15/08/2026
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দুজন স্ত্রী এবং ৬ জন সন্তান তাঁর জীবদ্দশায় ইন্তেকাল করেন!
এছাড়াও অসংখ্য সাহাবী শাহাদাতবরণ করেন, কেউ কেউ স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন।
এই লেখায় এমন ২০ জন সাহাবী ও সাহাবিয়ার নামোল্লেখ করা হয়েছে, যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় ইন্তেকাল করেন।
১. খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী। নবুওয়াতের দশম বছরে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর কবর মক্কায়, জান্নাতুল মুয়াল্লায়। একই বছরে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর চাচা আবু তালিবকেও হারান। প্রিয় দুই মানুষকে হারানোর কারণে সীরাতের এই বছরটি ‘আমুল হুযন’ বা দুঃখের বছর নামে পরিচিত।
২. হামজা রাদিয়াল্লাহু আনহু: উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা হামজা রাদিয়াল্লাহু আনহু শাহাদাতবরণ করেন। বদর যুদ্ধে তাঁর হাতে কুরাইশের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নিহত হয়েছিলেন। উহুদের আগে জুবাইর ইবনে মুতইম তার দাস ওয়াহশিকে হামজা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে হত্যা করতে পারলে মুক্ত করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। ওয়াহশির নিক্ষিপ্ত বর্শাতেই হামজা রাদিয়াল্লাহু আনহু শহীদ হন।
৩. সুমাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহা: ইসলামের ইতিহাসের প্রথম শহীদ সুমাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহা। তিনি ইয়াসির রাদিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রী এবং আম্মার ইবনে ইয়াসির রাদিয়াল্লাহু আনহুর মা। ইসলাম গ্রহণের কারণে পুরো পরিবারটির ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয়। একপর্যায়ে আবু জাহল সুমাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহাকে হত্যা করে। তিনি ইসলামের প্রথম শহীদ হিসেবে প্রসিদ্ধ।
৪. ইয়াসির রাদিয়াল্লাহু আনহু: সুমাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহার স্বামী এবং আম্মার রাদিয়াল্লাহু আনহুর বাবা। মক্কার দুর্বল মুসলিম পরিবারগুলোর মধ্যে ইয়াসিরের পরিবার ছিল সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত পরিবারগুলোর একটি। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাদের নির্যাতন দেখতেন এবং বলতেন, ‘সবর করো, হে ইয়াসিরের পরিবার! তোমাদের প্রতিশ্রুত স্থান জান্নাত।’ ইয়াসির রাদিয়াল্লাহু আনহুও মক্কায় নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
৫. মুস‘আব ইবনে উমাইর রাদিয়াল্লাহু আনহু: মক্কার অত্যন্ত ধনী ও বিলাসী পরিবারের সন্তান ছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর সবকিছু ছেড়ে দেন। মদীনায় ইসলামের প্রথম দাঈ হিসেবে তাঁকেই পাঠানো হয়েছিল। তাঁর দাওয়াতেই মদীনার বহু গুরুত্বপূর্ণ পরিবার ইসলাম গ্রহণ করে। উহুদের দিন মুসলিম বাহিনীর পতাকা ছিল তাঁর হাতে। সেই পতাকা রক্ষা করতে করতেই তিনি শাহাদাতবরণ করেন। মৃত্যুর পর তাঁর পুরো শরীর ঢাকার মতো যথেষ্ট বড় কাফনের কাপড়ও পাওয়া যায়নি।
৬. হানযালা ইবনে আবি আমির রাদিয়াল্লাহু আনহু: উহুদের রাতেই তাঁর বিয়ে হয়েছিল। যুদ্ধের ডাক শুনে গোসল করার আগেই তিনি যুদ্ধের ময়দানে চলে আসেন। উহুদে তিনি শাহাদাতবরণ করেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ জানান, ফেরেশতারা তাঁকে গোসল করাচ্ছেন। এজন্য তিনি ইতিহাসে ‘গাসীলুল মালায়িকা’, অর্থাৎ ফেরেশতাদের দ্বারা গোসলপ্রাপ্ত ব্যক্তি নামে পরিচিত হন।
৭. আব্দুল্লাহ ইবনে জাহশ রাদিয়াল্লাহু আনহু: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ফুফাতো ভাই। উহুদের আগে তিনি সা‘দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে আলাদা হয়ে দু‘আ করেছিলেন। তাঁর দু‘আ ছিল, এমন একজন শক্তিশালী শত্রুর মুখোমুখি যেন হন, যে তাঁকে হত্যা করবে এবং তাঁর নাক-কান কেটে দেবে। এরপর আল্লাহর সামনে তিনি বলতে পারবেন, ‘আপনার জন্যই আমার সাথে এমন করা হয়েছে।’ উহুদের দিন তাঁর সেই দু‘আর সাথে মিলে যায় এমনভাবেই তিনি শাহাদাতবরণ করেন।
