। এতেই মুসলিম উম্মাহর জন্য অধিকতর কল্যাণ নিহিত রয়েছে। মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য আসতে পারে কেবলমাত্র জীবনের সর্বক্ষেত্রে কিতাব ও সুন্নাতের উপর আমল করার ব্যাপারে ঐক্যমত হওয়ার মাধ্যমে।[11]

আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক বিষয়টি অনুধাবন করার তাওফীক দান করুন। আমীন!

আহমাদ আব্দুল্লাহ ছাকিব

পিএইচ.ডি গবেষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

মুহাম্মাদ শরীফুল ইসলাম

লিসান্স, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।

[1]. নাসাঈ হা/২১১৬।

[2]. তিরমিযী হা/৫৫৯; আবুদাঊদ হা/২০৪৪।

[3]. মির‘আত ৬/৪২৮ হা/১৯৮৯-এর ব্যাখ্যা।

[4]. মির‘আত ৬/৪২৯, হা/১৯৮৯-এর ব্যাখ্যা।

[5]. আবুদাউদ হা/১১৫৭, ২৩৩৯, মিশকাত হা/১৪৫০।

[6]. ইবনে মাজাহ হা/১৬৫৩।

[7]. বুখারী হা/১১৪৫; মুসলিম হা/৭৫৮; মিশকাত হা/১২২৩।

[8]. মুত্তাফাক আলাইহ, মিশকাত হা/১৯৭০।

[9]. ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম, পৃঃ ৪৫১।

[10]. মুত্তাফাক আলাইহ, মিশকাত হা/১৯৬৯।

[11]. ইসলামী ফিকহ একাডেমী (১২ ফেব্রুয়ারী ১৯৮১ইং, ৪র্থ বৈঠক, ৭ম সিদ্ধান্ত, في بيان توحيد الأهلة من عدمه); রাবেতা আলমে ইসলামী, জেদ্দা, সঊদী আরব।

Address

Kalaroa
9410

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when ইসলামী জীবন-ধারা posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share