Kaibalya Bhuban

Kaibalya Bhuban Try to open the messages and teachings of Sri Sri Ram Thakur to all at the same time try to work for the community welfare.

শ্রীশ্রীচন্ডী শ্রীশ্রীচন্ডী হিন্দু দেবী। তিনি দেবী দুর্গার রূপভেদ এবং ‘শক্তি’ নামে পরিচিত। মার্কন্ডেয় পুরাণ অনুসারে দেবী...
26/07/2026

শ্রীশ্রীচন্ডী
শ্রীশ্রীচন্ডী হিন্দু দেবী। তিনি দেবী দুর্গার রূপভেদ এবং ‘শক্তি’ নামে পরিচিত। মার্কন্ডেয় পুরাণ অনুসারে দেবী চন্ডী শুম্ভ, নিশুম্ভ নামে দু দানব এবং চন্ড ও মুন্ডসহ আরও অনেককে বধ করেন। চন্ডরূপ ধারণ করে দেবশত্রুদের বধ করেন বলে তাঁর নাম হয় চন্ডী। চন্ডীই যখন ভক্তের দুর্গতি বিনাশ করেন তখন তাঁকে বলা হয় দুর্গা। দুর্গারূপে তিনি মহিষাসুরকে বধ করেন।
বহু নামে ও রূপে চন্ডী পূজিত হন, যেমন: দেবীচন্ডী, মঙ্গলচন্ডী, জয়চন্ডী, ওলাইচন্ডী, কুলুইচন্ডী, চেলাইচন্ডী প্রভৃতি। জয়চন্ডীরূপে তিনি দ্বিভুজা, ত্রিনয়না, গৌরবর্ণা, বরাভয়হস্তা এবং পদ্মোপরি দন্ডায়মানা।
দেবী মাহাত্ম্য পাঠ ও শ্রবণে কী ফল, শ্রীশ্রীচন্ডীর দ্বাদশ অধ্যায়ে সব কথা দেবী নিজের শ্রীমুখেই বলেছেন। বিশ্বাস করলেই ফল পাওয়া যায়, কারণ শাস্ত্র বিশ্বাসীর জন্য, অবিশ্বাসীর জন্য নয়। দেবীর কথাগুলো আমাদের মত বিশ্বাসীর জন্য বেদবাক্য ও একমাত্র অবলম্বন। সত্যস্বরূপা তিনি, সুতরাং দেবীর কথাও মূর্তিমান সত্য। জ্ঞানস্বরূপা তিনি, সুতরাং দেবীর কথাও জ্ঞানময়। আনন্দস্বরূপা তিনি, সুতরাং দেবীর কথাও আনন্দের মূর্তি, আনন্দের খনি।
মার্কন্ডেয় পুরাণে চন্ডী নামে একটি অধ্যায় আছে যার শ্লোকসংখ্যা সাতশ। এখানে দেবীচন্ডীর বিচিত্র রূপ ও মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। দেবীপূজা, বিশেষত দুর্গাপূজা উপলক্ষে কিংবা গৃহস্থের কল্যাণ কামনায় চন্ডীপাঠের নিয়ম আছে।
উক্ত উল্লেখিত বিশাল আয়তনের চন্ডী আমাদের মত সাধারণ মানুষের পক্ষে পাঠ করাও সম্ভব না, অপরদিকে চন্ডীপাঠ ও শ্রবণ থেকে যে কল্যাণ হয় তা’হতে আমরা যেন বঞ্চিত না হই সেজন্যই হয়ত আমাদের করুণাঘন শ্রীশ্রীঠাকুর আমাদের জন্য শ্রীহস্তে ছোট করে শ্রীশ্রীচন্ডীখানি লিখে গেলেন। শ্রীশ্রীচন্ডী পাঠের অমোঘ কল্যাণ আমরা যদি দেখি, শ্রীশ্রীচন্ডীতে দেবী বলেছেন;
তস্মান্মমৈতন্মাহাত্ম্যং পঠিতব্যং সমাহিতৈঃ।
শ্রোতব্যঞ্চ সদা ভক্তা পরং স্বস্ত্যয়নং হি তৎ।।'' (১২/৭).
--- 'অতএব আমার এই মাহাত্ম্য সমাহিতচিত্তে নিত্য ভক্তিপূর্বক পাঠ বা শ্রবণ করা কর্তব্য। কারণ তাহা অতিশয় মঙ্গলজনক। 'অতিশয় মঙ্গলজনক'--এই চন্ডীর কথা আলোচনা করলে আমরা প্রায় ঊনবিংশ ধরণের লাভের কথা জানতে পারি, সেগুলো হচ্ছে নিম্নরূপ--
প্রথম লাভ - কল্যাণ (ঐহিক ও পারত্রিক), দ্বিতীয় লাভ - পাপনাশ ও পাপজনিত আপদ নাশ, তৃতীয় লাভ - দারিদ্রনাশ, চতুর্থ লাভ - প্রিয়বিয়োগ নাশ, পঞ্চম লাভ - শত্রু, দস্যু, রাজা, শস্ত্র, অগ্নি ও জলপ্রবাহ থেকে সমস্ত ভয় নাশ, ষষ্ঠ লাভ - মহামারীজনিত সর্বপ্রকার উপদ্রব ও ত্রিবিধ উৎপাত দমন, সপ্তম লাভ - দেবীর প্রসন্নতা ও সন্নিধি, অষ্টম লাভ - নির্ভীকতা, নবম লাভ - শত্রুক্ষয়, দশম লাভ - বংশের উন্নতি, একাদশ লাভ - শান্তিকর্মে সিদ্ধি, দ্বাদশ লাভ - গ্রহশান্তি, ত্রয়োদশ লাভ - দুঃস্বপ্ন সমূহ সুস্বপ্নে পরিণতি, চতুর্দশ লাভ - ডাকিনী ও পূতনাদি বালগ্রহ দ্বারা আক্রান্ত শিশুগণের শান্তিলাভ, পঞ্চদশ লাভ - বৈরীভাব দূরীকরণ ও মিত্রতা স্থাপন, ষোড়শ লাভ - রাক্ষস, ভূত ও পিশাচগণের বিতাড়ন, সপ্তদশ লাভ - আরোগ্য, অষ্টাদশ লাভ - শুভ মতি লাভ অর্থাৎ চিত্তশুদ্ধি হয়, ঊনবিংশ লাভ - সমস্ত সঙ্কট হতে মুক্তি।
আমি (শ্রীযুক্ত রোহিনী কুমার মজুমদার মহাশয়) ছাত্রজীবন থেকেই প্রতিদিন চন্ডী সম্পূর্ণ পাঠ করিতাম। সম্পূর্ণ চন্ডীপাঠে অনেক সময়ের প্রয়োজন হয় বলিয়া ঠাকুরকে অনুরোধ করিলাম তিনি যদি কৃপা করিয়া সংক্ষেপে চন্ডী লিখিয়া দেন তাহা হইলে ভাল হয়। ঠাকুর সে সময় প্রভাতদা’র (অধ্যাপক প্রভাত চক্রবর্তী) বাড়িতে অবস্থান করিতেছিলেন। ঠাকুরও আমাকে সংক্ষেপে চন্ডী লিখিয়া দিলেন। আমি আজও ঠাকুরের স্বহস্তে লিখিত সেই চন্ডী নিয়মিত পাঠ করিয়া থাকি।
ভক্ত সাধারণের জন্য ঠাকুরের শ্রীহস্তের লিখিত চন্ডীর অনুলিপি আমার (শ্রীযুক্ত রোহিনী কুমার মজুমদার মহাশয়) স্মৃতিচারণের মধ্যেই সংযোজন করিলাম।

শ্রীশ্রীচন্ডী
শিবং ভাস্কর মগ্নিঞ্চ
কেশবং কৌশিকীস্তথা
পঞ্চ নাম স্মরেন্নিত্যং
সদ্যপাতক নাশনং
যা চন্ডী, মধু কৈটভাদি,
দৈত্যদলিনী।
যা মহিষোন্মুলিনী, যাধুম্রারাক্ষত চন্ডমুন্ড মথিনী
যারক্তরীজাশনি শক্তিঃ
শুম্ভ নিশুম্ব দৈত্য দলিনী।
যা সিদ্ধিঃ লক্ষ্মী
পরাংসা দেবী নবকোটি।
মূর্ত্তিসঁহিত মাংপাত কর্ম
বিশ্বেশ্বরী।।
মূলেন পাহি নো দেবি পাহি
খড়গেন চাম্বিকে, ঘন্টাস্বনেন
পাহি চাপর্য্যা নিস্বনে নচ।
প্রাচ্যাং রক্ষপ্রতিচ্যাঞ্চ চন্ডিকে
রক্ষ দক্ষিণে ভ্রাময়ণ
আত্ম শূলস্য উত্তরাস্যাং তথৈশ্বরী।
সৌম্যানি যানিরূপানি
ত্রৈলোক্য বিচরন্তিতে
তানি চাত্যর্থ্য ঘোরাণি
তৈরক্ষ্মাং মাংস্তুথাভুবম্
খড়াগশূল গদাদীনি যানি
চাস্ত্রানি চাম্বিকে করপল্লব
সঙ্গিনী তৈরক্ষাং মাং রক্ষ
সর্ব্বতঃ। সর্ব্ব স্বরূপে
সর্ব্বেশে সর্ব্বশক্তি সমন্বিতে
ভয়েভ্যো স্ত্রাহিনো দেবি
দুর্গে দেবী নমোস্তুতে।।
জয়ত্বং দেবী চামুন্ডে জয়ভুর্ত্ত পহারিনী।
জয় সর্ব্বগতে
দেবি কাল রাত্রি নমোস্তুতে।।
জয়ন্তি মঙ্গলা কালী
ভদ্রকালী কপালিনী
দুর্গা শিবা ক্ষমাধাত্রী
স্বাহা স্বধা নমোস্তুতে।।
সর্ব্ব মঙ্গল্যে মঙ্গল্যে
শিবে সর্ব্বার্থ সাধিকে
শরণ্যেত্র্যম্বকে গৌরি
নারায়ণি নমোস্তুতে।।

তাই যেহেতু শ্রীশ্রীঠাকুর শ্রীহস্তে শ্রীশ্রীচন্ডী আমাদের জন্যে লিখে গেছেন সেহেতু উল্লেখিত অমোঘ কল্যাণ সমূহ পাওয়ার জন্যে শ্রীশ্রীঠাকুরের শ্রীহস্ত লিখিত শ্রীশ্রীচন্ডী পাঠ ও শ্রবণ করা আজ রাম মণ্ডলীর সকলের জন্য একান্ত অপরিহার্য্য ও দায়িত্ব।
কৈবল্য ভুবনের সাথে থাকুন- শ্রীশ্রীরাম ঠাকুরকে জানুন।

https://www.youtube.com/watch?v=Kpr4ZnaFg-s&t=17s
10/07/2026

https://www.youtube.com/watch?v=Kpr4ZnaFg-s&t=17s

শ্রীশ্রীগুরুগীতার মাহাত্ম্যশ্রীশ্রীরামঠাকুরের সকল আশ্রিতদের প্রথমে...

