সুফী-Sufi

সুফী-Sufi মুজাদ্দেদি ও অনান্য তরিকা সমুহের উল্লেখযোগ্য বিষয় সমুহের সংগ্রহীত আলোচনা।

20/07/2026

** হযরত খাজা বাকি বিল্লাহ (রা)- এর মূল্যবান বাণী**

১. তিনি বলেন, যদি কোনো তরিকতের সালিক গোনাহের মধ্যে লিপ্ত থাকে কিংবা দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণ বোধ করে তাহলে এর এক বা একাধিক কারণ হলো:
১. সে নিজেকে যা-ই প্রাপ্ত হচ্ছে তার দ্বারা তৃপ্তিবোধ করে না।
২. সে জনতার সঙ্গে বেশি মেলামেশা করে।
৩. সে আল্লাহর জিকির থেকে গাফিল আছে।
৪. সে আল্লাহর নিকট থেকে এমন কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করছে যা গাইরুল্লাহর অন্তর্ভুক্ত।
৫. সে তার নফসের বিরুদ্ধে মুজাহাদায় লিপ্ত নয়।
৬. সে শরীয়তের চিরন্তন আইন-কানুন পুরোপুরি গ্রহণ করে নি।

30/05/2026

সালাত ও তার স্তর সম্পর্কে ইমাম গাজ্জালী র ভাবনা

আপনি বছরের পর বছর ধরে নামাজ পড়ছেন—প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত, হাজার হাজার নামাজ। কিন্তু ইমাম গাজ্জালী শিক্ষা দিয়েছিলেন যে অধিকাংশ মুসলিম কখনও নামাজের প্রথম স্তর অতিক্রম করতে পারেন না। তারা নামাজের বাহ্যিক কাজগুলো ঠিকভাবে সম্পন্ন করেন, শরীয়তের বিধান পূরণ করেন, কিন্তু নামাজ আসলে কী—তার মূল উদ্দেশ্যটাই বুঝতে পারেন না।

তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ইহইয়া উলুম আল দ্বীন এ আল-গাজ্জালী নামাজে চেতনার সাতটি ভিন্ন স্তরের কথা বলেছেন। প্রতিটি স্তর নিজ নিজভাবে পূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য, কিন্তু প্রতিটি স্তর মানুষকে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর আরও গভীর এক অভিজ্ঞতার দিকে নিয়ে যায়।

অধিকাংশ মানুষের নামাজ সারাজীবন এক বা দুই নম্বর স্তরেই থেকে যায়। কেউ কেউ তিন বা চার নম্বরে পৌঁছায়। আর খুব অল্প কিছু মানুষ পাঁচ, ছয় বা সাত নম্বর স্তরের স্বাদ পায়।

স্তর এক: দেহের নামাজ
এখান থেকেই সবার শুরু।
দেহের নামাজ হলো কেবল শারীরিক কাজগুলো যান্ত্রিকভাবে সম্পন্ন করা—দাঁড়ানো, রুকু করা, সিজদা করা, বসা—সবকিছু ঠিক ক্রমে করা। ছোটবেলায় আপনাকে এভাবেই নামাজ শিখানো হয়েছিল।এ পর্যায়ে আপনি আধা-ঘুমের মধ্যেও নামাজ পড়তে পারেন, আর অনেকেই তাই করেন।
আল-গাজ্জালী লিখেছেন:
“তুমি তোমার দেহ দিয়ে নামাজ পড়ছ, কিন্তু মন বা হৃদয় দিয়ে নয়।”

