22/12/2024
আসসালামু আলাইকুম
আজ ২২ ডিসেম্বর ২০২৪ ইং, রবিবার
২১ জুমাদিউল সানি,১৪৪৬....
আজকের আলোচ্য বিষয়: ইসলামের দ্বিতীয় মৌলিক বিষয় হচ্ছে আল্লাহ তাআলার ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস।
নিচে তা নিয়ে আলোচনা করা হলো ও তার সম্পূর্ণভাবে পড়ার অনুরোধ করা হলো::
((Part-3))
ফেরেশতাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় হলেন জিবরীল আলাইহিস সালাম। তিনি অহীর দায়িত্বশীল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَإِنَّهُ لَتَنزِيلُ رَبِّ الْعَالَمِينَ نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الْأَمِينُ عَلَىٰ قَلْبِكَ لِتَكُونَ مِنَ الْمُنذِرِينَ بِلِسَانٍ عَرَبِيٍّ مُّبِينٍ﴾
‘‘এটি রববুল আলামীনের নাযিল করা কিতাব। একে নিয়ে আমানতদার রূহ অবতরণ করেছে তোমার হৃদয়ে, যাতে তুমি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হও। পরিস্কার আরবী ভাষায়’’। (সূরা শুআরা: ১৯২-১৯৫) আল্লাহ তা‘আলা সূরা নাহালের ১০২ নং আয়াতে আরো বলেন,
﴿قُلْ نَزَّلَهُ رُوحُ الْقُدُسِ مِن رَّبِّكَ بِالْحَقِّ ﴾‘‘বলো, একে তো রূহুল কুদুছ সত্যসহকারে তোমার রবের পক্ষ থেকে পর্যায়ক্রমে নাযিল করেছে’’।
আল্লাহ তা‘আলা ফেরেশতাদেরকে বিভিন্ন আকার-আকৃতি ধারণ করার ক্ষমতা দিয়েছেন। তারা ইবরাহীম ও লুত আলাইহিস সালামের নিকট মেহমানের বেশে আগমন করেছিলেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট জিবরীল আসতেন বিভিন্ন আকৃতিতে। কখনো আসতেন দিহইয়া কালবীর আকৃতিতে, কখনো আসতেন গ্রাম্য লোকের আকৃতিতে আবার কখনো আসতেন তার আসল আকৃতিতে যেভাবে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে সেভাবেই। দু’বার এমনটি হয়েছিল। জিবরীল অন্য আকৃতিতে আসার কারণ হলো, মানুষ ফেরেশতাদেরকে আসল আকৃতিতে দেখার ক্ষমতা রাখে না। মুশরিকরা যখন আবেদন করেছিল, আল্লাহ তা‘আলা যেন তাদের কাছে ফেরেশতা পাঠান, তখন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
﴿وَقَالُوا لَوْلَا أُنزِلَ عَلَيْهِ مَلَكٌ وَلَوْ أَنزَلْنَا مَلَكًا لَّقُضِيَ الْأَمْرُ ثُمَّ لَا يُنظَرُونَ وَلَوْ جَعَلْنَاهُ مَلَكًا لَّجَعَلْنَاهُ رَجُلًا وَلَلَبَسْنَا عَلَيْهِم مَّا يَلْبِسُونَ﴾
তারা বলে, তার কাছে ফেরেশতা পাঠানো হয় না কেন? যদি ফেরেশতা পাঠাতাম, তাহলে ফায়সালা হয়ে যেতো, তখন তাদেরকে আর কোনো অবকাশই দেয়া হতোনা। যদি ফেরেশতা পাঠাতাম তাহলেও তাকে মানুষের আকৃতিতেই পাঠাতাম এবং তাদেরকে ঠিক তেমনি সংশয়ে লিপ্ত করতাম যেমন তারা এখন লিপ্ত রয়েছে (সূরা আল আনআম: ৮-৯)
