21/11/2025
বিজ্ঞানের আলোকে ভূমিকম্প এবং বেদে ভূমিকম্প নিয়ে আলোচনা..
মাটি থেকে প্রায় ১৫০ কিমি এর মত গভীরে পৃথিবীর ম্যান্টেলে তীব্র তাপমাত্রা বজায় থাকে।যদি সেখানে স্বাভাবিক চাপ থাকত তাহলে সেটা গলে তরল হয়ে যেত।কিন্তু অনেক বেশি চাপ তাকে তরল হতে দেয় না।অর্ধতরল, আবার অর্ধকঠিন অবস্থায় থাকে।এই অঞ্চলের নাম এন্থেনোস্ফিয়ার।
এন্থোনোস্ফিয়ারের বাইরে ক্রাস্টের নিচে ম্যান্টেলের উপরিভাগ এমন নয়।সেটা শক্ত,পাথরের।এন্থেনোস্ফিয়ার থেকে শুরু করে ক্রাস্টের উপরের মাটি পর্যন্ত জায়গার নাম হলো লিথোস্ফিয়ার।
এই লিথোস্ফিয়ারের পুরুত্ব একেক জায়গায় একেক রকম।কোথাও আবার ফাঁকা।সব মিলিয়ে টুকরো টুকরো।
এই টুকরোকেই বলে টেকটনিক প্লেট।
এই টেকটনিক প্লেটগুলো পৃথিবী অভ্যন্তরে তীব্র তাপে গলিত অর্ধতরল পদার্থের উপর অনেকটা ভাসমান অবস্থায় থাকে।পৃথিবীর গভীরের প্রচন্ড তাপ পরিচলন প্রক্রিয়ায় তরল এন্থেনোস্ফিয়্যারের উপর দিয়ে উঠে লিথোস্ফিয়ারকে ধাক্কা দেয়।প্লেটগুলো নড়াচড়া করে।
ফলে ছোটখাটো ভূমিকম্প হয়।মাঝেমধ্যে এরা একে অপরকে ধাক্কা দেয়।তখন তীব্র ভূমিকম্প উৎপন্ন হয়।
দুই প্লেটের সংযোগস্থলের নাম ফল্ট লাইন।ফল্ট লাইনে বেশি ভূমিকম্প অনুভূত হয়।ফল্ট লাইনে যে শক্তি নির্গত হয় তা সিসমিক ওয়েভরুপে উপরে ছড়িয়ে পড়ে।
ভূমিকম্প উৎপন্ন হয় যে কেন্দ্রে,তার নাম হাইপোসেন্টার।আর মাটির উপরে যেখানে যে বিন্দুতে অনুভূত হয় তার নাম এপিসেন্টার।
উৎপত্তিস্থলের ভূমিকম্প সবচেয়ে তীব্র।
ভূমিকম্পে তিন ধরনের ওয়েভ থাকে।
প্রাইমারি,সেকেন্ডারি,সার্ফেস ওয়েভ।
কেন্দ্রে যে ওয়েভ সৃষ্টি হয় সেটা প্রাইমারি ওয়েভ।সেটা খুব দ্রুত আশেপাশে ছড়ায়।
এরপর সেকেন্ড একটা ওয়েভ তৈরি হয় যার নাম সেকেন্ডারি ওয়েভ।সেকেন্ডারি ওয়েভ সার্ফেস ওয়েভরূপে ভূপৃষ্ঠে আঘাত হানে।আর তখন আমরা সেটা ভূমিকম্প হিসেবে অনুভব করি।
ভূমিকম্প সাধারণত কয়েক সেকেন্ড থেকে ১/২ মিনিট
স্থায়ী হয়। তবে খুবই কমসংখ্যক কিছু ভূমিকম্প ৮-১০
মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হয়। মাঝে মাঝে কম্পন এত দুর্বল হয় যে, তা অনুভবও করা যায় না। কিন্তু শক্তিশালী ও বিধ্বংসী ভূমিকম্পে ঘর-বাড়ি ও ধন-সম্পত্তির ব্যাপক
ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং অসংখ্য প্রাণহানি ঘটে। সাধারণ জ্ঞানে ভূমিকম্প শব্দটি দ্বারা যে কোন প্রকার ভূকম্পনজনিত ঘটনাকে বোঝায় - সেটা প্রাকৃতিক বা