গুরুগীতার মাহাত্ম্যসম্পাদনা অচ্যুত প্রসাদকৈবল্যধামের পরম পূজনীয় দ্বিতীয় মোহন্ত মহারাজ শ্রীমৎ শ্যামাচরণ চট্টোপাধ্যায় গুরু...
10/07/2026

গুরুগীতার মাহাত্ম্য
সম্পাদনা অচ্যুত প্রসাদ
কৈবল্যধামের পরম পূজনীয় দ্বিতীয় মোহন্ত মহারাজ শ্রীমৎ শ্যামাচরণ চট্টোপাধ্যায় গুরুগীতা গ্রন্থে যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা লিখেছেন তা ভক্তবৃন্দের জন্য নিম্নে উপস্থাপন করা হলো;
“যিনি জ্ঞানরূপ অঞ্জন পরাইয়া মোহান্ধকারে অন্ধীকৃত ব্যক্তির জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত ও উজ্জ্বল দৃষ্টিযুক্ত করিয়াছেন, যাঁহার প্রভাব বা মাহাত্ম্য জগত্রয়ে ব্যাপ্ত এবং যাহা হইতে তত্ত্বজ্ঞান লাভ করা যায়, সেই শিবরূপী নিজ গুরুর বন্দনা আমরা শ্রীগুরুগীতার স্তোত্রগুলিতে পাই। গুরু ব্রহ্মা, গুরু বিষ্ণু, গুরু মহেশ্বর, গুরু তীর্থ, গুরু যজ্ঞ, গুরু দান, গুরু তপস্যা, গুরু অগ্নি, গুরু সূর্য্য, জগতের স্থাবর, জঙ্গম যাহা দেখা যায় এক কথায় অনন্তকোটি ব্রহ্মান্ড সবই গুরু। কারণ প্রথমে একমাত্র পরম ব্রহ্ম ছিলেন। একাকী ক্রীড়া হয় না, তাই তিনি বহু হইয়াছেন। বেদ, উপনিষৎ, দর্শন, পুরাণ, তন্ত্র, সংহিতা সবই সেই একজনকে লাভ করিবার পথ নির্দ্দেশ করিতেছেন। তাঁকে লাভের একমাত্র উপায় গুরুসেবা, গুরূপদিষ্ট মার্গে বিচরণ করা। গুরু ব্রহ্মা, গুরু বিষ্ণু, গুরু মহেশ্বর, ত্রিলোকে গুরুর অধিক কেহ নাই।
গুরু যেরূপ ঈশ্বরও সেই প্রকার, ঈশ্বরও যেমন গুরুও তাদৃশ, গুরু ও ঈশ্বরে ভেদ নাই। সাধন ভজনহীন মানবের গুরুই ঈশ্বর একথা ধারণা করা সহজ নয়। আমার নবরূপধারী গুরু এই অনন্ত কোটি ব্রহ্মান্ডের অধীশ্বর শ্রীভগবান, প্রথমে একথায় অন্ধবিশ্বাস করিয়া গুরুদত্ত মন্ত্র সাধন করিতে করিতে গুরু, মন্ত্র, ইষ্ট -তিনটি এক ইহা ধারণা করিতে শিষ্য সমর্থ হয়। গুরুদেবের প্রকৃত এবং পূর্ণস্বরূপ বুঝাইবার জন্য গুরুগীতার শ্লোকগুলি অনুধাবন করিতে করিতে এবং গুরুমহিমা অভিনিবেশ সহকারে পাঠ করিতে করিতে অথবা শুনিতে শুনিতে শিষ্যের গুরুর প্রতি প্রগাঢ় ভক্তি আসিয়া উপস্থিত হয়। তখন সে কায়মনোবাক্যে গুরুসেবা করিতে থাকে এবং ক্রমে গুরুকৃপায় তার আত্মস্বরূপ প্রত্যক্ষ হয়। শ্রীশ্রীঠাকুরের কথায়-এই শ্লোকগুলি স্মারক; ইহারা ইষ্টস্মৃতি জাগাইয়া তোলে এবং তাহাতেই এইগুলির সার্থকতা।
গুরুগীতা পাঠ ও অনুধাবনে শ্রীভগবানকে লাভ করিবার যিনি উপায় বা পথ নির্দ্দেশ করেন, তাঁর শক্তিতেও মুমুক্ষু মানবের বিশ্বাস স্থাপিত হউক, ভগবৎ চরণে এই প্রার্থনা ।” শ্যামাচরণ চট্রোপাধ্যায়
শ্রীগুরুর কৃপা ব্যতীত সামান্যতম বস্তুও লাভ করা যায় না-ইহা অতীব সত্য। লোকগুরু (যে গুরুদেব আমাদের অর্থাৎ জনসাধারণের পরিত্রাতা) স্বয়ং সাক্ষাৎ লোকতত্ত্ববিদ্। গুরুতত্ত্বে অনভিজ্ঞ ব্যক্তির যজ্ঞ, ব্রত, তপস্যা, দান, জপ, তীর্থসেবা ইত্যাদি নিষ্ফল হইবেই-ইহাতে কোন সন্দেহ নাই। শ্রীগুরুর পদসেবা করিলে আত্মা সর্ব্বপাপবিমুক্ত হইয়া বিশুদ্ধ হয়। আর (শ্রীগুরু-পাদপদ্ম সেবা করিলে) সর্ব্বতীর্থ অবগাহনের ফল নিশ্চিতরূপে পাওয়া যায়। প্রত্যহ গুরুমূর্তি স্মরণ করা, সদা সর্ব্বদা গুরুনাম (শ্রীগুরু প্রদত্ত নাম) জপ করা এবং শ্রীগুরুর আজ্ঞা পালন করাই একমাত্র কর্ত্তব্য। শ্রীগুরুই দেবতা, তিনিই ধর্ম, তাঁহার প্রতি নিষ্ঠাই পরম তপস্যা। গুরু হইতে শ্রেষ্ঠ কিছুই নাই, শ্রেষ্ঠ তত্ত্ববস্তুও কিছুই নাই।
গুরুগীতায় আমরা পাই শ্রীগুরুদেবের মূর্ত্তিই ধ্যানের মূল, শ্রীগুরু-পাদপদ্ম পূজার মূল, গুরুবাক্য মন্ত্রের মূল এবং মোক্ষলাভের মূলবস্তু হইল গুরুকৃপা।
পরমজ্ঞান ব্যতীত কেবল গুরুভক্তিতেই মুক্তিপদ লাভ করা যায়। গুরুপথাবলম্বীগণের নিকট শ্রীগুরুদেবের ধ্যান ব্যতীত শ্রেষ্ঠতর আর কিছুই নাই।
যে গুরুনিন্দা করে, যতদিন চন্দ্র-সূর্য বিরাজ করিবে, ততদিন সে ঘোর নরকে বাস করিবে।
দেহের অন্তকাল অবধি শ্রীগুরুদেবকে স্মরণ করিবে। মুণিগণ, সর্পগণ, দেবগণও যদি অভিশাপ প্রদান করেন, শমন (কাল) ও মৃত্যুভয় হইতে একমাত্র শ্রীগুরুদেবই রক্ষা করিতে পারেন। অপরদিকে সকল দেবতা এবং মুনিগণ গুরুশাপগ্রস্ত ব্যক্তিকে রক্ষা করিতে অপারগ, তাহার বিনষ্টি অবশ্যম্ভাবী।

গুরুগীতায় বলা হয়েছে গুরুই সব। গুরুকে বিভিন্নরূপে প্রণাম করার কথা বলা হয়েছে, যেমন ;
 শ্রীগুরুদেব ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর এবং তিনিই পরমব্রহ্ম, সেই শ্রীগুরুদেবকে প্রণাম করি।
 অজ্ঞানতারূপ অন্ধকারে আচ্ছন্ন অন্ধব্যক্তির চক্ষুকে যিনি জ্ঞানরূপ অঞ্জনশলাকা দ্বারা উন্মীলিত করিয়াছেন, সেই শ্রীগুরুদেবকে প্রণাম করি।
 অখন্ডমন্ডলাকার বিশ্ব-ব্রহ্মান্ডকে যিনি প্রকাশ করেন এবং যিনি তাঁহার পরমপদকে পরিদর্শন করাইয়া দেন, সেই শ্রীগুরুদেবকে প্রণাম করি।
 স্থাবর-জঙ্গমাত্মক এই চরাচরে সামান্যতমও যাহা পরিব্যাপ্ত এবং যিনি সেই পরমপদ দর্শন করাইয়া দেন, সেই শ্রীগুরুদেবকে প্রণাম করি।
 সমগ্র ত্রিলোককে যিনি চিন্ময়ী-স্বরূপতার (চৈতন্যময়ী শক্তি) দ্বারা পরিব্যাপ্ত করিয়া রাখিয়াছেন এবং যিনি সেই ব্রহ্মপদকে দেখাইয়া দেন, সেই শ্রীগুরুদেবকে প্রণাম করি।
 শ্রুতি (বেদ) সমূহের শিরোরত্ন যাঁহার শ্রীপাদপদ্মে বিরাজিত, যিনি বেদান্তরূপ কমল প্রকাশে সূর্যস্বরূপ, সেই শ্রীগুরুদেবকে প্রণাম করি।
 যিনি চৈতন্য, শাশ্বত, শান্ত, আকাশ হইতেও নির্মল, যিনি বিন্দু, নাদ ও কলার অতীত সেই শ্রীগুরুদেবকে প্রণাম করি ।
 যিনি জ্ঞানশক্তিতে সমাসীন, তত্ত্বরূপ মালিকা দ্বারা বিভূষিত, যিনি ভোগ ও মুক্তিদান করেন, সেই শ্রীগুরুদেবকে প্রণাম করি।
 অনেকজন্ম সংক্রান্ত কর্মবন্ধনের যিনি মুক্তিদাতা, যিনি আত্মজ্ঞান প্রদানকারী, সেই শ্রীগুরুদেবকে প্রণাম করি।
 যে শ্রীগুরুর চরণামৃত ভবসমূদ্রকে শোষণ করিয়া জগতের সার সম্পদকে সম্যকরূপে জ্ঞাপন করাইয়া দেয়, সেই শ্রীগুরুদেবকে প্রণাম করি।
 শ্রীগুরুর অধিক কোন তত্ত্ববস্তু নাই, কোন তপস্যা নাই। গুরুতত্ত্ব হইতে শ্রেষ্ঠতর কোন তত্ত্বজ্ঞান নাই; সেই শ্রীগুরুদেবকে প্রণাম করি।
 আমার নাথই (পতি) জগতের নাথ; আমার গুরুই জগৎগুরু। আমার আত্মাই সর্ব্বভূতের আত্মা। সেই (আত্মারূপী আমার পতি-জগৎ গুরু সদৃশ) শ্রীগুরুদেবকে প্রণাম করি।
 শ্রীগুরুদেবই সকল বস্তুর আদি এবং অনাদি; শ্রীগুরুদেবই পরমদেবতা। শ্রীগুরুদেবের উপরে শ্রেষ্ঠ বস্তু কিছুই নাই। সেই শ্রীগুরুদেবকে প্রণাম করি।
 শ্রীগুরুদেব আকাশের ন্যায় দ্বন্দ্বাতীত এবং তত্ত্বমসি লক্ষ্য যুক্ত। তিনি নিত্য, অদ্বিতীয়, বিমল, অমল এবং সর্ব্বদা সকল প্রকৃতির সাক্ষীস্বরূপ। সেই ভাবাতীত এবং ত্রিগুণ (সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ) রহিত শ্রীগুরুদেবকে প্রণাম করি।
 যিনি নিত্য, শুদ্ধ, নিরাভাস, নিরাকার, নিরঞ্জন, নিত্যবোধযুক্ত, চিৎ এবং আনন্দময় ব্রহ্মস্বরূপ সেই শ্রীগুরুদেবকে প্রণাম করি।

