17/05/2026
জিলহজ্জ মাসের প্রথম ১০ দিন (বিশেষ করে প্রথম ৯ দিন, কারণ ১০ম দিন ঈদুল আজহা হওয়ায় সেদিন রোজা রাখা হারাম) ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত বরকতময় ও মর্যাদাপূর্ণ। এই দিনগুলোর ইবাদত আল্লাহর কাছে বছরের অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রিয়।
হাদিসের আলোকে জিলহজ্জের প্রথম ৯ দিন রোজা রাখার অতুলনীয় ফজিলত নিচে বিস্তারিত সাজিয়ে দেওয়া হলো:
১. আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল
রাসূলুল্লাহ (সা.) এই দিনগুলোর আমলকে সর্বোত্তম বলে ঘোষণা করেছেন।
হাদিস: হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"জিলহজ্জের প্রথম ১০ দিনের আমলের চেয়ে আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় আর কোনো আমল নেই।" সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও কি এর চেয়ে উত্তম নয়?" তিনি বললেন, "না, জিহাদও নয়। তবে সেই ব্যক্তির কথা ভিন্ন, যে নিজের জান ও মাল নিয়ে জিহাদে বের হয়েছে এবং এর কোনো কিছুই আর ফেরত নিয়ে আসেনি (অর্থাৎ শহীদ হয়েছে)।" (সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৯৬৯)
২. প্রতিটি রোজার সওয়াব এক বছরের রোজার সমান
এই দিনগুলোতে সাধারণ নফল রোজার চেয়ে বহুগুণ বেশি সওয়াব পাওয়া যায়।
হাদিস: হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা.) বলেছেন:
"জিলহজ্জের প্রথম ১০ দিনে ইবাদত করা আল্লাহর কাছে অন্য যেকোনো দিনের ইবাদতের চেয়ে বেশি প্রিয়। এর প্রতিটি দিনের রোজা এক বছরের রোজার সমতুল্য এবং প্রতিটি রাতের ইবাদত লাইলাতুল কদরের ইবাদতের সমতুল্য।" (জামে তিরমিযী, হাদিস নং: ৭৫৮)
৩. আরাফার দিনের রোজা: দুই বছরের গুনাহ মাফ
৯ই জিলহজ্জ বা আরাফাতের দিনের রোজা এই নয়টি রোজার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ফজিলতপূর্ণ। যারা হজে যাননি, তাদের জন্য এই রোজা রাখা সুন্নাত।
হাদিস: হযরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে আরাফার দিনের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন:
"আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, এটি তার পূর্ববর্তী এক বছর এবং পরবর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা (ক্ষমা) হয়ে যাবে।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১১৬২)
৪. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিয়মিত আমল
এই রোজাগুলো এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, মহানবী (সা.) নিজে কখনো এই আমলটি বাদ দিতেন না।
হাদিস: হযরত হাফসা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
"চারটি আমল নবী করীম (সা.) কখনো ছাড়তেন না— আশুরার রোজা, জিলহজ্জের প্রথম নয় দিনের রোজা, প্রত্যেক মাসের তিনটি (আইয়ামে বিযের) রোজা এবং ফজরের ফরযের পূর্বে দুই রাকাত সুন্নাত নামায।" (সুনানে নাসায়ী, হাদিস নং: ২৪১৬)
৫. কুরআনের পাতায় জিলহজ্জের প্রথম ১০ দিন
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের সূরা ফাজর-এর শুরুতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কসম খেয়েছেন। তার মধ্যে একটি হলো জিলহজ্জের এই ১০ দিন।
কুরআনের বাণী: "কসম ভোরের এবং কসম ১০টি রাতের।" (সূরা আল-ফাজর, আয়াত: ১-২)
তাফসীর: ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.) সহ প্রায় সব প্রখ্যাত মুফাসসিরীনদের মতে, এখানে '১০টি রাত' বলতে জিলহজ্জ মাসের প্রথম ১০ দিন ও রাতকেই বোঝানো হয়েছে। আল্লাহ তাআলা কুরআনে কোনো সাধারণ বিষয়ের কসম খান না। যে বিষয়ের কসম খাওয়া হয়, তার গুরুত্ব আল্লাহর কাছে অপরিসীম।
৬. রমজানের শেষ ১০ দিন বনাম জিলহজ্জের প্রথম ১০ দিন
ইসলামী শরীয়তে এই দুই দশকের মর্যাদা নিয়ে উলামায়ে কেরামদের মাঝে একটি চমৎকার বিশ্লেষণ রয়েছে। ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.) এই দুই দশকের তুলনা করতে গিয়ে লিখেছেন:
▪️রমজানের শেষ ১০ রাতের মর্যাদা বেশি, কারণ তাতে 'লাইলাতুল কদর' বা শবে কদর রয়েছে।
