30/01/2026
সৌদি আরবের সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের প্রাক্তন সদস্য এবং প্রধান বিচারপতি শাইখ সালিহ আল লুহাইদান রহিমাহুল্লাহ গণতন্ত্র, বর্তমানের কতিপয় ইসলামি রাষ্ট্র (যেখানে গণতন্ত্র প্রচলিত আছে) যেমন: আলজেরিয়া, লিবিয়া ইত্যাদিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচন এবং উক্ত নির্বাচনসমূহে ভোটদান সম্পর্কে আলোচনা করেছেন । এ বিষয়ে উনার মোট ৫ টি ফাতাওয়া আছে, যার মধ্যে ৪ টি ইসলামি রাষ্ট্রের ব্যাপারে আর অবশিষ্ট টি দারুল কুফরে অবস্থানরত সংখ্যালঘু মুসলিম কমিউনিটির ব্যাপারে । নিচে এগুলো ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করা হলো:
১.
উপস্থাপক: প্রশ্নকারী বলছেন: আসসালামু আলাইকুম, সম্মানিত পিতা! গণতন্ত্র কি কুফর? রাজনৈতিক দল গঠন করা ও এরূপ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা কি জায়েয? আর একজন সালাফি কি নির্বাচনে তার ভোট দিতে পারবে?
শাইখের উত্তর: প্রথমে আমাদেরকে বুঝতে হবে, গণতন্ত্রের অর্থ কী। গণতন্ত্র মানে যদি বুঝায় যে - সবকিছু জনগণের হাতে ন্যস্ত করা, এবং জনগণ এর যা ইচ্ছা সেটাকেই আইন হিসেবে নির্ধারণ করবে, যাতে মানুষ সেই অনুযায়ী শাসন পরিচালনা করতে পারে - তাহলে আমি বলবো: নিঃসন্দেহে এটি ইসলামের মধ্যে গ্রহণযোগ্য নয়। মুসলিম রাষ্ট্রে হুকুম প্রণয়নের অধিকার একমাত্র আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবী ﷺ–এর সুন্নাহর জন্য নির্দিষ্ট। অর্থাৎ, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ–এর কথার ভিত্তিতেই শাসন চলবে।
কিন্তু বর্তমানের জটিল পরিস্থিতিতে যদি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় , তাহলে যদি সম্ভব হয় এমন ব্যক্তিকে নির্বাচিত করা উচিত, যে দ্বীন ও দুনিয়ার দিক থেকে দেশের জন্য বেশি উপকারী। অতএব, এরূপ অবস্থায় ভোট দেওয়া জরুরি হয়ে যায়।
আর যদি কাউকে নির্বাচিত করার মাধ্যমে অধিকতর খারাপ অবস্থাকে কমিয়ে আনা যায়, তাহলে একজন মুসলিম ব্যক্তি তার কাজ ও অবস্থান এমনভাবে নির্ধারণ করবে, যাতে সাধ্য অনুযায়ী হককে সম্মানিত করা যায় এবং বাতিলকে কমানো যায়। এটাই মূল কথা।আমরা আল্লাহ তা‘আলার কাছে কায়মনোবাক্যে চাই-তিনি যেন আমাদের সকল বিষয়ে পরিণাম উত্তম করে দেন।
২.
প্রশ্নকারী বলছেন: নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও ভোট দেওয়ার হুকুম কী?