গুরুগীতা মাহাত্ম্য
 গুরুগীতা ভক্তি সহকারে পাঠ, শ্রবণ অথবা লিখিয়া অন্য কাহাকে প্রদান করিলে সর্ব্বকর্ম্ম ফল লাভ হইবে।
 গুরুগীতার এক একটি অক্ষর এক একটি শ্রেষ্ঠ মন্ত্র (মন্ত্রের রাজা) অন্যবিধ মন্ত্রসমূহ ইহার ষোল ভাগের একভাগও নহে।
 ইহা (গুরুগীতা) সকল প্রকার পাপ, উদ্বেগ ও দারিদ্র্যনাশক। ইহা অকালমৃত্যু নিবারণ করে এবং সর্ব্ব প্রকার সংকট বিদূরিত করে।
 ইহা যক্ষ, রাক্ষস, ভূত, চোর, ব্যাঘ্র ইত্যাদির ভয় দূরীভূত করে। মহাব্যাধি হরণ করিয়া বিভূতিরূপ সিদ্ধি প্রদান করে।
 ইহা সর্ব্বপ্রাণীকে মোহিত করে এবং শ্রেষ্ঠ বন্ধন বিমোচক। ইহা দেবতা ও রাজাকে প্রিয় করে এবং সর্ব্বলোককে বশীভূত করে।
 ইহা লোকদের মুখকে স্তম্ভিত করে, সদ্গুণরাশিকে বর্দ্ধিত করিয়া দেয় এবং দুষ্কর্ম্মসমূহকে বিনাশ করিয়া সৎকর্ম্মে সিদ্ধিলাভ দান করে।
 ইহা ভক্তি-প্রদান করে, সর্ব্বকার্য্যে সিদ্ধিদান করে, নবগ্রহ ভীতি বিদূরিত করে এবং দুঃস্বপ্নকে বিনাশ করিয়া সুস্বপ্ন প্রদর্শন করায়।
 ইহা পাঠ করিলে নিত্য সর্ব্বশান্তি বিরাজ করে, বন্ধ্যাকে পুত্রফল প্রদান করে এবং নারীগণের বৈধব্য-দোষ বিনষ্ট করিয়া পরম সৌভাগ্য প্রদান করে।
 ইহার পাঠে আয়ু, আরোগ্য, ঐশ্বয্য, পুত্র, পৌত্রাদি বর্দ্ধিত হয়। নিষ্কামভাবে তিনবার পাঠ বা জপ করিলে মোক্ষলাভ হয়।
 ইহা পাঠ করিলে সর্ব্বপ্রকার দুঃখ, ভয়, বিঘ্নাদি বিনাশ করে, সর্ব্বপ্রকার তাপ হরণ করে।
 সকল প্রকার বাধা প্রশমন করিয়া ধর্ম্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ প্রদান করে।
 ইহার পাঠক বা শ্রোতা যাহা চিন্তা করেন, নিশ্চয়ই তাহা প্রাপ্ত হন।
 এই শ্লোকগুলি কামনাশীল ব্যক্তির পক্ষে কামধেনু স্বরূপ এবং কল্পনার দেববৃক্ষ সদৃশ।
 এই গুরুগীতা চিন্তাকারীদের চিন্তামণিস্বরূপ এবং সর্ব্বমঙ্গল কারক। শাক্ত, শৈব, গাণপত্য, বৈষ্ণব এবং সৌরগণ ইহা জপ করে।
 সংসাররূপ মল বিনাশ করিবার নিমিত্ত এবং ভবতাপ নিবারণের জন্য গুরুগীতারূপ জলে তত্ত্বজ্ঞ ব্যক্তিগণ সর্ব্বদা স্নান করে।
 এই দুর্ল্লভ গুরুগীতা যে দেশে অবস্থান করেন, সেই ক্ষেত্ররূপ পীঠস্থানে সকল দেব-দেবী বাস করিয়া থাকেন।
 যে সকল জ্ঞানীব্যক্তিরা শুচি (পবিত্র) অন্তঃকরণে গুরুগীতা জপ করেন, তাঁহাদের দর্শনে আর পুনর্জ্জন্ম হয় না।
 গুরুগীতা পাঠকের মাতা-পিতা ধন্য, বংশকুল ধন্য, পৃথিবীও ধন্যা।

গুরুগীতায় ভক্তি সাধনার শ্রেষ্ঠ পাত্র শঙ্কর, দেবী পার্ব্বতীকে বলিলেন, ইহাই সত্য সত্য যে - এই গুরুগীতার সমান আর কিছুই নাই।

কৈবল্য ভুবনের সাথে থাকুন- শ্রীশ্রীরাম ঠাকুরকে জানুন।

বেদবাণী মাহাত্ম্যসম্পাদনা অচ্যুত প্রসাদ শ্রীদেহে থাকাকালীন বিভিন্ন সময়ে ভক্তগণ তাঁহাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা এবং অধ্যাত্ম ব...
04/07/2026