৮. সা‘দ ইবনে মু‘আয রাদিয়াল্লাহু আনহু: আনসারদের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা। তাঁর ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর গোত্র বনু আবদুল আশহালের মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে। খন্দকের যুদ্ধে তাঁর হাতে গুরুতর আঘাত লাগে। পরে সেই ক্ষত থেকেই তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ‘সা‘দ ইবনে মু‘আযের মৃত্যুতে আরশ কেঁপে উঠেছে।’
৯. উসমান ইবনে মায‘উন রাদিয়াল্লাহু আনহু: ইসলামের একেবারে প্রথম যুগের সাহাবী এবং প্রথম হাবশা হিজরতে অংশগ্রহণকারীদের একজন। অত্যন্ত ইবাদতগুজার ছিলেন। মদীনায় মুহাজিরদের মধ্যে প্রথম মৃত্যুবরণকারী হিসেবে তিনি প্রসিদ্ধ। তাঁকে জান্নাতুল বাকীতে দাফন করা হয়।
১০. আস‘আদ ইবনে যুরারাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু: মদীনায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম। আকাবার বাইআতের আগেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মুস‘আব ইবনে উমাইর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে মদীনায় দাওয়াতের কাজে সহযোগিতা করেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ মদীনায় হিজরত করার অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ইন্তেকাল করেন। আনসারদের মধ্যে প্রথম দিকে মৃত্যুবরণকারীদের অন্যতম তিনি।
১১. আবু সালামা আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল আসাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দুধভাই এবং প্রথম যুগের মুসলিম। হাবশা ও মদীনা, দুই হিজরতই করেছিলেন। উহুদে পাওয়া আঘাত পরবর্তীতে আবার গুরুতর হয়ে ওঠে এবং ৪ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর জন্য দু‘আ করেন। পরবর্তীতে তাঁর স্ত্রী উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ বিয়ে করেন।
১২. যায়দ ইবনে হারিসা রাদিয়াল্লাহু আনহু: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অত্যন্ত প্রিয় সাহাবী। একসময় মানুষ তাঁকে যায়দ ইবনে মুহাম্মাদ বলেও ডাকত। মু’তার যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রথম সেনাপতি হিসেবে তাঁকেই নিযুক্ত করেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছিলেন, যায়দ শহীদ হলে জাফর নেতৃত্ব নেবে। মু’তার ময়দানে পতাকা হাতে যুদ্ধ করতে করতে যায়দ রাদিয়াল্লাহু আনহু শাহাদাতবরণ করেন।
১৩. জাফর ইবনে আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু: আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর বড় ভাই। হাবশায় নাজাশির দরবারে ইসলামের পক্ষে তাঁর ঐতিহাসিক বক্তব্য সীরাতের অন্যতম বিখ্যাত ঘটনা। মু’তার যুদ্ধে যায়দ রাদিয়াল্লাহু আনহু শহীদ হওয়ার পর পতাকা তুলে নেন জাফর। যুদ্ধ করতে করতে তাঁর দুই হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং তিনি শাহাদাতবরণ করেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ জানান, আল্লাহ তাঁর দুই হাতের পরিবর্তে জান্নাতে দুটি ডানা দিয়েছেন। এজন্য তিনি ‘জাফর আত-তাইয়ার’ নামেও পরিচিত।
১৪. আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রাদিয়াল্লাহু আনহু: আনসারদের বিখ্যাত কবি ও সাহাবী। মু’তার তৃতীয় সেনাপতি ছিলেন তিনি। যায়দ ও জাফর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা একে একে শহীদ হওয়ার পর নেতৃত্ব তাঁর হাতে আসে। কিছু মুহূর্ত নিজের নফসের সাথে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত সামনে এগিয়ে যান এবং শাহাদাতবরণ করেন। একই যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নির্ধারিত তিন সেনাপতিই একে একে শহীদ হন।