মনুষ্যসৃষ্ট যাই হোক না কেন। বেশিরভাগ ভূমিকম্পের
কারণ হল ভূগর্ভে ফাটল ও স্তরচ্যুতি হওয়া; কিন্তু সেটা
অন্যান্য কারণেও; যেমন: অগ্ন্যুৎপাত, ভূমিধস, খনিতে
বিষ্ফোরণ বা ভূগর্ভস্থে নিউক্লিয়ার গবেষণায় ঘটানো
আণবিক পরীক্ষা থেকেও হয়ে থাকতে পারে। ভূগর্ভে
ভূমিকম্পের প্রাথমিক ফাটলকে বলে কেন্দ্র (ফোকাস) বা অধোকেন্দ্র (হাইপোসেন্টার) এবং অধোকেন্দ্র থেকে
উল্লম্ব বরাবর ভূপৃষ্ঠে অবস্থিত কেন্দ্রটিকে উপকেন্দ্ৰ
(এপিসেন্টার) বলে।
👉 ভূমিকম্পের কেন্দ্র :
পৃথিবীর অভ্যন্তরে যেখান থেকে ভূকম্প-তরঙ্গ উৎপন্ন হয়, তাকে ভূমিকম্পের কেন্দ্র বলে। এই কেন্দ্ৰ থেকে কম্পন ভিন্ন ভিন্ন তরঙ্গের মাধ্যমে সব দিকে ছড়িয়ে
পড়ে। শিলার পীড়ন-ক্ষমতা সহ্যসীমার বাহিরে চলে
গেলে শিলায় ফাটল ধরে ও শক্তির মুক্তি ঘটে। তাই প্রায়শই ভূমিকম্পের কেন্দ্র চ্যুতিরেখা অংশে অবস্থান করে। সাধারণত ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ১৬ কি.মি.-র মধ্যে এই
কেন্দ্র অবস্থান করে। তবে ৭০০ কি.মি. গভীরে
গুরুমণ্ডল (Mantle) থেকেও ভূ-কম্পন উত্থিত হতে
পারে।
👉 ভূমিকম্পের কারণ :
ভূমিকম্প কয়েকটি কারণে হতে পারে। যেমন :
👉 ভূ-পৃষ্ঠজনিত : আমাদের ভূ-পৃষ্ঠ অনেকগুলো প্লেট-এর সমন্বয়ে গঠিত। প্লেটগুলোর নিচেই থাকে ভূ-অভ্যন্তরের সকল গলিত পদার্থ। কোনও প্রাকৃতিক কারণে এই গলিত পদার্থগুলোর স্থানচ্যুতি ঘটলে প্লেটগুলোরও কিছুটা স্থানচ্যুতি ঘটে। এ কারণে একটি প্লেটের কোনও অংশ অপর প্লেটের তলায় ঢুকে যায়, যার ফলে ভূমিতে কম্পন সৃষ্টি হয়। আর এই কম্পনই ভূমিকম্প রূপে আমাদের নিকট আবির্ভূত হয়।
👉 আগ্নেয়গিরিজনিত : কখনো কখনো আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ও গলিত লাভা উৎক্ষিপ্ত হওয়ার কারণে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হতে পারে।
👉 শিলাচ্যুতি বা শিলাতে ভাজের সৃষ্টি : পৃথিবীর অভ্যন্তরে শিলাচ্যুতি বা শিলাতে ভাজে সৃষ্টি হলে ভূত্বকের কোন অংশ উপরে উঠিত হয় বা নিচে বসে যায় এবং চ্যুতির সমতলে প্রবল ঘর্ষণ সৃষ্টি হয় ও
ভূমিকম্প হয়।
👉 ভূপাত : কোনো কারণে পাহাড়-পর্বত হতে বৃহৎ শিলাখণ্ড ভূত্বকের ওপর ধসে পড়ে ভূমিকম্প হয়। সাধারণত ভাজ পর্বতের নিকট অধিক ভূমিকম্প হয় ।
