05/04/2026
এই ম্যাপটা ভালোভাবে বুঝলে সীরাতের অন্তত ২০% ক্লিয়ারলি বুঝতে পারবেন!
আবরাহা এসেছিলো কাবা আক্রমণ করতে। কিন্তু, তার সেই ইচ্ছেপূরণ হয়নি। আল্লাহ আবাবিল পাঠিয়ে আবরাহার বাহিনীকে পরাজিত করেন।
আবরাহা কেনো এসেছিলো মক্কা আক্রমণ করতে? এটার পেছনে অন্যতম কারণ ছিলো ব্যবসা-বাণিজ্য।
আবরাহা দেখতে পায় মানুষজন মক্কায় যাচ্ছে, মক্কাবাসী সহজেই ব্যবসা করতে পারছে, মক্কা পরিণত হয়েছে সেই সময়ের অন্যতম ট্রেড সেন্টারে; যদিও মক্কায় ব্যবসা করার মতো কিছু নেই। তাহলে কী কারণে মক্কা এতো সমৃদ্ধ? সে খুঁজে বের করে, এটার অন্যতম কারণ কাবা।
তখন সে কাবার মতো ‘আল-কুল্লাইস’ গীর্জা নির্মাণ করে। কিন্তু, তার সেই উদ্দেশ্য পূরণ হয়নি।
আবরাহা কাবা আক্রমণ করতে আসে ইয়েমেন থেকে। মানচিত্রে আমরা ইয়েমেন থেকে মক্কার দূরত্ব দেখতে পাচ্ছি।
এই ঘটনা আছে ‘সূরা ফিল’ –এ।
এরপরের সূরায় আছে মক্কাবাসী বছরে দুটো ব্যবসা করতো। একটা শীতকালে, আরেকটা গ্রীষ্মকালে। শীতকালে তারা যেতো ইয়েমেন, গ্রীষ্মকালে তারা যেতো সিরিয়া।
এখন লেখাটি পড়া থামিয়ে মানচিত্রটা আবার দেখুন। মানচিত্রের একেবারে উপরে, উত্তরে সিরিয়া, দক্ষিণে ইয়েমেন।
আবরাহার বাহিনীর পরাজয় ঘটে। তারপরও মক্কাবাসী কীভাবে ইয়েমেন যেতো ব্যবসা করতে? মাত্র আবরাহার বাহিনী পরাজিত হলো, আবার কোন সাহসে মক্কা থেকে ব্যবসায়ীরা ইয়েমেন যাবে?
দুটো কারণ।
আবরাহার বাহিনীর শোচনীয় পরাজয়ের ফলে মক্কাবাসীকে অন্যান্য আরব গোত্র সমীহ করা শুরু করে; আগের চেয়ে বেশি।
দ্বিতীয়ত, আবরাহার পরাজয়ের পরপর ইয়েমেনে আবরাহার শাসনের অবসান ঘটে। তার দুই ছেলে ইয়াকসুম ও মাসরুক পরবর্তীতে কিছুদিন শাসন করলে তার সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।
সেই যুগে ইয়েমেন ছিলো মূলত তৎকালীন পরাশক্তিগুলোর বলয়ের মধ্যে। বর্তমানে যেমন আমেরিকা-রাশিয়ার বলয়ের মধ্যে দেশগুলো থাকে, তখন ইয়েমেন ছিলো রোমান-পারস্যের। আবরাহা ছিলো রোমানদের প্রতি অনুগত; এখনকার অনেক দেশ যেমন আমেরিকার প্রতি। কিন্তু, কিছুদিনের মধ্যে ইয়েমেন চলে যায় পারস্যের বলয়ে, যেটার মূল প্রভাবক ছিলো সাইফ ইবনে যি ইয়াযান।
বর্তমান পরাশক্তিগুলো কী করে? তাদের পছন্দের নেতাকে প্রধানমন্ত্রী/প্রেসিডেন্ট হতে সাহায্য করে। তৎকালেও এর ব্যতিক্রম ছিলো না। ইয়েমেন সেটার অন্যতম উদাহরণ।
