17/03/2025
—তাদাব্বুরে কুরআন—
'আহ্বানকারী এবং যাকে আহ্বান করা হয়'
আল্লাহর বাণী,
مثل الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أموالهم في سبيل الله كمثل حبة البنت سبع سنابل في كل ملكلة مالة حية والله يُضَاعِفُ لِمَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ
যারা আল্লাহর পথে নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের (দান)
সেই বীজের মতো, যাত্থেকে সাতটি শীষ জন্ম নেয়, প্রত্যেক শীষে একশত করে দানা। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছে বাড়িয়ে দেন। বস্তুত আল্লাহ প্রাচুর্যের অধিকারী, জ্ঞানময়।' (সূরাহ বাকারা, ২: ২৬১)
আল্লাহ তাআলা তাঁর পথে সম্পদ ব্যয়কারীর ব্যয়কে হোক জিহাদে কিংবা তাবৎ কল্যাণকর পথে-তুলনা দিয়েছেন সেই ব্যক্তির সাথে, যে একটি বীজ বপন করে, যাথেকে জন্মায় সাতটি শীষ। প্রত্যেক শীষে একশত করে দানা। আর আল্লাহ আরও বাড়িয়ে দেন, বাড়িয়ে ব্যয়কারীর অবস্থার প্রেক্ষিতে। তার ঈমান, ইখলাস এবং ইহসানের বিচারে বাড়ানো হয়। কখন খরচ করছে, কতটুকু করছে, কোথায় করছে- এসবের ওপর নির্ভর করে দানের প্রতিদান। মূলত পার্থক্য সূচিত হয় অন্তরের কারণে। দানের সময় অন্তরের ঈমান এবং ইখলাসের তারতম্য অনুযায়ী। আর তা হচ্ছে, যখন ব্যক্তি সম্পদ খরচ করে অন্তরের অন্তস্থল থেকে, খোলা মনে, উদার চিত্তে। হাতে করে দেবার আগেই অন্তর থেকেই দিয়ে দেয়া। অর্থাৎ দানের সময় অন্তরে দৃঢ়তা থাকা। পরিমাণটা যেন সামান্য না হয়। কোনো প্রকার ভয়, প্রবৃত্তির সায়-সব একপাশে রেখে দান করে দেয়া। না কাঁপে হাত, না কাপে অন্তর। এছাড়া পার্থক্য তৈরি হয় খরচ থেকে জন্মানো কল্যাণের ভিত্তিতে; কোন পথে হচ্ছে এবং দান করা সম্পদের পবিত্রতা ও নিষ্কলুষতার মাত্রা বুঝে।
এই উপমায় বোঝার কিছু বিষয় আছে: আল্লাহ তাআলা খরচ করাকে বীজ বপনের সদৃশ বলেছেন। কারণ, খরচকারী তার উত্তম সম্পদ আল্লাহর জন্যই ব্যয় করে, অন্য কারো জন্য নয়। এর মানে সে তার সম্পদ উর্বর জমিনে বপন করল। আর ফসল
কেমন ফলবে তা নির্ভর করছে বীজের মান, জমিনের উর্বরতা, যাত্নাত্নের পরিমাণের ওপর; যেমন: সেচ দেয়া, আগাছা পরিষ্কার রাখা ইত্যাদি। এই সবগুলো যখন পুঙ্খানু পুঙ্খানুভাবে পালন করা হবে এবং ফসল আগুনে পোড়ানো হবে না, কোনো প্রকার দুর্যোগ বা মহামারী আক্রমণ করবে না, তখন ফসল ফলবে পাহাড় সমান। এর উপমা হতে পারে উঁচু স্থানে বপন করা একটি শস্য দানা। যেখানে সূর্যের কিরণ পৌঁছায়, বাতাস বয়, ফলে গাছগুলো খুব ভালোভাবে বেড়ে উঠে। সময়ের সময়ে নেমে আসে আকাশ থেকে ভারী বর্ষণ। বৃষ্টিমুখর রৌদ্রমুখর পরিবেশ! এতে করে শস্যগুলো আরও কয়েকগুণ বাড়তে থাকে। ফল ধরে দ্বিগুন। যদি বৃষ্টির পরিমাণ কম হয়, তবুও অল্প হলেও জন্মাবে। এই অল্প বৃষ্টিই তার পরিমাণ বাড়িয়ে দেবে, বড় করবে। ভারী বর্ষণ, আর মাঝারী বৃষ্টির এই উপমা দুই প্রকার ব্যয়ের কথা বোঝাচ্ছে; বৃহৎ পরিসরে ব্যয় করা এবং অল্প পরিসরে করা। মানুষের মধ্যে কারো কারো দান ভারী বর্ষণের মতো, কারো হয় গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মতো। তবে আল্লাহ তাআলা অণু পরিমাণ আমলও ভেস্তে যেতে দেন না।
কিন্তু আল্লাহর রাস্তায় খরচকারী যদি (বদ আমল দ্বারা) নেক আমলগুলোকে ডুবিয়ে দেয়, সাওয়াবগুলোকে নষ্ট করে, তাহলে সে তো ঐ ব্যক্তির মতো যার একটি খেজুর এবং আঙ্গুরের বাগান আছে। সেই বাগানের মধ্য দিয়ে বয়ে যায় নদীর পানি। সেখানে জন্মায় সব প্রকারের ফলফলাদি। দেখতে দেখতে একদিন ব্যক্তিকে বার্ধক্য চেপে ধরল। কিন্তু তার বাচ্চাগুলো তখনো খুব ছোট। অপরদিকে তার ফসলে আগুনের ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানল। পুড়িয়ে দিলো (সবকিছু)। আমলের প্রতিদান বুঝে নেবার দিনে, পুরস্কার লাভের দিনে ব্যক্তি তার আমলগুলোকে ঠিক ওই বাগানওয়ালার মতোই পাবে। ফলে সেদিন তার আফসোস বাগানওয়ালার আফসোসের চেয়েও বেশি হবে।
আল্লাহ তাআলা এই দৃষ্টান্ত দিয়ে সেই আফসোসের চিত্র অঙ্কন করেছেন, সবচেয়ে প্রয়োজনের মুহূর্তে নিয়ামত হারালে যে আফসোস জাগ্রত হয়। অনেকটা ওই ব্যক্তির মতো, যিনি বার্ধক্যে উপনিত হল, দূর্বলতা চেপে বসল, সাথে আছে ছোট ছোট সন্তানসন্ততি; ফলে তার প্রাপ্ত নিয়ামত থেকে তারা কোনো উপকার লাভ করতে পারে না। অথচ সেই মুহূর্তে তার এবং সন্তানসন্ততির জন্য সেই নিয়ামত অত্যন্ত জরুরি ছিল। কারণ, তারা সবাই দুর্বল। তাহলে সেই ব্যক্তির অবস্থা কেমন হবে, যার একটি বাগান আছে, সেখানে সব প্রকার ফল জন্মায়, মানেও উৎকৃষ্ট এবং সুন্দর ফল, খেজুর, আঙ্গুর, এসব তার এবং তার সন্তানসন্ততির জন্য যথেষ্ট হতো; এরপর আকস্মিক সেই বাগানে আগুন ছেয়ে গেল! এর চেয়ে বড় দুঃখজনক এবং আফসোসের বিষয় আর কি হতে পারে!
___________________________
~ইমাম ইবনুল কাইয়্যুম رحمه الله
[আল আমছাল ফিল কুরআনিল কারিম]