25/08/2026
বিদআতপন্থীদের ব্যাপারে সতর্ক করার অপরিহার্যতা।
কুরআন থেকে দলিল: আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর নিশ্চয়ই এটাই আমার সরল পথ। অতএব তোমরা তা অনুসরণ করো এবং বিভিন্ন পথ অনুসরণ করো না; তাহলে সেগুলো তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। তিনি তোমাদেরকে এ বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো।” (সূরা আল-আন‘আম, ৬:১৫৩)
আল্লাহ আরও বলেন:
“আপনি প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না; তাহলে তা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দিবে। নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হয়, তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি—কারণ তারা হিসাবের দিনকে ভুলে গিয়েছিল।” —সূরা সোয়াদ, ৩৮:২৬
আরও বলেন:
“আপনি কি তাকে দেখেছেন, যে তার প্রবৃত্তিকে নিজের উপাস্য বানিয়েছে? আল্লাহ জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, তার শ্রবণশক্তি ও হৃদয়ের ওপর মোহর মেরে দিয়েছেন এবং তার চোখের ওপর পর্দা দিয়েছেন। অতএব আল্লাহর পর কে তাকে হিদায়াত করবে? তোমরা কি উপদেশ গ্রহণ করবে না?” —সূরা আল-জাসিয়াহ, ৪৫:২৩
আল্লাহ বলেন:
“নিশ্চয়ই যারা তাদের দ্বীনে বিভেদ সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের সঙ্গে আপনার কোনো সম্পর্ক নেই।” —সূরা আল-আন‘আম, ৬:১৫৯
আরও বলেন:
“তোমরা মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না—যারা তাদের দীনে বিভেদ সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে। প্রত্যেক দলই তাদের নিজেদের কাছে যা আছে তা নিয়ে আনন্দিত।” —সূরা আর-রূম, ৩০:৩১–৩২
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
“তারা নিজেদের মুখের ফুঁ দিয়ে আল্লাহর আলো নিভিয়ে দিতে চায়; কিন্তু কাফিররা অপছন্দ করলেও আল্লাহ তাঁর আলো পূর্ণ করবেন।” —সূরা আস-সফ, ৬১:৮
হাদিস থেকে দলিল
১- রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“ইহুদিরা একাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছিল। তাদের মধ্যে একটি দল জান্নাতে এবং সত্তরটি দল জাহান্নামে যাবে। খ্রিস্টানরা বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছিল। তাদের মধ্যে একাত্তরটি দল জাহান্নামে এবং একটি দল জান্নাতে যাবে। যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ, তাঁর শপথ! আমার উম্মত তিয়াত্তর দলে বিভক্ত হবে। একটি দল জান্নাতে এবং বাহাত্তরটি দল জাহান্নামে যাবে।”
জিজ্ঞাসা করা হলো, “হে আল্লাহর রাসুল! তারা কারা?” তিনি বললেন: “আল-জামাআত।”
২- ইরবাদ্ব ইবনু সারিয়াহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:
একদিন রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের নিয়ে ফজরের সালাত আদায় করলেন। এরপর তিনি আমাদের দিকে ফিরে অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী একটি নসিহত করলেন। এতে চোখ অশ্রুসিক্ত হলো এবং অন্তর ভীত হয়ে উঠল। তখন একজন বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল! মনে হচ্ছে এটি যেন বিদায় নেওয়া ব্যক্তির নসিহত। সুতরাং আপনি আমাদের কী অসিয়ত করছেন?” তিনি বললেন: “আমি তোমাদেরকে আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করার