26/08/2023
হরে কৃষ্ণ
পবিত্রারোপণী একাদশী
আগামীকাল ২৭/০৮/২০২৩ ইং, রবিবার, পবিত্রারোপণী একাদশী
পারণ-পরদিন সোমবার সকাল ০৫:৩৪ থেকে ০৯:৪৭ পর্যন্ত।
পবিত্রারোপণী একাদশী ব্রত মাহাত্ম্য:----------------------------------------------------------
একদিন মহারাজ যুধিষ্ঠির ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করলেন-হে প্রভু! শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের একাদশীর নাম কি তা কৃপা করে আমাকে বলুন। শ্রীকৃষ্ণ বললেন-হে মহারাজ! এখন আমি সেই পবিত্র ব্রত মাহাত্ম্য বর্ণনা করছি, মনোযোগ দিয়ে তা শ্রবণ করুন। যা শোনামাত্রই বাজপেয় যজ্ঞের ফল লাভ হয়।
প্রাচীন কালে দ্বাপর যুগের শুরুতে মহিজীৎ নামে এক বিখ্যাত রাজা ছিলেন। তিনি মাহিস্মতি নগরে রাজত্ব করতেন। কিন্তু দু:খের বিষয় এই যে তার মনে বিন্দুমাত্র সুখ-শান্তি ছিল না। কেননা তিনি ছিলেন অপুত্রক। ‘পুত্রহীনের ইহলোক পরলোক কোথাও সুখ হয় না’- এইরূপ চিন্তা করতে করতে বহুদিন কেটে গেল। কিন্তু তবুও পুত্রমুখ দর্শনে রাজা বঞ্চিতই রইলেন। নিজেকে অত্যন্ত দুর্ভগা মনে করে রাজা চিন্তাগ্রস্থ হলেন। প্রজাদের সামনে গিয়ে বলতে লাগলেন-হে প্রজাবৃন্দ! তোমরা শোন। আমি এই জন্মে তো কোন পাপকাজ করিনি, অন্যায়ভাবে আমার রাজকোষ বৃদ্ধি করিনি, ব্রাহ্মণ বা দেবতাদের সম্পদ কখনও গ্রহণ করিনি উপরন্তু প্রজাদেরকে পুত্রের মতো পালন করেছি, ধর্ম অনুযায়ী পৃথিবী শাসন করেছি। দুষ্টদের যথানুরূপ দন্ড দিয়েছি, সজ্জন ব্যক্তিদের যথাযোগ্য সম্মান করতেও কখনও অবহেলা করিনি। তাই হে ব্রাহ্মণগণ, এই প্রকার ধর্মপথ অবলম্বন করা সত্ত্বেও কেন আমার পুত্র লাভ হল না, তা আপনারা কৃপা করে অনুসন্ধান করুন। রাজার এই প্রকার কাতর উক্তি শ্রবণে ব্যথিত রাজভক্ত পুরোহিত ব্রাহ্মণগণ রাজার মঙ্গলের জন্য গভীর বনে ত্রিকালজ্ঞ মুনিঋষির কাছে যেতে মনস্থ করলেন। বনের মধ্যে ঋষিদের আশ্রমসকল দেখতে দেখতে তারা এক মুনির সন্ধান পেলেন। তিনি দীর্ঘায়ু, নীরোগ, নিরাহারে ঘোর তপস্যায় মগ্ন ছিলেন। সর্বশাস্ত্র বিশারদ ধর্মতত্ত্বজ্ঞ ও ত্রিকালজ্ঞ সেই মহামুনি লোমশ নামে পরিচিত। ব্রহ্মার এক কল্প অতিবাহিত হলে মুনিবরের গায়ের একটি লোম পরিত্যাক্ত হোত। এই কারণে এই মহামুনির নাম লোমশ। তাকে দেখে সকলেই ধন্য হলেন। তারা পরস্পর বলতে লাগলেন যে, আমাদের বহু জন্মের সৌভাগ্যের ফলে আজ আমরা এই মুনিবরের সাক্ষাৎ লাভ করলাম। তারপর ঋষিবর তাদের সম্বোধন করে বরলেন-কি কারণে আপনারা এখানে এসেছেন এবং কেনই বা আমার এত প্রশংসা করছেন, তা স্পষ্ট করে বলুন। আপনাদের যাতে মঙ্গল হয়, আমি নিশ্চয়ই তার চেষ্টা করব। ব্রাহ্মণেরা বললেন-হে ঋষিবর! আমরা