অর্থাৎ মানুষের কাছে যদি ফেরেশতা রসূল পাঠাতাম, তাহলে ফেরেশতা মানুষের আকৃতিতেই আসতেন। যাতে করে মানুষেরা তার সাথে কথা বলতে পারে এবং তার কাছ থেকে আল্লাহ তা‘আলার বাণী গ্রহণ করে উপকৃত হতে পারে। কেননা প্রত্যেক প্রকার সৃষ্টিই সমজাতীয় সৃষ্টির সাথে মিশতে পারে, ঘনিষ্টতা ও সখ্যতা তৈরী করতে অভ্যস্ত এবং অন্য প্রকৃতির সৃষ্টি থেকে দূরে সরে যায়। ফেরেশতা সম্পর্কে এতটুকু আলোচনাকেই যথেষ্ট মনে করছি। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে বুঝার তাওফীক দিন। আমীন।
‘‘যা কিছু মানুষের সামনে আছে তা তিনি জানেন এবং যা কিছু তাদের অগোচরে আছে সে সম্পর্কেও তিনি অবগত’’। (সূরা বাকারা: ২৫৫) আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, ﴿وَلَا يَشْفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ارْتَضَى وَهُمْ مِنْ خَشْيَتِهِ مُشْفِقُونَ﴾ ‘‘যাদের পক্ষে সুপারিশ শুনতে আল্লাহ সম্মত তাদের পক্ষে ছাড়া আর কারো সুপারিশ তারা করে না এবং তারা তাঁর ভয়ে থাকে ভীত-সন্ত্রস্ত’’। (সূরা আন্বীয়া: ২৮) আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,﴿يَخَافُونَ رَبَّهُمْ مِنْ فَوْقِهِمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ﴾ ‘‘তারা ভয় করে নিজেদের রবকে যিনি তাদের উপরে আছেন এবং যা কিছু হুকুম দেয়া হয় তারা তাই করে’’। (সূরা নাহাল: ৫০)
সুতরাং ফেরেশতারা হচ্ছেন আল্লাহর সম্মানিত বান্দা। তাদের মধ্যে কতক ফেরেশতা সারিবদ্ধভাবে দন্ডায়মান। কেউবা তাসবীহ পাঠে মশগুল। তাদের প্রত্যেকের জন্যই রয়েছে সুনির্দিষ্ট দাড়াবার স্থান। তিনি তা অতিক্রম করতে পারেন না। তিনি আদিষ্ট কর্মে ব্যস্ত রয়েছেন। সেই কাজ করতে কোন প্রকার ত্রুটি করেন না এবং তাঁকে যেই কাজের আদেশ করা হয়েছে, তার সীমাও লংঘন করেন না। যারা আল্লাহর নিকটবর্তী, তাদের মর্যাদা সর্বোচ্চ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,﴿لَا يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِهِ وَلَا يَسْتَحْسِرُونَ يُسَبِّحُونَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ لَا يَفْتُرُونَ﴾ ‘‘তারা নিজেদেরকে বড় মনে করে তাঁর এবাদত থেকে বিমুখ হয় না এবং না ক্লান্ত হয়। দিনরাত তাঁর প্রশংসা ও মহিমা ঘোষণা করতে থাকেন, বিরাম বা বিশ্রাম নেন না’’। (সূরা আম্বীয়া: ১৯-২০)
ফেরেশতাদের প্রধান ও নেতা হলেন তিনজন। জিবরীল, মীকাঈল এবং ইসরাফীল। তারা সকল মানুষ, প্রাণী, জীব ও উদ্ভিদের হায়াতের দায়িত্বপ্রাপ্ত। জিবরীল (আঃ) অহীর দায়িত্বপ্রাপ্ত। অহীর মাধ্যমেই রূহ এবং অন্তর জীবিত হয়। মিকাঈল বৃষ্টির দায়িত্বপ্রাপ্ত। বৃষ্টির মাধ্যমে যমীন, উদ্ভিদ এবং প্রাণী জগৎ জীবিত হয়। ইসরাফীল শিঙ্গায় ফুৎকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত। এর মাধ্যমে সৃষ্টি মৃত্যুর পর পুনঃজীবন ফেরত পাবে। সুতরাং ফেরেশতারা হচ্ছে আল্লাহর সৃষ্টি ও আদেশের ক্ষেত্রে আল্লাহর দূত। তারা তাঁর মাঝে এবং তাঁর বান্দাদের মাঝে দূত স্বরূপ। তারা আল্লাহর নিকট থেকে সৃষ্টি জগতের সকল প্রামেত্ম