18/05/2026
শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন,
“কলিতে বেদ নাই সুতরাং বিধিও নাই। কলিতে প্রয়োজন হইতেছে গুরু চরণে আত্মনিবেদন, আত্ম নিবেদন পূর্বক যাহা বোধ হইবে তাহাই বেদ এবং তদ্অনুযায়ী যাহা করণীয় মনে হইবে তাহাই বিধি”
সুখে-দুঃখে, বিপদে-সম্পদে, ত্যাগে-ভোগে, সুখে-অসুখে তিনিই হয়েছেন আমাদের আশ্রয়দাতা, পরিত্রাতা, সর্বোপরি আমাদের প্রাণের ঠাকুর।
“সংসারটা হইছে জ্বালাময়।” তাই একটা উপমা দিয়া ঠাকুর পুনরায় বলিলেন, “দেখ, তুমি এক স্থান হইতে অন্যস্থানে যাইতাছ, এখন মাঝখানে একটা কাঁটাবন, তার ভিতর দিয়া একটা মাত্র সরু পথ। ঐ পথটা অতিক্রম করতে পারলেই তুমি ফাঁকা মাঠে যাইয়া পরবা এবং আলো দেইখা গন্তব্য স্থলে পৌঁছাইতে পারবা। এখন এই কাঁটাবনের ভিতর দিয়া চলার সময় তোমার পায়ে ও শরীরে দু-একটা কাঁটা লাগব, কিন্তু তুমি ঐ সমস্ত ভ্রুক্ষেপ না কইরা কতক্ষণে কাঁটাবন পার হইয়া ফাঁকা মাঠে ওই আলোতে যাইয়া পৌঁছাইবা সেইদিকে তোমার লক্ষ্য রাখতে হইব। তাহা হইলেই তুমি গন্তব্য স্থলে যাইয়া পৌঁছাইতে পারবা।” “সেইরূপ এই সংসার থাইকা ভগবানের দিকে লক্ষ্য রাইখা যাবতীয় কর্ত্তব্য কইরা যাইতে হইব। সংসারে কর্ত্তব্য করতে যাইয়া কেহ তোমাকে প্রসংসা করব, আবার কেহ তোমার নিন্দা করব। তুমি ঐ সমস্ত কথার দিকে লক্ষ্য না রাইখা তোমার কর্ত্তব্য কাজ যত তাড়াতাড়ি পার শেষ কইরা ভগবানের পাদপদ্মে পৌঁছাইতে পার সতত তার চেষ্টায় থাকবা। তা হইলে সংসারের কোন বন্ধনই তোমাকে আবদ্ধ করতে পারবো না এবং তুমি ও অচিরেই সংসার হইতে মুক্তি পাইয়া যাইবা।”
একজন শ্রীশ্রীরামঠাকুরের কাছে জানতে চাইলেন- ‘শান্তি কিসে পাওয়া যায়, বলতে পারেন? ‘উত্তর দিলেন রাম- ‘শান্ত হইলেই শান্তি পাইবেন’। ছোট্ট একটা কথা অথচ কত মর্ম্মস্পর্শী। আসলে মানুষের মনের স্বভাবই হল চঞ্চল হওয়া-বিকারগ্রস্থ হওয়া। মনের সেই চঞ্চলতা আর বিকারের কারণেই ইন্দ্রিয় বহির্মুখী হয়। আর কষ্টপায় জীব।
শ্রীশ্রীরামঠাকুর একদিন একটা কাগজে একটি বৃত্ত আঁকলেন। মধ্যে একটা বিন্দু দিলেন। পরে কাগজটি ইন্দুভূষণ বাবুর সামনে ধরে বললেন- এই বৃত্তটি দেখছেন- এটাই হল সীমাবদ্ধ মন বুদ্ধি আর ইন্দ্রিয়ের পরিধি। আর আপনাকে যা দেওয়া হয়েছে তা হল বিন্দু। এই বিন্দুটির আয়তন যতই বাড়বে মন বুদ্ধি ইন্দ্রিয়ের পরিধির পরিমাপ ততই কমবে। আপনি এই বিন্দুটির সেবা পরিচর্যা লইয়াই থাকুন। উহাদের সহিত মিত্রতাও করিবেন না, উহাদের বিরোধিতাও করিবেন না। করুণাময় আমাদের ঠাকুর যে নিত্য সদাজাগ্রত।
