28/02/2026
মহামানবদের আচার আচরণ কেন এত মাধুর্যময়
শিষ্টাচার একটি মাধূর্যময় শব্দ। এই শব্দটির তাৎপর্য ব্যক্তিজীবনে প্রতিস্থাপিত হলে জীবন অবধারিত ভাবে সৌন্দর্য মন্ডিত হয়ে উঠে। শিষ্টাচারের প্রতিশব্দ আছে অনেক। আদব, শ্রদ্ধা, ভালবাসা, সহমর্মিতা ইত্যাদি। সৃষ্টির প্রতি ভালবাসা ও মানবতা প্রদর্শনের জন্যও দরকার আছে এই শিষ্টাচারের। মানব চরিত্রে শিষ্টাচারের প্রকাশ ঘটে দৈনন্দিন আচার ব্যবহারে, চাল চলনে, কথাবার্তায়, উঠাবসায়। সর্বকালের সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) হচ্ছেন শিষ্টাচারের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি বলেছেন, এক মুসলমান ভাই আরেক মুসলমান ভাইয়ের সাথে দেখা হলে শিষ্টাচারের প্রকাশ স্বরুপ তাঁর মঙ্গল কামনা করে বলবে "আসসালামু আলাইকুম" অর্থাৎ আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক। এর জবাবে অন্য মুসলমান ভাইও শিষ্টাচার প্রদর্শন করে বলবে "ওয়ালাইকুম আসসালাম" অর্থাৎ আপনার উপরও শান্তি বর্ষিত হোক। যেহেতু হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বিশ্ব মানবতার জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন সেহেতু শুধু মুসলমান ভাই নয় পরিচিত অন্য ধর্মাবলম্বী কোন ভাইয়ের সাথে দেখা হলেও আদবের সহিত তাহার সাথে কুশলাদি বিনিময়ের পরামর্শ দিয়েছেন। এটা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে একে অন্যের কাছে প্রাপ্য। দৈনন্দিন আচার ব্যবহারে, লেনদেনে একে অন্যের সাথে মার্জিত ভাষা ব্যবহার করতে হবে। সুন্দর ও শ্রুতিমধুর ভাষা অন্যের হৃদয়কে আনন্দিত করে। পরিমার্জিত অঙ্গভঙ্গি, চোখের চাহনি ও হাঁটাচলার মাঝেও শিষ্টাচারের প্রকাশ ঘটে। যে কোন বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধার সহিত শান্ত ও সুন্দর ব্যবহার এবং বয়োকনিষ্ঠদের প্রতি স্নেহের পরশে কথা বলা শিষ্টাচারেরই অন্যতম বহিঃপ্রকাশ। এমন শিষ্টাচারের মাধ্যমেই প্রকাশ পায় মোহাম্মদী ইসলাম যে সত্যিকার অর্থে একটি শক্তিশালী ও মাধূর্যময় চরিত্রের ধর্ম। যে উত্তম আদর্শের কাছে চারপাশের সকলে আকর্ষণীয় আচার ব্যবহার পান। চারপাশের সবকিছু নিরাপত্তা পায়, সহনশীলতা ও সহমর্মিতা উপলব্ধি করতে পারে। মোহাম্মদী ইসলামের একজন অনুসারীর কাছে শুধুমাত্র মানুষই যে শিষ্টাচার সম্পৃক্ত আচার ব্যবহার পায় তা কিন্তু নয়। এই অনুসারীরা হচ্ছেন একজন অনন্য চরিত্রের মানুষ। তাই এই অনুসারী বা আশেকে রাসূলের কাছে চারপাশের প্রকৃতি ও পরিবেশও পরিশীলিত যত্ন পেয়ে থাকে। একজন শিষ্টাচারি মানুষ বা আশেকে রাসূল জীবজন্তুর প্রতিও সমভাবে মায়া মমতা প্রদর্শন করে থাকেন। একজন আশেকে রাসূলের হৃদয় থাকে বিশ্বজনীন ভালবাসায় পরিপূর্ণ। আপন মনে সর্বদা বহন করে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা, স্নেহ, ভালবাসা, সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও কল্যাণের শুভ চিন্তা।
