01/07/2026
হে জগৎগুরু, তোমার চরণে কৃপা ভিখারী
সম্পাদনা- অচ্যুত প্রসাদ
ওঁ শ্রীশ্রীরামচন্দ্রায় নমঃ
ওঁ নমঃ শ্রীরামচন্দ্রায় মৃদুমধুর ভাষিণে।
সৌম্যশান্তাবতারায় তস্মৈ শ্রীগুরুবে নমঃ ॥
গুরুর্ব্রহ্মা গুরুর্বিষ্ণুঃ গুরুর্দেবো মহেশ্বরঃ।
গুরুরেব পরং ব্রহ্ম তস্মৈ শ্রীগুরুবে নমঃ॥
শ্রদ্ধেয় ভক্তবৃন্দ ও সুধী মন্ডলী
আপনারা সকলে আমার প্রণাম গ্রহণ করুন ও আমাকে আশির্বাদ করুন।
যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্
অর্থ: হে ভারত, যখনই ধর্মের অধঃপতন হয় এবং অধর্মের অভ্যূত্থান হয় তখনই আমি নিজেকে প্রকাশ করে অবতীর্ণ হই।
পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভাবামি যুগে যুগে
অর্থ: সাধুদের পরিত্রাণ করার জন্য এবং দুস্কৃতকারীদের বিনাশ করার জন্য এবং ধর্ম সংস্থাপনের জন্য আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হই।
এই বাণীর আলোকেই ভগবান সত্যযুগে নারায়ণ, ত্রেতাযুগে শ্রীরামচন্দ্র, দ্বাপরে কৃষ্ণ ও কলিযুগে গৌরাঙ্গদেব ও সর্বশেষ শ্রীশ্রীরাম ঠাকুর রুপে এ পৃথিবীতে অবতীর্ন হয়েছিলেন।
‘শ্রীশ্রীরামঠাকুর’ কখন এলেন? কি ভয়াবহ অবস্থা ভারতবর্ষের- জাতিভেদ ও বর্ণপ্রথা, দু’ দুটি বিশ্বযুদ্ধ, পারমাণবিক বিস্ফোরণ, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের নিপীড়ন, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের ঘটনা পরম্পরা, সকল সংকটে রামঠাকুর দাঁড়িয়েছেন আর্ত মানবতার পাশে, দ্বারে দ্বারে ঘুরে যুগিয়েছেন সাহস, আশা এবং আশির্বাদ, রামঠাকুর ‘সেবা’ করেছেন সর্বজীবের, পথনির্দেশনা দিয়েছেন ‘সত্য ও শান্তি’র, অপার করুণাধারায় তিনি ঋদ্ধ করেছেন শত সহস্র মানুষের জীবন। ধর্ম সংস্থাপন করেছেন, করেছেন সমাজ সংস্কার।দুর করেছেন বর্ণ প্রথা।শ্রীশ্রীরামঠাকুর বলেছেন, “আপনারা মানব সম্প্রদায়”। অযাচিত কৃপা, সেবাপরায়ণতা, মানবপ্রীতি, মধুর কথন, বিনম্র ব্যবহার, সহানুভূতি-অনুকম্পা-করুনার অপার দানে ‘রামঠাকুর’ অনন্য, এই বিশ্বসংসার তাঁর ‘পরিবার’, সকলেই তাঁর ‘আপনজন’।
যারা তাঁর সর্ম্পকে জানেন না তারাই বলতে পারেন যে তিনি আবার কিভাবে অবতার হলেন?
