19/05/2026
সনাতন ধর্মশাস্ত্রে, বিশেষত মহাকাব্য মহাভারতে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কেবল একজন অবতার বা আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবেই আবির্ভূত হননি, বরং তিনি ছিলেন প্রাচীন ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ কূটনীতিবিদ, রাষ্ট্রনায়ক এবং এক অসামান্য পররাষ্ট্র নীতির প্রণেতা। তাঁর পররাষ্ট্র নীতির মূল ভিত্তি ছিল ধর্মের সংস্থাপন বা ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। সাম্রাজ্য বিস্তার তাঁর লক্ষ্য ছিল না; তাঁর লক্ষ্য ছিল এমন এক বিশ্বব্যবস্থা তৈরি করা যেখানে ন্যায় ও প্রজার কল্যাণ সুনিশ্চিত হয়।
প্রাচীন ভারতীয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মূল স্তম্ভ চতুরঙ্গ নীতি বা সাম, দান, ভেদ ও দণ্ড এর নিখুঁত ও বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায় শ্রীকৃষ্ণের রাজনৈতিক পদক্ষেপে। মহাভারতের উদ্যোগ পর্ব (যেখানে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পূর্বপ্রস্তুতি ও শান্তি স্থাপনের চেষ্টা বর্ণিত হয়েছে) হলো শ্রীকৃষ্ণের পররাষ্ট্র নীতির শ্রেষ্ঠ দলিল।
শ্রীকৃষ্ণের পররাষ্ট্র নীতির প্রথম ও প্রধান ধাপ ছিল যুদ্ধ এড়িয়ে শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা। তিনি বিশ্বাস করতেন যে যুদ্ধ হলো সর্বশেষ বিকল্প, কারণ এতে মানবজাতির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
মহাভারতের উদ্যোগ পর্বে পাণ্ডবদের তরফ থেকে শান্তিদূত হিসেবে শ্রীকৃষ্ণ হস্তিনাপুরে কুরুসভায় যান। তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল কৌরব ও পাণ্ডবদের মধ্যে একটি শান্তিপূর্ণ মীমাংসা করা।
কুরুসভায় ধৃতরাষ্ট্রকে উদ্দেশ্য করে শ্রীকৃষ্ণ শান্তির প্রস্তাব দিয়ে বলেছিলেন
শমং কুরুষ্ব রাজেন্দ্র পাণ্ডবৈঃ সহ কৌরব।
তথা চেদং কুরূণাং বৈ পাণ্ডবানাং চ ভারত।।
শর্ম স্যাদমমিত্রঘ্ন সর্বেষাং চ মহীক্ষিতাম্।
(মহাভারত, উদ্যোগ পর্ব, ৯৫/১৬-১৭)
অর্থ: হে রাজেন্দ্র! পাণ্ডবদের সাথে আপনি শান্তি স্থাপন করুন। হে ভারত! যদি আপনি তা করেন, তবে কুরু, পাণ্ডব এবং পৃথিবীর সকল রাজন্যবর্গের মঙ্গল সাধিত হবে।
এখানে স্পষ্ট দেখা যায়, শ্রীকৃষ্ণ সমগ্র ভূ-মণ্ডল বা মিত্র রাষ্ট্রগুলোর সার্বিক নিরাপত্তার কথা ভেবেই শান্তির প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
পররাষ্ট্র নীতিতে দান বলতে বোঝায় কিছু সুবিধা বা ছাড় দিয়ে বড় কোনো বিপদ এড়ানো। পাণ্ডবরা ইন্দ্রপ্রস্থের ন্যায্য অধিকারী এবং সমগ্র অর্ধ রাজ্যের দাবিদার হওয়া সত্ত্বেও, শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের বুঝিয়েছিলেন বড় যুদ্ধ এড়াতে ন্যূনতম শর্তে রাজি হতে।
শ্রীকৃষ্ণ কুরুসভায় প্রস্তাব দেন যে, কৌরবরা যদি পাণ্ডবদের কেবল ৫টি গ্রাম (ইন্দ্রপ্রস্থ, বৃকপ্রস্থ, জয়ন্ত, বারণাবত ও আরেকটি) প্রদান করে, তবে পাণ্ডবরা সন্তুষ্ট থাকবেন এবং কোনো যুদ্ধ হবে না। এটি ছিল শ্রীকৃষ্ণের চরম নমনীয়তা ও ছাড় দেওয়ার নীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত, যার উদ্দেশ্য ছিল রক্তপাত এড়ানো।
যখন আলোচনা (সাম) এবং আপসের (দান) মাধ্যমে দুর্যোধন সন্ধি করতে রাজি হলেন না ("সূচ্যগ্র মেদিনীও বিনা যুদ্ধে দিব না"), তখন শ্রীকৃষ্ণ ভেদ বা বিভাজন নীতির আশ্রয় নেন। শত্রুপক্ষের শক্তি দুর্বল করার জন্য তিনি তাদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলোকে ব্যবহার করেন।
কৌরব পক্ষের অন্যতম প্রধান সেনাপতি ও যোদ্ধা ছিলেন সূর্যপুত্র কর্ণ। শ্রীকৃষ্ণ জানতেন কর্ণ পাণ্ডবদের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা। তিনি কর্ণের সাথে একান্তে সাক্ষাৎ করেন।
শ্রীকৃষ্ণ কর্ণকে তাঁর জন্মবৃত্তান্ত জানিয়ে বলেন যে তিনি কুন্তীর প্রথম সন্তান এবং তাঁকে পাণ্ডবদের পক্ষে যোগদানের আমন্ত্রণ জানান।