তাঁর আদেশ ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে অবতরণ করে এবং তাঁর নিকট উন্নীত হয়। ফেরেশতাদের ভারে আসমানসমূহ কড়কড় আওয়াজ করে। আওয়াজ করাই এগুলোর জন্য সমীচিন। আসমানে চার আঙ্গুল পরিমাণ জায়গাও খালী নেই, যাতে কোনো না কোনো ফেরেশতা দাঁড়িয়ে, কিংবা রুকু অবস্থায় অথবা সিজদারত অবস্থায় আল্লাহর এবাদতে মশগুল নয়। প্রতিদিন সত্তর হাজার ফেরেশতা বাইতুল মা’মুরে প্রবেশ করে। তাদের কেউ সেটাতে দ্বিতীয়বার প্রবেশের সুযোগ পাবে না। কুরআন মজীদ বিভিন্ন প্রকার ফেরেশতা এবং তাদের বিভিন্ন পদ মর্যাদার আলোচনায় ভরপূর। কোথাও কোথাও আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নামের সাথে ফেরেশতার নাম যুক্ত করে উল্লেখ করেছেন এবং আল্লাহর সালাতকে ফেরেশতাদের সালাতের সাথে মিলিয়ে উল্লেখ করেছেন। আবার কখনো কখনো সম্মান জনক স্থানের দিকে তাদেরকে সম্বোধিত করেছেন। আবার কখনো উল্লেখ করেছেন যে, ফেরেশতারা আরশকে ঘিরে আছে এবং তারা আরশ বহন করে আছে। আবার কখনো উল্লেখ করা হয়েছে যে, তারা পাপ কাজ করা হতে মুক্ত। কখনো বলা হয়েছে যে, তারা সম্মানিত, নৈকট্যশীল, তারা উপরে উঠে, তারা পবিত্র, শক্তিধর এবং একনিষ্ঠ। (আল্লাহ তা‘আলাই সর্বাধিক অবগত রয়েছেন)
[3]. সহীহ মুসলিম, হা/২৬৪৩, তিরমিযী, হা/২১৩৭, সহীহ।
[4] . এর অর্থ এও হতে পারে যে ফেরেশতারা মহান আল্লাহ তা‘আলা ও নবী-রাসূলদের মধ্যে বার্তা পৌঁছাবার কাজ করেন। সে হিসাবে তারা আল্লাহর দূত। আবার এ অর্থও হতে পারে যে, সমগ্র বিশ্ব-জাহানে মহাশক্তির অধিকারী আল্লাহর বিধান নিয়ে যাওয়া এবং সেগুলো প্রবর্তন করা ফেরেশতাদেরই কাজ। এ কথা উল্লেখ করার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ফেরেশতাদেরকে মুশরিকরা দেব-দেবীতে পরিণত করেছিল অথচ এদের মর্যাদা এক আল্লাহর একান্ত অনুগত খাদেমের চেয়ে মোটেই বেশি নয়। বাদশাহর খাদেমরা যেমন তার হুকুম তামিল করার জন্য দৌড়াদৌড়ি করে থাকে ঠিক তেমনি এ ফেরেশতারাও বিশ্ব-জাহানের প্রকৃত শাসনকর্তার হুকুম পালন করার জন্য উড়ে চলতে থাকেন। এ খাদেমদের কোনো ক্ষমতা নেই। সমস্ত ক্ষমতা রয়েছে আসল শাসনকর্তার হাতে। আল্লাহ তা‘আলাই সর্বাধিক অবগত রয়েছেন।
[5]. ফেরেশতাদের হাত ও ডানার অবস্থা ও ধরণ জানার কোনো মাধ্যম আমাদের কাছে নেই। কিন্তু এর অবস্থা ও ধরণ বর্ণনা করার জন্য আল্লাহ যখন এমন শব্দ ব্যবহার করেছেন যা মানুষের ভাষায় পাখিদের হাত ও ডানার জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে তখন অবশ্যই আমাদের ভাষার এ শব্দকেই আসল অবস্থা ও ধরণ বর্ণনার নিকটতর বলে ধারণা করা যেতে পারে। দুই দুই, তিন তিন ও চার চার ডানার কথা বলা থেকে বুঝা যায় যে, বিভিন্ন ফেরেশতাকে আল্লাহ বিভিন্ন রকম শক্তি দান করেছেন এবং যাকে দিয়ে যে কাজ করতে চান তাকে সেরকম দ্রুতগতি ও কর্মশক্তি দান করেছেন।