বেদবাণী মাহাত্ম্য
সম্পাদনা অচ্যুত প্রসাদ
শ্রীদেহে থাকাকালীন বিভিন্ন সময়ে ভক্তগণ তাঁহাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা এবং অধ্যাত্ম বিষয়ে মনে উদিত প্রশ্ন ইত্যাদি জানাইয়া ঠাকুর মহাশয়কে চিঠি লিখিতেন। শ্রীশ্রীঠাকুর সকলের চিঠিরই উত্তর দিতেন। সেইসব চিঠিতে থাকিত সতীধর্মের কথা, স্বভাব ধর্মের কথা, প্রাক্তন- প্রারব্ধ ভোগ নিরসনের কথা, সত্যনারায়ণ সেবা মাহাত্ম্য ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক উপদেশবাণী। শ্রীশ্রীঠাকুরের অপ্রকট লীলার পরে তাঁহার লিখিত ঐরূপ আটশত আটখানা চিঠি প্রথমে সংগ্রহ করিয়া ঠাকুরের আশ্রিত পরম ভক্ত কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শ্রীযুক্ত ইন্দুভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় ‘বেদবাণী’ নাম দিয়া পুস্তকাকারে প্রকাশ করেন। পরে ভারত সরকারের জাতীয় শিক্ষক উপাধি প্রাপ্ত শ্রীযুক্ত শিতিকণ্ঠ সেনগুপ্ত মহাশয় ঐরূপ আরও একশত বিরানব্বই খানা চিঠি সংগ্রহ করিয়া পুস্তকাকারে প্রকাশ করিলে সর্বমোট এক হাজার খানা চিঠি প্রকাশ পায়। ‘বেদবাণী’র এই চিঠিগুলি পাঠ করিলেই বুঝা যায় ইহা বেদ, উপনিষদ, গীতা, তথা সমগ্র পুরাণাদির নির্যাস স্বরূপ। এই তো রামবাণী, জ্ঞানবাণী, সনাতন বাণী। শ্রীশ্রীরামঠাকুর এর স্বয়ং তত্ত্ব পরমতত্ত্ব। আচার্য ইন্দুভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও পরবর্তীতে শ্রীযুক্ত শিতিকণ্ঠ সেনগুপ্ত মহাশয় ঠাকুরের লিখিত পত্রবাণী লেখনীবদ্ধ করিয়াছেন। ইহা মানব সম্প্রদায়ের পরম সম্পদ। বেদবাণী জ্ঞানের বাণী। শ্রীশ্রীঠাকুরের আশ্রিতদের জন্য, মুমূর্ষু মানুষের জন্য এ বেদবাণী আচার্য ইন্দুভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও শ্রীযুক্ত শিতিকণ্ঠ সেনগুপ্ত মহাশয় গ্রন্থবদ্ধ করিয়াছিলেন যা আজ ঠাকুরাশ্রিতদের কাছে পরম সম্পদ তথা মহাগ্রন্থ। বেদবাণীর গুরুবাণী ঠাকুরাশ্রিতকে প্রত্যেক দিনই দুইবার না হইলেও অন্তত একবার পাঠ করা অবশ্য কর্তব্য। এ পবিত্র গ্রন্থ ভক্তকে মুক্তির দ্বার দেখাইয়া দিয়া সত্যলোক, গুরুলোকের পথ দেখাইয়া দিবে।
বেদবাণী’র মাহাত্ম্য সর্ম্পকে শ্রীশ্রীঠাকুরের পরম ভক্ত শ্রীযুক্ত শিতিকণ্ঠ সেন গুপ্ত মহাশয়ের একটি লেখা ভক্তদের জন্য নিম্নে উপস্থাপিত হলো, আশা করি সবার ভালো লাগবে।
শ্রীযুক্ত শিতিকণ্ঠ সেন গুপ্ত মহাশয়ের লেখনীতে;
বেদবাণী সর্ম্পকে আলোচনা শুরু করার পূর্ব্বে “রাম ঠাকুরের কথা” হতে ‘বেদবাণী’র সম্পাদক মহাশয়ের কয়েকটি উক্তি উদ্ধৃত করবো-
(ক) “প্রত্যেক মহাপুরুষেরই কথা বলিবার একটি বিশিষ্ট ভঙ্গী থাকে এবং সে ভঙ্গীটি আয়ত্ত করিতে না পারিলে তাঁহার বক্তব্য বুঝিয়া উঠা যায় না। শ্রদ্ধাসহকারে পুনঃ পুনঃ আলোচনাই এ সমস্ত সমাধানের একমাত্র উপায়।”
(খ) “কিন্তু আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হইতে বলিতে পারি যে, শ্রদ্ধাসহকারে এই পত্রাংশগুলি পুনঃ পুনঃ পড়িলে ইহার মর্ম্মার্থ ক্রমেই পরিস্ফুট হইয়া উঠে এবং যত বেশী পড়া যায় ততই নূতন নূতন ভাবের উদ্দীপনা হইয়া থাকে। কখনও কখনও বিভিন্ন পত্রাংশগুলির মধ্যে আপাতদৃষ্টিতে যে সকল অসামঞ্জস্য পরিলক্ষিত হয় তাহারও সুনিশ্চিত মীমাংসা হইয়া যায়।”
“বুঝ্তে চাইলে বুঝতে পারে না। বুঝ্তে না চাইলে বুঝাইয়া দেয়।”- একথাটিও শ্রীশ্রীঠাকুর ইন্দুবাবুকেই বলেছিলেন। অতএব, ‘বেদবাণী’র মর্ম্মার্থ বুঝতে হলে নিজের সীমাবদ্ধ বুদ্ধির উপর নির্ভর না ক’রে, পরম দয়াল শ্রীশ্রীঠাকুরের উপর নির্ভর করতে পারলেই তিনি কৃপা করে আমার উপযোগী করে আমায় বুঝিয়ে দেবেন।
‘বেদবাণী’ পরম দয়াল শ্রীশ্রীঠাকুরের অপার করুণারই নিদর্শন। অপরাপর শাস্ত্রগ্রন্থের জন্য ‘বেদবাণী’ পাঠ করতে গেলে হতাশ হওয়া ভিন্ন গত্যন্তর নেই। ‘বেদবাণী’ পূর্ব্বাপর সামঞ্জস্য বজায় রেখে লেখা কোন গ্রন্থ নয়। কোন একটি বিশেষ মতবাদ প্রতিষ্ঠা বা প্রচারের উদ্দেশ্যে ঠাকুর কাউকে কোন চিঠি লিখেন নি। প্রকৃত জিজ্ঞাসুকে উপযুক্ত পথের নির্দ্দেশ দানই ঠাকুরের লক্ষ্য ছিল। ঠাকুর কোন দল বা সম্প্রদায়ের নন্। তাই কোন দল বা সম্প্রদায় গঠনের চেষ্টাও তিনি করেন নি। তিনি এসেছিলেন সকলের জন্য। তাই ‘বেদবাণী’তে প্রায় সকলের কথাই আছে। পন্ডিত-মূর্খ, পাপী-পুন্যাত্মা, সবল-দুর্ব্বল, যোগ্য-অযোগ্য, ধনী-দরিদ্র সকলের গ্রহণযোগ্য উপদেশই ‘বেদবাণী’ খুঁজলে পাওয়া যাবে। কোন একটি বিশেষ স্থানিক বা সাময়িক ধর্ম্মবিশ্বাস বিশেষ দলের নিকট আদর পেতে পারে, কিন্তু সর্ব্বদেশের সর্ব্বলোককে তার পথের সন্ধান দিতে পারে না। পরিবর্ত্তনশীল জগতে সব কিছুরই দ্রুত পরিবর্ত্তন হচ্ছে। দুনিয়ার মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার গতি-প্রকৃতিও স্থান, কাল এবং পাত্রভেদে নিরন্তর পরিবর্ত্তিত হচ্ছে। একই পদ্ধতিতে সর্ব্বকালের সর্ব্বলোকের সমস্যার সমাধান আশা করা বাতুলতা। করুণার অবতার শ্রীশ্রীঠাকুর কোন মানুষকেই নিরাশ করতে চাননি। তাই, গ্রহীতার যোগ্যতা বা প্রস্তুতির কথা ভেবে তার মত করেই তাকে সুস্পষ্টভাবে নির্দ্দেশ দিয়েছেন। নানা যুক্তিতর্ক, নানা নজির, নানা মতবাদ অনেক সময়ই মানুষকে বিভ্রান্ত করে ফেলে। দয়াল ঠাকুরের দরদ-মাখানো সান্তনাবাণী এ বিষয়ে যথেষ্ট সহায়তা করবে। ভবরোগের সুদক্ষ বৈদ্য শ্রীশ্রীঠাকুর ভবরোগ নিরাময়ের ব্যবস্থাই সবাইকে দিয়েছেন। তবে, রোগী বা রোগিণীর ধাত বুঝে ঔষধের মাত্রা, অনুপান, ব্যবহার-বিধি ইত্যাদি স্থির করে দিয়েছেন। কারণ, ঠাকুরের মূল লক্ষ্য- আমাদের সুস্থ ও সবল করে তোলা।
করুণাঘন বিগ্রহ শ্রীশ্রীঠাকুরও তাই জোর করে কোন আদেশ বা নির্দ্দেশ কারো উপর চাপাতে চাননি। তবে, একটি সাধারণ প্রতিষেধকের ব্যবস্থা ঠাকুর সকলকেই সমভাবে দিয়েছেন- “নাম করেন, নাম করলেই সব হবে।”
অতএব একমাত্র ‘শ্রীনাম, আশ্রয় করে, ধৈর্য্য ধরে চলার নির্দ্দেশই ঠাকুর সকলকে সমভাবে দিয়েছেন। কিন্তু তার জন্যও ঠাকুর কোন নিয়ম বেঁধে দেন নি। স্বভাবের সহজ নিয়ম, যিনি যে ভাবে পারবেন, সে ভাবেই ‘শ্রীনাম’ আশ্রয় করে তিনি চলার চেষ্টা করবেন - এ স্বাধীনতা ঠাকুর সকলের জন্যই মঞ্জুর করেছেন।
মনে পড়েÑ একদিন ‘বেদবাণী’ পাঠকালে যখন বল্লাম যে, “নাক দিয়া যে শ্বাস-প্রশ্বাস আসে যায় তার দিকে লক্ষ্য না রাখলেও চলে।” অমনি পাশের এক ভক্ত একটু উত্তেজিত হয়েই ‘বললেন, ঠাকুর এমন কথা বলতেই পারেন না। অথচ ‘বেদবাণী’র প্রথম খন্ডের ৭২ নম্বর চিঠিতে ঠাকুর একথাই বলেছেন। ব্যক্তিটির উষ্মা প্রকাশ দেখে সহজভাবে বললুম, আপনি যা চাচ্ছেন তা দ্বিতীয় খন্ডের ১৪৪ নম্বর চিঠিতে স্পষ্ট আছে শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া থাকিবার চেষ্টা করিতে হয়।” এতে কি একথাই বুঝায় না যে, যিনি শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রতি লক্ষ্য রেখে চলতে সক্ষম তিনি নিশ্চয়ই তা করবেন? কিন্তু যিনি তা’ পারেন না অর্থাৎ যাদের সে যোগ্যতা বা উপযুক্ত পরিবেশ নেই, তাদের কি তাহলে কোন ভরসাই নেই? অভয়দাতা ঠাকুর এ অভয়বাণী শুনাতেই তো এসেছেন!
“সকল ক্রিয়া, স্তবস্তুতি, জপাদি যাহা নৈমিত্তিক বিধান আছে, কি ধ্যান, সকলি পারলে করবেন, না পারলে না করিবেন, তাহাতে কোন প্রকার অপরাধ হইবে না।........ কোন চিন্তা ভাবনা করিবেন না।” (২ঃ১৯০)