মক্কাবাসী আবরাহার আগে-পরে দুই সময়ই ব্যবসা করতে পারে খুব সহজেই। ইয়েমেন ছিলো তখন এশিয়ার অন্যতম মার্কেটপ্লেস, সিরিয়া ছিলো সেই যুগের প্রেক্ষিতে ইউরোপের। কুরাইশরা ইয়েমেনের পণ্য নিয়ে যেতো সিরিয়ায়, সিরিয়ার পণ্য নিয়ে আসতো ইয়েমেন। মক্কার নিজস্ব কোনো প্রোডাক্ট ছিলো না, কৃষি বা শিল্পও ছিলো না।
সেই যুগে সিরিয়া-পারস্যের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিলো, যেমনটা বর্তমান সময়ের পরাশক্তিগুলোর মধ্যে থাকে।
যখনই যুদ্ধ শুরু হতো, সবার ব্যবসা বন্ধ। কিন্তু, কুরাইশরা তখন ব্যবসা করতে পারতো। কেউ তাদেরকে বিরক্ত করতো না।
দুটো কারণে। একটা হলো তারা কাবার তত্ত্বাবধায়ক, আরেকটা হলো ‘ইলাফ’; যেটা সূরা কুরাইশের প্রথম আয়াতে আল্লাহ উল্লেখ করেন। আব্দে মানাফের ৪ ছেলে তৎকালীন সুপারপাওয়ার সিরিয়া, ইয়েমেন, পারস্য, আবিসিনিয়ার সাথে বাণিজ্য চুক্তি করে।
বর্তমানে যুদ্ধের কারণে পুরো বিশ্বে সেটার প্রভাব পড়েছে। কিন্তু, তখন যুদ্ধ হলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হতো কুরাইশরা।
কুরাইশদের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক হাব ছিলো সিরিয়া। এমনিতেই তো সেটা ঐ সময়ের ‘আমেরিকা’। বছরের সবচেয়ে বড় প্রফিট আসতো গ্রীষ্মকালে।
এখন ম্যাপটা আবার দেখুন। মক্কাবাসী যদি সিরিয়ায় যেতে চায়, তাহলে কিন্তু তাদেরকে মদীনার পাশ দিয়েই যেতে হবে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং প্রায় ৫০০ সাহাবী মদীনায় হিজরত করেন নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে, সমস্ত সম্পদ মক্কায় রেখে।
এখন কুরাইশরা যদি সিরিয়ায় ব্যবসা করতে যায়, তারা স্বাভাবিকভাবেই বাধার শিকার হবে। তাদের কারণেই তো মুসলিমরা ঘর ছাড়া।
মদীনায় যাবার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাত্র ৬ মাসের মধ্যে মদীনাকে গুছিয়ে ফেলেন। যখন মদীনা আভ্যন্তরীণ দিক দিয়ে শক্তিশালী, তখন রাসূলুল্লাহ কুরাইশদের ব্লাডলাইন, অর্থাৎ অর্থনীতির দিকে হাত দিলেন।
সিরিয়ার সাথে মক্কার যে বাণিজ্য, সেটা তিনি বন্ধ করতে চাইলেন।
বদর যুদ্ধের আগে ৮টা অভিযানের ফলে কুরাইশদের বাণিজ্য হুমকির মুখে পড়ে। বদর যুদ্ধে পরাজয়ের পর কুরাইশদের সবচেয়ে বড় মার্কেট (সিরিয়া) হাতছাড়া হয়ে যায়!
এই প্রেক্ষাপটে আপনি বর্তমানে ‘হরমোজ প্রণালী’ এবং বর্তমান যুদ্ধ ব্যবস্থা, যুদ্ধ অর্থনীতি সামনে রেখে সীরাত পড়ুন, দেখবেন সীরাতকে জীবন্ত মনে হবে।