যে উদ্দেশ্যে এখানে এসেছি আপনি তা কৃপা করে শুনুন। এ পৃথিবীতে আপনার মতো শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি আর কোথাও নেই। মহিজীৎ নামে এক রাজা নি:সন্তান হওয়ায় অতি দু:খে দিনযাপন করছে। আমরা তার প্রজা, তিনি আমাদেরকে পুত্রের মতো পালন করেন। কিন্তু তিনি পুত্রহীন বলে আমরাও সবাই মর্মাহত। তার দু:খ দূর করতে আমরা এই বনে প্রবেশ করেছি। হে ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ! রাজা যাতে পুত্রের মুখ দর্শন করতে পারেন, কৃপা করে তার কোন উপায় আমাদের বলুন।
তাদের কথা শুনে মুনিবর ধ্যানমগ্ন হলেন। কিছু সময় পরে রাজার পূর্বজন্মবৃত্তান্ত বলতে লাগলেন। এই রাজা পূর্বজন্মে এক দরিদ্র বৈশ্য ছিলেন। একবার তিনি একটি অন্যায় কার্য করে ফেলেন। ব্যবসা করবার জন্য তিনি এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাতায়াত করতেন। এক সময় জৈষ্ঠ্য মাসে শুক্লপক্ষের দশমীর দিনে কোথাও যাওয়ার পথে তিনি অত্যন্ত তৃষ্ণার্থ হয়ে পড়েন। গ্রাম প্রান্তে একটি জলাশয় তিনি দেখতে পান। সেখানে জলপানের জন্য যান। একটি গাভী ও তার বাছুর সেখানে জলপান করছিল। তাদেরকে তাড়িয়ে দিয়ে তিনি নিজেই জলপান করতে লাগলেন। এই পাপকর্মের ফলে তিনি পুত্রসুখে বঞ্চিত হয়েছেন। কিন্তু পূর্বজন্মের কোন পুণ্যের ফলে তিনি এইরকম নিষ্কণ্টক রাজ্য লাভ করেছেন। হে মুনিবর! শাস্ত্রে আছে যে পুণ্য দ্বারা পাপক্ষয় হয়। তাই আপনি এমন একটি পুণ্যব্রতের উপদেশ করুন যাতে তার পারব্ধ পাপ দূর হয় এবং আপনার অনুগ্রহে তিনি পুত্রসন্তান লাভ করতে পারেন। লোমশ মুনি বললেন-শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের পবিত্রারোপণী একাদশী ব্রত অভিষ্ট ফল প্রদান করে। আপনারা যথাবিধি তা সকলে পালন করুন। লোমশ মুনির উপদেশ শুনে আনন্দ চিত্তে গৃহে প্রত্যাবর্তন করে তাঁরা রাজাকে সে সকল কথা জানালেন। তারপর সকলে মিলে মুনির নির্দেশ অনুসারে ব্রত পালন করলেন। তাদের সকলের পুণ্যফল রাজাকে প্রদান করলেন। সেই পুণ্য প্রভাবে রাজমহিষী গর্ভবতী হলেন। উপযুক্ত সময়ে বলিষ্ঠ, সর্বাঙ্গসুন্দর এক পুত্রসন্তানের জন্ম দান করলেন। ভবিষোত্তরপুরাণে এই মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। এই ব্রত মাহাত্ম্য যিনি পাঠ বা শ্রবণ করবেন তিনি সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হবেন এবং পুত্রসুখ ভোগ করে অবশেষে দিব্যধাম প্রাপ্ত হবেন।
🙏হরেকৃষ্ণ
____একাদশী পালনের নিয়ম বিধি____------------------------------------------------------------
শুদ্ধ ভাবে একাদশী পালনের নিয়ম॥ একাদশীতে আসুন জেনে নেই সেই সব নিয়ম, নিষেধ গুলি কি কি?????