ত্বং বৈ মাত্রা সমুৎসৃষ্টো রাধেয় ইতি মন্যসে।
পাণ্ডবানাং ভবান্ জ্যেষ্ঠো ভ্রাতা ভরতসত্তম।।
(মহাভারত, উদ্যোগ পর্ব, ১৪০/৬)
অর্থ: তুমি মনে করো তুমি রাধার পুত্র, কিন্তু কুন্তী তোমাকে জন্ম দিয়েছেন। হে ভরতশ্রেষ্ঠ! তুমি পাণ্ডবদের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা। তুমি পাণ্ডবপক্ষে এলে যুধিষ্ঠির তোমাকে হস্তিনাপুরের সিংহাসন ছেড়ে দেবেন।
এটি ছিল একটি দুর্ধর্ষ মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক চাল। যদিও কর্ণ বন্ধুত্বের খাতিরে দুর্যোধনকে ত্যাগ করেননি, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের এই পদক্ষেপে কর্ণের মনে তাঁর ভাইদের প্রতি এক অন্তর্নিহিত দুর্বলতা তৈরি হয়, যা কৌরবদের সামরিক অবস্থানকে পরোক্ষভাবে দুর্বল করে দিয়েছিল।
যখন কূটনীতির সকল শান্তিকামী পথ রুদ্ধ হয়ে যায়, তখন শ্রীকৃষ্ণের পররাষ্ট্র নীতির চূড়ান্ত রূপ হলো দণ্ড বা সামরিক শক্তি প্রয়োগ।
উদ্যোগ পর্বে কুরুসভায় দুর্যোধন যখন শ্রীকৃষ্ণের শান্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে উল্টো তাঁকেই বন্দী করার নির্দেশ দেন, তখন শ্রীকৃষ্ণ তাঁর বিশ্বরূপ দর্শন করান। এটি ছিল শত্রুকে নিজের চরম ক্ষমতা প্রদর্শন , যাতে শত্রু ভয় পেয়ে পিছু হটে। কিন্তু দুর্যোধন তাতেও নিবৃত্ত না হলে, শ্রীকৃষ্ণ ধর্মযুদ্ধের নির্দেশ দেন।
যুদ্ধ যে অনিবার্য এবং দুষ্টের দমনের জন্য দণ্ড প্রয়োগ যে অবশ্য কর্তব্য, তা শ্রীকৃষ্ণ ভগবদগীতায় স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন
পরিত্রাণায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্।
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।।
(ভগবদগীতা ৪/৮)
অর্থ: সাধুদের রক্ষা করার জন্য, দুষ্কৃতকারীদের বিনাশ করার জন্য এবং ধর্ম (ন্যায়বিচার ও শৃঙ্খলার) পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হই।
এখানে বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম হলো শ্রীকৃষ্ণের পররাষ্ট্র নীতির সেই দিক, যেখানে অন্যায্য ও স্বৈরাচারী শক্তির বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে।
শ্রীকৃষ্ণের পররাষ্ট্র নীতির আরেকটি বিস্ময়কর দিক ছিল মিত্রতা ও জোট গঠন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগে যখন দুর্যোধন ও অর্জুন উভয়েই শ্রীকৃষ্ণের কাছে সাহায্য চাইতে দ্বারকায় যান, তখন শ্রীকৃষ্ণ এক অসাধারণ নিরপেক্ষতা ও সামরিক কূটনীতির পরিচয় দেন।
তিনি একদিকে তাঁর দুর্ধর্ষ নারায়ণী সেনা প্রদান করেন দুর্যোধনকে এবং অন্যদিকে নিজে অস্ত্রহীন অবস্থায় অর্জুনের রথের সারথি হওয়ার প্রস্তাব দেন। এর মাধ্যমে তিনি যাদবদের সরাসরি যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করেন, আবার নিজের প্রজ্ঞা ও নেতৃত্ব দিয়ে পাণ্ডবদের জয় সুনিশ্চিত করেন।
শ্রী কৃষ্ণের পররাষ্ট্র নীতি কোনো আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদ ছিল না। তাঁর নীতির মূল দর্শন একটি শ্লোকেই নিহিত
"যতো ধর্মস্ততো কৃষ্ণো যতো কৃষ্ণস্ততো জয়ঃ"
(যেখানে ধর্ম, সেখানে কৃষ্ণ; আর যেখানে কৃষ্ণ, সেখানেই জয়)
তাঁর পররাষ্ট্র নীতি আমাদের শেখায় যে, রাষ্ট্রকে সর্বদা প্রথমে শান্তির চেষ্টা করতে হবে (সাম ও দান), প্রয়োজন হলে চতুর কূটনীতির আশ্রয় নিতে হবে (ভেদ), এবং দেশের সার্বভৌমিকতা, ন্যায় ও ধর্ম রক্ষার্থে চরম শক্তি প্রয়োগের (দণ্ড) জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকতে হবে। সনাতন শাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণকে তাই একজন নিখুঁত, বাস্তববাদী ও পরম ধার্মিক রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।
তথ্য সংগ্রহ লেখা এবং © ব্রহ্মসত্য