আপনার ঠোঁট সূরা ফাতিহা পড়ছে, অথচ মন রাতের খাবারের পরিকল্পনা করছে। আপনি রুকুতে যাচ্ছেন, কিন্তু ভাবছেন আগামীকালের মিটিং নিয়ে। সিজদায় আছেন, কিন্তু গতকালের তর্ক মনে পড়ছে।
দেহ নামাজে আছে, কিন্তু চেতনা নামাজের বাইরে।
এই স্তরের নামাজ বৈধ। আপনার ফরজ আদায় হয়েছে। কিন্তু আল-গাজ্জালী এ বিষয়ে কঠোর ছিলেন।
তিনি বলেন, এই নামাজ এমন যেন খাবার খাওয়া কিন্তু তার স্বাদ না পাওয়া। যেন চোখ আছে, কিন্তু কিছু দেখা হচ্ছে না। যেন মানুষ জীবিত, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বেঁচে নেই।
দেহ নামাজ পড়ে, আমল লেখা হয়, কিন্তু ভেতরে কোনো পরিবর্তন ঘটে না। নামাজ শেষে আপনি সেই একই মানুষ থাকেন, যিনি নামাজ শুরু করেছিলেন।
এই স্তরের লক্ষণ:
সদ্য পড়া নামাজে কী তেলাওয়াত করেছেন তা মনে না থাকা।
শেষ রাকাতে দুইবার না তিনবার রুকু করেছেন, তা নিয়ে সন্দেহ হওয়া।
কোন সূরা পড়েছেন তা ভুলে যাওয়া।
অর্থাৎ, দেহ উপস্থিত ছিল, কিন্তু আপনি ছিলেন অনুপস্থিত।
এই স্তর থেকে বের হতে আল-গাজ্জালী একটি অনুশীলন বলেছেন:নামাজে নিজের শ্বাস গণনা করুন।ধ্যানের মতো নয়, সচেতনতা তৈরির জন্য।
নামাজ শুরুর আগে একটি শ্বাস নিন এবং মনে মনে বলুন “এক”। ফাতিহা পড়ার আগে “দুই”। এভাবে পুরো নামাজে চলতে থাকুন।কারণ, একই সাথে মানুষ গণনাও করতে পারে না, আবার মনকেও এদিক-ওদিক ঘোরাতে পারে না।
এভাবে টানা ৪০ ওয়াক্ত নামাজ পড়লে আপনি বুঝতে শুরু করবেন—কখন আপনি উপস্থিত, আর কখন হারিয়ে যাচ্ছেন।
স্তর দুই: মনের নামাজ
এ পর্যায়ে আপনি বুঝতে পারেন আপনি কী করছেন।
মন নামাজের প্রতিটি কাজ অনুসরণ করে। আপনি জানেন কোন রাকাতে আছেন। নিজের তেলাওয়াত শুনতে পান। প্রতিটি অবস্থান অনুভব করেন।এখন আপনি “অটোপাইলট”-এ নেই।আল-গাজ্জালী এটিকে প্রকৃত নামাজের শুরু বলেছেন। কারণ এখন “আপনি” নামাজ পড়ছেন—শুধু দেহ নয়।তবে তিনি সতর্কও করেছেন:এই স্তর একটি ফাঁদ হতে পারে।
কারণ অনেকেই এখানে এসে ভাবে—“আমি পৌঁছে গেছি।”
এখনও আপনার ভেতরে “আমি নামাজ পড়ছি”—এই অনুভূতি আছে।
একটি “আমি”, একটি “আল্লাহ”, এবং একটি “নামাজ”—এই তিনটি আলাদা সত্তা।
এখানেই সূক্ষ্ম আত্মগর্ব জন্মায়:
“আমি কত মনোযোগী!”
“আমি এখন সত্যিকারের নামাজ পড়ি!”
অহংকার নামাজের মান নিজের কৃতিত্ব হিসেবে দাবি করতে শুরু করে।
এই স্তরের লক্ষণ:
নামাজ শেষে আপনি হয় নিজের মনোযোগ নিয়ে সন্তুষ্ট হন, নয়তো মনোযোগ হারানো নিয়ে হতাশ হন।
দুই ক্ষেত্রেই আপনি নিজের পারফরম্যান্স বিচার করছেন।
এ স্তর অতিক্রম করতে হলে আপনি যা পড়ছেন তার অর্থ বুঝতে হবে।
অনেকেই আরবি পড়েন, কিন্তু তা অনুভব করেন না।
