22/07/2026
মা জয়দুর্গার ধ্যানমন্ত্র তো আমরা সকলেই জানি কিন্তু এই ধ্যানের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মায়ের সেই পরমতত্ত্ব যা আজ আলোচনা করবো। মা জয়দুর্গার ধ্যানে আমরা দেখতে পাই -
ওঁ হ্রীং কালাভ্রাভাং কটাক্ষেররিকুলভয়দাং মৌলিবদ্ধেন্দুরেখাং শঙ্খং চক্রং কৃপাণং ত্রিশিখমপি করৈরুদ্বহন্তীং ত্রিনেত্রাম্। সিংহস্কন্ধাধিরূঢাং ত্রিভুবনমখিলং তেজসা পূরয়ন্তীং ধ্যায়েদ্দুর্গাং জয়াখ্যাং ত্রিদশপরিবৃতাং সেবিতাং সিদ্ধিকামৈঃ।।
এই ধ্যান আদতে কিন্তু কোনো সাধারণ ধ্যান নয় এটি একাধারে সাধকের অন্তর্দেহেরই চিত্র স্বরূপ বলা যেতে পারে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে এটি মা জয়দুর্গার রূপ বর্ণন মনে হলেও সাধকের দৃষ্টিতে এই ধ্যানের রূপ অন্য। যোগশাস্ত্রে বলা হয়—“যদ পিণ্ডে তদ ব্রহ্মাণ্ডে”—অর্থাৎ এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যা কিছু বিদ্যমান, তা আমাদের এই ক্ষুদ্র মানবদেহের ভেতরেও সূক্ষ্মরূপে বিদ্যমান। সাধক যখন স্থূল জগৎ আর চিন্তা হতে মুক্ত হয়ে হন, তখন তাঁর কাছে দেবীর এই ধ্যান হয়ে উঠে নিজ অন্তরের সেই পরমতত্ত্বে।
ধ্যানের প্রথমেই আমরা দেখতে পাই "কালাভ্রাভাং"—যা সাধারণ অর্থে সজল কৃষ্ণমেঘের মতো বর্ণ । কিন্তু সাধকের কাছে এর মানে অন্য। এই "কালাভ্রাভাং" নির্দেশ করে আমাদের মণিপুর চক্রকে।
আমাদের মেরুদণ্ডের নাভিপ্রদেশে অবস্থিত মণিপুর চক্র হলো প্রাগ্অগ্নির স্থান। এটি অগ্নিতত্ত্বের আধার।
সাধনায় যখন এই চক্রে পান ও অপান বায়ুর মিলন ঘটে, তখন সেখানকার অগ্নির প্রাথমিক রূপটি হয় প্রলয়কালীন ঘন, সজল নীল-কালো মেঘের মতো। যেমন তীব্রতম অগ্নির মূল উৎস থাকে গভীর নীলবর্ণ, ঠিক তেমনি শক্তি যখন নাভিপ্রদেশে প্রথম স্পন্দিত হতে শুরু করে, তখন সাধকের অন্তর্দৃষ্টিতে সেই তেজ নিবিড় নীল-কৃষ্ণ আভার মতো প্রতিভাত হয়।
এই চক্র হলো আমাদের অহং ও বাসনার প্রধান স্থান। এই চক্রে দেবীর জয়া রূপের প্রকাশ ঘটে।
জয়া অর্থ যিনি বিজয়িনী। যে পরমশক্তি আমাদের ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ভয়, কাম ও মোহ রূপি অসুরদের জয় করে সাধককে ঊর্ধ্বমার্গে পরিচালিত করেন।
এই নাভিচক্রেরই প্রজ্জ্বলিত এই সজল-মেঘবরণী শক্তির স্থান থেকেই দেবীর মূল তেজের স্ফুরণ ঘটে যা সমগ্র দেহ মধ্যকার ব্রহ্মাণ্ডকে প্লাবিত করে।
এরপর আমরা দেখতে পাই "কটাক্ষৈররিকুলভয়দাং" অর্থাৎ —ষড়রিপু বিনাশে যে শক্তি নাভিচক্রে কালাভ্র তমসাচ্ছন্ন তেজে বিরাজমান, তাঁর কটাক্ষ বা সামান্য অপাঙ্গ দৃষ্টিপাতে শত্রুকুল ভীত ও কম্পমান হয়।
আমরা জানি সাধনার মূল শত্রু হলো সাধকের অন্তরের ষড়রিপু যথা —কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য। এগুলো হলো সাধনার পথে আসা নানা প্রকার বাধা । শক্তি যখন মণিপুর চক্র অতিক্রম করে অনাহতের দিকে ধাবিত হয়, তখন দেবীর সেই শক্তির সামান্য রশ্মি দৃষ্টিপাত মাত্রই মনের ভিতরে থাকা অবিদ্যা এক নিমেষে ভস্মীভূত হয়ে যায়। সাধক তখন ভয়হীন এক পরম স্থিতি লাভ করেন।
নাভিচক্র থেকে নির্গত সেই পরমশক্তি যখন ঊর্ধ্বমুখী হয়ে সাধকের মস্তিষ্কের দিকে ধাবিত হয়, তখন প্রকাশিত হয় দেবীর "মৌলিবদ্ধেন্দুরেখাং"আর "ত্রিনেত্রাম্" রূপ।