১৫. হারিস ইবনে উমাইর আল-আযদি রাদিয়াল্লাহু আনহু: রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে দূত হিসেবে শামের দিকে পাঠিয়েছিলেন। পথে গাসসানি শাসক শুরাহবিল ইবনে আমর তাঁকে আটক করে হত্যা করে। সাধারণত রাষ্ট্রীয় দূতকে হত্যা করা হতো না। তাঁর হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়াতেই রাসূলুল্লাহ ﷺ মু’তার দিকে তিন হাজার সৈন্যের বাহিনী পাঠান। এভাবেই তাঁর শাহাদাত মুসলিমদের সাথে বাইজেন্টাইন প্রভাবাধীন শক্তির সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হয়ে দাঁড়ায়।
১৬. রুকাইয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহা: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কন্যা এবং উসমান ইবনে আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রী। বদর যুদ্ধের সময় তিনি গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুকে তাঁর সেবার জন্য মদীনায় রেখে যান। মুসলিমরা যখন বদরের বিজয়ের সংবাদ নিয়ে মদীনায় ফিরছিলেন, তখন রুকাইয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহার দাফন সম্পন্ন হচ্ছিল।
১৭. যায়নাব রাদিয়াল্লাহু আনহা: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বড় কন্যা। তাঁর স্বামী আবুল আস প্রথমদিকে ইসলাম গ্রহণ করেননি। হিজরতের সময় যায়নাব রাদিয়াল্লাহু আনহাকে মক্কা থেকে মদীনায় আসার পথে বাধা দেওয়া হয় এবং তিনি আঘাতপ্রাপ্ত হন। পরবর্তীতে আবুল আস ইসলাম গ্রহণ করলে তাঁদের দাম্পত্য আবার প্রতিষ্ঠিত হয়। ৮ হিজরিতে যায়নাব রাদিয়াল্লাহু আনহা ইন্তেকাল করেন।
১৮. উম্মে কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহা: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কন্যা। রুকাইয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহার মৃত্যুর পর উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে তাঁর বিয়ে হয়। এ কারণেই উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু ‘যুন নূরাইন’, অর্থাৎ দুই নূরের অধিকারী নামে প্রসিদ্ধ হন। ৯ হিজরিতে উম্মে কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহা ইন্তেকাল করেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে তাঁর দাফনের সময় উপস্থিত ছিলেন।
১৯. সা‘দ ইবনে খাইসামা রাদিয়াল্লাহু আনহু: আকাবার বাইআতে অংশগ্রহণকারী আনসারি সাহাবী। বদরের যুদ্ধে যাওয়ার সময় তাঁর বাবা খাইসামার সাথে কে যুদ্ধে যাবেন, তা নিয়ে আলোচনা হয়। শেষ পর্যন্ত লটারিতে সা‘দ রাদিয়াল্লাহু আনহুর নাম ওঠে। তিনি বদরে অংশগ্রহণ করেন এবং সেখানেই শাহাদাতবরণ করেন। পরে তাঁর বাবা খাইসামা রাদিয়াল্লাহু আনহুও উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন।
২০. উম্মে রুমান রাদিয়াল্লাহু আনহা: আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রী এবং আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহার মা। ইসলামের প্রথম যুগেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মদীনায় হিজরত করেন। আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়, ইফকের ঘটনার সময়ও তিনি মেয়ের পাশে ছিলেন। প্রসিদ্ধ সীরাতি বর্ণনা অনুযায়ী তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবদ্দশাতেই মদীনায় ইন্তেকাল করেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবদ্দশায় মৃত্যুবরণকারী সাহাবীর সংখ্যা এই ২০ জনেই সীমাবদ্ধ নয়।
বদরেই শহীদ হন ১৪ জন। উহুদে প্রায় ৭০ জন। বিরে মাউনার ঘটনায় শহীদ হন বহু কুরআনের কারী সাহাবী। মু’তার যুদ্ধে শহীদ হন যায়দ, জাফর, আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহাসহ আরও অনেকে।
অর্থাৎ, ২৩ বছরের নবুওয়াতি জীবনে রাসূলুল্লাহ ﷺ শুধু একটি নতুন উম্মাহ গড়ে উঠতে দেখেননি। নিজের চোখের সামনে একে একে হারিয়েছেন স্ত্রী, সন্তান, চাচা, আত্মীয়, বন্ধু এবং অসংখ্য প্রিয় সাহাবীকে।