এবং শ্রবণ ও আনুগত্য করার অসিয়ত করছি—এমনকি যদি তোমাদের ওপর একজন নাক-কান কাটা হাবশি দাসও শাসক হয়। কারণ তোমাদের মধ্যে যারা আমার পরে জীবিত থাকবে, তারা অনেক মতভেদ দেখতে পাবে। তখন তোমরা আমার সুন্নাহ এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ আঁকড়ে ধরবে। তোমরা তা দৃঢ়ভাবে ধারণ করবে এবং মাড়ির দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে রাখবে। আর সাবধান! দ্বীনের মধ্যে নব-উদ্ভাবিত বিষয় থেকে। কারণ প্রত্যেক নব-উদ্ভাবিত বিষয়ই বিদআত এবং প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা।”
শায়খ আলবানী রহিমাহুল্লাহ এই হাদিসের পর বলেন:“এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাদিসগুলোর একটি। এটি মুসলিমদের সুন্নাহ এবং খোলাফায়ে রাশেদীন চারজনের সুন্নাহ ও যারা তাঁদের পথ অনুসরণ করেছেন, তাঁদের সুন্নাহ দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরতে উৎসাহিত করে। একইসঙ্গে প্রত্যেক বিদআত থেকে নিষেধ করে এবং জানিয়ে দেয় যে তা ভ্রষ্টতা—মানুষ সেটিকে ভালো মনে করলেও। যেমন ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকেও সহিহভাবে বর্ণিত হয়েছে।”
“এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞামূলক হাদিস অনেক রয়েছে এবং সেগুলো সুপরিচিত। কিন্তু আজ অধিকাংশ মুসলিমই এসব থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে—সাধারণ মানুষ ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই; অল্প কিছু মানুষ ব্যতিক্রম।”
“বরং অনেকেই এ বিষয়ে আলোচনা করাকে তুচ্ছ বিষয় মনে করে। তারা মনে করে সুন্নাহ ও বিদআতের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় নিয়ে আলোচনা করলে ফিতনা সৃষ্টি হয় এবং ঐক্য বিনষ্ট হয়। তাই তারা এসব বিষয় ছেড়ে দিতে এবং মতভেদপূর্ণ সব বিষয়ে পরস্পরকে নসিহত করা ছেড়ে দিতে বলে।”
“তারা ভুলে যায় কিংবা ভুলে যাওয়ার ভান করে যে, আহলুস সুন্নাহ ও বিদআতপন্থীদের মধ্যকার মতভেদের বিষয়গুলোর অন্যতম হলো তাওহীদের কালিমা। তারা এর অর্থ থেকে আল্লাহকে ইবাদতের ক্ষেত্রে একক করার অপরিহার্যতা বুঝতে পারে না। তারা বুঝতে পারে না যে, ইবাদতের কোনো বিষয়েই আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও দিকে মুখাপেক্ষী হওয়া বৈধ নয়—যেমন মৃত ওলি ও নেককার ব্যক্তিদের কাছে বিপদে সাহায্য চাওয়া এবং তাদের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করা। অথচ তারা মনে করে যে তারা ভালো কাজই করছে।”
হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত দল
৩- মুগীরাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে সহীহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “আমার উম্মতের মধ্যে এমন একটি দল সর্বদা প্রকাশ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে, অবশেষে আল্লাহর নির্দেশ এসে যাবে, অথচ তারা বিজয়ী অবস্থায় থাকবে।”
৪- জাবির রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে: “আমার উম্মতের একটি দল কিয়ামত পর্যন্ত সত্যের জন্য যুদ্ধ করতে থাকবে এবং তারা বিজয়ী থাকবে।”