তাদের জন্য বলছি, তিনি নিজেই বলেছেন-
শ্রীশ্রীঠাকুরের উক্তি “জীবনই নাই তো জীবনী কিরূপে হইব, সেই বৃন্দাবন থাইকা তো একই আছি।”
নিজের বক্ষে অংগুলি সংকেত করে বলেছেন-
“পূর্ণব্রহ্ম সনাতন সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়ের কারণ সত্যনারায়ণ- এই রামচন্দ্র।”
স্পষ্টাক্ষরে বলেছেন, “অন্নপূর্ণা, শিবনাথ, কি ব্রজনাথ, ইনিই রামসীতা, কি রাধাকৃষ্ণ, ইনিই ভগবান, ইনিই আমি।”
তাঁর মধ্যে বিশ্বরূপ দর্শন একবার এক গর্বিত পন্ডিতের হয়েছিলঃ পূর্ববঙ্গের ভৈরব ষ্টেশনের রেল আবাসনে ললিত রায় মহাশয়ের বাড়ী ঠাকুর আছেন। একদিন সকাল বেলায় জাতিতে ব্রাহ্মণ, স্থানীয় একজন তথাকথিত পন্ডিত শ্রেণীর ব্যক্তি...পান্ডিত্যের গৌরবে গর্বিত হয়ে উচ্চকণ্ঠে বলতে লাগলেন, কৈ গো তোমাদের রামঠাকুর, তিনি নাকি ভগবান, তানরে একবার দেইখা যাই।” গৃহমধ্যে ভক্ত পরিবৃত হয়ে ঠাকুর মহাশয় একখানা তক্তাপোষের উপর তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে বসে আছেন। উদ্ধত পন্ডিতের সম্মুখে দন্ডায়মান পূর্বক তার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে উদাত্তকণ্ঠে বলতে লাগলেন, “পূর্ণব্রহ্ম সনাতন, সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয় কারণ সত্যনারায়ণ আমিই সেই রামঠাকুর।”
পান্ডিত্যের অহঙ্কারে অহষ্কারী পন্ডিতপ্রবর...ঠাকুরের মধ্যে কী দেখলেন তা তিনিই জানেন।... পন্ডিত মুহুর্তের মধ্যে থর থর করে কাঁপতে কাঁপতে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় ভূপতিত হলেন।... কিছুক্ষণ পরে সংজ্ঞা ফিরে আসলে দাম্ভিক পন্ডিত শ্রীশ্রীঠাকুরের সম্মুখে হাঁটু গেড়ে বসলেন। তারপর হাত জোড় করে কম্পিত কণ্ঠে...গীতার একাদশ অধ্যায় বিশ্বরূপ দর্শন সস্পূর্ণ আবৃত্তি করতে করতে মুহূর্মুহূ কেঁপে উঠছিলেন ঠাকুর মহাশয় তাঁর আসনে স্থির হয়ে বসেছিলেন।
ধারণা করা হয়, স্বর্গীয় প্রভাত চন্দ্র চক্রবর্তী মহাশয়ও তাঁর মধ্যে বিশ্বরূপ দর্শন করার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন এবং তারই ফলশ্রুতিতে তিনি শ্রীশ্রীরাম স্তোত্রম লিখেছিলেন।
শ্রদ্ধেয় উপেন্দ্র সাহা মহাশয় ঠাকুরকে প্রণাম করে মাথা তুলে কদম বৃক্ষের নীচে চতুর্ভুজ শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী নারায়ণমূর্ত্তি দর্শন করার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন।