▪️জিলহজ্জের প্রথম ১০ দিনের মর্যাদা বেশি, কারণ তাতে 'আরাফার দিন' ও 'কোরবানির দিন' রয়েছে এবং এই দিনগুলোতে ইসলামের মূল ৫টি স্তম্ভের (ঈমান, নামায, রোজা, যাকাত ও হজ) সবগুলোর মিলন ঘটে, যা বছরের অন্য কোনো সময়ে সম্ভব নয়।
সুতরাং, দিনের বেলা ইবাদত (যেমন: রোজা রাখা) ও জিকিরের জন্য জিলহজ্জের প্রথম ৯ দিন বছরের সেরা দিন।
৭. এই দিনগুলোতে রোজা রাখার আত্মিক ও আধ্যাত্মিক উপকারিতা
এই ৯ দিন রোজা রাখা কেবল সওয়াব অর্জনের মাধ্যমই নয়, বরং একজন মুমিনের আত্মশুদ্ধির জন্য এক মহৌষধ:
▪️জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একদিন রোজা রাখে, আল্লাহ তার মুখমণ্ডলকে জাহান্নামের আগুন থেকে ৭০ বছরের দূরত্বে সরিয়ে নেন।" (সহীহ বুখারী)। জিলহজ্জের মতো পবিত্র মাসে রোজা রাখলে এই পুরস্কারের মর্যাদা যে আরও কত বৃদ্ধি পাবে, তা সহজেই অনুমেয়।
▪️দোয়ার কবুলিয়াত: রোজাদারের দোয়া আল্লাহর কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। বিশেষ করে জিলহজ্জের ৯ দিন এবং আরাফার বিকেলের দোয়া আল্লাহর কাছে অত্যন্ত দ্রুত কবুল হয়।
▪️গুনাহ বর্জনের প্রশিক্ষণ: কোরবানির মূল উদ্দেশ্য হলো নিজের পশুবৃত্তিকে জবাই করা। জিলহজ্জের প্রথম ৯ দিন রোজা রাখার মাধ্যমে মানুষ তার নফস বা কুপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার শক্তি অর্জন করে, যা তাকে কোরবানির মূল চেতনার দিকে ধাবিত করে।
৮. আরাফার দিনের রোজার বিশেষ তাৎপর্য (গভীর বিশ্লেষণ)
৯ই জিলহজ্জ বা আরাফার দিনের রোজা কেন দুই বছরের গুনাহ মাফ করে? মুহাদ্দিসগণ এর ব্যাখ্যায় বলেন:
মানুষের জীবনে সাধারণত ছোটখাটো ভুলত্রুটি বা সগীরা গুনাহ প্রতিনিয়ত হয়ে থাকে। আরাফার দিনের একটি মাত্র রোজা আল্লাহর দরবারে এতটাই মকবুল যে, আল্লাহ তার বান্দার পেছনের এক বছরের কৃত গুনাহ তো মাফ করেনই, উপরন্তু বান্দার প্রতি দয়াশীল হয়ে আগামী এক বছর তাকে বড় কোনো গুনাহে লিপ্ত হওয়া থেকে হেফাজত করেন অথবা অগ্রিম গুনাহ মাফ করে দেন।
▪️নোট: তবে মনে রাখতে হবে, বড় গুনাহ বা কবীরা গুনাহ এবং বান্দার হকের (কারো পাওনা বা অধিকার নষ্ট করা) জন্য খাঁটি তওবা বা ক্ষমা চেয়ে নেওয়া জরুরি।
৯. সালাফে সালেহীন বা পূর্বসূরিদের আমল কেমন ছিল?
হযরত হাসান বসরী (রহ.), ইমাম আতা (রহ.) এবং প্রখ্যাত তাবেয়ীগণ জিলহজ্জের চাঁদ দেখার পর থেকে নিজেদের ইবাদতের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতেন।
▪️সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রহ.) (যিনি একজন প্রখ্যাত তাবেয়ী ছিলেন) জিলহজ্জের প্রথম ১০ দিন এলে ইবাদতে এতটাই মগ্ন হয়ে যেতেন যে, তাকে দেখে মনে হতো তিনি নিজের সাধ্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছেন। তিনি বলতেন, "তোমরা জিলহজ্জের রাতে তোমাদের ঘরের বাতি নিভিয়ে দিও না (অর্থাৎ সারারাত জেগে ইবাদত করো এবং দিনে রোজা রাখো)।"
🌿 অবহেলার কারণে যা আমরা মিস করছি (একটি অনুধাবন)
আমরা অনেকেই রমজান মাস এলে ইবাদতের জন্য পাগলপ্রায় হয়ে যাই, যা অত্যন্ত চমৎকার। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, জিলহজ্জের এই দিনগুলো যখন আসে, তখন আমরা কেবল কোরবানির পশু কেনা, হাটবাজার করা বা ঈদের কেনাকাটা নিয়েই ব্যস্ত থাকি। অথচ এই দিনগুলোর মর্যাদা রমজানের দিনের চেয়েও বেশি!
যদি কোনো ব্যক্তি অলসতাবশত বা গুরুত্ব না বুঝে এই ৯টি রোজা মিস করেন, তবে তিনি মূলত:
▪️ ৯ বছর নফল রোজা রাখার সমপরিমাণ সওয়াব হারালেন।
▪️৯টি লাইলাতুল কদরের সমান মর্যাদাপূর্ণ রাতের ইবাদতের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হলেন।
▪️ দুই বছরের গুনাহ মাফের এক রাজকীয় সুযোগ হাতছাড়া করলেন।
🌿 জিলহজ্জ মাসের প্রথম রোজা, ১৮'ই মে সোমবার থেকে ২৭ তারিখ বুধবার পর্যন্ত.!
তাই আসুন, এবার জিলহজ্জের চাঁদ ওঠার আগে থেকেই আমরা মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিই। নিজে রোজা রাখার পাশাপাশি পরিবারের সবাইকে, বন্ধু-বান্ধবদের এই ফজিলতের কথা স্মরণ করিয়ে দিই। আল্লাহ আমাদের আমল করার তাওফিক দান করুন। আমীন।