08/10/2026
◾পবিত্র বেদে আল্লাহর নাম?? অপপ্রচারের জবাব:
পবিত্র বেদ হিন্দুদের সর্বোচ্চ ধর্মগ্রন্থ এবং হিন্দু ধর্মীয় দর্শন, উপাসনা ও বৈদিক ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তাই বেদে কোনো শব্দ বা বাক্য পাওয়া গেলে সেটির প্রকৃত অর্থ কী তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে শব্দটির মূল সংস্কৃত রূপ, ব্যাকরণ, ধাতু, বৈদিক প্রয়োগ, প্রসঙ্গ এবং প্রাচীন ব্যাখ্যা বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে কিছু ইসলামিক বক্তা ও প্রচারক দীর্ঘদিন ধরে মিথ্যা দাবি করে আসছেন যে, বেদে নাকি ‘আল্লাহ’-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে জাকির নায়েকসহ কয়েকজন বক্তার বক্তব্যে এমন দাবি বিভিন্ন সময়ে প্রচারিত হয়েছে।
এখানে মূল প্রশ্ন হলো কোনো সংস্কৃত শব্দের উচ্চারণ আরবি ‘আল্লাহ’ শব্দের সঙ্গে সামান্য মিললেই কি সেটিকে ‘আল্লাহ’ বলা যায়?
অবশ্যই নয়।
একটি ভাষার শব্দকে অন্য ভাষার শব্দের সঙ্গে জোর করে মিলিয়ে দেওয়ার আগে দেখতে হয় দুটি শব্দের উৎস, বানান, ব্যাকরণগত গঠন, অর্থ, উচ্চারণ এবং সংশ্লিষ্ট ধর্মগ্রন্থে তাদের ব্যবহার একই কি না। শুধু ধ্বনিগত মিল কোনো শব্দের অভিন্ন উৎস বা অভিন্ন অর্থ প্রমাণ করে না।
এই জায়গাতেই ‘ইলা’, ‘অলা’, ‘অলায়্য’ ইত্যাদি বৈদিক শব্দকে ‘আল্লাহ’ হিসেবে প্রচার করার দাবিগুলো প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাদের এহেন দাবীকৃত মন্ত্র ও সেগুলোর অর্থ বিকৃত করে তার দাবীসমূহের পর্যালোচনা করে দেখা যাক-
ত্বমগ্নে অদিতির্দেব দাশুষে ত্বং হোত্রা ভারতী বর্ধমে গিরা।
ত্বমিলা শাতহিমা দক্ষসে ত্বং বৃত্তহা বসুপতে সরস্বতী।।
(ঋগ্বেদ ২।১।১১)
সরলার্থঃ হে সব কিছু দানকারী অগ্রণী প্রভো! তুমি দানশীলের জন্য না খন্ডনকারী হও। তুমিই যজ্ঞাদি সিদ্ধকারী আদিত্য রশ্মিরূপ বাণী, এই বানী দ্বারা তুমি বর্ধিত হও। তুমিই শত হিম ঋতু পর্যন্ত বহমান এই পৃথিবী হও, সব প্রকার উন্নতির কারন হও, হে ঐশ্বর্যের স্বামী তুমিই সব বাসনা নষ্টকারী জ্ঞানদাত্রী।
সমীক্ষাঃ উক্ত মন্ত্রে "ইলা" শব্দটি এসেছে। সংস্কৃতে অনভিজ্ঞ মোল্লারা একে আল্লাহ বানিয়ে ফেলেছে। প্রসিদ্ধ Monir William এর Sanskrit to English Dictionary তে "ইলা" শব্দের অর্থ speech, the world রয়েছে।
অলাতৃণো বল ইন্দ্র ব্রজো গোঃ পুরা হন্তোর্ভয়মানো ব্যার।
সুগান পথো অকৃণোত্রিরজে গাঃ প্রাবন্ বাণীঃ পুরুহতং ধমন্তীঃ।।
(ঋগ্বেদ ৩।৩০।১০)