শ্রীশ্রীঠাকুরের অনুগ্রহে ঠাকুরের পরম প্রিয় ফণীন্দ্র কুমার মালাকার মহাশয় ঠাকুরকে প্রণাম করে মাথা তুলে ঠাকুরের মধ্যে মা কালীর চিন্ময়ীরূপ দর্শন করলেন।
শ্রীশ্রীরামঠাকুর প্রথম জীবনে খুবই প্রচ্ছন্ন ছিলেন। তবু তার যোগবিভূতিগুলি ধীরে ধীরে জনসাধারণের চক্ষে প্রকটিত হয়ে পড়েছিল, এর কারণ তিনি নিজেই বলেছেন, “যাহারা মহাজন, যোগৈশ্বর্য্যগুলি তাঁহাদের পরিচর্য্যার প্রতীক্ষায় সর্বদাই সঙ্গে সঙ্গে থাকে। মহাজনরা সেদিকে দৃকপাত করেন না, কিন্তু কখনও কখনও কোন বিশেষ কারণে ঐ সকল যোগ-বিভৃতি প্রত্যক্ষ হইয়া পড়ে।”
ব্রহ্মঃ ঠাকুর বললেন, “ব্রহ্মের আবার দিগবিদিক কি? ব্রহ্ম সর্বদিকে বিরাজ করেন। যেইভাবে বসাইলে আপনি আনন্দ পান সেইভাবে বসান গিয়া। আনন্দ পাওয়া নিয়া কথা।” ফণীবাবু লিখেছেন, ঠাকুরের কথা বিচার করিলে দেখবেন ভদ্রলোক কৈবল্যনাথ বিগ্রহ বসাবেন, আর ঠাকুর বললেন ব্রহ্মের দিগবিদিগ নাই। ব্রহ্ম সকল দিকে আছেন। তা হলে বিচারে পাওয়া গেল ঠাকুর প্রকারান্তরে নিজেকে ব্রহ্ম বলে স্বীকার করলেন।
নারায়ণঃ একজন প্রবীণ ভক্ত স্নান করে সিক্ত বসনে সচন্দন তুলসী হস্তে ঠাকুরের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন লক্ষ্য করে ঠাকুর চরণ দু‘খানি প্রসারিত করে দিলেন। কিন্তু তিনি সচন্দন তুলসীপত্র নিয়ে ঠাকুরের নিকট যেয়ে হস্ত প্রসারণ করে ঠাকুরের বক্ষঃস্থলের নিকট নিতেই ঠাকুর প্রশ্ন করলেন-“এইগুলি কোনখানে দিবেন?” তিনি বললেন-“বাবা সচন্দন তুলসীপত্র আপনার বক্ষে দিব।” ঠাকুর চরণ দু-খানি দেখিয়ে বললেন, “তুলসীপত্রের স্থান নারায়ণের শ্রীদেহের অন্য কোথাও না। উহার স্থান নারায়ণের চরণযুগলে।” তা হলে বিচারে পাওয়া গেল ঠাকুর প্রকারান্তরে নিজেকে নারায়ণ বলে স্বীকার করলেন।
শ্রীহরিঃ চাঁদপুরে শ্রীশ্রীঠাকুর মোক্তার বসন্ত কুমার মজুমদার মহাশয়ের স্ত্রীর মৃত্যুর সময় তার শিয়রে দাড়িয়ে বলেছিলেন, “দেখেন আপনার শিয়রে স্বয়ং শ্রীহরি দন্ডায়মান।” তা হলে বিচারে পাওয়া গেল ঠাকুর প্রকারান্তরে নিজেকে শ্রীহরি বলে স্বীকার করলেন।