এমন আশার বাণী,এমন ভরসার কথা আর আমরা কার কাছে শুনবো? ভগবান সকলের এবং তাঁকে ভালবাসার অধিকারও সকলেরই সমান। যোগ্য-অযোগ্য, উচ্চাধিকারী, নিম্নাধিকারী বলে কোন বিচার এখানে নেই। আমি অযোগ্য হতে পারি, কিন্তু তাঁর কৃপালাভের যোগ্যতা আমারও আছে, বরং অযোগ্যের জন্যই তাঁর ভাবনা একটু বেশী হওয়া স্বাভাবিক। কোন স্নেহময় পিতাই তার সন্তানের কাঁধে এমন বোঝা চাপাতে যাবেন না, যা সে অনায়াসে বহন করতে অক্ষম্ কারণ সে যদি অপারগ হয়, তাহলে পিতৃ-আদেশ লঙ্ঘন-জনিত অপরাধ তার মনের উপর প্রভাব বিস্তার করে তাকে হতোদ্যম করে ফেলতে পারে, এ দুর্ভাবনা কি পিতার নেই? সন্তানের যাতে কোন অমঙ্গল না হয়, পিতার সজাগ দৃষ্টি সর্ব্বদা সেই দিকে থাকে। ঠাকুরের কথা বলার ভঙ্গী লক্ষ্য করলেও বুঝা যেত যে, তিনি কাউকে বিমুখ বা নিরাশ করাটা পছন্দ করতেন না। ঠাকুর সকল স্তরের ভক্তকেই সমভাবে কৃপা করেছেন। একমাত্র সরলতার অভাবই ঠাকুরের অনেক সময় পীড়া দিত।
মরমী ঠাকুর, যার যেমন যোগ্যতা-সেই ভাবেই তাকে উপদেশ করেছেন। আধারে যেটুকু ধরবে, ধাতে যেমনটি সইবে এসব বিবেচনা না করে উপদেশ দিলে যে সব বৃথা হবে সবার প্রকৃতি এবং সংস্কার সমান নয়। যার যেমনটি প্রয়োজন, মা সে ভাবেই তার ব্যবস্থা করেন। ঠাকুর ও তাই মায়ের মত দরদ ঢেলে আমাদের সুস্থ সবল করতে চেয়েছেন। কাজেই বলা যেতে পারে, ‘বেদবাণী’র বিভিন্ন উক্তিসমূহ দয়াময়ের অপার স্নেহেরই নিদর্শন।
অনেক সময় ‘বেদবানী’র একখানা চিঠি সম্যক্ পাঠ না করেই আমরা আমাদের বক্তব্য বল্তে শুরু করি। যেমন, তৃতীয় খন্ডের ৫৬ নম্বর চিঠিতে আছে, “মনস্থির করিবার চেষ্টা করিতে নাই।” কিন্তু পরের লাইনেই আবার, “এজন্যই মনকে চঞ্চল হইতে দিবে যে পর্যন্ত দেহ অভিমান থাকে।” কাজেই চিঠিখানা সম্যক্ পড়ে তবে আমাদের মতামত ব্যক্ত করাই সঙ্গত। ঠাকুর, মনকে স্থির করার নানা প্রক্রিয়ার কথাও যেমন বলেছেন, আবার মনস্থিরের প্রতি লক্ষ্য না রাখার কথাও তেমন বলেছেন। কাজেই, যদি প্রচার করে বেড়াই যে, ঠাকুর বলেছেন মনস্থির করার কোন দরকার নেই, তাহলে এ অপব্যাখ্যার জন্য দায়ী কে? এখানে আর একটি প্রশ্নও উঠতে পারে, সবাই বলেছেন, মনস্থির না করা পর্য্যন্ত কিছুই হবে না, আর প্রথম খন্ডের ১৫০ নম্বর চিঠিতে ঠাকুর স্পষ্টই লিখেছেন, “মন বিষয়ে লিপ্ত থাকে, তাকে স্থির করিবার চেষ্টা অনর্থক”। ঠাকুরের এ ধরণের উক্তির মর্ম্মার্থ কী? সংকল্প ও বিকল্পের তরঙ্গই মন। কাজেই মানুষের মন তরঙ্গের জন্যই সদা চঞ্চল। সমুদ্রে স্নান করতে গিয়ে যদি কেউ দাবী করেন, আগে ঢেউগুলি স্থির হউক তারপর স্নান করবো, তাহলে তার যেমন আর স্নান করাই হয় না, তাকে স্নান করতে হলে যেমন ঐ অবস্থায়ই করে নিতে হয়; ঠিক তেমনি ঠাকুরের কথা হলো, মনস্থির করা রূপ অসাধ্য-সাধনে শক্তি ব্যয় না করে, আমার প্রয়োজন যেখানে, সে বিষয়ে মনোযোগ দেওয়াই কর্ত্তব্য। মনটাকে একটু স্থির করবো, একথা ভাবতে গেলেই সে যেন আরো বেশী অস্থির পয়ে পড়ে না কি? যে চিন্তা আমি করবো না মনে করি সে চিন্তাই যেন আমায় পেয়ে বসে। বর্ত্তমান অশান্ত পরিবেশের মধ্যে থেকে মনস্থির করা একরূপ অসাধ্য সাধনের মত। কাজেই মিছিমিছি পন্ডশ্রম না করার জন্যই ঠাকুর সোজাসুজি বললেন, “মনস্থির করিবার চেষ্টা করিতে নাই।” আসল কথা মনস্থির করবো কেন? তাঁকে পাবার জন্য তো? অর্থাৎ করাটাই আসল নয়; পাওয়াটাই আসল। এ পাওয়ার প্রয়োজন-বোধ আমার না জাগলে, মনস্থির করার জন্য নানা প্রক্রিয়ার সাহায্য নিলে কী হবে? ঠাকুরের কথা হলো- মন স্থির করা নয়, মনের লয় বা উদ্ধার করা।
“মন স্থির করিলে মাত্র দেবতাদির সঙ্গলাভ হয়, আত্মার উদ্ধার হয় না।” (১ঃ১৫০)
ঠাকুর মন স্থির করা বলতে, মনকে কামনাশূণ্য করে, তাঁর উদ্দেশ্যে রাখার কথা বলেছেন। কাজেই, একবার যদি আমরা পরম বান্ধবটিকে ভালবাসতে পারি, তাহলে মন আর কোন দিকে যেতে চাইবে না। একেই ঠাকুর অদ্বৈতভাব বলছেন। তাইতো ঠাকুর স্পষ্ট করে বলেছেন,
“তাঁর শরণে সর্ব্বদা লিপ্ত থাকাই প্রয়োজন করিতে হয়।” (১ঃ১৪৯) ঠাকুর আরো বলেছেন,
“মন স্থিরের প্রতি লক্ষ্য না রাখিয়া ভগবানের প্রতি লক্ষ্য রাখিবে।” (১ঃ৩০৯)
দৃষ্টান্ত দিয়েছেন,
“ব্রজবাসীদের মনের স্থীর কি মনের শান্তির জন্য প্রয়াস করে না, কেবল পতিব্রতা ধর্ম্ম সহায় করিয়া, প্রাক্তন যাতনা ভোগ করিয়া পরমানন্দে নিত্যসেবার রস অধিকার করিয়া লইয়া ব্রজবাসী অন্তরঙ্গ পরিকর হইয়াছে।” (৩ঃ১০৯)
আসল কথা, মন স্থিরের প্রয়াস করতে গিয়ে যেন আমরা লক্ষ্য ভুলে না যাই, তার জন্যই ঠাকুর এভাবে বলেছেন। তা’ছাড়া এ যুগে যোগসাধন অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। তাই আমাদের মত সদা ব্যস্ত ঘোর সংসারী জীবের জন্যই ঠাকুরের এ বিকল্প ব্যবস্থা। মানুষ এক জাতের হতে পারে, কিন্তু এক ছাঁচের বা এক ধাতের দুটি মানুষ পাওয়া মুস্কিল। মানুষের প্রবৃত্তি এবং সংস্কার, যা তার চলা, বলা, করা, কওয়া সব কিছুকে নিয়ন্ত্রিত করছে তাকে অস্বীকার করে তার উপর কোন নির্দ্দেশ চাপিয়ে দিলে কোন লাভ হয় না, এ বিষয়ে ঠাকুরের সজাগ দৃষ্টি ছিল। মানুষকে আপন আপন বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী চলার স্বাধীনতা না দিলে তার চলা কখনও স্বাভাবিক হতে পারে না। তাই তো মরমী ঠাকুরকে এভাবে নানা ঢং-এ কথা বলতে হয়েছে। হজমের সুবিধার জন্য যেমন এক দুধকেই ছানা, মাখন, দই ইত্যাদি রূপে পরিবেশন করা হয়ে থাকে, ঠাকুরও তাই আশ্রিতের গ্রহণযোগ্য করে এক সত্যকেই নানা আকারে পরিবেশন করেছেন। ভক্তের আধ্যাত্মিক পুষ্টিবিধানই ঠাকুরের লক্ষ্য। এ জন্যই ঠাকুর যাগ-যজ্ঞ ত্যাগ-সংযম, ধ্যান-তপস্যা ইত্যাদির বিধান সকলকে দেন নি। সকলের কথাই ‘বেদবাণী’তে আছে। আমাদের কাজ , লক্ষ্য স্থির করে পথে এসে দাঁড়ান। তাঁকে পাবার ইচ্ছা যার প্রবল, তুচ্ছ উপায়ের জন্য তার ভাবনা করার দরকার নেই। ঠাকুরই কৃপা ক’রে হাত ধ’রে তাকে স্বধামে নিয়ে যাবেন, এ আশ্বাস ঠাকুর বার বার দিয়েছেন।
“সাধন- ভজন দ্বারা ভগবৎভক্তি প্রেম পাইতে পারে না, ঐশ্বর্যাদি উপভোগ করিতে পারে। তাহাও কঠোর সাধ্যসিদ্ধ, হওয়াও দুষ্কর। অতএব সর্ব্বদাই ভগবানের নামের নিকট থাকিয়া সহিষ্ণুতা আহরণ করিবে, ইহা ভিন্ন আর কোন উপায় মুক্তির নাই।” (১ঃ৩২১)
“মন, বুদ্ধি, বাসনা সকল গুরুপ্রাপ্তি-ইচ্ছায় রাখিয়া দিবে। কোন বিষয়েই অধীর হইতে নাই। সর্ব্বদা কেবল গুরুর দিকে লক্ষ্য রাখিবেন, গুরু আপনার মঙ্গল করিবেন।” (৩ঃ১৩৫)
“সততঃ সকল ভার গুরুর উপর দিয়া সংসারের কার্য্য যাহা যখন উপস্থিত হয় করিয়া যাইবে। তাহাতেই পরিণামে গুরুই উদ্ধার করিবেন। গুরু ভরসা ব্যতীত বর্ত্তমানে তপস্যাদির দ্বারা শক্তি আহরণ করিতে ক্ষমতা কাহারই নাই।” (১ঃ১৮৯)
অতএব, ঠাকুরকে পরম আপন জ্ঞানে তাঁর উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে যে ভাবে আমার ভাল লাগে, অনায়াসে স্বাভাবিক ভাবে আমি যা করতে পারবো, সে ভাবেই আমাকে অগ্রসর হতে হবে। ঠাকুরের কোন্ নির্দ্দেশটি আমি মেনে চলবো তা নিয়েও আমার দুর্ভাবনার কোন কারণ নেই। কোন্ পথটি আমার পক্ষে কল্যাণকর, কল্যাণময় ঠাকুরই তা আমায় বুঝিয়ে দিবেন। কাজেই, ‘বেদবাণী’র নানা উক্তিতে বিভ্রান্ত না হয়ে, মঙ্গলময় প্রভুর একান্ত শরণে থাকার চেষ্টাই আমার আসল প্রয়োজন। দরদী ঠাকুরকে একান্ত আপন জ্ঞানে ভালবেসে, তাঁর প্রীতির উদ্দেশ্যে কর্ম্ম ক’রে যেতে পারলেই হলো। কাজেই স্বভাবের স্বাভাবিক নিয়মে যা করতে পারি, আমি তাই করবো। দয়াল প্রভুর রাতুল চরণে এই মিনতি, সমস্ত চিত্ত দিয়ে যেন তোমার প্রতি অটুট বিশ্বাস থাকে।
“তোমারে যেন না করি সংশয়”- (রবীন্দ্রনাথ)

