07/05/2026
১৮৩১ সালের ৬ মে বালাকোটের প্রান্তরে যে বিপ্লবের বীজ রোপিত হয়েছিল, তা থেকেই অঙ্কুরিত হয়েছে এ যমিনের আযাদি ও অধিকার আদায়ের প্রতিটি সংগ্রাম।
১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলা এবং ১৮০৩ সালে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর সমগ্র ভারতবর্ষের শাসনক্ষমতা দখল করে নেয় ফিরিঙ্গি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে পরিকল্পিতভাবে ইসলামকে মুছে ফেলা হলো এবং মুসলিমদের হাতে পরিয়ে দেওয়া হলো পরাধীনতার জিঞ্জীর।
এর বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম জোরালো কণ্ঠস্বর তুলেছিলেন শাহ আব্দুল আযিয দেহলভী (রহ.)। তিনি তাঁর পিতা মহান সংস্কারক শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভীর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ঘোষণা করেন যে, ভারতবর্ষে ইসলামের শাসনকর্তৃত্ব আজ অনুপস্থিত। এক ঐতিহাসিক ফতোয়ায় তিনি ভারতবর্ষকে ‘দারুল হারব’ হিসেবে ঘোষণা করেন এবং দখলদার ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আবশ্যক বলে রায় দেন। এই ফতোয়া ছিল ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে প্রথম প্রকাশ্য বিদ্রোহের ঘোষণা। তাঁকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল রূপকার বললে কোনো অত্যুক্তি হবে না।
এই ঐতিহাসিক ফতোয়া ভারতবর্ষের মুসলমানদের মনে এক নতুন সংগ্রামী চেতনার সঞ্চার করে। এটি মুসলিম সমাজ সংস্কার ও ইসলামের পুনর্জাগরণ আন্দোলনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। তৎকালীন ভারতবর্ষের প্রথম সুসংগঠিত ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ছিল ‘তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়া’। উত্তরপ্রদেশের রায়বেরেলির সাইয়েদ আহমাদ শহীদ শাহ ওয়ালিউল্লাহ ও শাহ আব্দুল আযিযের চিন্তাধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে এ ভূখণ্ডে ইসলামের পুনর্জাগরণ ও ব্রিটিশ বিতাড়নের সংকল্প গ্রহণ করেন। ছাত্রজীবনে তিনি শাহ আব্দুল আযিযের সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন। শাহ আব্দুল আযিযের স্বপ্ন ছিল সমগ্র ভারতবর্ষের মুসলিমদের ‘সিরাতে মুস্তাকীমের’ পথে পরিচালিত করা, আর সেই মহান দায়িত্ব অর্পিত হয় সাইয়েদ আহমাদের ওপর। ফলে দলে দলে মানুষ তাঁর হাতে বায়আত গ্রহণ করতে শুরু করে। তৎকালীন বিখ্যাত আলিম-উলামাগণও এতে পিছিয়ে ছিলেন না। শাহ ইসমাইল শহীদ ও মাওলানা আব্দুল হাইয়ের মতো বরেণ্য ব্যক্তিরা তাঁর হাতে বায়আত হন। তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন স্থান থেকে দাওয়াত আসতে থাকে। তিনি ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত ভ্রমণ করে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন এবং বায়আত গ্রহণ করেন। তাঁর দাওয়াহর মূল ভিত্তি ছিল দুটি:
১) বিশুদ্ধ তাওহীদের প্রচার: অর্থাৎ আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। বান্দা ও আল্লাহর মাঝে কোনো মাধ্যম নেই—চাই তিনি ফেরেশতা, আলিম বা পীর যে-ই হোন না কেন। বান্দার সম্পর্ক হবে সরাসরি আল্লাহর সাথে।
২) জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান মান্য করা: ইবাদত, বিচারব্যবস্থা কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনা—কোনো ক্ষেত্রেই আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরিক করা যাবে না। মুসলিম হিসেবে একজন ব্যক্তি কোনো অবস্থাতেই আল্লাহর নাযিলকৃত বিধানের বাইরে অন্য কোনো বিধান মেনে নিতে পারে না।