গোবিন্দঃ “কৃপাসিন্ধু রামঠাকুর” গ্রন্থে শ্রীমনোরঞ্জন মুখুটি লিখেছেন, একদিন আমি ও প্রভাতদা ঠাকুরের সঙ্গে শা-নগর এক ভক্তের বাড়ী উপস্থিত হই। ভক্তপ্রবর দরজা খোলা মাত্রই ঠাকুর বললেন, “আজ আপনার দরজায় স্বয়ং গোবিন্দ উপস্থিত।” তা হলে বিচারে পাওয়া গেল ঠাকুর প্রকারান্তরে নিজেকে গোবিন্দ অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ বলে স্বীকার করলেন।
জগন্নাথঃ “কৃপাসিন্ধু রামঠাকুর” গ্রন্থে শ্রীমনোরঞ্জন মুখুটি লিখেছেন, “ঠাকুর একবার আমার সেজ ভ্রাতার কালির কারখানা, সদানন্দ রোডে অসুস্থ হয়ে গুপ্তভাবে অবস্থান করছিলেন। তখন নিজমুখে একদিন আমার সেজভাইকে বলেছিলেন-“আমিই জগন্নাথ।” তা হলে বিচারে পাওয়া গেল ঠাকুর প্রকারান্তরে নিজেকে জগন্নাথ বলে স্বীকার করলেন।
গৌরাঙ্গদেবঃ “রামভাই স্মরণে”, ঠাকুরকে রাজসূয় যজ্ঞের মালসা ভোগ দিতে ভুলে যাওয়ায়, শ্রীশ্রীঠাকুর ভক্তবৃন্দের কাছে মালসা ভোগের নাম ও কাহিনী বলতে বলতে তন্ময় হয়ে ওঠেন এবং ভাবাবেশে বলেন, “আমিই গৌরাঙ্গদেব।” তা হলে বিচারে পাওয়া গেল ঠাকুর প্রকারান্তরে নিজেকে গৌরাঙ্গদেব বলে স্বীকার করলেন।
ফেনীতে প্রমথবাবুর বাসায় শ্রীশ্রীসত্যনারায়ণের পূজার পর ঠাকুর স্বাভাবিক অবস্থায় বার বার বলতে লাগলেন, “আমিই_ত_সত্যনারায়ণ, আমিই ত সত্যনারায়ণ, আমিই ত সত্যনারায়ণ; শত শত ধারাল অস্ত্র নিক্ষেপ করিয়াও আপনাদের কেহই কিছু করিতে পারিবেনা।”
একদিন বোমা বর্ষণের সময় মাধবচন্দ্র মজুমদার মশাই ঠাকুরকে ট্রেন্চে যেতে অনুরোধ করলে ঠাকুরমশাই বলেছিলেন, “আমার মাথায় বজ্র পড়িবে,সেই বজ্র আজও তৈয়ার হয় নাই।”
সুতরাং দেখা যায় সমসাময়িক মহাপুরুষদের দৃষ্টিতে, কোন কোন ভাগ্যবান আশ্রিতবর্গের উপলদ্ধিতে এবং শ্রীশ্রীঠাকুরের শ্রীমুখের উক্তিতে তিনিই “ষড়ৈশ্বর্য্যশালী_ভগবান।”
আমাদের মত সাধারণের কাছে তিনি পতিতপাবন রামঠাকুর। আমাদের মত পতিতদের উদ্ধারের জন্য তিনি পতিতপাবন রূপে দাঁড়িয়েছেন সমভূমিতে।
কিন্তু কেন তার এই প্রচ্ছন্নতা? - “পাছে আমরা অলৌকিকতার অন্তরালে সে অহৈতুকী কৃপাসিন্ধু স্বভাব প্রেমিক সহজ সরল মানুষটিকে হারিয়ে ফেলি, তাঁর ও আমাদের মধ্যে এক দুরতিক্রমণীয় ব্যবধান সৃষ্টি করি, বোধ করি সেজন্যই তিনি সতত নিজেকে প্রচ্ছন্ন রাখতেন।
