27/08/2026
🔥 ১৯১৮—মদিনার শেষ প্রহরী ফখরুদ্দীন পাশা!
সাল ১৯১৮, বসন্তের কোন এক জুমাবার। মসজিদে নববীতে সালাত শেষে ফখরুদ্দীন পাশা রাসূল ﷺ-এর রওজা মুবারকের দিকে মুখ করে উচ্চকণ্ঠে দৃঢ়ভাবে বললেন—
“ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনাকে আমি কখনো ছেড়ে যাব না।”
ওমর ফখরুদ্দীন পাশা—তিনি ছিলেন একজন অটোম্যান সেনানায়ক এবং মদিনার শেষ উসমানীয় গভর্নর (১৯১৬–১৯১৯)। ইতিহাসে যিনি অমর হয়ে আছেন “Defender of Medina”, অর্থাৎ মদিনার মুহাফিজ হিসেবে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তিনি জীবনের সবটুকু দিয়ে মদিনাকে রক্ষা করে গিয়েছিলেন। তাঁর অসাধারণ দৃঢ়তা ও সামরিক নেতৃত্বের কারণে ব্রিটিশ মহলেও তিনি পরিচিত হন “Tiger of the Desert” নামে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯১৬ সালের ২৩ মে জামাল পাশার আদেশে তিনি মদিনার প্রতিরক্ষার উদ্দেশ্যে হেজাজে রওয়ানা হন। ১৭ জুলাই তাকে হেজাজ এক্সপেডিশনারি ফোর্সের কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।
ফখরুদ্দীন পাশাকে বিদ্রোহীরা ঘিরে ফেললেও তিনি কঠোরভাবে পবিত্র শহরের প্রতিরক্ষা করে যান। মদিনার প্রতিরক্ষার পাশাপাশি তাকে হেজাজ রেলপথ সুরক্ষার বিষয়টিও দেখতে হতো। টি. ই. লরেন্স ও তার আরব বিদ্রোহী বাহিনী বারবার এই রেলপথে আক্রমণ চালাচ্ছিল।
মদিনা তখন কার্যত অবরুদ্ধ।
রসদ কমে আসছে। সৈন্যদের অবস্থা কঠিন। চারদিক থেকে চাপ বাড়ছে। কিন্তু ফখরুদ্দীন পাশা মদিনা ছাড়তে রাজি নন।
উসমানীয় ও ব্রিটিশ-সমর্থিত আরব বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর সবাই আশা করছিল—এইবার হয়তো ফখরুদ্দীন পাশা আত্মসমর্পণ করবেন।
কিন্তু তিনি তা করতে অস্বীকৃতি জানান।
তিনি বলেছিলেন, তিনি একটি স্বপ্ন দেখেছেন—যেখানে মুহাম্মদ ﷺ তাকে আত্মসমর্পণ না করার নির্দেশ দিয়েছেন।
১৯১৮ সালের আগস্টে শরিফ হুসাইন বিন আলী তাকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানান। এমনকি উসমানীয় যুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকে সরাসরি আদেশ আসার পরও তিনি তলোয়ার ফেলে দিতে অস্বীকৃতি জানান।
তার এই অবস্থানে উসমানীয় সরকারও বিচলিত হয়ে পড়ে। সুলতান ষষ্ঠ মুহাম্মদ তাকে পদচ্যুত করেন। কিন্তু ফখরুদ্দীন পাশা আদেশ মানতে অস্বীকার করেন এবং যুদ্ধ শেষ হওয়ার ৭২ দিন পর পর্যন্ত মদিনায় উসমানীয় পতাকা সমুন্নত রাখেন।
তারপরও তিনি মদিনা ছাড়তে চাননি।
ঐ জুম'আয় সৈনিকদের উদ্দেশ্যে তাঁর দেয়া ভাষণ আজও ইতিহাসে স্মরণীয়—
“ওহে সৈনিকেরা! নবীকে সাক্ষী রেখে আমি তোমাদের প্রতি আরজ করছি। আমি আদেশ দিচ্ছি—শেষ গুলি ও শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত নবী ও তাঁর শহরকে রক্ষা করতে; শত্রুসংখ্যা যা-ই হোক না কেন। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করুন এবং মুহাম্মদ ﷺ-এর দুআ যাতে আমাদের সাথে থাকে।”
আরও বলেছিলেন—
“তুর্কির বীর সেনা অফিসাররা! মুহাম্মদের উত্তরসুরীরা! এগিয়ে আস, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সামনে নিজেদের জীবনের বিনিময়ে তোমাদের ঈমানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওয়াদা দাও।”
ফখরুদ্দীন পাশা প্রকৃতপক্ষেই ছিলেন একজন নবিপ্রেমিক।
তিনি জানতেন—যুদ্ধ শুধু একটি ভূখণ্ডের জন্য নয়।
এটি ছিল মদিনার জন্য।
রাসূল ﷺ-এর শহরের জন্য।
আর সেই কারণেই তাঁর নাম মুসলিম ইতিহাসের এক বিশেষ অধ্যায়ে চিরকাল লেখা থাকবে।
⚠️ আর ইতিহাসের আরেকটি কঠিন অধ্যায়—যেটি ভুলে গেলে চলবে না
ফখরুদ্দীন পাশা যখন মদিনা রক্ষায় ব্রিটিশ-সমর্থিত আরব বিদ্রোহের বিরুদ্ধে লড়ছিলেন, তখন একই সময়ে নজদভিত্তিক ইবন সৌদপন্থী শক্তির সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। প্রমাণ হিসেবে ব্রিটিশদের নিজেদের আর্কাইভের দলিল দেখুন।