[১] সমর্থ পক্ষে দশমীতে একাহার, একাদশীতে নিরাহার, ও দ্বাদশীতে একাহার করিবেন।
[২] তা হতে অসমর্থ পক্ষে শুধুমাত্র একাদশীতে অনাহার করিতে হয় ।
[৩] যদি উহাতেও অসমর্থ হন, একাদশীতে পঞ্চ রবিশস্য বর্জন করিবেন। ফল মুলাদি অনুকল্প গ্রহণের বিধান রইয়াছে। সমর্থপক্ষে রাত্রি জাগরণের বিধি আছে। মহান গোস্বামীগন ও আচার্যবৃন্দের অনুমোদিত তালিকা বা পঞ্জিকায় যে সমস্ত একাদশী নির্জলা ব্রত পালনের ( জল ব্যতীত ) পালনের নির্দেশ প্রদান করেছেন , সেগুলি সেই মতে করলে সর্বোত্তম হয় । নিরন্তর কৃষ্ণ ভজনায় থেকে নিরাহার থাকতে। একান্ত অপারগ হলে নির্জলা সহ অন্যান্য একাদশীতে কিছু সবজি, ফলমূল গ্রহণ করতে পারবেন। যেমন : গোল আলু, মিষ্টি আলু, চালকুমড়ো, পেঁপে ,টমেটো , ফুলকপি ইত্যাদি সবজি ,ঘি অথবা বাদাম তেলে রান্না করে ভগবানকে উৎসর্গ করে, আহার করতে পারেন। হলুদ মরিচ, লবন ব্যবহার্য। আবার অন্যান্য আহার্য যেমন ____ দুধ, কলা, আপেল, আঙুর , আনারস , আঁখ, আমড়াশস্য, তরমুজ, বেল, নারিকেল , মিষ্টি , আলু, বাদাম, লেবুর শরবত । ইত্যাদি ফলমূল খেতে পারেন।
একাদশীতে পাঁচ প্রকার রবিশস্য গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছে:_____
[১] ধান জাতীয় সকল প্রকার খাদ্য যেমন ___চাল,মুড়ি, চিড়া, সুজি , পায়েস, খিচুড়ি ,চালের পিঠা,খৈ, ইত্যাদি ।
[২] গম জাতীয় সকল প্রকার খাদ্য যেমন __ আট, ময়দা, সুজি, বেকারির বিস্কুট, বা সকল প্রকার বিস্কুট, বেকারির রুটি, হরলিক্স জাতীয় ইত্যাদি ।
[৩] যব বা ভূট্টা জাতীয় সকল প্রকার খাদ্য যেমন __ ছাতু, খই, রুটি ইত্যাদি ।
[৪] ডাল জাতীয় সকল প্রকার খাদ্য যেমন _মুগ, মসুরী, মাসকলাই, খেসারী, ছোলা, অড়হর, ফেনল, মটরশুঁটি, বরবটি, সিম
ইত্যাদি ।
[৫] সরিষার তেল, সয়াবিন তেল, তিল তেল, ইত্যাদি । উপরোক্ত পঞ্চ রবি শস্য যে কোন একটি একাদশীতে গ্রহণ করলে ব্রত নষ্ট হয় । উল্লেখ্য যারা সাত্বিক আহারী নন, এবং চা, বিড়ি, সিগারেট , পান, কফি, নেশা গ্রহণ করেন একাদশী ব্রত পালনের সময়কাল পর্যন্ত এই সব গ্রহণ না করাটাই ভালো । [একাদশী ব্রত মাহাত্ব্য]: একাদশী করলে যে কেবলমাত্র নিজের জীবন এর সদগতি হয় তা নয়, একাদশী ব্যক্তির প্রয়াত পিতা/ মাতা নিজ কর্মদোষে নরকবাসী হন , তবে সেই পুত্র ই পিতা/ মাতা কে নরকের থেকে উদ্ধার করতে পারবে ।একাদশীতে অন্ন ভোজন করলে যেমন নরকবাসী হবে , তেমনই অন্যকে অন্নভোজন করালেও নরকবাসী হবে। কাজেই একাদশী ব্রত পালন করা আমাদের সকলের কর্তব্য ।