বিশ্বকবি_রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ঠাকুরের সাক্ষাৎ পরিচয় হয়নি। ডাঃ জে. এম. দাশগুপ্ত তাকে ঠাকুরের আধ্যাত্মিক উপদেশ সম্বলিত কতগুলি পত্র পাঠ করতে দিয়েছিলেন। সেইগুলি ফেরৎ দেওয়ার সময় কবিবর ডাক্তারবাবুকে বলেছিলেন “মানুষ বলে সমুদ্রের কোন কুল কিনারা নাই। আমি বলি, সমুদ্রেরও একটা কুল কিনারা আছে, কিন্তু তোমার ঠাকুরের কোনই কুল কিনারা নাই।”
কথাশিল্পী_শরৎচন্দ্র_চট্টোপাধ্যায়ের উক্তিটিও প্রণিধানযোগ্য। ‘শ্রুতিতে রামঠাকুর’ থেকে উৎকলিত, “তার কাছে যখনই থেকেছি মনে হয়েছে সব-পেয়েছির দেশে বাস করছি। দূরে গেলে সে সুর হারিয়ে ফেলি। হারানো সে সুর আর খুঁজে পাইনা। তাই তো আবার তাঁকে দেখতে চাই।”
‘শ্রীপট’
শ্রীশ্রীঠাকুর ভক্তদেরকে প্রায়ই বলিতেন, “পট ও দেহ অভিন্ন। আমাকে যেভাবে যত্ন করেন, পটকেও সেভাবে করবেন। আমার পিছনে ঘুইরা লাভ কি? আমি তো ঐ পটের মধ্যেই আছি।” আমরা শ্রীশ্রীঠাকুরের সাধারণতঃ তিন ধরণের শ্রীপট পেয়ে থাকি শ্রীশ্রীকৈবল্যনাথ, শ্রীশ্রীসত্যনারায়ণ, শ্রীশ্রীরামঠাকুর রূপে। উপরিলিখিত তিনটি শ্রীপট সম্বন্ধে শ্রীশিতিকণ্ঠ সেনগুপ্ত মহাশয়ের উপলব্ধিঃ
(১) শ্রীশ্রীকৈবল্যনাথ (শান্ত, সমাহিত, অদ্বৈত চেতনার দ্যোতক)
(২) শ্রীশ্রীসত্যনারায়ণ (ভক্তের অভীষ্ট পূরণকারী ভগবান)
(৩) শ্রীশ্রীরামঠাকুর (আমাদের ইহকাল পরকালের সত্যিকারের দরদী বান্ধব)
তিন ধরণের শ্রীপটের মধ্যে শ্রীশ্রীকৈবল্যনাথ ও শ্রীশ্রীসত্যনারায়ণ পট বিশেষ তাৎপর্যপূণ্য, স্বয়ং শ্রীশ্রীঠাকুর কর্তৃক নির্ধারিত। শ্রীশ্রীঠাকুর সত্যনারায়ণের পট দেখিয়ে নিজ মুখে ভক্তদের উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, “ইনি সত্যপীর-সত্যনারায়ণ। সিন্নী দিয়া সকল কামনা বাসনা এনাকেই জানাইবেন, কৈবল্যনাথের কাছে কিছুই প্রার্থনা করিতে নাই।” সুতরাং বুঝা যায় শ্রীশ্রীঠাকুর আমাদের মত সাধারণ ভক্তদের দুঃখ দুর্দশা দূর করার জন্য শ্রীশ্রীসত্যনারায়ণের শ্রীপট এবং উচ্চস্তরের ভক্তদের মোক্ষলাভের জন্য শ্রীশ্রীকৈবল্যনাথের শ্রীপট সৃষ্টি করে গেছেন। যদি তা না করে যেতেন তাহ’লে আমাদের অবস্থা কি হতো একটু ভেবে দেখুন, তাই শ্রীশ্রীঠাকুরের শ্রীপটও শ্রীশ্রীরামচন্দ্রদেবের ভক্তদের এক অপূর্ব্ব সম্পদ।
সূখে-দুঃখে, বিপদে-সম্পদে, ত্যাগে-ভোগে, সুখে-অসুখে তিনিই হয়েছেন আমাদের আশ্রয়দাতা, পরিত্রাতা, সর্বোপরি আমাদের প্রাণের ঠাকুর।
ঠাকুর আমাদের বলেছেন, অকর্তাবুদ্ধিই স্বভাব, অনন্য চিন্তাই নাম, অনন্যশরণই পন্থা, ধৈর্য্যই ধর্ম্ম।