১৯১৫ সালের Darin Treaty-এর মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার ইবন সৌদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি করে। ব্রিটিশ লাইব্রেরির সংরক্ষিত নথিতে এই চুক্তির পাশাপাশি ইবন সৌদের জন্য ব্রিটিশ ভর্তুকি, রাইফেল ও গোলাবারুদ সরবরাহের রসিদ পর্যন্ত রয়েছে।
আরও বিস্ময়কর বিষয়—ব্রিটিশ সরকারি নথিতে ইবন সৌদের জন্য মাসে £5,000 ভর্তুকি প্রদানের প্রস্তাব ও অর্থপ্রদানের কাগজপত্র সংরক্ষিত আছে।
১৯১৬ সালের একটি ব্রিটিশ নথিতে আবার দেখা যায়—ইবন সৌদের কাছে ৪টি মেশিনগান এবং ১,০০০ রাইফেল সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং একই সঙ্গে মাসিক £5,000 ভর্তুকির বিষয়টিও অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছিল।
এগুলো কোনো গুজব নয়।
British Library-এর India Office Records-এর নথি।
এমনকি ব্রিটিশ আর্কাইভে পরবর্তী সময়ের Ikhwan বাহিনী ও ব্রিটিশ সরকারের সম্পর্ক, ইবন সৌদের ভর্তুকি এবং ইখওয়ানের অভিযান নিয়েও আলাদা নথি রয়েছে।
অর্থাৎ ইতিহাসের ছবিটা অনেক বেশি জটিল।
একদিকে—
ফখরুদ্দীন পাশা → মদিনা রক্ষায় অবিচল।
অন্যদিকে—
ব্রিটিশ সাম্রাজ্য → উসমানীয় শক্তিকে দুর্বল করতে আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক ও অর্থ-অস্ত্রের লেনদেন করছে।
তাই আজ যারা ইতিহাসের একটি অংশ লুকিয়ে রেখে শুধু নিজেদের পছন্দের বর্ণনা প্রচার করে, তাদের কাছে প্রশ্ন করা দরকার—
মদিনা যখন অবরুদ্ধ, তখন কারা কার পাশে ছিল?
কারা ব্রিটিশদের সঙ্গে চুক্তি করেছিল?
কারা ব্রিটিশ অর্থ ও অস্ত্র পেয়েছিল?
আর সবচেয়ে বড় কথা—
মদিনার সেই অবরোধের ইতিহাস আমরা কেন ভুলে যাব?
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি—“সব ওহাবি” বা “সব আরব”কে একই রাজনৈতিক পক্ষ হিসেবে দেখানো ইতিহাসসম্মত নয়। এখানে আলোচনার বিষয় হলো নজদভিত্তিক ইবন সৌদপন্থী শক্তি, তাদের ইখওয়ান বাহিনী এবং ব্রিটিশ সরকারের নথিভুক্ত সম্পর্ক।
ইতিহাসকে অন্ধ ভক্তি দিয়ে নয়—দলিল দিয়ে পড়ুন।
কারণ দলিল যখন কথা বলে, তখন ইতিহাসের অনেক মুখোশ নিজেই খুলে যায়।
ফখরুদ্দীন পাশা ১৯৪৮ সালের ২২ নভেম্বর ইস্তাম্বুলে ৮০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
আজও তাঁর নাম উচ্চারিত হয়—
মদিনার মুহাফিজ ফখরুদ্দীন পাশা।
যে মানুষটি মদিনা ছেড়ে যেতে চাননি।
যে মানুষটি বলেছিলেন—
“ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনাকে আমি কখনো ছেড়ে যাবনা তথ্যসূত্র
১. British Library – India Office Records
IOR/R/15/2/32 — British relations with Ibn Saud; Darin Treaty, ব্রিটিশ ভর্তুকি এবং ইবন সৌদের কাছে রাইফেল ও গোলাবারুদ সরবরাহের রসিদ সংরক্ষিত আছে।
২. British Library – India Office Records
IOR/L/PS/10/390/1 — Arabia Policy towards Bin Saud; ইবন সৌদ, ইখওয়ান, হিজাজ এবং মদিনায় উসমানীয় বাহিনীর আত্মসমর্পণ-সংক্রান্ত ব্রিটিশ নথি।
৩. British Library – India Office Records
IOR/R/15/2/34 — Ibn Saud; ইবন সৌদের সঙ্গে ব্রিটিশ সম্পর্ক, ভর্তুকি এবং ইখওয়ান আন্দোলন সম্পর্কিত নথি।
৪. British Library – India Office Records
IOR/L/PS/10/1155 — Arabia: Printed Correspondence 1924–28; ব্রিটিশ-ইবন সৌদ সম্পর্ক, ওয়াহাবি বাহিনী/ইখওয়ান এবং হিজাজের রাজনৈতিক পরিস্থিতির নথি।
৫. Darin Treaty, 1915
ব্রিটিশ সরকার ও আবদুলআজিজ ইবন সৌদের মধ্যে ২৬ ডিসেম্বর ১৯১৫ সালের চুক্তি। চুক্তিতে ব্রিটেন ইবন সৌদের শাসনকে স্বীকৃতি দেয় এবং বিদেশি শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ পরামর্শ গ্রহণের বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। �
Wikisource +1
৬. Qatar Digital Library / British India Office Records
Ibn Saud Treaty Negotiations, 1926–1930 — ব্রিটিশ সরকার ও ইবন সৌদের মধ্যকার পরবর্তী চুক্তি ও কূটনৈতিক যোগাযোগের নথি। �
QDL
৭. British Library – India Office Records
IOR/R/15/5/24–42 — ইবন সৌদ, হিজাজ, মক্কা-মদিনা দখল এবং ইখওয়ান-সংক্রান্ত ব্রিটিশ নথিপত্র। �