অনুশীলন:
প্রতিদিন নামাজে একটি বাক্যের অর্থ নিজের ভাষায় মনে মনে বলুন।
আজ: “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” —তারপর মনে মনে অর্থ বলুন।
আগামীকাল যোগ করুন: “আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামিন।”
এভাবে ধীরে ধীরে এগোন।
যখন আপনি অর্থ বুঝতে শুরু করবেন, তখন মন শুধু দর্শক থাকবে না—অংশগ্রহণকারী হয়ে উঠবে।
স্তর তিন: হৃদয়ের নামাজ
এখানে নামাজ ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে।
এ পর্যায়ে “আর-রাহমান, আর-রাহিম” বললে শুধু অর্থ বোঝেন না—আল্লাহর রহমতের জন্য কৃতজ্ঞতাও অনুভব করেন।
রুকুতে শুধু ঝুঁকেন না—ভেতরে বিনয় জেগে ওঠে।
সিজদায় শুধু কপাল মাটিতে রাখেন না—বুকে আত্মসমর্পণের অনুভূতি আসে।
আল-গাজ্জালী লিখেছেন, এটাই সেই প্রথম স্তর যেখানে নামাজ মানুষকে বদলাতে শুরু করে।
কারণ অনুভূতিই অভিজ্ঞতাকে আত্মায় গেঁথে দেয়।
এ পর্যায়ে নামাজ আশ্রয় হয়ে ওঠে।
আপনি শুধু “পড়তেই হবে” বলে নামাজ পড়েন না—বরং “প্রয়োজন” বলে পড়েন।
দুনিয়া ভারী লাগে। নফস অস্থির। মন কোলাহলপূর্ণ। আর নামাজই একমাত্র জায়গা, যেখানে সবকিছু নামিয়ে রাখা যায়।
আপনি ভার নিয়ে নামাজে প্রবেশ করেন, আর হালকা হয়ে বের হন।
এই স্তরের লক্ষণ:
নামাজের সময়কে রক্ষা করতে শুরু করা।
কেউ বাধা দিলে বিরক্ত লাগা।
ফজরের অপেক্ষায় থাকা।
নামাজকে দায়িত্ব নয়, শান্তির জায়গা মনে হওয়া।
তবে এখানেও বিপদ আছে।
আপনি ভাবতে শুরু করতে পারেন—“ভালো নামাজ মানেই তীব্র অনুভূতি।”
যেদিন অনুভূতি আসে না, সেদিন মনে হয় নামাজ ব্যর্থ হয়েছে।
আল-গাজ্জালী বলেন, ধারাবাহিকতা তীব্রতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অনুশীলন:
প্রতিটি নামাজ শেষে দুই মিনিট বসে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন:
“এই নামাজে আমি কী অনুভব করেছি?”
কৃতজ্ঞতা? শান্তি? আকুলতা? নাকি কিছুই না?
কিছু বিচার করবেন না। শুধু লক্ষ্য করুন।
কারণ লক্ষ্য করার মধ্য দিয়েই হৃদয় জাগতে শুরু করে।
স্তর চার: উপস্থিতির নামাজ
এখানে মৌলিক পরিবর্তন ঘটে।
এখন আপনি শুধু কী করছেন বা কী অনুভব করছেন তা জানেন না—কার জন্য করছেন, তা অনুভব করতে শুরু করেন।
“ইয়্যাকা নাবুদু”—“আমরা শুধু তোমারই ইবাদত করি”—বললে মনে হয় কেউ সত্যিই আপনার কথা শুনছেন।
নামাজ আর একতরফা কথা থাকে না—সংলাপ হয়ে যায়।
আল-গাজ্জালী বলেন, এখানে পর্দা পাতলা হয়ে আসে।
প্রথম তিন স্তরে আপনি আল্লাহর দিকে নামাজ পড়েন।
চতুর্থ স্তরে আপনি আল্লাহর উপস্থিতিতে নামাজ পড়েন।
এটি তাত্ত্বিক পার্থক্য নয়—অভিজ্ঞতার পার্থক্য।