পতিব্রতা ধর্ম্ম। ঠাকুর তাঁহার পত্রাবলীর বহুস্থানে পতিব্রতা ধর্ম্মের কথা বলিয়াছেন এবং ইহাকেই সংসারোদ্ধারের একমাত্র উপায় বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়াছেন। মূল কথা হইল অনন্যনিষ্ঠা এবং যাহা কিছু এই অনন্যনিষ্ঠার প্রতিপোষক তাহাই ধর্ম্ম, যাহা কিছু ইহার পরিপন্থী তাহাই অধর্ম্ম। অনুষ্ঠান, প্রতিষ্ঠানাদির ভাল মন্দ বিচারেরও এই একই মাপ কাঠি। একখানা চিঠিতে ঠাকুর লিখিয়াছিলেনঃ “বিশুদ্ধ ভক্তি লাভ হইলেই প্রেম লাভ হয়, সেই প্রেমেই কৃষ্ণচন্দ্র মিলন ঘটে। উৎসব কি সভার মধ্যে তিনি থাকেন না।” ( বেদবাণী, প্রথম খন্ড, ১১১নং)। তাহাই যদি হয় তবে ইহাদের প্রবর্তন হইয়াছে কেন? উত্তরে ঠাকুর বলিয়াছিলেনঃ “ইহারা স্মারক, ইহাই ইহাদের মূল্য, আর কোন মূল্য নাই, ইহারা ইষ্টস্মৃতি জাগাইয়া তোলে এবং তাহাতেই ইহাদের সার্থকতা।”
ঠাকুর নিজে ব্রহ্ম হয়েও জীবদেহ ধারণ করে ব্রহ্মবিদ্ গুরুর আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন।
ফেনীতে শ্রীশরৎচন্দ্র কাব্যতীর্থ মহাশয় ঠাকুরকে প্রশ্ন করেন, ‘গুরু ভিন্ন কি ঈশ্বরলাভ হয় না?” উত্তরে ঠাকুর বললেন, “গুরু ভিন্ন এ জগতে কিছুই লাভ হয় না। আপনি যার কাছে খাইতে, হাঁটতে, কথা বলতে, কাজ করতে শিখেছেন, সকলেই গুরু বইলা; ধর্মজগতেও একই কথা। আগুন সর্বত্রই আছে, পাথরের মধ্যেও আছে, শূন্যেও আছে, শুখনা কাঠের মধ্যেও আছে। থাকলে কি হইব? আগুন পাওয়া যাইব কি ভাবে? যেখানে আগুন জ¦লছে, সেইখানে গেলে অতি সহজে পাওয়া যাইব। সেইরূপ ব্রহ্ম বা ঈশ্বর চিন্মায়রূপে সর্বলোকব্যাপী বিরাজ করলেও ব্রহ্মবিদ্ গুরুর আশ্রয় ভিন্ন ব্রহ্ম দেখাও যায় না, ধরাও যায় না। যেহেতু ব্রহ্মবিদ্ গুরুতেই ব্রহ্মের চিন্মায় শক্তি বিকশিত হইয়া আছে। সুতরাং ব্রহ্মবিদ্ গুরু ভিন্ন ঈশ্বর লাভ অসাধ্য বৈ কি।”
শ্রীশ্রীরাম ঠাকুর বলেছেনঃ
শ্রীশ্রীরামঠাকুরই সদ্ গুরু নররূপে স্বয়ং শ্রীভগবান। সদ্ গুরু সর্বজ্ঞ, সর্বদ্রষ্টা, সর্বশক্তিমান, সর্বনিয়ন্তা। সদ্ গুরুর কৃপাই- মহাশক্তি, মহাসিদ্ধি, মহামুক্তির উপায়। সদ্ গুরু অনন্ত জ্ঞান, অনন্ত প্রেম, অনন্ত কল্যাণের পরিপূর্ণ বিগ্রহ। সদ্ গুরুর আশ্রয় লাভ না করা পর্যন্ত জীবকে পুনঃ পুনঃ এই জন্মমৃত্যুর চক্রে বিঘূর্ণিত হইতে হইবে। একমাত্র সদ্ গুরুর কৃপাতেই আত্মজ্ঞান ও মুক্তিলাভ ঘটিতে পারে।