কৈবল্য ভুবনের সাথে থাকুন- শ্রীশ্রীরাম ঠাকুরকে জানুন।

হে জগৎগুরু, তোমার চরণে কৃপা ভিখারীসম্পাদনা- অচ্যুত প্রসাদওঁ শ্রীশ্রীরামচন্দ্রায় নমঃওঁ নমঃ শ্রীরামচন্দ্রায় মৃদুমধুর ভাষিণ...
01/07/2026

হে জগৎগুরু, তোমার চরণে কৃপা ভিখারী
সম্পাদনা- অচ্যুত প্রসাদ

ওঁ শ্রীশ্রীরামচন্দ্রায় নমঃ
ওঁ নমঃ শ্রীরামচন্দ্রায় মৃদুমধুর ভাষিণে।
সৌম্যশান্তাবতারায় তস্মৈ শ্রীগুরুবে নমঃ ॥
গুরুর্ব্রহ্মা গুরুর্বিষ্ণুঃ গুরুর্দেবো মহেশ্বরঃ।
গুরুরেব পরং ব্রহ্ম তস্মৈ শ্রীগুরুবে নমঃ॥

শ্রদ্ধেয় ভক্তবৃন্দ ও সুধী মন্ডলী
আপনারা সকলে আমার প্রণাম গ্রহণ করুন ও আমাকে আশির্বাদ করুন।

যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্
অর্থ: হে ভারত, যখনই ধর্মের অধঃপতন হয় এবং অধর্মের অভ্যূত্থান হয় তখনই আমি নিজেকে প্রকাশ করে অবতীর্ণ হই।
পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভাবামি যুগে যুগে
অর্থ: সাধুদের পরিত্রাণ করার জন্য এবং দুস্কৃতকারীদের বিনাশ করার জন্য এবং ধর্ম সংস্থাপনের জন্য আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হই।

এই বাণীর আলোকেই ভগবান সত্যযুগে নারায়ণ, ত্রেতাযুগে শ্রীরামচন্দ্র, দ্বাপরে কৃষ্ণ ও কলিযুগে গৌরাঙ্গদেব ও সর্বশেষ শ্রীশ্রীরাম ঠাকুর রুপে এ পৃথিবীতে অবতীর্ন হয়েছিলেন।

‘শ্রীশ্রীরামঠাকুর’ কখন এলেন? কি ভয়াবহ অবস্থা ভারতবর্ষের- জাতিভেদ ও বর্ণপ্রথা, দু’ দুটি বিশ্বযুদ্ধ, পারমাণবিক বিস্ফোরণ, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের নিপীড়ন, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের ঘটনা পরম্পরা, সকল সংকটে রামঠাকুর দাঁড়িয়েছেন আর্ত মানবতার পাশে, দ্বারে দ্বারে ঘুরে যুগিয়েছেন সাহস, আশা এবং আশির্বাদ, রামঠাকুর ‘সেবা’ করেছেন সর্বজীবের, পথনির্দেশনা দিয়েছেন ‘সত্য ও শান্তি’র, অপার করুণাধারায় তিনি ঋদ্ধ করেছেন শত সহস্র মানুষের জীবন। ধর্ম সংস্থাপন করেছেন, করেছেন সমাজ সংস্কার।দুর করেছেন বর্ণ প্রথা।শ্রীশ্রীরামঠাকুর বলেছেন, “আপনারা মানব সম্প্রদায়”। অযাচিত কৃপা, সেবাপরায়ণতা, মানবপ্রীতি, মধুর কথন, বিনম্র ব্যবহার, সহানুভূতি-অনুকম্পা-করুনার অপার দানে ‘রামঠাকুর’ অনন্য, এই বিশ্বসংসার তাঁর ‘পরিবার’, সকলেই তাঁর ‘আপনজন’।

যারা তাঁর সর্ম্পকে জানেন না তারাই বলতে পারেন যে তিনি আবার কিভাবে অবতার হলেন?
তাদের জন্য বলছি, তিনি নিজেই বলেছেন-

শ্রীশ্রীঠাকুরের উক্তি “জীবনই নাই তো জীবনী কিরূপে হইব, সেই বৃন্দাবন থাইকা তো একই আছি।”

নিজের বক্ষে অংগুলি সংকেত করে বলেছেন-
“পূর্ণব্রহ্ম সনাতন সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়ের কারণ সত্যনারায়ণ- এই রামচন্দ্র।”

স্পষ্টাক্ষরে বলেছেন, “অন্নপূর্ণা, শিবনাথ, কি ব্রজনাথ, ইনিই রামসীতা, কি রাধাকৃষ্ণ, ইনিই ভগবান, ইনিই আমি।”

তাঁর মধ্যে বিশ্বরূপ দর্শন একবার এক গর্বিত পন্ডিতের হয়েছিলঃ পূর্ববঙ্গের ভৈরব ষ্টেশনের রেল আবাসনে ললিত রায় মহাশয়ের বাড়ী ঠাকুর আছেন। একদিন সকাল বেলায় জাতিতে ব্রাহ্মণ, স্থানীয় একজন তথাকথিত পন্ডিত শ্রেণীর ব্যক্তি...পান্ডিত্যের গৌরবে গর্বিত হয়ে উচ্চকণ্ঠে বলতে লাগলেন, কৈ গো তোমাদের রামঠাকুর, তিনি নাকি ভগবান, তানরে একবার দেইখা যাই।” গৃহমধ্যে ভক্ত পরিবৃত হয়ে ঠাকুর মহাশয় একখানা তক্তাপোষের উপর তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে বসে আছেন। উদ্ধত পন্ডিতের সম্মুখে দন্ডায়মান পূর্বক তার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে উদাত্তকণ্ঠে বলতে লাগলেন, “পূর্ণব্রহ্ম সনাতন, সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয় কারণ সত্যনারায়ণ আমিই সেই রামঠাকুর।”

পান্ডিত্যের অহঙ্কারে অহষ্কারী পন্ডিতপ্রবর...ঠাকুরের মধ্যে কী দেখলেন তা তিনিই জানেন।... পন্ডিত মুহুর্তের মধ্যে থর থর করে কাঁপতে কাঁপতে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় ভূপতিত হলেন।... কিছুক্ষণ পরে সংজ্ঞা ফিরে আসলে দাম্ভিক পন্ডিত শ্রীশ্রীঠাকুরের সম্মুখে হাঁটু গেড়ে বসলেন। তারপর হাত জোড় করে কম্পিত কণ্ঠে...গীতার একাদশ অধ্যায় বিশ্বরূপ দর্শন সস্পূর্ণ আবৃত্তি করতে করতে মুহূর্মুহূ কেঁপে উঠছিলেন ঠাকুর মহাশয় তাঁর আসনে স্থির হয়ে বসেছিলেন।

ধারণা করা হয়, স্বর্গীয় প্রভাত চন্দ্র চক্রবর্তী মহাশয়ও তাঁর মধ্যে বিশ্বরূপ দর্শন করার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন এবং তারই ফলশ্রুতিতে তিনি শ্রীশ্রীরাম স্তোত্রম লিখেছিলেন।

শ্রদ্ধেয় উপেন্দ্র সাহা মহাশয় ঠাকুরকে প্রণাম করে মাথা তুলে কদম বৃক্ষের নীচে চতুর্ভুজ শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী নারায়ণমূর্ত্তি দর্শন করার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন।

শ্রীশ্রীঠাকুরের অনুগ্রহে ঠাকুরের পরম প্রিয় ফণীন্দ্র কুমার মালাকার মহাশয় ঠাকুরকে প্রণাম করে মাথা তুলে ঠাকুরের মধ্যে মা কালীর চিন্ময়ীরূপ দর্শন করলেন।

শ্রীশ্রীরামঠাকুর প্রথম জীবনে খুবই প্রচ্ছন্ন ছিলেন। তবু তার যোগবিভূতিগুলি ধীরে ধীরে জনসাধারণের চক্ষে প্রকটিত হয়ে পড়েছিল, এর কারণ তিনি নিজেই বলেছেন, “যাহারা মহাজন, যোগৈশ্বর্য্যগুলি তাঁহাদের পরিচর্য্যার প্রতীক্ষায় সর্বদাই সঙ্গে সঙ্গে থাকে। মহাজনরা সেদিকে দৃকপাত করেন না, কিন্তু কখনও কখনও কোন বিশেষ কারণে ঐ সকল যোগ-বিভৃতি প্রত্যক্ষ হইয়া পড়ে।”

ব্রহ্মঃ ঠাকুর বললেন, “ব্রহ্মের আবার দিগবিদিক কি? ব্রহ্ম সর্বদিকে বিরাজ করেন। যেইভাবে বসাইলে আপনি আনন্দ পান সেইভাবে বসান গিয়া। আনন্দ পাওয়া নিয়া কথা।” ফণীবাবু লিখেছেন, ঠাকুরের কথা বিচার করিলে দেখবেন ভদ্রলোক কৈবল্যনাথ বিগ্রহ বসাবেন, আর ঠাকুর বললেন ব্রহ্মের দিগবিদিগ নাই। ব্রহ্ম সকল দিকে আছেন। তা হলে বিচারে পাওয়া গেল ঠাকুর প্রকারান্তরে নিজেকে ব্রহ্ম বলে স্বীকার করলেন।

নারায়ণঃ একজন প্রবীণ ভক্ত স্নান করে সিক্ত বসনে সচন্দন তুলসী হস্তে ঠাকুরের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন লক্ষ্য করে ঠাকুর চরণ দু‘খানি প্রসারিত করে দিলেন। কিন্তু তিনি সচন্দন তুলসীপত্র নিয়ে ঠাকুরের নিকট যেয়ে হস্ত প্রসারণ করে ঠাকুরের বক্ষঃস্থলের নিকট নিতেই ঠাকুর প্রশ্ন করলেন-“এইগুলি কোনখানে দিবেন?” তিনি বললেন-“বাবা সচন্দন তুলসীপত্র আপনার বক্ষে দিব।” ঠাকুর চরণ দু-খানি দেখিয়ে বললেন, “তুলসীপত্রের স্থান নারায়ণের শ্রীদেহের অন্য কোথাও না। উহার স্থান নারায়ণের চরণযুগলে।” তা হলে বিচারে পাওয়া গেল ঠাকুর প্রকারান্তরে নিজেকে নারায়ণ বলে স্বীকার করলেন।