একই শব্দ, একই রুকু-সিজদা—কিন্তু পরিবেশের গুণগত মান বদলে যায়।
মনে হয়, “কেউ আছেন।”
কল্পনা নয়। মানসিক প্রক্ষেপণ নয়। বরং এমন এক অনুভূতি, যার প্রমাণের প্রয়োজন হয় না।
এই স্তরের লক্ষণ:
কখনও কখনও নামাজে কান্না আসে।
দুঃখের কারণে নয়—বরং এই উপলব্ধি থেকে যে আপনি শূন্যে কথা বলছেন না।
কেউ আপনাকে দেখছেন। জানছেন। শুনছেন।
স্তর পাঁচ: সাক্ষ্যের নামাজ
এখানে “আমি” এবং “তিনি”—এই বিভাজন ঝাপসা হতে শুরু করে।
আল-গাজ্জালী এটিকে বলেছেন মুশাহাদা—সাক্ষ্যের স্তর।
এ পর্যায়ে আপনি অনুভব করেন যে নামাজ কেবল “আপনি আল্লাহর জন্য করছেন” এমন নয়।
বরং আল্লাহই আপনার মাধ্যমে নিজের ইবাদত প্রকাশ করছেন।
আপনার জিহ্বা নড়ছে, কিন্তু প্রশংসা যেন আপনার ভেতর দিয়ে নিজেই প্রবাহিত হচ্ছে।
এই উপলব্ধি মানুষকে ভীতও করতে পারে।
কারণ প্রশ্ন আসে:
যদি আল্লাহই করাচ্ছেন, তবে আমার ভূমিকা কী?
তাহলে চেষ্টা কেন?
আল-গাজ্জালী বলেন—দুইটিই সত্য।
আপনি কর্তা, আবার কর্তা ননও।
আপনার ইচ্ছা বাস্তব, কিন্তু সেটিও আল্লাহর ইচ্ছারই প্রকাশ।
এই স্তরের লক্ষণ:
জীবনের সবকিছুই ইবাদত মনে হতে শুরু করে।
হাঁটা, কথা বলা, শ্বাস নেওয়া—সবই যেন নামাজের ধারাবাহিকতা।
স্তর ছয়: বিলুপ্তির নামাজ
আল-গাজ্জালী এখানে এসে বলেন—ভাষা আর যথেষ্ট নয়।
তিনি একে বলেছেন ফানা ফিস সালাহ—নামাজে আত্মবিলোপ।
আপনি নামাজ শুরু করেন একজন মানুষ হিসেবে।
কিন্তু কোনো এক মুহূর্তে—বিশেষত সিজদায়—“আমি নামাজ পড়ছি” এই অনুভূতিটাই হারিয়ে যায়।
নামাজ চলতে থাকে, কিন্তু “আমি” আর থাকে না।
শুধু নামাজ থাকে।
আল-গাজ্জালী বলেন, এটি জোর করে আনা যায় না। কৌশল দিয়ে অর্জন করা যায় না।
বহু বছরের আন্তরিক সাধনার পর আল্লাহর অনুগ্রহে সাময়িকভাবে এটি ঘটে।
এবং সাধারণত কয়েক সেকেন্ডের বেশি স্থায়ী হয় না।
স্তর সাত: স্থিতির নামাজ
এটি ছয় নম্বর স্তরের পরবর্তী অবস্থা।
বাকা—অর্থাৎ বিলুপ্তির পর স্থিতি।
আপনি ফিরে আসেন, কিন্তু আগের মানুষ হিসেবে আর ফিরে আসেন না।
আপনার পরিচয় থাকে, ব্যক্তিত্ব থাকে, ইতিহাস থাকে—কিন্তু আপনি জানেন এগুলো সবই অস্থায়ী আবরণ।
এ পর্যায়ে নামাজ কষ্টসাধ্য থাকে না।
কারণ যে অংশটি নামাজে বাধা দিত—অলসতা, অজুহাত, প্রতিরোধ—তা পুড়ে গেছে।
নামাজ তখন আগুনের জ্বলার মতো স্বাভাবিক হয়ে যায়।
আল-গাজ্জালীর শেষ উপদেশ
তিনি বলেন:
“স্তর লাফিয়ে অতিক্রম করার চেষ্টা করো না।”
আধ্যাত্মিক পথ প্রতিযোগিতা নয়।
যদি আপনি এক নম্বর স্তরে থাকেন, সেটিকে পরিপূর্ণ করুন।
দুই নম্বর স্তরে থাকলে—মনোযোগকে নিখুঁত করুন।
স্তরগুলো অর্জনের মেডেল নয়। এগুলো নামাজের গভীরতর সত্যের উন্মোচন।