সাইয়েদ আহমাদ শহীদের অনাড়ম্বর জীবন, আপসহীন আদর্শবাদিতা ও নিঃস্বার্থ চারিত্রিক মাধুর্যে যারা কাছে এসেছেন, তারাই মুগ্ধ হয়েছেন। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে নেমে এসেছিল আল্লাহর রহমত ও অভাবনীয় সাফল্য। উত্তর ভারত থেকে শুরু হওয়া এই ‘তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়া’ আন্দোলন ঊনবিংশ শতাব্দীর বিশ ও ত্রিশের দশকের দিকে বাংলায় এসে পৌঁছায়। ১৮২০ সালে তিনি যখন কলকাতায় আসেন, তখন প্রায় দশ হাজার অনুসারী তাঁর চারপাশে সমবেত হয়েছিল।
ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদে নামার আগে তিনি আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণ ও শক্তি সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে পবিত্র হজ্জ পালনের পরিকল্পনা করেন। ১৮২১ সালের জুলাই মাসে তিনি মক্কার পথে যাত্রা করেন। যাত্রাপথে তিনি পুনরায় কলকাতায় আসেন এবং তিন মাস অবস্থানকালীন সময়ে অত্যন্ত সফলভাবে তাঁর দাওয়াহ প্রচার করেন। এই সময়েই বাংলার বীর মুজাহিদ সাইয়েদ নিসার আলী ওরফে তিতুমীর তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং বাংলার গ্রামীণ জনপদে ‘তরিকায়ে মুহাম্মাদিয়া’ প্রচারে উদ্বুদ্ধ হন।
আরবে অবস্থানকালে সাইয়েদ আহমাদ শহীদ বিশ্ব মুসলিমের দুর্দশা ও লাঞ্ছনা সম্পর্কে অবগত হন। তিনি উপলব্ধি করেন, কীভাবে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে দ্রুতগতিতে শোষণ ও আধিপত্য বিস্তার করছে। এই বাস্তবতা তাঁর বিপ্লবী চেতনাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। ভারতে ফিরে তিনি পূর্ণ উদ্যমে আন্দোলন পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। প্রস্তুতির প্রাথমিক ধাপ হিসেবে তিনি তিনটি কাজ করেন:
১) শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য পর্যাপ্ত যোদ্ধা, অর্থ ও সমরাস্ত্র সংগ্রহ করা;
২) মুজাহিদ বাহিনীকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য একজন যোগ্য নেতা নির্বাচন করা;
৩) মুজাহিদদের নিরাপত্তার স্বার্থে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে কোনো মুসলিম শাসিত এলাকায় স্বাধীন কেন্দ্র বা ঘাঁটি স্থাপন করা।
প্রথম দুটি কাজ বেশ সহজেই সম্পন্ন হলো। দাওয়াত পৌঁছানো ও তহবিল সংগ্রহের জন্য তিনি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁর প্রতিনিধি বা খলিফাদের প্রেরণ করলেন। মুজাহিদদের নেতা হিসেবে সবাই তাঁকেই সানন্দে গ্রহণ করে নিল। এরপর তিনি সীমান্তের স্বাধীন এলাকাগুলোতে আন্দোলনের কেন্দ্র স্থাপনের কাজ শুরু করেন। তিনি ভেবেছিলেন, শত্রু থেকে দূরে এমন একটি স্বাধীন এলাকা যুদ্ধের কৌশল হিসেবে সহায়ক হবে এবং সীমান্তের দুর্ধর্ষ ও সাহসী উপজাতিরা এই জিহাদে তাঁর প্রধান শক্তি হয়ে দাঁড়াবে। মুজাহিদদের আহ্বানে সাধারণ উপজাতীয় জনগণ স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া দিলেও গোত্রপতিরা খুব একটা উৎসাহ দেখায়নি। সত্য প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে এটি এক চিরন্তন চিত্র—নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরাই অনেক সময় কায়েমি স্বার্থের কারণে বৃহত্তর ত্যাগের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