শ্রীহরিঃ চাঁদপুরে শ্রীশ্রীঠাকুর মোক্তার বসন্ত কুমার মজুমদার মহাশয়ের স্ত্রীর মৃত্যুর সময় তার শিয়রে দাড়িয়ে বলেছিলেন, “দেখেন আপনার শিয়রে স্বয়ং শ্রীহরি দন্ডায়মান।” তা হলে বিচারে পাওয়া গেল ঠাকুর প্রকারান্তরে নিজেকে শ্রীহরি বলে স্বীকার করলেন।

গোবিন্দঃ “কৃপাসিন্ধু রামঠাকুর” গ্রন্থে শ্রীমনোরঞ্জন মুখুটি লিখেছেন, একদিন আমি ও প্রভাতদা ঠাকুরের সঙ্গে শা-নগর এক ভক্তের বাড়ী উপস্থিত হই। ভক্তপ্রবর দরজা খোলা মাত্রই ঠাকুর বললেন, “আজ আপনার দরজায় স্বয়ং গোবিন্দ উপস্থিত।” তা হলে বিচারে পাওয়া গেল ঠাকুর প্রকারান্তরে নিজেকে গোবিন্দ অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ বলে স্বীকার করলেন।

জগন্নাথঃ “কৃপাসিন্ধু রামঠাকুর” গ্রন্থে শ্রীমনোরঞ্জন মুখুটি লিখেছেন, “ঠাকুর একবার আমার সেজ ভ্রাতার কালির কারখানা, সদানন্দ রোডে অসুস্থ হয়ে গুপ্তভাবে অবস্থান করছিলেন। তখন নিজমুখে একদিন আমার সেজভাইকে বলেছিলেন-“আমিই জগন্নাথ।” তা হলে বিচারে পাওয়া গেল ঠাকুর প্রকারান্তরে নিজেকে জগন্নাথ বলে স্বীকার করলেন।

গৌরাঙ্গদেবঃ “রামভাই স্মরণে”, ঠাকুরকে রাজসূয় যজ্ঞের মালসা ভোগ দিতে ভুলে যাওয়ায়, শ্রীশ্রীঠাকুর ভক্তবৃন্দের কাছে মালসা ভোগের নাম ও কাহিনী বলতে বলতে তন্ময় হয়ে ওঠেন এবং ভাবাবেশে বলেন, “আমিই গৌরাঙ্গদেব।” তা হলে বিচারে পাওয়া গেল ঠাকুর প্রকারান্তরে নিজেকে গৌরাঙ্গদেব বলে স্বীকার করলেন।

ফেনীতে প্রমথবাবুর বাসায় শ্রীশ্রীসত্যনারায়ণের পূজার পর ঠাকুর স্বাভাবিক অবস্থায় বার বার বলতে লাগলেন, “আমিই_ত_সত্যনারায়ণ, আমিই ত সত্যনারায়ণ, আমিই ত সত্যনারায়ণ; শত শত ধারাল অস্ত্র নিক্ষেপ করিয়াও আপনাদের কেহই কিছু করিতে পারিবেনা।”
একদিন বোমা বর্ষণের সময় মাধবচন্দ্র মজুমদার মশাই ঠাকুরকে ট্রেন্চে যেতে অনুরোধ করলে ঠাকুরমশাই বলেছিলেন, “আমার মাথায় বজ্র পড়িবে,সেই বজ্র আজও তৈয়ার হয় নাই।”
সুতরাং দেখা যায় সমসাময়িক মহাপুরুষদের দৃষ্টিতে, কোন কোন ভাগ্যবান আশ্রিতবর্গের উপলদ্ধিতে এবং শ্রীশ্রীঠাকুরের শ্রীমুখের উক্তিতে তিনিই “ষড়ৈশ্বর্য্যশালী_ভগবান।”

আমাদের মত সাধারণের কাছে তিনি পতিতপাবন রামঠাকুর। আমাদের মত পতিতদের উদ্ধারের জন্য তিনি পতিতপাবন রূপে দাঁড়িয়েছেন সমভূমিতে।
কিন্তু কেন তার এই প্রচ্ছন্নতা? - “পাছে আমরা অলৌকিকতার অন্তরালে সে অহৈতুকী কৃপাসিন্ধু স্বভাব প্রেমিক সহজ সরল মানুষটিকে হারিয়ে ফেলি, তাঁর ও আমাদের মধ্যে এক দুরতিক্রমণীয় ব্যবধান সৃষ্টি করি, বোধ করি সেজন্যই তিনি সতত নিজেকে প্রচ্ছন্ন রাখতেন।

বিশ্বকবি_রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ঠাকুরের সাক্ষাৎ পরিচয় হয়নি। ডাঃ জে. এম. দাশগুপ্ত তাকে ঠাকুরের আধ্যাত্মিক উপদেশ সম্বলিত কতগুলি পত্র পাঠ করতে দিয়েছিলেন। সেইগুলি ফেরৎ দেওয়ার সময় কবিবর ডাক্তারবাবুকে বলেছিলেন “মানুষ বলে সমুদ্রের কোন কুল কিনারা নাই। আমি বলি, সমুদ্রেরও একটা কুল কিনারা আছে, কিন্তু তোমার ঠাকুরের কোনই কুল কিনারা নাই।”

কথাশিল্পী_শরৎচন্দ্র_চট্টোপাধ্যায়ের উক্তিটিও প্রণিধানযোগ্য। ‘শ্রুতিতে রামঠাকুর’ থেকে উৎকলিত, “তার কাছে যখনই থেকেছি মনে হয়েছে সব-পেয়েছির দেশে বাস করছি। দূরে গেলে সে সুর হারিয়ে ফেলি। হারানো সে সুর আর খুঁজে পাইনা। তাই তো আবার তাঁকে দেখতে চাই।”
‘শ্রীপট’
শ্রীশ্রীঠাকুর ভক্তদেরকে প্রায়ই বলিতেন, “পট ও দেহ অভিন্ন। আমাকে যেভাবে যত্ন করেন, পটকেও সেভাবে করবেন। আমার পিছনে ঘুইরা লাভ কি? আমি তো ঐ পটের মধ্যেই আছি।” আমরা শ্রীশ্রীঠাকুরের সাধারণতঃ তিন ধরণের শ্রীপট পেয়ে থাকি শ্রীশ্রীকৈবল্যনাথ, শ্রীশ্রীসত্যনারায়ণ, শ্রীশ্রীরামঠাকুর রূপে। উপরিলিখিত তিনটি শ্রীপট সম্বন্ধে শ্রীশিতিকণ্ঠ সেনগুপ্ত মহাশয়ের উপলব্ধিঃ
(১) শ্রীশ্রীকৈবল্যনাথ (শান্ত, সমাহিত, অদ্বৈত চেতনার দ্যোতক)
(২) শ্রীশ্রীসত্যনারায়ণ (ভক্তের অভীষ্ট পূরণকারী ভগবান)
(৩) শ্রীশ্রীরামঠাকুর (আমাদের ইহকাল পরকালের সত্যিকারের দরদী বান্ধব)
তিন ধরণের শ্রীপটের মধ্যে শ্রীশ্রীকৈবল্যনাথ ও শ্রীশ্রীসত্যনারায়ণ পট বিশেষ তাৎপর্যপূণ্য, স্বয়ং শ্রীশ্রীঠাকুর কর্তৃক নির্ধারিত। শ্রীশ্রীঠাকুর সত্যনারায়ণের পট দেখিয়ে নিজ মুখে ভক্তদের উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, “ইনি সত্যপীর-সত্যনারায়ণ। সিন্নী দিয়া সকল কামনা বাসনা এনাকেই জানাইবেন, কৈবল্যনাথের কাছে কিছুই প্রার্থনা করিতে নাই।” সুতরাং বুঝা যায় শ্রীশ্রীঠাকুর আমাদের মত সাধারণ ভক্তদের দুঃখ দুর্দশা দূর করার জন্য শ্রীশ্রীসত্যনারায়ণের শ্রীপট এবং উচ্চস্তরের ভক্তদের মোক্ষলাভের জন্য শ্রীশ্রীকৈবল্যনাথের শ্রীপট সৃষ্টি করে গেছেন। যদি তা না করে যেতেন তাহ’লে আমাদের অবস্থা কি হতো একটু ভেবে দেখুন, তাই শ্রীশ্রীঠাকুরের শ্রীপটও শ্রীশ্রীরামচন্দ্রদেবের ভক্তদের এক অপূর্ব্ব সম্পদ।

সূখে-দুঃখে, বিপদে-সম্পদে, ত্যাগে-ভোগে, সুখে-অসুখে তিনিই হয়েছেন আমাদের আশ্রয়দাতা, পরিত্রাতা, সর্বোপরি আমাদের প্রাণের ঠাকুর।
ঠাকুর আমাদের বলেছেন, অকর্তাবুদ্ধিই স্বভাব, অনন্য চিন্তাই নাম, অনন্যশরণই পন্থা, ধৈর্য্যই ধর্ম্ম।

পতিব্রতা ধর্ম্ম। ঠাকুর তাঁহার পত্রাবলীর বহুস্থানে পতিব্রতা ধর্ম্মের কথা বলিয়াছেন এবং ইহাকেই সংসারোদ্ধারের একমাত্র উপায় বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়াছেন। মূল কথা হইল অনন্যনিষ্ঠা এবং যাহা কিছু এই অনন্যনিষ্ঠার প্রতিপোষক তাহাই ধর্ম্ম, যাহা কিছু ইহার পরিপন্থী তাহাই অধর্ম্ম। অনুষ্ঠান, প্রতিষ্ঠানাদির ভাল মন্দ বিচারেরও এই একই মাপ কাঠি। একখানা চিঠিতে ঠাকুর লিখিয়াছিলেনঃ “বিশুদ্ধ ভক্তি লাভ হইলেই প্রেম লাভ হয়, সেই প্রেমেই কৃষ্ণচন্দ্র মিলন ঘটে। উৎসব কি সভার মধ্যে তিনি থাকেন না।” ( বেদবাণী, প্রথম খন্ড, ১১১নং)। তাহাই যদি হয় তবে ইহাদের প্রবর্তন হইয়াছে কেন? উত্তরে ঠাকুর বলিয়াছিলেনঃ “ইহারা স্মারক, ইহাই ইহাদের মূল্য, আর কোন মূল্য নাই, ইহারা ইষ্টস্মৃতি জাগাইয়া তোলে এবং তাহাতেই ইহাদের সার্থকতা।”