৫- সহীহ মুসলিমে সাওবান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে এসেছে: “আমার উম্মতের একটি দল সর্বদা সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। যারা তাদের সাহায্য করবে না, তারা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না—অবশেষে আল্লাহর নির্দেশ এসে যাবে এবং তারা সেই অবস্থাতেই থাকবে।”
৬- সহীহ মুসলিমে মু‘আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত: “আমার উম্মতের একটি দল সর্বদা আল্লাহর নির্দেশের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। যারা তাদের সাহায্য করবে না কিংবা তাদের বিরোধিতা করবে, তারা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না—অবশেষে আল্লাহর নির্দেশ এসে যাবে এবং তারা মানুষের ওপর বিজয়ী থাকবে।”
আলেমদের বক্তব্য
১- শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ রহিমাহুল্লাহ
শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ রহিমাহুল্লাহ মাজমূ‘উল ফাতাওয়া-তে বলেন: “তাদের (বিদআতপন্থীদের) অবস্থা স্পষ্ট করা এবং তাদের ব্যাপারে উম্মতকে সতর্ক করা মুসলিমদের ঐকমত্য অনুযায়ী অপরিহার্য। এমনকি ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বলকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: একজন ব্যক্তি সালাত আদায় করে, সিয়াম পালন করে এবং ই‘তিকাফ করে—এটি কি আপনার কাছে অধিক প্রিয়, নাকি সে বিদআতপন্থীদের ব্যাপারে আলোচনা করে? তিনি বললেন: সে যখন সালাত আদায় করে, সিয়াম পালন করে ও ই‘তিকাফ করে, তখন তা কেবল তার নিজের জন্য। কিন্তু সে যখন বিদআতপন্থীদের ব্যাপারে আলোচনা করে, তখন তা মুসলিমদের জন্য। এটি অধিক উত্তম।”
এর মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, বিদআতপন্থীদের ব্যাপারে সতর্ক করা মুসলিমদের দ্বীনের জন্য ব্যাপক উপকার বয়ে আনে এবং এটি জিহাদেরই একটি প্রকারের মতো।
২- ইমাম আবু ইসমাঈল আস-সাবূনী রহিমাহুল্লাহ
ইমাম আবু ইসমাঈল আস-সাবূনী ‘আকীদাতুস সালাফ আসহাবিল হাদিস গ্রন্থে বলেন:
“তারা সেই বিদআতপন্থীদের ঘৃণা করেন, যারা দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু উদ্ভাবন করেছে যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়। তারা তাদের ভালোবাসেন না, তাদের সঙ্গে ওঠাবসা করেন না, তাদের কথা শোনেন না, তাদের সঙ্গে বসেন না এবং দ্বীনের বিষয়ে তাদের সঙ্গে বিতর্ক বা তর্ক করেন না। তারা তাদের কানকে তাদের বাতিল কথাবার্তা শোনা থেকে রক্ষা করাকে সঠিক মনে করেন। কারণ এসব কথা কানে প্রবেশ করে অন্তরে স্থান করে নিলে ক্ষতি করে এবং অন্তরে নানা ধরনের কুমন্ত্রণা ও ভ্রান্ত চিন্তার জন্ম দেয়।”
তিনি আরও বলেন:
“তারা (সালাফগণ) এ বিষয়েও একমত ছিলেন যে, বিদআতপন্থীদের দমন করা, তাদের অপমান করা, তাদের লাঞ্ছিত করা, তাদের দূরে সরিয়ে দেওয়া, তাদের বর্জন করা, তাদের থেকে দূরে থাকা এবং তাদের সঙ্গ ও মেলামেশা পরিত্যাগ করা উচিত। আর তাদের থেকে বিচ্ছিন্নতা ও হিজরত করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা উচিত।”
আলেমদের আরও কিছু বক্তব্য
৩- শায়খ আবদুল লতিফ ইবনু আবদুর রহমান আলে শায়খ তাঁর মাজমূ‘উর রাসায়িল আন-নাজদিয়্যাহ-তে (৩/১১১) কিছু পথভ্রষ্ট বিদআতপন্থী সম্পর্কে সতর্ক করতে গিয়ে বলেন:
“উম্মতের সালাফ ও ইমামদের এবং সুন্নাহর ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বলের সুপরিচিত সুন্নাহগুলোর মধ্যে রয়েছে—তাদের (বিদআতপন্থীদের) বর্জনের ব্যাপারে কঠোর হওয়া, তাদের অবহেলা করা, তাদের সঙ্গে বিতর্ক পরিত্যাগ করা, তাদের কথাবার্তা প্রত্যাখ্যান করা, তাদের থেকে দূরে থাকা এবং তাদের প্রতি ঘৃণা, নিন্দা ও দোষত্রুটি প্রকাশের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা।”
৪- শায়খ সুলাইমান ইবনু সাহমান কাশফুশ শুবহাতাইন ফির রদ্দি ‘আলা ইউসুফ ইবনু শাবীব আল-কুয়াইতি গ্রন্থে (পৃ. ৩৭) বলেন:
“আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন! জেনে রাখুন, শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ এবং তাঁর মতো পূর্ববর্তী সালাফদের কাছ থেকে বিদআত ও ভ্রষ্টতার অনুসারীদের বিরোধিতা সম্পর্কে যে বক্তব্য এসেছে, তা এমন কোনো ভ্রষ্টতা নয় যা ইসলাম থেকে বের করে দেয়। তবে তাঁরা এ ব্যাপারে কঠোর হয়েছেন এবং সতর্ক করেছেন দুটি কারণে।”
প্রথম কারণ: দীনের ক্ষেত্রে বিদআতের গুরুতরতা। তাঁদের কাছে বিদআত কবিরা গুনাহের চেয়েও গুরুতর। তাই তাঁরা বিদআতপন্থীদের সঙ্গে কবিরা গুনাহকারীদের তুলনায় আরও কঠোর আচরণ করতেন। আজও মানুষের অন্তরে এর উদাহরণ দেখা যায়—একজন রাফেযি ব্যক্তি আলেম ও ইবাদতগুজার হলেও তার প্রতি এমন একজন সুন্নির চেয়ে বেশি ঘৃণা পোষণ করা হয়, যে প্রকাশ্যে কবিরা গুনাহ করে।
দ্বিতীয় কারণ: বিদআত অনেক সময় সুস্পষ্ট কুফরির দিকে নিয়ে যায়—যেমন বহু বিদআতপন্থীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে।
৫- শায়খ হামূদ আত-তুওয়াইজরী আল-কাওলুল বালীগ ফিত তাহযীর মিন জামা‘আতিত তাবলীগ গ্রন্থে বলেন:
“সালাফে সালেহীন বিদআতপন্থীদের ব্যাপারে সতর্ক করতেন এবং তাদের সম্পর্কে সতর্ক করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। তাঁরা তাদের সঙ্গে বসতে, তাদের সঙ্গ গ্রহণ করতে এবং তাদের কথা শুনতে নিষেধ করতেন। বরং তাদের থেকে দূরে থাকা, তাদের বিরোধিতা করা, তাদের ঘৃণা করা এবং তাদের বর্জন করার নির্দেশ দিতেন।”
৬- শায়খ ইবনু বায রহিমাহুল্লাহ
শায়খ ইবনু বায রহিমাহুল্লাহ বলেন:
“যে ব্যক্তি কোনো মন্দ কাজ বা বিদআত প্রকাশ্যে করে, তার ব্যাপারে মানুষকে সতর্ক করা হবে। তার নেক আমল দেখে তাকে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। তার নেক আমলের হিসাব তার ও তার রবের মধ্যে। যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে কোনো মন্দ কাজ বা বিদআত করে, তার ব্যাপারে সতর্ক করা হবে এবং তাকে নসিহত করা হবে, যাতে সে হিদায়াত লাভ করে। এভাবেই সুন্নাহ এসেছে।”
তিনি বিদআতপন্থীদের সম্পর্কে আরও বলেন:
“আমার মত হলো, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা উচিত এবং সংবাদপত্রের পৃষ্ঠা, রেডিও এবং গ্রন্থের মাধ্যমে তাদের অনিষ্ট, ভ্রষ্টতা ও উদ্দেশ্যসমূহ স্পষ্ট করা উচিত। প্রত্যেক রোগের একটি চিকিৎসা রয়েছে। বাতিলপন্থীরা যখন তাদের বাতিল প্রকাশ্যে তুলে ধরে, তখন হকপন্থীদের ওপরও হককে প্রকাশ করা অপরিহার্য।”
“এই দুনিয়া সংগ্রামের স্থান, যুদ্ধের স্থান, সংস্কারের স্থান এবং মুজাহাদার স্থান। আর আখিরাত হলো প্রতিদান ও হিসাবের স্থান। সুতরাং বাতিলপন্থীরা হকপন্থীদের চেয়ে বেশি সক্রিয় হবে—এটা হতে পারে না। বাতিল প্রকাশের ক্ষেত্রে তারা হক প্রকাশকারীদের চেয়ে বেশি সাহসী হবে—এটাও হতে পারে না। বরং হকপন্থীদেরই অধিক সাহসী, আল্লাহর নির্দেশ পালনে অধিক দৃঢ় এবং বাতিলপন্থীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অধিক সত্যনিষ্ঠ হওয়া উচিত।”