সদ্ গুরুর কৃপালাভ
শ্রীভগবান স্বয়ং সদ্ গুরু রূপে কোটি কোটি মানবের মহামুক্তি দানের জন্য জগতে অবতীর্ণ হন। ভক্ত বা শিষ্য যদি একান্ত বিশ্বাস ও সম্পূর্ণ নির্ভরতার সহিত প্রাণের শ্রদ্ধা ভক্তি-ভালবাসার দ্বারা সদ্ গুরুর স্মরণ, মনন এবং আদেশ উপদেশানুযায়ী জীবন যাপনে যত্ন করেন তবে অচিরে সদ্ গুরুর কৃপালাভ ঘটিবে। জীবনে মরণে, শয়নে স্বপনে, অহরহঃ অনুক্ষণ, অবিরত প্রাণে জ্বলন্তরূপে জাগাইয়া রাখিতে হইবে-
“তুমি আপন হইতে হও আপনার,
যার কেহ নাই তুমি আছ তার।”
“নাম! নাম করিলেই গুরুকে পাওয়া যায়। নামের মাধ্যমে তাঁহার সহিত যোগাযোগের কেন্দ্র স্থাপিত হয়। সেই কেন্দ্র স্থাপন করিলেই ‘তত্ত্বমসি’ তুমিই সেই পরব্রহ্ম, যাহা প্রত্যেকের অন্তরে নিহিত আছেন, তাহা উপলব্ধি করা যায় এবং তাঁর কৃপা লাভ হয়। নাম আর ভগবান এক।”
“সদ্গুরুর কাজ হইল ভক্তকে উদ্ধার করা। ভক্ত নাম করুক আর না করুক, সদ্গুরু যিনি তিনি ভক্তকে উদ্ধার করিবেনই।”
শ্রীশ্রী ঠাকুর আবার বলেছেনঃ
“দীক্ষা-দেখা। দর্শন-আত্ম দর্শন। নাম করিতে করিতে দেখা হয়।” অর্থাৎ নাম করিতে করিতেই দীক্ষা হয়। “নামের সঙ্গই গুরু সঙ্গ। নামের সেবাই গুরু সেবা।” সেবা কথাটির অর্থই হচ্ছে নামের নিকটে থাকা।
“এ নাম হইল গুরু মূর্তি। নামে আত্মসমর্পণই গুরুতে আত্মসমর্পণ।”
“গুরুরা যা দেন তা বীজ। বীজ গোপনে রাখ্তে হয়। এখানে যা পাইছেন তা ফল-পুষ্প সমম্বিত মহামহীরুহ। ফলটা দিলাম, শুধু-পাড়েন আর খায়েন, শুধু-পাড়েন আর খায়েন।”
জনৈক স্বামীজী ঠাকুরকে বললেন, আপনি আশ্রয় প্রার্থীদের শুধু নাম দেন, বীজ দেন না, এটা কি হলো?
শ্রীশ্রীরামঠাকুর বললেন, “কি করুম? মাটি যে রকম শক্ত, আর বাতাস যে রকম শুকনা তাতে বীজ পুঁতলে উঠাইতে অনেকেই পারব না। সেইজন্য একেবারে কলম কইরা দিলাম। এইবার একটু জল দিলেই গাছ বড় হইয়া তাড়াতাড়ি ফল ধরব। অপরাধ যদি কিছু কইরা থাকি, তবে এদের কল্যাণের জন্যই করছি।”
কোনও নামপ্রার্থী বললেন, নাম দিলেন, বীজ দিলেন না বাবা?
ঠাকুর বললেন, “বীজ দেই নাই, ফল দিছি পাড়েন আর খান।”
শ্রীশ্রীঠাকুরের সহিত শ্রীঁফণীন্দ্র কুমার মালাকার মহাশয়ের কথোপকথন।
“ঠাকুর, নাম করতে বসলে মন বিভিন্ন স্থানে ও বিষয়ে ঘুরে বেড়ায়। নাম হয় না। কি নাম দিলেন?"
