02/03/2026
◑|| পরমতীর্থ হিমাইতপুরধামে দোল উৎসবের আদি কথা ও শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ||
শুরুটি প্রেমময়, ইতিহাস হয়ে ওঠে যে দিন
বঙ্গাব্দ ১৩৩১, ফাগুন মাসের পূর্ণিমা—দোলযাত্রা। দিনটি কেবল একটি ধর্মীয় বা ঋতুকালীন উৎসব ছিল না, বরং সেইদিন হিমাইতপুর পরমতীর্থে এক অনন্য অধ্যায় সূচিত হয়েছিল—শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রকে কেন্দ্র করে প্রেম, ভক্তি ও রঙের উৎসবের। সাধকপ্রবর মহারাজ অনন্তনাথ রায়, যিনি শ্রীশ্রীঠাকুরের প্রিয়তম লীলাপার্ষদদের অন্যতম, সেই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে চাইলেন মহাপ্রভুর নবকলেবর, শ্রীশ্রীঠাকুরকে রাঙিয়ে দিয়ে।
দোল উৎসবের আয়োজনের খবর ছড়িয়ে পড়ল আশ্রমমণ্ডলে—গোঁসাইদা, কিশোরীমোহনদা, হেমকবি এবং অনেকে পরম উৎসাহে যোগ দিলেন। পদ্মার ধারে বাবলা গাছের ডালে কাপড় বেঁধে তৈরী হল দোলমঞ্চ, যেখানে ঠাকুরের প্রতিকৃতি এবং সরকার সাহেবের প্রতিকৃতি একত্রে স্থাপন করা হলো।
।শ্রীমায়ের সম্মতি ও শ্রীশ্রীঠাকুরের অভিষিক্ত রূপ
।
এই আয়োজনের কথা জানাতে মহারাজ গিয়েছিলেন শ্রীমায়ের কাছে। মাতৃসম্মতিতে তিনি ঠাকুরের কাছে গিয়ে প্রার্থনা করেন: “ঠাকুর, আপনার দোল উৎসবের আয়োজন হয়েছে। আপনাকে মঞ্চে বসিয়ে সকলে সমবেত প্রার্থনা করি, এই আমাদের কামনা।”
এই প্রার্থনায় সম্মতি দিয়েই শুরু হয় হিমাইতপুরে শ্রীশ্রীঠাকুরকে কেন্দ্র করে দোল উৎসবের সূচনা। শুধু প্রথাগত আয়োজন নয়, এটি হয়ে ওঠে অন্তরভরা প্রেম ও ভক্তির বিস্ফোরণ—যেখানে রঙ ছিল ভক্তির বাহন, আবির ছিল আত্মিক অনুরাগের প্রতীক।
।ঠাকুরের দোল: প্রণামের প্রাচুর্য, রঙের উচ্ছ্বাস।
উৎসবের দিনে শ্রীশ্রীঠাকুর প্রথমে তাঁর স্বর্গীয় পিতৃদেবের প্রতিকৃতির পায়ে, এরপর শ্রীমায়ের পায়ে আবির অর্পণ করে প্রণাম করেন। তারপর হুজুর মহারাজ ও সরকার সাহেবের প্রতিকৃতিকে প্রণাম করে দোলনায় বড়মাকে পাশে নিয়ে বসেন।
ভক্তরা একে একে সারিবদ্ধভাবে এসে ঠাকুরের পায়ে আবির দিয়ে প্রণাম করতেন।
এই দৃশ্যই কবি হেমচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের বিখ্যাত গানটির উৎস:
“ধন্য হল দ্বাপর লীলা ফাগ দিয়ে আজ তোমার পায় কি দেব যে তোমায় মানায় প্রণাম যেথা লজ্জা পায়।। মধু মাসে মধুর খেলা আজ আমাদের মধু উৎসব পদ্মাতীরে বাবলা তলার প্রাঙ্গণে আজ মিলেছি সব।।”
এই গান আজও হিমাইতপুরের দোল উৎসবে অনুরণিত হয়, যেন চেতনায় রঙ ছড়িয়ে দেয় সেই ঐতিহাসিক প্রথম দিনের অনুভব।
।দোল খেলার প্রাণপ্রবাহ ও ঠাকুরের লীলা।
দোলের রঙ খেলার এই উৎসব ছিল উদ্দাম, প্রাণময় এবং অলঙ্ঘনীয়। কারও রঙের ভয়, কারও গোপন লুকানো, কিছুই কাজে আসত না। মহারাজ দরজার খিল ভেঙে ঘরের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সঙ্গীকেও রঙ মাখিয়ে দিতেন। পরে তিনিই সেই দরজার মেরামতের ব্যবস্থা করতেন—এক অনুপম লীলারশ্মি।
।পদ্মার জলে ঐশ্বরিক স্নান: চক্রব্যূহ ও পরমপুরুষ।
রঙের খেলা শেষে সকলেই ছুটে যেতেন পদ্মার জলে স্নানে। আশ্রমিক যুবকেরা চক্রাকারে ব্যুহ রচনা করত এবং সেই ব্যুহের কেন্দ্রে শ্রীশ্রীঠাকুর, স্নিগ্ধ, সৌম্য, দিব্য রূপে সানন্দে স্নান করতেন।
চক্রব্যুহের বাইরে আশ্রমবাসীরা একে অপরকে জল ছিটিয়ে ভিজিয়ে দিতেন—রঙের রেশ যেন জলে ছড়িয়ে পড়ত। পদ্মার জলে তখন রঙের ঝিলিক—“রঙে রঙিন পদ্মা!”
।উৎসবের সমাপ্তি ও চিরন্তন রেশ।
স্নান শেষে সবাই মিলে শুকনো পোশাক পরে আনন্দবাজারে প্রসাদ গ্রহণে বসতেন। উৎসব শেষ হলেও তার জ্যোতি, তার অনুরণন মুছে যেত না, বরং হৃদয়ে গেঁথে থাকত।
এই উৎসবের মূলকেন্দ্র ছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর। তিনি আমাদের জীবনের মূর্ত উৎসব, যাঁর জীবনে সকল রঙের উৎসার, যিনি বিবর্ণ জীবনেও রামধনুর রঙ ছড়িয়ে দেন প্রেমে, উৎসবে, আনন্দে।
উপসংহার
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রকে কেন্দ্র করে দোল উৎসব কেবল একটি ধর্মীয় আচরণ নয়, বরং তা ঈশ্বরীয় প্রেমের প্রকাশ, গুরুপ্রেমে আত্মবিসর্জনের প্রতীক। হিমাইতপুরধামে এই উৎসব আজও একই প্রেরণা নিয়ে পালন হয়। ঠাকুরের সেই প্রেমময় রঙ আজও তাঁর ভক্তের হৃদয় রাঙিয়ে তোলে।
সূত্র:
• পুরুষোত্তম লীলাপার্ষদ মহারাজ অনন্তনাথ, মাতৃস্মৃতি
• হেমচন্দ্র মুখোপাধ্যায় (হেমকবি), দোল উপলক্ষে রচিত গান।।
• ------------------------------------------------------------------
✍️ নিবেদক— ইষ্টভক্ত এক অন্বেষণপ্রবণ অন্তরাত্মা পরিমল দাস, সৎসঙ্গ। শনিবার, ১০ই মে, ২০২৫। ২৭শে বৈশাখ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ। অনুকূল অব্দ: ১৩৭।