প্রথম স্তরে নামাজ কর্তব্য।
দ্বিতীয় স্তরে শৃঙ্খলা।
তৃতীয় স্তরে সম্পর্ক।
চতুর্থ স্তরে সাক্ষাৎ।
পঞ্চম স্তরে উপলব্ধি।
ষষ্ঠ স্তরে বিলোপ।
সপ্তম স্তরে অস্তিত্ব।

শেষে তিনি ইহইয়া উলুম আল দ্বীন থেকে বলেন:
“যখন তুমি নামাজে দাঁড়াবে, এমনভাবে দাঁড়াও যেন এটি তোমার জীবনের শেষ নামাজ। কারণ একদিন সত্যিই তা হবে—আর তুমি জানবে না কোন নামাজটি সেই শেষ নামাজ।”

16/05/2026

[বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম। সুফি সাধক, আরিফ ও ওলি-আউলিয়াদের অতীন্দ্রিয় জগতের চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা, নূরানী মোশাহেদা এবং আল্লাহর জিকিরে ফানা হয়ে যাওয়ার এই পরম আধ্যাত্মিক যাত্রায় আপনাকে স্বাগতম।]
-------------------------------------------------------
সুলাইমানিয়া লাইব্রেরির ৩০২৮ নম্বর পাণ্ডুলিপিতে আবু আল-কাসিম আল-কুশায়রী ৪৩৭ হিজরি সালের ২৭শে রজবের রাতের এক ঘটনার বিবরণ নথিবদ্ধ করেছেন। মাগরিব ও এশার সালাতের মধ্যবর্তী সময়ে তিনি এক অতীন্দ্রিয় অবস্থার সম্মুখীন হন। তাঁর বর্ণনানুযায়ী পুরো বিশ্ব কাঁচের মতো স্বচ্ছ হয়ে গিয়েছিল। মসজিদের মেঝের ভেতর দিয়ে তিনি নিচের সাতটি স্তর এবং প্রতিটি স্তরের নিজস্ব সৃষ্টিজগৎ দেখতে পান। মাথার ওপরে ছাদ ভেদ করে একে একে সাতটি আসমানের দুয়ার খুলে যায়। সপ্তম আসমানে তিনি সত্তর হাজার ডানা বিশিষ্ট একটি সবুজ পাখি প্রত্যক্ষ করেন যার প্রতিটি ডানায় এমন এক একটি ঐশী নাম খোদাই করা ছিল যা তিনি পূর্বে কখনো শোনেননি।

​এই আত্মিক অবস্থা মাত্র তিন শ্বাসের স্থায়িত্বের সমান ছিল। এই অবস্থা যখন শেষ হলো তখন তিনি দেখলেন বাস্তব জগতের চার ঘণ্টা সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। মসজিদের অন্যান্য মুসল্লিরা জানিয়েছিলেন তিনি দীর্ঘ সময় সিজদাবনত অবস্থায় স্থির ছিলেন তবে তাঁর চোখের পানিতে জায়নামাজ ভিজে নিচের পাথর পর্যন্ত গড়িয়ে পড়েছিল। ইসলামি পাণ্ডুলিপিগুলোর প্রান্তসীমায় এমন অসংখ্য চাক্ষুষ অভিজ্ঞতার বিবরণ রয়েছে যা কোনো রূপক বা প্রতীকী গল্প নয়; সরাসরি আধ্যাত্মিক সাক্ষ্য।