ঠাকুর বলিলেন - "তোমার পূর্বজন্মের সাধিত নাম শুনাইছি, নাম দেই নাই। মাতৃজঠরেও নাম শুনাইছিলাম। প্রকৃতির রাজ্যে আইস্যা ভুইলা গেছ। পুনরায় নাম স্মরণ করাইয়া দিছি। নাম করে শিবরূপী প্রাণে। নাম আবরনহীন। তাই মনের সংকল্প বিকল্পের অপেক্ষা রাখে না, অবিরাম নাম হয়। নাম শুনতে মন লাগে না। মন যেইখানে ইচ্ছা ঘুইরা বেড়াক। তুমি নাম শুনার জন্য চেষ্টা করবা। মনের দিকে লক্ষ্য রাখবা না। লক্ষ্য রাখবা নামের দিকে। মনের গতি চিরচঞ্চল। যত চঞ্চল হউক, আর যেইখানে যাউক না কেন ফিরা আবার নিজের জায়গায় আসবো। ফিরা আইসা তুমি যেই নাম শুনছ, মনও সেই নাম শুনতে পাইব। তুমি সর্ব্বদা নাম শুনবার জন্য অভ্যাস কর।"
শ্রীশ্রীরামঠাকুরের দর্শন - ‘গুরুনাম জপ, শ্রীগুরুর চরণ সেবার সঙ্গে সত্যাশ্রয়ী হয়ে অকাতরে প্রারদ্ধ ভোগদান, কলিকালের সর্বোৎকৃষ্ট সাধন, ইহাই শ্রীরামঠাকুরের দর্শন।’
শ্রীশ্রীঠাকুর উপদেশ প্রদানের পরে বলিতেন, “আমার ধৃস্টতা মার্জনা করিবেন। আমি উপদেষ্টা নই, আমি দৃষ্টান্ত মাত্র।” তাই শ্রীশ্রীঠাকুরের আচরণ তথা দৃষ্টান্তই আমাদের অনুকরনীয়
শ্রীশ্রীঠাকুর বলিয়াছেন “যাগযোগ তপস্যা দ্বারা ভগবান লাভ করা যায় না, কিছু শক্তি আহরণ করা যায়। তাহাও বাধক।”
ঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করা হইল-“তবে কিসে পাওয়া যায়।” উত্তর দিলেন “কৃপা দ্বারা”। ‘সেই কৃপা লাভ কি করিয়া হয়?’ -আবার জিজ্ঞাসা করিলে, উত্তর পাওয়া গেল- “ধৈর্য্যের সহিত, সম্পূর্ণ নির্ভরতা দ্বারা।”
ঠাকুর, ভক্ত অক্ষয় কুমার মজুমদার কে জানালেন, “কলিতে বেদ নাই সুতরাং বিধিও নাই। কলিতে প্রয়োজন হইতেছে গুরু চরণে আত্মনিবেদন, আত্ম নিবেদন পূর্বক যাহা বোধ হইবে তাহাই বেদ এবং তদ্অনুযায়ী যাহা করণীয় মনে হইবে তাহাই বিধি”
সবশেষে ডক্টর প্রঁভাত চন্দ্র চক্রবর্তী মহাশয়ের লেখা প্রবন্ধ “ তাঁহার কথা ” অনুসরণে তাঁর সাথে একই সুরে প্রাণের আবেগে শেষে শুধু বলিতে ইচ্ছা হয়- “তুঁয়া চরণে মন লাগহুঁ রে”। জন্মে জন্মে যেন তাঁহার শ্রীচরণের দাসানুদাস হইতে পারি-- ইহাই প্রার্থনা।
জয়রাম, জয়গোবিন্দ।
কৈবল্য ভুবনের সাথে থাকুন- শ্রীশ্রীঠাকরকে জানুন।