তাই তিনি বলেছেন “প্রারব্ধ ভূঞ্জমানাণি গীতাধ্যান পরায়ণা”। (৩/১২৩ বেদবানী)। ঐ গীতাটি ভগবানের হৃদয় সন্দেহ নাই। এই শরীরে ভগবান আছেন, তাহাকে জানিয়া লইতে পারিবেন। তাঁর নিকট সকল চেষ্টা রাখিতে পারিলেই সকল সংসার মুক্ত হয়।
শ্রীশ্রীরামঠাকুর ছিলেন স্বয়ং গীতার প্রতিমূর্ত্তি। তাঁর বাণী অনুসরণ না করে পারমাথির্ক সফলতা লাভ করা অসম্ভব। তাঁর প্রদর্শিত পন্থাতেই কৃষ্ণানুশীলনে রত হওয়া কর্ত্তব্য। তাঁর বাণীর সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের বাণীর পার্থক্য নেই, কেন না তাঁরা অভিন্ন।
“শ্রীশ্রী ঠাকুর দয়ানিধি কথা প্রসঙ্গে এক সময় প্রকাশ করিয়াছিলেন যে “আমার কোটি কোটি অংশের এক কণা যে বুঝিতে পারিয়াছে সে এই দেহে নাই; যদিও থাকে সে লোকালয়ে নাই।” এ কথার দ্বারা প্রাণগোবিন্দ শ্রীশ্রীঠাকুর আমাদের কি এ কথাই বোঝাচ্ছেন না যে তিনিই স্বয়ং ভগবান।
তিনি শ্রীশ্রী সত্যনারায়ণ সেবার প্রচলন করেছিলেন জগতের অশেষ কল্যাণের জন্য। যাদবপুর শ্রীশ্রী কৈবল্যধামে সত্যনারায়ণ পীঠ সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন- “জগতের অশেষ কল্যাণের জন্য সত্যের ইচ্ছায় সত্যপীঠ পুনঃ প্রকাশিত হইল।” তিনিই যে স্বয়ং শ্রীশ্রীসত্যানারায়ণ তাও তিনি জানিয়েছেন ভক্তগণকে বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে।
বেদবাণী প্রথম খন্ডের ১০২ নং পত্রে বলেছেন “পিতা-মাতা, ভাই ভগ্নী, খুড়া জ্যেঠা, মাসী পিসী, বাড়ীঘর, গ্রামবাসী, দেশবাসী, আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব, শত্রুমিত্র, সৎ অসৎ সংগ সকল ঋণগত কর্মফল। ইহা সকলি ভাগ্যক্রমে প্রাপ্ত হয়। ইহাদের মধ্যে কাহারও কোন দোষ নাই। ভাগ্যবশতঃ ফলাফল ভালমন্দ ব্যবস্থা যা থাকে ইহাই ঋনবদ্ধ। এই সকলের গঞ্জনা যথাশক্তি সহ্য করিবে। যাহার যে প্রাপ্ত অংশ আছে তাহারা যে যে ভাবে আদায় করিতে পারে, সেই ভাবে আদায়ের চেষ্টা করে। ইহাদিগকে ফাঁকি দিয়া বনে গিয়া কি ফল হইবে, কিংবা দেহ ছাড়িলেই বা কি হইবে। এদের ঋণ তো শোধ হইবেই না, দফে দফে চিরজন্মই ভোগ করিতে হইবে। যাহা হইক, সত্যনারায়ণের ব্রত ভুলিবেন না।”
শ্রীশ্রী কৈবল্যনাথ করুণার্দ্র হৃদয়ে মায়ামুগ্ধ জীবকে পরম শান্তির পথে আহ্বান করেছেন। আত্মা অবিনশ্বর, দেহ নশ্বর, এই নশ্বর দেহ অবিনাশী আত্মজ্ঞানের সহায়ক রূপে ব্যবহারের যোগ্যতম পন্থা শ্রীশ্রীঠাকুর দেখিয়েছেন। যার যা ভাব যা সংস্কার যা অভিরুচি, তা বুঝে নিয়ে নিজ নিজ অধিকার অনুসারে কীভাবে মানব জন্মকে উচ্চতম শিখরে আরোহণের সোপান রূপে ব্যবহার করা যায় তার অনবদ্য উপায় শ্রীশ্রীঠাকুর দেখিয়েছেন।