শাইখের উত্তর: নিঃসন্দেহে নির্বাচনের পদ্ধতিটাই এক ধরনের অনিষ্টকর পদ্ধতি; কেননা এতে অনেক সময় এমন লোকের ওপর নির্ভর করা হয়, যাদের ওপর শরীয়তসম্মতভাবে কোনো বিষয়ে নির্ভর করা ঠিক নয়। কোনো প্রার্থী বেশি ভোট পেলে বলা হয়—এই ব্যক্তি ভোট ও নির্বাচনের মাধ্যমে জয়ী হয়েছে। কিন্তু এরপর তারা এমন সব বিষয়ে লিপ্ত হয়, যেগুলোর শরীয়তে কোনো ভিত্তি নেই এবং তারা এসবের ব্যাপারে সচেতনও থাকে না।যদি কোনো ব্যক্তি জানে যে - সে কাউকে মনোনীত করলে বা সমর্থন করলে এবং তার প্রার্থী জয়ী হলে অনিষ্ট সংঘটিত হবে, সেক্ষেত্রে উক্ত ব্যক্তির উচিত এমন পথ অবলম্বন করা যা অনিষ্ট কমায় এবং কল্যাণকে বৃদ্ধি করে। আর হ্যাঁ, মূলনীতি হলো—মন্দকে যতটা সম্ভব কমানো এবং ভালোকে যতটা সম্ভব বাড়ানো।
৩.
প্রশ্নকারী: আল্লাহ আপনাকে বরকত দান করুন, হে শাইখ! আমাদের আলজেরিয়ায় বর্তমানে সংসদীয় নির্বাচন চলছে।শরিয়তের দৃষ্টিতে এগুলো পশ্চিমা ব্যবস্থা, যার সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই—এর হুকুম তো সকলেরই জানা।
শাইখ: হ্যাঁ, জানা আছে। তাহলে সমস্যাটা কী?
প্রশ্নকারী: এখন কিছু দল আছে যারা শাসক দলের বিরোধী এবং তারা ক্ষমতায় আসতে চায়। আমরা যদি ভোট না দিই, তাহলে এমন একটি দল ক্ষমতায় আসতে পারে, যে দল সালাফি দাওয়াতের ক্ষতি করবে। এই অবস্থায় কি আমরা বর্তমান প্রেসিডেন্টের দলের পক্ষে ভোট দিতে পারি?
শাইখ: শোনো, যে দলটি জিতলে তোমাদের ক্ষতি হবে বলে আশঙ্কা করছো সেই দলের বিরুদ্ধে ভোট দাও।
প্রশ্নকারী:প্রেসিডেন্টের দল ইনশাআল্লাহ ভালো।
শাইখ: যদি তা-ই হয়, তাহলে দেখো—সবচেয়ে ভালো দল কোনটি, তার পক্ষেই ভোট দাও।
প্রশ্নকারী: অর্থাৎ প্রেসিডেন্টের দলই ইনশাআল্লাহ?
শাইখ: আল্লাহর কসম! আমি জানি না।তোমরা বিষয়টি বিবেচনা করো, যে দলটি সবচেয়ে ভালো, তার পক্ষেই ভোট দাও। ব্যস ।
৪.
প্রশ্নকারী: শায়খ সালেহ ! আপনি কি ফোনকলে আছেন, শায়খ?
শাইখ: জি,
প্রশ্নকারী: শায়খ সালেহ।
শাইখ: জি , বলছি
প্রশ্নকারী: শায়খ। আমি লিবিয়া থেকে বলছি, শায়খ।
শাইখ: ঠিক আছে, বলুন । আপনার কী প্রশ্ন?