“আমি আমার এ কথা যারা শুনছে এবং অন্য সবাইকে নসিহত করছি—তারা যেন আল্লাহর জন্য দাঁড়ায় এবং মানুষের মধ্যে যা কিছু আল্লাহর শরিয়তের বিরোধী হিসেবে প্রকাশ পায়, তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে—তা আধুনিকতাবাদী, কমিউনিস্ট, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী, সুফি কিংবা অন্য যেকোনো বাতিলপন্থী গোষ্ঠীর হোক।”
“যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসুলের সুন্নাহর বিরোধী কোনো বিষয় প্রকাশ করে, সে যদি অজ্ঞ হয়, তাহলে তাকে বিষয়টি বুঝিয়ে দিতে হবে, সঠিক পথ দেখাতে হবে এবং হকের দিকে আহ্বান করতে হবে। আর যদি সে জেনেশুনে বাতিলের ওপর অটল থাকে, তাহলে তার অনিষ্ট স্পষ্ট করা, তার ব্যাপারে সতর্ক করা, তার জবাব দেওয়া এবং তাকে হিদায়াতের দিকে আহ্বান করা অপরিহার্য—যাতে হয়তো সে হিদায়াত লাভ করে।”
৭- শায়খ ইবনু উসাইমীন রহিমাহুল্লাহ
শায়খ বকর আবু যায়দ-এর বক্তব্যের ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে শায়খ ইবনু উসাইমীন রহিমাহুল্লাহ বলেন:
“তিনি বিদআতপন্থীদের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। তারা এরই উপযুক্ত। বিশেষত যখন কোনো বিদআতপন্থী তীক্ষ্ণভাষী ও অত্যন্ত বাগ্মী হয়, তখন তার অনিষ্ট আরও বেশি ও মারাত্মক হয়। বিশেষ করে তার বিদআত যদি কুফরিসৃষ্টিকারী হয় অথবা গুরুতর ফাসিকির পর্যায়ের হয়, তাহলে তার বিপদ আরও বড়।”
“আরও বিশেষভাবে, যখন সে মানুষের সামনে নিজেকে আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত বলে প্রকাশ করে। কারণ কিছু বিদআতপন্থীর মধ্যে মুনাফিকি রয়েছে। তুমি দেখবে, যার কাছ থেকে সে ভয় পায় তার সামনে নিজেকে অসহায় ও নিরীহ হিসেবে প্রকাশ করছে এবং বলছে: ‘আমি আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত। আমি অমুক বা অমুক সাহাবিকে ঘৃণা করি না। আমি আপনাদের সঙ্গেই আছি।’ অথচ সে মিথ্যাবাদী। সুতরাং এ ধরনের লোকদের ব্যাপারে সতর্ক থাকা অপরিহার্য।”
৮- আল-কাহতানীর কবিতা
আল-কাহতানী আশ‘আরিদের উদ্দেশে কঠোর ভাষায় বলেন:
“হে আশ‘আরিরা, হে সৃষ্টির নিকৃষ্টতম লোকেরা,
হে অন্ধ ও বধিরেরা—যাদের কান নেই!
আমি তোমাদের এবং তোমাদের দলকে ঘৃণা করি,
তোমাদের প্রতি আমার সামান্যতম ঘৃণাও আমাকে অস্থির করে।
আমি যদি দুই চোখেই অন্ধ হয়ে যেতাম, তবুও তাতে আনন্দিত হতাম,
যাতে তোমাদের কাউকে আমার চোখে দেখতে না হয়।
তোমাদের অন্তর আমার প্রতি ক্রোধ ও বিদ্বেষে
প্রচণ্ডভাবে উত্তপ্ত হয়ে জ্বলছে।
তোমরা তোমাদের ক্রোধেই মরে যাও, আক্ষেপ ও দুঃখেই মরে যাও,
আর আমার কারণে আঙুল কামড়াতে থাকো।”
৯- ইমাম আহমাদ রহিমাহুল্লাহর একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য
সবশেষে মুহাম্মাদ ইবনু বান্দার আল-জুরজানী ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল রহিমাহুল্লাহকে বলেছিলেন:
“আমার জন্য এ কথা বলা খুব কঠিন হয়ে যায় যে, ‘অমুক এমন, অমুক তেমন।’”
তখন ইমাম আহমাদ রহিমাহুল্লাহ বললেন:
“তুমি যদি নীরব থাকো এবং আমিও নীরব থাকি, তাহলে অজ্ঞ ব্যক্তি কীভাবে সঠিক ও ভুলের মধ্যে পার্থক্য চিনবে?”
লেখক: শাইখ প্রফেসর ড. আবু বকর মুহাম্মাদ জাকারিয়া।