[একাদশী পারন]: একাদশী তিথির পরদিন উপবাস ব্রত ভাঙার পর নিয়ম একাদশী পারনের। ( উপবাসের পরদিন সকালে ) যে নির্দিষ্ট সময় দেওয়া থাকে , সেই সময়ের মধ্যে পঞ্চ রবিশস্য ভগবানকে নিবেদন করে প্রসাদ গ্রহণ করে পারন করা একান্ত ভাবে দরকার । নতুবা একাদশীর কোনো ফল লাভ হবেনা । একাদশী ব্রত পালনের একমাত্র প্রকৃত উদ্দেশ্যে কেবল উপবাস করা নয়। নিরন্তর ভগবান এর নাম স্মরণ , মনন, ও শ্রবন কীর্তনের মাধ্যমে একাদশীর দিন অতিবাহিত করতে হয় । এই দিন যতটুকু সম্ভব উচিত একাদশী পালনে পরনিন্দা, পরচর্চা, মিথ্য ভাষন, ক্রোধ, দুরাচারী, স্ত্রী সহবাস, সম্পুর্ন রূপে নিষিদ্ধ ।
[বিঃ দ্রঃ নিন্মক্ত বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টি বাঞ্ছনীয়] একাদশী ব্রতের আগের দিন রাত ১২ টার আগেই অন্ন ভোজন সম্পন্ন করে নিলে সর্বোত্তম। ঘুমাতে যাওয়ার আগে দাত ব্রাশ করে দাত ও মুখে লেগে থাকা অন্ন পরিস্কার করে নেওয়া উচিত। সকালে উঠে শুধু মুখ কুলি ও স্নান করতে হয় । একাদশীর সময় সবজি কাটার থেকে সতর্ক থাকতে হবে। যেনো কোথাও কেটে না যায়। একাদশী তে রক্তক্ষরণ বর্জনীয়। দাত ব্রাশ করার সময়কালে ও রক্তক্ষরণ হয়ে থাকে। তাই আগের দিনই দাত ব্রাশ করা সর্বোত্তম । একাদশীতে চলমান একাদশীর মাহাত্ম্য ভগবদ্ভক্তের শ্রীমুখ হতে শ্রবন অথবা সম্ভব না হলে নিজেই ভক্তিসহকারে পাঠ করতে হয়। যারা একাদশীতে একাদশীর রান্না করেন তাদের পাঁচ ফোড়ন ব্যবহার থেকে সতর্ক থাকা উচিত । কারন পাঁচ ফোড়নে সরিষার তেল, তিল থাকতে পারে, যা বর্জনীয়। একাদশী তে শরীরে প্রসাধনীর ব্যবহার নিষিদ্ধ । তৈল, সুগন্ধী সাবান, শ্যাম্পু , ইত্যাদি বর্জনীয়। সকল প্রকার ক্ষৌরকর্ম__ শেভ, চুল, নখ,কাটা নিষিদ্ধ ।
[একাদশী না থাকলে কি করবেন তাও জেনে নিন]:
একাদশী না থাকা কালীন আপনি যে খাবার গ্রহণ করবেন অর্থাৎ খাদ্য শস্য গ্রহণ করবেন তা আপনি খাবেন না, তা খাবার নয় পাপ ভক্ষণ করবেন। কারন মাত্র ১টি খাদ্য শস্যের মধ্যে চার ধরনের পাপ থাকে।
[পাপ গুলো কি কি দেখুন]: ১। মাতৃ হত্যার পাপ। ২। পিতৃ হত্যার পাপ। ৩। ব্রহ্ম হত্যার পাপ। ৪। গুরু হত্যার পাপ।
আপনিই মাত্র টি দানা নয় প্রতি গ্রাসে হাজার হাজার দানা ভক্ষণ করবেন। ভেবে দেখুন যে পাপ কাজ আপনি করেন নি সেই পাপ কাজের ভাগীদার আপনাকে হতে হবে। যদি আপনি একাদশীর সময় খাদ্যশস্য গ্রহণ করেন। আর ঠিক তেমনই নিজে খেলে যে পাপ হবে অন্যকে খাওয়ালেও সেই একই পাপ হবে। তাই একজন সনাতনী হিসাবে আপনার একাদশী থাকা উচিত না অনুচিত নিজেই বিচার করুন।
(একাদশী পারন মন্ত্র)
একাদশ্যাং নিরাহারো ব্রতেনানেন কেশব ॥
প্রসীদ সুমুখ নাথ জ্ঞানদৃষ্টিপ্রদো ভব॥
শেয়ার করে সবাইকে জানিয়ে দিন .........। হরে কৃষ্ণ ।।