মৌলিবদ্ধেন্দুরেখাং অর্থাৎ, সাধকের মস্তকস্থিত সহস্রার চক্র হলো ইড়া ও পিঙ্গলা নাড়ীর চরম মিলনস্থল আর সোমরসের আধার। দেবী যখন সহস্রারে পরম শিবের সাথে মিলিত হন, তখন সেখান থেকেই এক ধরনের শীতল চিদামৃত ক্ষরিত হয়।
তা দেবী নিজের মস্তকেই সেই চন্দ্রকলা রূপে ধারণ করে আছেন যা সাধকের চিত্তে শান্তি, বোধ্যজ্ঞান ও আনন্দ রস বর্ষণ করে। তাই তো তিনি মৌলিবদ্ধেন্দুরেখাং 😊।
দেবীর ডান চোখ হলো সূর্যরূপী পিঙ্গলা নাড়ী এবং বাম চোখ হলো চন্দ্ররূপী ইড়া নাড়ী আর তৃতীয় নয়ন হলো অগ্নিরূপী সুষুম্না নাড়ী। যখন সুষুম্নার দ্বার উন্মুক্ত হয় এবং তৃতীয় নয়ন জাগ্রত হয়, তখন সাধক অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ—ত্রিকালের পরম সত্যকে এক বিন্দুতে প্রত্যক্ষ করেন। তখন আর দ্বৈতভাব থাকে না তা বিলুপ্ত হয়ে অদ্বৈত প্রজ্ঞার উদয় হয়। তাই তো তিনি ত্রিনেত্রাম্।
মা জয়াদুর্গা চার হাতে আমরা দেখতে পাই চার অস্ত্র যথা - শঙ্খ, চক্র, কৃপাণ ও খড়গ। যা আদতে সাধকের অন্তর্জাগরণেরই চার রূপ ।
প্রথমেই বলি শঙ্খের ব্যাপারে। শঙ্খ হলো 'অনাহত নাদ' এর প্রতীক। সাধক যখন ধ্যানস্থ হন, তখন তাঁর দেহের ভেতরে এক স্বতঃস্ফূর্ত দিব্য শঙ্খধ্বনি অনুরণিত হতে থাকে যা মনকে নিমেষের মধ্যে স্থির করে দেয়।
এরপরে আসি চক্রে, এটি কালের চক্র ও মানবদেহের নবচক্রের গতিবিধির প্রতীক। এটি আদতে পরম প্রজ্ঞারই একপ্রকার ঘূর্ণন মাত্র যা সাধকের সূক্ষ্ম শরীরের সমস্ত গ্রন্থি ও চক্রকে বিশোধিত করে। কৃপাণ হলো তীব্র বিবেক আর জ্ঞানের অস্ত্রস্বরূপ । সাধক এই জ্ঞান-খড়্গ দিয়ে এক কোপে মায়ার বন্ধন, অহংকার এবং জন্ম-জন্মান্তরের সঞ্চিত কর্মফলের পাশ কেটে ফেলে দেন।
এরপর বলি ত্রিশিখ এর ব্যাপারে, ত্রিশিখ সাধারণ অর্থে ত্রিশূল। এটি ত্রিগুণ তথা - সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ এবং ত্রিনাড়ী অর্থাৎ ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না কে বলা যেতে পারে এটি দুই অর্থেই সঠিক।
এখন প্রশ্ন মনে আসতে পারে মা কেন সিংহস্কন্ধাধিরূঢাং? কারণ আমরা জানি সিংহ হলো বনের রাজা—যা চরম অহংকার, তমঃ ও রজোগুণ, হিংসা ও পাশব প্রকৃতির রূপক। সাধারণত মানুষেরা প্রবৃত্তির দ্বারাই চালিত হয় কিন্তু একজন সাধক যখন শক্তিকে জাগ্রত করেন, তখন জাগ্রত সেই কুণ্ডলিনী সিংহরূপী অহংকার ও পশুপ্রবৃত্তির ওপর আরোহণ করেন। অর্থাৎ, সাধকের তমো ও রজোগুণ তখন সম্পূর্ণ দমিত হয়ে দেবীর দিব্য বাহনে পরিণত হয়। শক্তির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এসে সাধকের ভেতরের হিংস্রতা বীরভাবে এবং বীরভাব পরম দিব্যভাবে রূপান্তরিত হয়।
সবশেষে, শক্তি যখন নবচক্র ভেদ করে তখন সাধকের ভিতরে উদ্ভাসিত হয় সেই ত্রিভুবনমখিলং রূপ। সাধকের ক্ষেত্রে এই ত্রিভুবন' হলো তাঁর তিনটি মূল শরীর যথা- স্থূল শরীর, সূক্ষ্ম শরীর এবং কারণ শরীর। শক্তির পরম তেজে এই তিন শরীরই তখন হয়ে উঠে পুষ্ট, শুদ্ধ ও জ্যোতির্ময়। তখন দেহের প্রতিটি কোষেই শক্তির এক আলাদাই স্ফুরণ ঘটে আর সাধক তখন পঞ্চভূতের ও পঞ্চকোশের বন্ধন ছাড়িয়ে এক দিব্য চৈতন্যাস্বাদ লাভ করেন।
জয় মা রাজরাজেশ্বরী 🙏😊🙏
~ চিত্র ও লেখা - সৃজন ভট্টাচার্য্য
এডমিন - দশমহাবিদ্যা তত্ত্ব
[ এই লেখাটি যদি কপি করতে চান তাহলে কোনো ভাবেই লেখাটি পরিবর্তন করা যাবে না। লেখক এর নাম অবশ্যই থাকতে হবে ]