অবিভক্ত ভারতের কোণে কোণে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রস্তুতি ও জনমত গঠন শেষে, ১৮২৬ সালে সাইয়েদ আহমাদ (রহ.) রায়বেরেলী ত্যাগ করেন। জিহাদের কেন্দ্র হিসেবে তিনি বেছে নেন আফগানিস্তানকে। যাত্রাকালে তাঁর সঙ্গে মুজাহিদের সংখ্যা ছিল ১২ হাজার, যা অল্প সময়ের মধ্যেই এক লাখে উন্নীত হয়। কান্দাহার ও কাবুল অতিক্রম করে তাঁরা খেশগীতে পৌঁছান এবং ১৮২৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর নওশেরায় অবস্থান গ্রহণ করেন।
সে সময় পাঞ্জাবে শিখ শক্তি এক প্রবল প্রতাপে আবির্ভূত হয়েছিল। ১৮১৫ সালে ওয়াটারলুর যুদ্ধে নেপোলিয়নের পরাজয়ের পর তাঁর সেনাবাহিনী ভেঙে দেওয়া হলে অনেক অভিজ্ঞ ফরাসি সেনা কর্মকর্তা, বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী শিখ রাজা রণজিৎ সিং-এর দরবারে আশ্রয় নেন। তাঁদের রণকৌশল ও কারিগরি দক্ষতায় শিখ বাহিনী এক অপরাজেয় সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়। এই শক্তির দাপটে তারা ভারতের সীমান্ত এলাকাগুলো দখল করতে শুরু করে এবং স্থানীয় মুসলিম ও সাধারণ জনগণের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালায়।
নওশেরায় পৌঁছে সাইয়েদ আহমাদ শহীদ অত্যাচারী শিখ রাজা বুধ সিং-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন। যুদ্ধের আগে ইসলামী রীতি অনুযায়ী তিনি প্রথমে কর বা জিজিয়া প্রদানের প্রস্তাব দেন। এর পরপরই খবর আসে যে, বুধ সিং বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে আকুড়ায় প্রবেশ করেছে। সংবাদ শুনেই তিনি সকলকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দেন। সেই রাতে মুসলিম বাহিনীর অতর্কিত হামলায় সাতশ শিখ সৈন্য নিহত হয়। এই অসম লড়াইয়ে ৩৬ জন ভারতীয় ও ৪৫ জন কান্দাহারী মুজাহিদ শাহাদাত বরণ করেন এবং আরও অনেকেই আহত হন। এই প্রথম বিজয় মুজাহিদদের মনোবল ও উদ্দীপনাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
শিখ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে মুজাহিদদের এই গেরিলা অভিযানগুলো ছোট-বড় নানা মাত্রায় অব্যাহত থাকে। একপর্যায়ে পেশোয়ারের অধিবাসীরা শিখদের ওপর চূড়ান্ত হামলার জন্য সাইয়েদ আহমাদকে আহ্বান জানায়। সে সময় প্রায় দশ হাজার দুর্ধর্ষ যোদ্ধা তাঁকে নেতা হিসেবে গ্রহণ করে এবং মুজাহিদদের মোট সংখ্যা এক লাখে পৌঁছায়। এদিকে রণজিৎ সিং গদি রক্ষায় চক্রান্ত শুরু করেন। তিনি কতিপয় মুসলিম গোত্রনেতাকে অর্থের লোভে বশীভূত করার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত মুজাহিদ বাহিনীকে তিনটি ফ্রন্টে লড়াই করতে হয়—শিখ সৈন্য, পেশোয়ারের বিশ্বাসঘাতক নেতা এবং খুবি খাঁ। তবে বালাকোটের চূড়ান্ত যুদ্ধের আগে প্রতিটি লড়াইয়েই শিখরা মুজাহিদদের কাছে পরাজিত হয়। সাইয়েদ আহমাদের একটি চিঠিতে উল্লেখ পাওয়া যায় যে, শেষ পর্যায়ে মুজাহিদদের সংখ্যা ৩ লাখে উপনীত হয়েছিল। ১৮৩০ সালে রণজিৎ সিং-এর প্রশিক্ষিত ‘খালসা বাহিনী’কে পরাজিত করে তাঁরা পেশোয়ার জয় করেন এবং পাঞ্জতারকে রাজধানী করে সেখানে শরিয়াহ শাসন কায়েম করেন।
তবে এই বিজয়ের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় ঘরের শত্রু বিভীষণরা। স্থানীয় অনেক গোত্রনেতা স্বার্থের লোভে বিশ্বাসঘাতকতা করে শত্রুদের সঙ্গে হাত মেলায়। তাদের বারবার এই বিশ্বাসভঙ্গ ও ষড়যন্ত্রে সাইয়েদ আহমাদ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন এবং মুজাহিদ বাহিনীও বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। শেষ পর্যন্ত তিনি আন্দোলনের প্রধান ঘাঁটি কাশ্মীরে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