​আলী হুজভিরির ফারসি গ্রন্থ 'কাশফ আল-মাহজুব'-এ এমন শত শত অভিজ্ঞতার কথা সংরক্ষিত আছে। তিনি বায়েজিদ বোস্তামী সম্পর্কে লিখেছেন যে বায়েজিদ তাঁকে সরাসরি বলেছিলেন, "দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে আমি আল্লাহর সাথে কথা বলেছি অথচ মানুষ ভেবেছে আমি তাদের সাথে কথা বলছি। মানুষের প্রশ্নের উত্তরে আমার জিহ্বা নড়াচড়া করলেও আমার ভেতরের কথোপকথন সার্বক্ষণিকভাবে ঐশী সান্নিধ্যে মগ্ন থাকত।" আবু নাসর আল-সাররাজের 'কিতাব আল-লুমা'-তেও বায়েজিদ বোস্তামীর নিজস্ব কিছু উক্তি সংরক্ষিত আছে যেখানে তিনি বলেন, "আল্লাহ যখন আমাকে অন্য সবকিছু থেকে বিমুখ করে নিজের নূরে আলোকিত করলেন তখন আমি নিশ্চিত বিশ্বাসের চোখ দিয়ে তাঁর দিকে তাকালাম। তিনি আমাকে তাঁর গোপন জ্ঞান ও অন্তর্নিহিত রহস্যসমূহ দেখালেন। আমি তাঁর অস্তিত্বের মাঝে আমার অস্তিত্ব এবং তাঁর নূরের মাঝে আমার নূর দেখতে পেলাম।"

​পাণ্ডুলিপিতে বায়েজিদের সেই সুনির্দিষ্ট শারীরিক অবস্থার বিবরণ রয়েছে যেখানে তিনি বলেছেন, "আমার চামড়া স্বচ্ছ হয়ে গিয়েছিল। আমি আমার রক্তপ্রবাহ দেখতে পাচ্ছিলাম যার প্রতিটি ফোঁটা কোনো বর্ণ বা অক্ষর ছাড়াই আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করছিল। আমার হাড়গুলো বাঁশিতে পরিণত হয়েছিল যার ভেতর দিয়ে ঐশী শ্বাস এমন সুর বাজাচ্ছিল যার কোনো স্বরলিপি হয় না। এরপর আমি সম্পূর্ণ হারিয়ে গেলাম। আমার যে কণ্ঠনালী ছিল তার ভেতর দিয়ে তিনি নিজের সাথে কথা বলছিলেন।"

মহিউদ্দিন ইবনে আরাবী তাঁর 'ফুতুহাত' গ্রন্থে আধ্যাত্মিক অবস্থার এমন অনেক মনস্তাত্ত্বিক বিবরণ দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, "৬২৭ হিজরি সালের ১৫ই রমজান দামেস্কে মিহরাব তাওয়াফ করার সময় হঠাৎ দেয়ালটি উন্মুক্ত হয়ে গেল। আমি এমন একটি বাগানে প্রবেশ করলাম যার প্রতিটি গাছ ছিল নূরের তৈরি। সেগুলোর ফলগুলো ঐশী নামের স্পন্দনে কাঁপছিল। আমি 'আল-লতিফ' নামের স্পন্দনে কাঁপতে থাকা একটি ফল ছিঁড়ে যখন তার স্বাদ নিলাম তখন মহাবিশ্বে বিদ্যমান সমস্ত কোমলতার প্রকৃত রহস্য আমার সামনে স্পষ্ট হয়ে গেল।"