প্রশ্নকারী: শায়খ, আমাদের দেশে সামনে যে নির্বাচন আসছে, সে বিষয়েই আমার প্রশ্ন। এই নির্বাচন, শায়খ—আপনি জানেন—আমাদের এতে কোনো পছন্দই নেই; বরং এটি আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই এটি অনিবার্যভাবেই অনুষ্ঠিত হবেই। আর শায়খ, প্রায় এক মাস পর একটি জাতীয় পরিষদের নির্বাচন হবে, যেখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ২০০ জন নির্বাচিত হবেন। এই ২০০ জন এমন ক্ষমতা পাবে যা—
শাইখ: দেখুন ভাই, আপনারা যাকে দেশের জন্য দ্বীন ও দুনিয়ার দিক থেকে সবচেয়ে উপযোগী মনে করেন—তাকেই নির্বাচিত করুন। জি,নির্বাচনে অংশ নিন।
প্রশ্নকারী: কিন্তু শায়খ, আমাদের এখানে কিছু তালিবুল ইলম আছেন—তারা আমাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন। তারা বলেন, “ভোট দিও না।”
শাইখ: আমি বলছি—আমার কথা শুনুন।
যদি ভোট দিতে যান, তাহলে সেই ব্যক্তিকে দেখুন যাকে আপনি জানেন, অন্যরাও জানে—যে ব্যক্তি দেশের জন্য দ্বীন ও দুনিয়ার দিক থেকে সবচেয়ে উপকারী।
যদি সে প্রার্থী হয়, তাকে ভোট দিন।
প্রশ্নকারী: ঠিক আছে শাইখ, আমাদের এখানে কিছু সেক্যুলার (ধর্মনিরপেক্ষ) লোকও আছে। আমরা সেক্যুলারদের ব্যাপারে মানুষকে সতর্ক করি, শায়খ।আমার কাছে জনসাধারণকে বোঝানোর মতো খুব কথা নেই।
শাইখ: কিন্তু আমি এটুকু বলি—যে ব্যক্তি দেশের জন্য দ্বীন ও দুনিয়ার দিক থেকে সবচেয়ে উপকারী, সে কখনোই সেক্যুলার হতে পারে না। সে কখনোই দ্বীন ও দুনিয়ায় উপকারী হতে পারে না যদি সে সেক্যুলার হয়—কখনোই না।
প্রশ্নকারী: কিন্তু কিছু যুবক ও তালিবুল ইলম বলেন, “সেক্যুলারদের ব্যাপারে সতর্ক করো না, কারণ এতে তোমরা ইখওয়ানদের (মুসলিম ব্রাদারহুড) উত্থান ঘটাবে, আর তারা ক্ষমতায় চলে আসবে।
শাইখ: এ বিষয়ে-আল্লাহর কসম-আমার কাছে কোনো উত্তর নেই। আপনারা লিবিয়ার মানুষ, আপনারাই লিবিয়াকে সবচেয়ে ভালো জানেন। আপনারা কেবল তাকেই নির্বাচিত করুন যাকে আপনারা নিশ্চিতভাবে জানেন—সে দেশের জন্য দ্বীন ও দুনিয়ার দিক থেকে সবচেয়ে উপকারী।এটাকে একটি মূলনীতি বানিয়ে নিন—হ্যাঁ।
প্রশ্নকারী: শাইখ, তাহলে এতে কোনো সমস্যা নেই—আমরা যাকে উপকারী মনে করি তাকে ভোট দেব?
শাইখ: যাকে আপনারা মনে করেন দেশের জন্য দ্বীন ও দুনিয়ার দিক থেকে সবচেয়ে উপকারী তাকেই নির্বাচিত করুন।
প্রশ্নকারী: শাইখ, যারা নির্বাচনে বিশ্বাসই করে না এবং মানুষকে অংশগ্রহণের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করে—তাদের ব্যাপারে আপনার নির্দেশনা কী?
শাইখ: আমি বলি—যে ভোট দেয় না, সে তার নিজের ব্যাপারে স্বাধীন। কিন্তু যদি কেউ ভোট দেয় এবং তার মাধ্যমে দেশের উপকার হয়—তাহলে সেটাই সঠিক।
প্রশ্নকারী: জি, শাইখ।আল্লাহ আপনাকে বরকত দিন। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন। আমাদের জন্য দোয়া করবেন শাইখ যেন আমরা সফল হই।
শাইখ: আল্লাহ তাওফিক দিন সেই কাজে, যা তিনি ভালোবাসেন ও পছন্দ করেন।আল্লাহ আপনাকে বরকত দিন। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।
©