যাত্রাপথে আম্বের পায়েন্দা খাঁ বাধা দিলে মুজাহিদ সেনাপতি শাহ ইসমাঈল আম্ব জয় করেন এবং সেখানে ঘাঁটি স্থাপন করেন। আম্ব থেকে মর্দান পর্যন্ত এক বিশাল এলাকা মুজাহিদদের অধীনে আসে এবং সেখানে ইনসাফভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা কায়েম হয়। সাইয়েদ আহমাদ মাওলানা মাযহার আলীকে কাজী নিযুক্ত করেন এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব দেন কাবুলের আমির দোস্ত মুহাম্মদের ভাই সুলতান মুহাম্মদের হাতে।
১৮৩০ সালের ডিসেম্বর মাস। সাইয়েদ আহমাদ শহীদ পেশোয়ারের পাঞ্জতার ঘাঁটি থেকে কাশ্মীর অভিমুখে যাত্রা করেন। বর্তমান হাযারা অঞ্চলের উঁচু ভূমি পার হয়ে তিনি মুযাফফরাবাদের দিকে অগ্রসর হন এবং চূড়ান্ত প্রস্তুতির জন্য পাহাড়ঘেরা বালাকোট উপত্যকায় শিবির স্থাপন করেন। কিন্তু বিশ্বাসঘাতক নেতারা এই গোপন খবর শিখদের কাছে পৌঁছে দেয়। ফলে শিখ সেনাপতি শের সিং এক বিশাল বাহিনী নিয়ে মুজাহিদদের পিছু নেয়।
শত্রুর গতিবিধি লক্ষ করে সাইয়েদ আহমাদ যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিকল্পনা সাজান। বালাকোট শহরের পশ্চিমে উত্তর-দক্ষিণমুখী একটি কৌশলগত অবস্থানে যুদ্ধের ময়দান প্রস্তুত করা হয়। আত্মবিশ্বাসী সাইয়েদ আহমাদ বিচক্ষণতার সঙ্গে মেট্টিকোট টিলার পাদদেশে ও সাতবানে ঝরনার আশপাশে মুজাহিদদের মোতায়েন করেন। কিন্তু ৫ মে দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিপুল সংখ্যক শিখ সৈন্য অন্যদিক দিয়ে মেট্টিকোট পাহাড়ের চূড়ায় উঠে পড়ে। এর ফলে নিচের সমতলে থাকা মুজাহিদরা শত্রুর নিশানার মধ্যে চলে আসেন।
পরদিন, ৬ মে ১৮৩১, শুক্রবার। ১০ হাজার শিখ সেনার বিরুদ্ধে মাত্র ৭০০ মুজাহিদের এক অসম লড়াই শুরু হয়। প্রায় দুই ঘণ্টা স্থায়ী এই যুদ্ধে শত্রুদের সুবিধাজনক অবস্থান, সৈন্যসংখ্যার বিশাল পার্থক্য, রসদপত্রের অভাব এবং মুনাফিকদের বিশ্বাসঘাতকতায় মুজাহিদ বাহিনী কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। যুদ্ধের একপর্যায়ে সাতবানে ঝরনার কাছে প্রধান নেতা সাইয়েদ আহমাদ ও শাহ ইসমাঈল শাহাদাত বরণ করেন। তাঁদের সঙ্গে অসংখ্য মুজাহিদও জীবন উৎসর্গ করেন। আপাতদৃষ্টিতে এই ক্ষুদ্র অথচ সাহসী বাহিনীর পরাজয় ঘটে।
কিন্তু বালাকোটের সেই রক্তক্ষয়ী প্রান্তরে সংগ্রামের যে আগুন জ্বলে উঠেছিল, তা নিভে যায়নি। পরবর্তীতে পাটনার সিত্তানা থেকে মাওলানা উইলায়াত আলী ও ইনায়াত আলী এই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যান। ব্রিটিশদের দমন-পীড়নে এক সময় আন্দোলন স্তিমিত হলেও এর বিপ্লবী আদর্শ ভারতবর্ষের প্রতিটি স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত গড়ে দিয়েছিল।
তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, ১৮৫৭ সালের মহাবিপ্লব, হাজী শরীয়তুল্লাহর ফরায়েজী আন্দোলন কিংবা ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রাম—প্রতিটি আন্দোলনের গভীরে সাইয়েদ আহমাদ শহীদের চেতনার ছাপ ছিল স্পষ্ট।
আমাদের স্বাধীনতার লড়াইয়ের সূচনাবিন্দু ছিল বালাকোট। আজ প্রায় দুইশ বছর পেরিয়ে গেছে। এই সুদীর্ঘ সময়ে আমরা বারবার স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় জেগে উঠেছি, বালাকোটের ত্যাগকে প্রেরণা মেনে লড়াই করেছি এবং রক্ত দিয়েছি। আযাদির লড়াইয়ের এই সিলসিলা আজও চলমান। বালাকোট যেমন আমাদের পূর্বসূরিদের উজ্জীবিত করেছিল, তেমনি আজও আমাদের জন্য এক জ্বলন্ত অনুপ্রেরণার নাম।