পদার্থঃ (অলাতৃণঃ বলঃ) [জল দ্বারা ভর্তি হওয়ার কারনে] সম্পূর্ণ ছেদনযোগ্য [অলাতৃণোহলমাতর্দনো, নিঃ৬।২] (ব্রজঃ) অন্তরিক্ষ মধ্যে চলমান মেঘ [ব্রজত্যন্তরিক্ষে, নিঃ ৬,২] (ইন্দ্র) বিদ্যুৎ (গোঃ) বাক (পুরঃ হন্তোঃ) প্রহারের পূর্বেই ( ভয়মানঃ ব্যান) ভয়মান হয়ে ঢেলে পড়ে [আর এই বিদ্যুৎ] (গাঃ নিরজে) জল নিষ্কাষনের জন্য (সুগান পথ অকৃণোত্) সুগম পথ তৈরী করে (বাণীঃ পুরুহুতং ধমন্তীঃ) এবং পুনরায় এই জল নদী আদি মধ্যে যেয়ে [ধমতির্গতিকর্মা, নিঃ ৬,২] (প্র অবন) প্রাণীদের রক্ষা করেন।
সরলার্থঃ [জল দ্বারা ভর্তি হওয়ার কারনে] সম্পূর্ণ ছেদনযোগ্য অন্তরিক্ষ মধ্যে চলমান মেঘ বিদ্যুৎ বাক প্রহারের পূর্বেই ভয়মান হয়ে ঢেলে পড়ে [আর এই বিদ্যুৎ] জল নিষ্কাষনের জন্য সুগম পথ তৈরী করে, এবং পুনরায় এই জল নদী আদি মধ্যে যেয়ে প্রাণীদের রক্ষা করে।
সমীক্ষাঃ মন্ত্রে অলাতৃণ শব্দটি এসেছে। এখানে অলাতৃণ অর্থ কখনোই আল্লাহ
নয়। নিরুক্তে ৬।২ "অলাতৃণ" অর্থ হচ্ছে "অলাতৃণোহলমার্তদনো" অর্থাৎ সম্পূর্ণ ছেদন যোগ্য। Monir Willam dictionary তে অর্থ রয়েছে, not granting anything, miserly I তাহলে অলাতৃণ মানে আল্লাহ ধরলে অর্থ দাড়ায় তিনি ছেদনযোগ্য, অগ্রহনযোগ্য, কূপন স্বভাবের।
অলায়্যস্য পরশুর্ননাশ তমা পবস্য দেব সোম।
আখুং চিদেব দেব সোম।।
ঋগ্বেদ ৯।৬৭।৩০)
পদার্থঃ (সোম) হে পরমাত্মন! (দেব) দিব্যগুণসম্পন্ন (অলায়্যস্য) সর্বত্র ব্যপ্ত শত্রুর (পরশুঃ) যে অস্ত্র (তম) সেই (আখুংচিত্) সর্বঘাতক অস্ত্র কে (ননাশ) নাশ করুন (দেব) হে পরমাত্মন! (আপবস্য) আপনি আমাদের পবিত্র করুন। সরলার্থঃ হে পরমাত্মন! দিব্যগুণসম্পন্ন সর্বত্র ব্যপ্ত শত্রুর যে অস্ত্র সেই সর্বঘাতক অস্ত্র কে নাশ করুন হে পরমাত্মন! আপনি আমাদের পবিত্র করুন।
সমীক্ষাঃ মন্ত্রে অলায়্য শব্দ এসেছে। বৈদিক কোষে অলায়্য শব্দের অর্থ ক্ষমা, ধন, আদি দেবার অযোগ্য অর্থাৎ শত্রু বিশেষ। আর উক্ত মন্ত্রে পরমাত্মার কাছে প্রার্থনা করা হচ্ছে যেন সেই তিনি সেই শত্রুর অস্ত্র নাশ করেন। অলায়্য মানে আল্লাহ ধরলে অর্থ দাড়ায় পরমাত্মা যেন আল্লার অস্ত্র কে নষ্ট করেন।
অতএব বেদে ‘আল্লাহ’ খোঁজার এই ধরনের প্রচেষ্টা অনেকটা স্বর্ণের দোকানে গিয়ে সবজি খোঁজার মতো যে জিনিসটি যেখানে নেই, সেখানে শব্দের সামান্য ধ্বনিগত মিল ধরে সেটি আবিষ্কার করার চেষ্টা করা।প্রমাণ চাইলে শব্দের উচ্চারণ নয় মূল পাঠ, ব্যাকরণ, ব্যুৎপত্তি, প্রসঙ্গ এবং প্রামাণিক ভাষ্য দেখান ।তাহলেই বোঝা যাবে কোনটি প্রকৃত ধর্মগ্রন্থের ব্যাখ্যা, আর কোনটি কেবল ধর্মীয় প্রচারের সুবিধার জন্য শব্দের অর্থ নিয়ে খেলা।