তাইতো শ্রীশ্রী ঠাকুরের পাদপদ্মে প্রণতি জানিয়ে কবিগুরুর ভাষায় বলি,
‘শুধু তোমার বাণী নয় গো হে বন্ধু হে প্রিয়,
মাঝে মাঝে প্রাণে তোমার পরশখানি দিও।’
শ্রীশ্রী ঠাকুরের নির্দেশে যাদবপুর কৈবল্যধামে উৎসবের ব্যবস্থাদি হওয়ার পর ক্ষিতিবাবু প্রবীন ভক্তগণ সহ ঠাকুরকে আনতে আর্লষ্ট্রীটে কুঞ্জবাবুর বাড়ী গেলে ঠাকুর বললেন “আমি যামুনা”। ক্ষিতি বাবুর বাঁধভাঙা অশ্রুপাত ও মর্মবেদনা উপলব্ধি করে শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁহার ব্যবহৃত কমলাদেবীর দেওয়া কেড্স পাদুকা যুগল এগিয়ে দিয়ে বললেন “এই খানা নিয়ে গৃহ প্রবেশ করেন, আমি সেই খানেই থাকুম এই বিশ্বাস রাইখেন। ১৯৩০ ইংরেজী ১০ই শ্রাবন ১৩৩৭ বাংলা শ্রীশ্রী ঠাকুরের নির্দেশে পাহাড়তলী কৈবল্যধামে কৈবল্যনাথের শ্রীপট বিগ্রহ রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়। এইখানে কোনো পটের নির্দেশনা দিলেন না। ক্ষিতি বাবু একটি থালায় করে পাদুকা যুগল মাথায় করে ডা. জে.এম দাশগুপ্ত, অধ্যাপক ইন্দুভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, অধ্যাপক প্রমথ নাথ চক্রবর্তী, পরেশ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, উপেন্দ্র নাথ সাহা, এডভোকেট শুভময় দত্ত, অধ্যাপক লোকেশ চন্দ্র চক্রবর্তী প্রকুখ প্রবীন ভক্তগন সহ পূজার আঙিনায় আসেন। এই ব্যবস্থায় ত্রেতা যুগে ভরতের পাদুকা গ্রহন মনে পড়ে।
ঠাকুর ভক্ত অক্ষয় কুমার মজুমদার কে জানালেন, “কলিতে বেদ নাই সুতরাং বিধিও নাই। কলিতে প্রয়োজন হইতেছে গুরু চরণে আত্মনিবেদন, আত্ম নিবেদন পূর্বক যাহা বোধ হইবে তাহাই বেদ এবং তদ্অনুযায়ী যাহা করণীয় মনে হইবে তাহাই বিধি” প্রথম দিকে কয়েকদিন ডাক্তার বাবু প্রদোষে সত্যনারায়ণ সেবা করেছিলেন। একদিন ধ্যানস্থ অবস্থায় উপলব্ধি করলেন খড়ম পায়ে হাটার শব্দ তুলসীমঞ্চে এসে স্তব্ধ। ধ্যান নেত্রে দেখলেন আলখাল্লা পরিহিত দাড়ি শোভিত অপূর্ব মূর্ত্তি তুলসী মঞ্চে উপবিষ্ট, গাড়ী পাঠিয়ে তৎক্ষনাৎ বাড়ীতে সযত্নে রক্ষিত চিত্রপট খানি আনালেন। ঠাকুর তখন বেলেঘাটায় ভক্ত প্রবর ডাঃ কৈলাস চন্দ্র মজুমদারের বাড়ীতে উপস্থিত ভক্তদের বললেন আজ যাদবপুরে সত্যনারায়ণের পট প্রতিষ্টা হইল।
