22/05/2026
◾একসময় সমাজে ধর্মের নামে এমন এক অন্ধকার যুগ নেমে এসেছিল, যখন নারীকে মানুষ হিসেবে নয়—পুরুষের সম্পত্তি হিসেবে দেখা হতো। স্বামীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রীর জীবনেরও ইতি ঘটবে—এই নির্মম, অমানবিক ও বর্বর ধারণাকেই ধর্মের মোড়কে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল “সতীদাহ” নামে। অথচ এই প্রথার কোনও বৈদিক ভিত্তি ছিল না; বরং এটি ছিল কিছু স্বার্থান্বেষী ভণ্ড পণ্ডিত ও সমাজশোষকদের তৈরি এক ভয়ংকর সামাজিক ষড়যন্ত্র।
পৌরাণিক যুগে এক শ্রেণির নামধারী পণ্ডিত সমাজের উপর নিজেদের একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। তারা বুঝেছিল, যতদিন সাধারণ মানুষ বেদ-উপনিষদ পড়তে পারবে, ততদিন তাদের মিথ্যা ও কুসংস্কার টিকবে না। তাই পরিকল্পিতভাবে সমাজে বেদপাঠ নিষিদ্ধ করা হলো। নারীদের তো বটেই, সাধারণ মানুষের কাছ থেকেও কেড়ে নেওয়া হলো শাস্ত্র জানার অধিকার। কেবল কিছু টাইটেলসর্বস্ব দ্বিজের হাতেই সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হলো ধর্মীয় জ্ঞান।
কয়েক প্রজন্ম পেরোতে না পেরোতেই মানুষ বেদে আসলে কী লেখা আছে, তা ভুলতে শুরু করল। কিন্তু সংস্কৃত ভাষা ও শ্লোকের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা তখনও অটুট ছিল। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একদল ভণ্ড পণ্ডিত মনগড়া পুরাণ, গৌণ স্মৃতি ও নানা কুসংস্কারপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করল। সংস্কৃত শ্লোক জুড়ে দিয়ে তারা নিজেদের স্বার্থে নতুন নতুন নিয়ম সমাজে চাপিয়ে দিল। এভাবেই ধর্মের নামে চালু হলো সতীদাহ, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, দেবদাসী প্রথার মতো অসংখ্য বর্বর রীতি।
বিশেষ করে বঙ্গ অঞ্চলে যখন বিধবাদের সম্পত্তির অধিকার নিয়ে আইন চালু হয়, তখন লোভী সমাজপতিরা আরও বেশি করে সতীদাহ প্রথাকে উসকে দিতে শুরু করে। কারণ একজন বিধবা বেঁচে থাকলে স্বামীর সম্পত্তিতে তার অধিকার থাকত। কিন্তু তাকে চিতায় পুড়িয়ে মারতে পারলে সেই সম্পত্তি সহজেই দখল করা যেত। ধর্মকে ব্যবহার করা হয়েছিল সম্পত্তি লুটের অস্ত্র হিসেবে।
এইসব বানোয়াট গ্রন্থে প্রচার করা হতো—স্বামীর সঙ্গে সহমরণে গেলে নারী নাকি স্বর্গ লাভ করবে, এর চেয়ে বড় পূণ্য আর নেই। অনেক ক্ষেত্রেই নারীদের জোর করে মন্ত্র পড়িয়ে “সতী” বানানো হতো। একবার সংকল্প করিয়ে দিলে বলা হতো—এখন আর ফিরে আসার উপায় নেই। কান্না, আর্তনাদ, জীবনের আকুতি—সবকিছু ঢেকে যেত ধর্মীয় উন্মাদনায়।
এই অমানবিক প্রথাকে বৈধতা দিতে কুখ্যাত স্মার্ত পণ্ডিত রঘুনন্দন ভট্টাচার্য পবিত্র ঋগ্বেদের মন্ত্র পর্যন্ত বিকৃত করেছিলেন। একটি শব্দের অর্থ বদলে দিয়ে তিনি “অগ্নি” সম্পর্কিত ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে সতীদাহের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করান। ধর্মগ্রন্থ বিকৃত করে সমাজকে ভুল পথে পরিচালিত করার এমন জঘন্য উদাহরণ ইতিহাসে বিরল। তার এই বিকৃত ব্যাখ্যার প্রভাবে অসংখ্য নিরপরাধ নারীকে অকালে জীবন দিতে হয়েছে।
কিন্তু ইতিহাসে সব অন্ধকারের মাঝেও কিছু মানুষ সূর্যের মতো আবির্ভূত হন। বাংলার নবজাগরণের মহান পথিকৃৎ রাজা রামমোহন রায় ছিলেন তেমনই এক মহামানব। তিনি সাহসের সঙ্গে ঘোষণা করেছিলেন—সতীদাহ বৈদিক নয়, মানবিকও নয়। তিনি ঋগ্বেদ ও অথর্ববেদের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করেন, বেদ কোথাও সতীদাহ সমর্থন করে না। বরং বেদে বিধবাকে নতুন জীবন শুরু করার কথাই বলা হয়েছে।
তার লেখা “প্রবর্তক ও নিবর্তকের সংবাদ” গ্রন্থ সেই সময়ের ধর্মব্যবসায়ীদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। তিনি দেখিয়ে দেন, ধর্মের নামে সমাজে যেসব বর্বর প্রথা চালু আছে, তার অধিকাংশই বেদবিরুদ্ধ ও মানবতাবিরোধী। সতীদাহ, বাল্যবিবাহ, কুলীন প্রথা, বহুবিবাহ, দেবদাসী, শূদ্রদের বেদপাঠ নিষিদ্ধ করা—এসবের বিরুদ্ধে তিনি বুক চিতিয়ে লড়াই করেছিলেন।
তাঁর এই সংগ্রাম মোটেও সহজ ছিল না। ধর্মব্যবসায়ী গোষ্ঠী তাঁকে নাস্তিক, ধর্মদ্রোহী বলে অপমান করেছে, হত্যার হুমকি দিয়েছে, সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করেছে। তবুও তিনি থামেননি। কারণ তিনি বুঝেছিলেন—যে ধর্ম মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারে না, নারীর সম্মান দিতে পারে না, তা কখনও সত্য ধর্ম হতে পারে না।
অবশেষে ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক সতীদাহ প্রথা আইন করে নিষিদ্ধ করেন, এবং এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল রাজা রামমোহন রায়ের। তাঁর যুক্তি, শাস্ত্রজ্ঞান ও মানবতাবাদী আন্দোলনের ফলেই হাজার হাজার নারী নতুন জীবন ফিরে পেয়েছিল।
রাজা রামমোহন রায় শুধু একজন সমাজসংস্কারক নন; তিনি ছিলেন বাঙালির আত্মজাগরণের সূর্যসন্তান। তিনি বাংলায় উপনিষদের অনুবাদ করেছেন, নিরাকার ব্রহ্মবাদ প্রচার করেছেন, নারীশিক্ষা ও মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলেছেন। তিনি শিখিয়েছেন—ধর্ম মানে অন্ধ বিশ্বাস নয়, ধর্ম মানে সত্য, জ্ঞান ও মানবতা।
আজ তাঁর জন্মতিথিতে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।যে মানুষটি ধর্মের নামে নারীর জীবন্ত দাহের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পেরেছিলেন, তিনিই প্রকৃত অর্থে মানবতার পুরোহিত।বাংলার ইতিহাসে তাঁর নাম চিরকাল আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।