অন্যের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র বিনা অনুমতিতে না ধরাও একটি উত্তম শিষ্টাচার। তেমনি ভাবে আহার ও পানিয় গ্রহণ এমনকি অন্যত্র শৌচাগার ব্যবহারেও শিষ্টাচারের ব্যাপার রয়েছে। সহপাঠী ও পাড়া প্রতিবেশীদের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন শিষ্টাচারে পরিগনিত বিষয়।
অন্যের ঘরে প্রবেশের সময় অনুমতি নেয়া একটি উত্তম শিষ্টাচার। দয়াময় আল্লাহ পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّىٰ تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَىٰ أَهْلِهَا ۚ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ ﴿٢٧﴾ فَإِن لَّمْ تَجِدُوا فِيهَا أَحَدًا فَلَا تَدْخُلُوهَا حَتَّىٰ يُؤْذَنَ لَكُمْ ۖ وَإِن قِيلَ لَكُمُ ارْجِعُوا فَارْجِعُوا ۖ هُوَ أَزْكَىٰ لَكُمْ ۚ وَاللَّـهُ بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ ﴿٢٨﴾
অর্থাৎ: হে বিশ্বাসীগণ,তোমরা নিজেদের ঘর ছাড়া অন্যের ঘরে অনুমতি না নিয়ে প্রবেশ করো না। অন্যের ঘরে প্রবেশ করার আগে তাদের সালাম জানাও ও অনুমতি নাও। এ নিয়ম তোমাদের জন্যে কল্যাণকর। এ ব্যাপারে তোমরা সচেতন থাকবে। যদি তোমরা বাড়িতে কাউকে না পাও, তবে তোমাদের অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত ঘরে ঢুকবে না। যদি তোমাদের বলা হয়, ফিরে যাও, তাহলে ফিরে যাবে। নীতি হিসেবে এটাই উত্তম। আর তোমরা যা করো, আল্লাহ তা ভালোই জানেন।
আল কোরআন, সূরা নূর, আয়াত ২৭-২৮।
দয়াল রাসূল (সাঃ)- এর বাণী মোবারক তথা হাদিস শরীফে শিষ্টাচার সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বাণী পাওয়া যায়। ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবন যাপন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, পেশাগত ও রাষ্ট্রীয় জীবনে এই শিষ্টাচারকে তিনি গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। তেমনি একটি হাদিস শরীফে তিনি ব্যাক্তি জীবনে অন্যান্য গুণের সাথে শিষ্টাচারকে নবুয়তের পঁচিশ ভাগের এক ভাগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন:
"নিশ্চয়ই উত্তম চরিত্র,ভালো ব্যবহার তথা শিষ্টাচার ও পরিমিত ব্যয় বা মধ্যপন্থা অবলম্বন করা নবুওতের পঁচিশ ভাগের এক ভাগ।"
আবু দাউদ শরীফ,হাদিস নাম্বার-৪৭৭৬।
যেহেতু আল্লাহর অলিগন হলেন রাসূল (সঃ) এর উত্তরসূরী এবং মোহাম্মদী আদর্শ ধারনকারী , তাই অলিদের জীবনেও উত্তম শিষ্টাচার লক্ষ্য করা যায় ৷
আসুন আমরা সকলে আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে শিষ্টাচারের অনুশীলন করি। দয়াল রাসূলের একজন আশেক বা প্রেমিক হিসেবে উত্তম চরিত্রের অধিকারী হয়ে সমাজকে আলোকিত করি। দয়াময় আল্লাহ উনার প্রিয় বন্ধু রাসূল (সাঃ)- এর উসিলায় আমাদেরকে দয়া করুক। আমিন।