আত্মা নির্লিপ্ত দ্রষ্টা সাক্ষীস্বরূপ। আত্মা প্রকৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে প্রকৃতির চঞ্চলতাকে নিজস্ব মনে করে। নিজেকে সে ভুলে যায়। আর তখনই আসে ঘোরতর দুঃসময়। কল্পিত ভ্রান্ত আমিত্বের জালে জড়িয়ে মুক্ত স্বভাব আত্মা নিজেকে বদ্ধ বলে ভাবে। এই কল্পিত বদ্ধতা থেকে জীবন্মুক্তির আস্বাদন দিতেই জীবের উদ্ধারকল্পে শ্রীশ্রী কৈবল্যনাথ সত্যনারায়ণ রামঠাকুরের অবতরণ লীলা। তাঁর সহজ-সরল নির্লিপ্ত-অনাসক্ত-করুণাঘন জীবনশৈলী ত্রিতাপ দগ্ধ তাপিত জাড়িত মানুষের কাছে নিরাপদ আশ্রয়। শান্তির নীড়। নিজেকে জানবার জন্য যাঁদের হৃদয় ব্যাকুল, তাঁদের জন্য শ্রীশ্রী ঠাকুরের চিরন্তনী বাণী দিব্যজ্ঞানের উম্মুক্ত বাতায়ন। যে সকল ভক্তের জাগতিক সমস্ত বাসনা ফুরিয়েছে, তাঁদের জন্য নিত্যকালের পরমসম্পদ স্বরূপ শ্রীশ্রী ঠাকুরের যুগল পাদপদ্ম।
জীবনের প্রকৃত অর্থ খোঁজার পথ দেখিয়েছেন শ্রীশ্রী ঠাকুর। তাঁর অমূল্য শাশ্বত বেদবাণীতে উল্লিখিত শান্তির পথ লাভের যা যা উপায় বর্ণিত হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হ’ল, সত্যব্রত, পতিব্রত, নিরুদ্বিগ্ন ভাব নিয়ে প্রারব্ধ ভোগ, নামাশ্রয়। কী অসাধারণ মনস্বত্ত্ব বিশ্লেষণ। শ্রীশ্রী ঠাকুর প্রকৃতিকে এতটাই নিবিড়ভাবে জেনেছেন যে, সেই প্রকৃতিকে বশে আনার সরলতম পদ্ধতি মানুষের কাছে বরদান স্বরূপ প্রদান করেছেন।
এখন শুধুই জীব কল্যাণ সাধন। ভগবত বিমুখ জীবের দশা দেখে ব্যথিত। কি ভাবে অসত্যের বন্ধন থেকে মুক্ত হবে জীব? কি ভাবে লাভ করবে পরম পুরুষার্থ? জীবকে স্বরূপ ও স্বভাবে প্রতিষ্ঠিত করাই যে তাঁর একমাত্র লক্ষ্য। সেই পরম সত্য প্রতিষ্ঠা করতেই তিনি ঘরে ঘরে কাঙ্গালের বেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন। বলতেন নিত্যবস্তু বা স্বভাবের সঙ্গ না করলে দুঃখ এড়াবার উপায় নেই। ভগবানের নামের দাস হয়ে সংসারে থাকতে হয়। কর্ম্মের পুরস্কার ভূক্ত না থেকে অর্থাৎ কর্ম্মফলের আশা ত্যাগ করে নাম করলে সংসারের সমস্ত উৎপাত সহ্যকরা যায়। কামনা আর বাসনাই হলো সাংসারিক উৎপাতের কারণ।
সলতে আর তেলের যোগানেই দীপ জ্বলে, প্রদীপের আলো ছড়ায়। ভক্তদের প্রচেষ্টায় সমস্ত দেশে-দেশান্তরে শ্রীশ্রী ঠাকুরের প্রতিষ্ঠা ঘটবে আমরা দূর থেকে মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখব প্রচ্ছন্ন নারায়ণের লীলা আর বলব অপূর্ব দৃশ্যের দূরবর্তী সাক্ষী আমরা।
(শ্রীশ্রীঠাকুরকে জানুন- কৈবল্য ভুবন।)
See less