👉 তাপ বিকিরণ : ভূত্বক তাপ বিকিরণ করে সংকুচিত হয়ে পড়লে ফাটল ও ভাঁজের সৃষ্টি হয়ে ভূমিকম্প হয়।
👉 ভূগর্ভস্থ বাষ্প : নানা কারণে ভূগর্ভে বাষ্পের সৃষ্টি হয়। এই বাষ্প ক্রমাগত বৃদ্ধি পেলে তা ভূত্বকের নিম্নভাগে ধাক্কা দেয়; ফলে প্রচণ্ড ভূকম্পন অনুভূত হয় এবং ভূমিকম্প হয়।
👉 হিমবাহের প্রভাবে :
কখনো কখনো প্রকাণ্ড হিমবাহ পর্বতগাত্র হতে হঠাৎ
নিচে পতিত হয়। এতে ভূত্বক কেঁপে ওঠে এবং
ভূকম্পনের সৃষ্টি হয় ফলে ভূমিকম্প হয়।
👉 ভূমিকম্প হলে দ্রুত যা করতে হবে :
★ ধীরস্থির ও শান্ত থাকতে হবে, বাড়ির বাইরে থাকলে ঘরে না ঢোকাই ভালো।
★ একতলা ভবন হলে দৌড়ে বাইরে চলে যেতে হবে। বহুতল ভবনের ভেতরে থাকলে টেবিল বা খাটের নিচে যেতে হবে; কাচের জিনিস থেকে দূরে থাকতে হবে। লিফট ব্যবহার করা যাবে না।
★ উঁচু ভবনের জানালা বা ছাদ থেকে লাফ দিয়ে নামার চেষ্টা করা যাবে না। ভূমি ধসে পড়ার আশঙ্কা আছে এমন উঁচু ভূমি থেকে দূরে থাকতে হবে।
★ ভূমিকম্পের সময় বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ বিচ্ছিন্ন
করতে হবে।
👉বেদে ভূমিকম্প নিয়ে আলোচনা...
সনাতন শাস্ত্র ত্রিবিধ দুঃখের কথা বর্ণণা রয়েছে যথা :
১. আধ্যাত্মিক দুঃখ।
২. আধিদৈবিক দুঃখ।
৩. আধিভৌতিক দুঃখ।
এর মধ্যে ২য় তথা আধিদৈবিক দুঃখ- প্রকৃতিক বস্তুসমূহ দ্বারা যেসব দুঃখ-কষ্ট ভোগ করে সেগুলো আধিদৈবিক দুঃখ। যেমন- ঝড়, বন্যা, ভূমিকম্প, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, খরা প্রভৃতি।
অথর্ববেদ ১৯।৯।৮ বলা হয়েছে -
শং নো ভূমির্বেপ্যমানা
অনুবাদঃ ভূমিকম্পে কম্পিত ভূমি আমাদের জন্য শান্তিদায়ক হোক ।
সামবেদেও জীবকে উপদেশ দেওয়া হয়েছে যেন সে আদিদৈবিক দুঃখ থেকে নিজেকে পৃথক করে। কেননা আধিদৈবিক দুঃখ মানবকারণেও হতে পারে যেমন অধিক বৃক্ষসংহার, পার্বত্যভূমি নষ্ট করা ইত্যাদি ।
অগ্নে হেডাꣳসি দৈব্যা যুয়োধি নঃ
[সামবেদ ১৬২৪]
অনুবাদঃ হে উন্নতি সাধক জীব ! আমাদের দৈবিক কারণে হওয়া প্রকোপ থেকে নিজেকে রক্ষা করো ।
ভূমিকম্প যে অত্যন্ত প্রবল হতে পারে এই বিষয়েও আমরা বেদে দেখতে পাই -
মহৎসধস্থং মহতী বভূবিথ মহান্বেগ এজথুর্বেপথুষ্টে
[অথর্ববেদ ১২।১।১৮]
অনুবাদঃ হে ভূমিমাতা ! তুমি একত্রে বসবাসের জন্য মহান স্থান । তুমি সত্যিই বিশাল । তুমি তীব্র গতিশীল । তোমার কম্পন অর্থাৎ ভুমিকম্পও অত্যন্ত প্রবল ।
#বৈদিকগুরুকুল #বাংলাদেশ_অগ্নিবীর
#ভূমিকম্প