ঠাকুর নিজে ব্রহ্ম হয়েও জীবদেহ ধারণ করে ব্রহ্মবিদ্ গুরুর আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন।
ফেনীতে শ্রীশরৎচন্দ্র কাব্যতীর্থ মহাশয় ঠাকুরকে প্রশ্ন করেন, ‘গুরু ভিন্ন কি ঈশ্বরলাভ হয় না?” উত্তরে ঠাকুর বললেন, “গুরু ভিন্ন এ জগতে কিছুই লাভ হয় না। আপনি যার কাছে খাইতে, হাঁটতে, কথা বলতে, কাজ করতে শিখেছেন, সকলেই গুরু বইলা; ধর্মজগতেও একই কথা। আগুন সর্বত্রই আছে, পাথরের মধ্যেও আছে, শূন্যেও আছে, শুখনা কাঠের মধ্যেও আছে। থাকলে কি হইব? আগুন পাওয়া যাইব কি ভাবে? যেখানে আগুন জ¦লছে, সেইখানে গেলে অতি সহজে পাওয়া যাইব। সেইরূপ ব্রহ্ম বা ঈশ্বর চিন্মায়রূপে সর্বলোকব্যাপী বিরাজ করলেও ব্রহ্মবিদ্ গুরুর আশ্রয় ভিন্ন ব্রহ্ম দেখাও যায় না, ধরাও যায় না। যেহেতু ব্রহ্মবিদ্ গুরুতেই ব্রহ্মের চিন্মায় শক্তি বিকশিত হইয়া আছে। সুতরাং ব্রহ্মবিদ্ গুরু ভিন্ন ঈশ্বর লাভ অসাধ্য বৈ কি।”

শ্রীশ্রীরাম ঠাকুর বলেছেনঃ
শ্রীশ্রীরামঠাকুরই সদ্ গুরু নররূপে স্বয়ং শ্রীভগবান। সদ্ গুরু সর্বজ্ঞ, সর্বদ্রষ্টা, সর্বশক্তিমান, সর্বনিয়ন্তা। সদ্ গুরুর কৃপাই- মহাশক্তি, মহাসিদ্ধি, মহামুক্তির উপায়। সদ্ গুরু অনন্ত জ্ঞান, অনন্ত প্রেম, অনন্ত কল্যাণের পরিপূর্ণ বিগ্রহ। সদ্ গুরুর আশ্রয় লাভ না করা পর্যন্ত জীবকে পুনঃ পুনঃ এই জন্মমৃত্যুর চক্রে বিঘূর্ণিত হইতে হইবে। একমাত্র সদ্ গুরুর কৃপাতেই আত্মজ্ঞান ও মুক্তিলাভ ঘটিতে পারে।

সদ্ গুরুর কৃপালাভ
শ্রীভগবান স্বয়ং সদ্ গুরু রূপে কোটি কোটি মানবের মহামুক্তি দানের জন্য জগতে অবতীর্ণ হন। ভক্ত বা শিষ্য যদি একান্ত বিশ্বাস ও সম্পূর্ণ নির্ভরতার সহিত প্রাণের শ্রদ্ধা ভক্তি-ভালবাসার দ্বারা সদ্ গুরুর স্মরণ, মনন এবং আদেশ উপদেশানুযায়ী জীবন যাপনে যত্ন করেন তবে অচিরে সদ্ গুরুর কৃপালাভ ঘটিবে। জীবনে মরণে, শয়নে স্বপনে, অহরহঃ অনুক্ষণ, অবিরত প্রাণে জ্বলন্তরূপে জাগাইয়া রাখিতে হইবে-
“তুমি আপন হইতে হও আপনার,
যার কেহ নাই তুমি আছ তার।”

“নাম! নাম করিলেই গুরুকে পাওয়া যায়। নামের মাধ্যমে তাঁহার সহিত যোগাযোগের কেন্দ্র স্থাপিত হয়। সেই কেন্দ্র স্থাপন করিলেই ‘তত্ত্বমসি’ তুমিই সেই পরব্রহ্ম, যাহা প্রত্যেকের অন্তরে নিহিত আছেন, তাহা উপলব্ধি করা যায় এবং তাঁর কৃপা লাভ হয়। নাম আর ভগবান এক।”

“সদ্গুরুর কাজ হইল ভক্তকে উদ্ধার করা। ভক্ত নাম করুক আর না করুক, সদ্গুরু যিনি তিনি ভক্তকে উদ্ধার করিবেনই।”

শ্রীশ্রী ঠাকুর আবার বলেছেনঃ
“দীক্ষা-দেখা। দর্শন-আত্ম দর্শন। নাম করিতে করিতে দেখা হয়।” অর্থাৎ নাম করিতে করিতেই দীক্ষা হয়। “নামের সঙ্গই গুরু সঙ্গ। নামের সেবাই গুরু সেবা।” সেবা কথাটির অর্থই হচ্ছে নামের নিকটে থাকা।
“এ নাম হইল গুরু মূর্তি। নামে আত্মসমর্পণই গুরুতে আত্মসমর্পণ।”
“গুরুরা যা দেন তা বীজ। বীজ গোপনে রাখ্তে হয়। এখানে যা পাইছেন তা ফল-পুষ্প সমম্বিত মহামহীরুহ। ফলটা দিলাম, শুধু-পাড়েন আর খায়েন, শুধু-পাড়েন আর খায়েন।”

জনৈক স্বামীজী ঠাকুরকে বললেন, আপনি আশ্রয় প্রার্থীদের শুধু নাম দেন, বীজ দেন না, এটা কি হলো?
শ্রীশ্রীরামঠাকুর বললেন, “কি করুম? মাটি যে রকম শক্ত, আর বাতাস যে রকম শুকনা তাতে বীজ পুঁতলে উঠাইতে অনেকেই পারব না। সেইজন্য একেবারে কলম কইরা দিলাম। এইবার একটু জল দিলেই গাছ বড় হইয়া তাড়াতাড়ি ফল ধরব। অপরাধ যদি কিছু কইরা থাকি, তবে এদের কল্যাণের জন্যই করছি।”
কোনও নামপ্রার্থী বললেন, নাম দিলেন, বীজ দিলেন না বাবা?
ঠাকুর বললেন, “বীজ দেই নাই, ফল দিছি পাড়েন আর খান।”
শ্রীশ্রীঠাকুরের সহিত শ্রীঁফণীন্দ্র কুমার মালাকার মহাশয়ের কথোপকথন।
“ঠাকুর, নাম করতে বসলে মন বিভিন্ন স্থানে ও বিষয়ে ঘুরে বেড়ায়। নাম হয় না। কি নাম দিলেন?"
ঠাকুর বলিলেন - "তোমার পূর্বজন্মের সাধিত নাম শুনাইছি, নাম দেই নাই। মাতৃজঠরেও নাম শুনাইছিলাম। প্রকৃতির রাজ্যে আইস্যা ভুইলা গেছ। পুনরায় নাম স্মরণ করাইয়া দিছি। নাম করে শিবরূপী প্রাণে। নাম আবরনহীন। তাই মনের সংকল্প বিকল্পের অপেক্ষা রাখে না, অবিরাম নাম হয়। নাম শুনতে মন লাগে না। মন যেইখানে ইচ্ছা ঘুইরা বেড়াক। তুমি নাম শুনার জন্য চেষ্টা করবা। মনের দিকে লক্ষ্য রাখবা না। লক্ষ্য রাখবা নামের দিকে। মনের গতি চিরচঞ্চল। যত চঞ্চল হউক, আর যেইখানে যাউক না কেন ফিরা আবার নিজের জায়গায় আসবো। ফিরা আইসা তুমি যেই নাম শুনছ, মনও সেই নাম শুনতে পাইব। তুমি সর্ব্বদা নাম শুনবার জন্য অভ্যাস কর।"

শ্রীশ্রীরামঠাকুরের দর্শন - ‘গুরুনাম জপ, শ্রীগুরুর চরণ সেবার সঙ্গে সত্যাশ্রয়ী হয়ে অকাতরে প্রারদ্ধ ভোগদান, কলিকালের সর্বোৎকৃষ্ট সাধন, ইহাই শ্রীরামঠাকুরের দর্শন।’
শ্রীশ্রীঠাকুর উপদেশ প্রদানের পরে বলিতেন, “আমার ধৃস্টতা মার্জনা করিবেন। আমি উপদেষ্টা নই, আমি দৃষ্টান্ত মাত্র।” তাই শ্রীশ্রীঠাকুরের আচরণ তথা দৃষ্টান্তই আমাদের অনুকরনীয়
শ্রীশ্রীঠাকুর বলিয়াছেন “যাগযোগ তপস্যা দ্বারা ভগবান লাভ করা যায় না, কিছু শক্তি আহরণ করা যায়। তাহাও বাধক।”
ঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করা হইল-“তবে কিসে পাওয়া যায়।” উত্তর দিলেন “কৃপা দ্বারা”। ‘সেই কৃপা লাভ কি করিয়া হয়?’ -আবার জিজ্ঞাসা করিলে, উত্তর পাওয়া গেল- “ধৈর্য্যের সহিত, সম্পূর্ণ নির্ভরতা দ্বারা।”
ঠাকুর, ভক্ত অক্ষয় কুমার মজুমদার কে জানালেন, “কলিতে বেদ নাই সুতরাং বিধিও নাই। কলিতে প্রয়োজন হইতেছে গুরু চরণে আত্মনিবেদন, আত্ম নিবেদন পূর্বক যাহা বোধ হইবে তাহাই বেদ এবং তদ্অনুযায়ী যাহা করণীয় মনে হইবে তাহাই বিধি”
সবশেষে ডক্টর প্রঁভাত চন্দ্র চক্রবর্তী মহাশয়ের লেখা প্রবন্ধ “ তাঁহার কথা ” অনুসরণে তাঁর সাথে একই সুরে প্রাণের আবেগে শেষে শুধু বলিতে ইচ্ছা হয়- “তুঁয়া চরণে মন লাগহুঁ রে”। জন্মে জন্মে যেন তাঁহার শ্রীচরণের দাসানুদাস হইতে পারি-- ইহাই প্রার্থনা।
জয়রাম, জয়গোবিন্দ।
কৈবল্য ভুবনের সাথে থাকুন- শ্রীশ্রীঠাকরকে জানুন।

Address

Flat 13C, House 27/1/B, Road 3, Shyamoli
Dhaka
1207

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Kaibalya Bhuban posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Place Of Worship

Send a message to Kaibalya Bhuban:

Shortcuts

Share