​তিনি এই অভিজ্ঞতার সুনির্দিষ্ট বিবরণ দিয়ে বলেন, "শুরুতে আমার দুই ভ্রুর মাঝখানে তীব্র চাপ অনুভূত হলো এবং সিল্কের কাপড় ছিঁড়ে যাওয়ার মতো একটি শব্দ হলো। এরপর এমন কিছু রঙের আবির্ভাব ঘটল যার কোনো নাম মানুষের ভাষায় নেই। এটি ছিল সবুজ ও সোনার মধ্যবর্তী এক রঙ যা একই সাথে উজ্জ্বল ও অন্ধকার ছিল। এই রঙগুলোর ভেতর থেকে বিভিন্ন জ্যামিতিক নকশা প্রকাশ পেল যা পরবর্তীতে আরবি অক্ষরে এবং সবশেষে আকৃতিহীন খাঁটি অর্থে রূপ নিল।"

​আন্দালুসিয়ার প্রখ্যাত সুফি ইবনে সাবইন ফেজের এক সংরক্ষিত চিঠিতে তাঁর ফজরের সালাতের এক অতীন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন। তিনি যখন সালাতের তাকবির দিলেন তখন কান পর্যন্ত তোলা তাঁর হাত দুটি ওপরের দিকে উঠতেই থাকল। হাত দুটি তাঁর শরীর, মসজিদ এবং শহর ছাড়িয়ে সরাসরি আল্লাহর আরশ স্পর্শ করল। আরও নিখুঁতভাবে বললে তিনি উপলব্ধি করলেন তাঁর হাত সর্বদা আরশ স্পর্শ করেই ছিল, কেবল সেই মুহূর্তে তিনি তা বুঝতে পেরেছেন।
​রুজবিহান বাকলীর 'কাশফ আল-আসরার' গ্রন্থে তাঁর ডায়েরির কিছু অংশ রয়েছে। ১৮ই জিলহজের পাতায় তিনি লিখেছেন, "আজ বাজারে ডালিম পরীক্ষা করার সময় প্রতিটি দানা এক একটি মহাবিশ্বে রূপ নিল। আমি একটিমাত্র ফলের ভেতর বিভিন্ন সভ্যতার উত্থান ও পতন দেখতে পেলাম। দোকানদার আমাকে সুস্থ আছি কি না জিজ্ঞেস করলে আমি তাকে দাম চুকিয়ে মসজিদের দিকে হেঁটে গেলাম, অথচ তখনও আমার হাতের তালুর ভেতর অসংখ্য মহাবিশ্বের জন্ম ও মৃত্যু ঘটছিল।" পরের দিনের পাতায় তিনি লিখেছেন, "এই দর্শন এখনও চলছে। এখন আমি দেখছি প্রতিটি পরমাণুর ভেতর একটি করে আরশ রয়েছে যেখানে আল্লাহ উপবিষ্ট আছেন এবং বলছেন 'আমি তোমাদের ঘাড়ের রগের চেয়েও নিকটে।' আসল রহস্য এটি নয় যে তিনি কাছে আছেন, রহস্য হলো আমরা দূরত্ব অনুভব করি।"

আবু ইয়াজিদ আল-বায়েজিদ বোস্তামীর এই আধ্যাত্মিক আরোহণের কাহিনী সুলামীর 'তাবাকাত' সহ একাধিক উৎসে সংরক্ষিত আছে। বায়েজিদ বলেন, "আমি আমার অন্তরের আসমানগুলোর দিকে আরোহণ করলাম। প্রতিটি আসমানে আমি একবার মৃত্যুবরণ করলাম এবং পুনর্জন্ম লাভ করলাম। প্রথম আসমানে আমি পার্থিব আনন্দের কাছে মরে গিয়ে সংগ্রামের মাঝে জন্ম নিলাম। দ্বিতীয় আসমানে আমি সংগ্রামের কাছে মরে গিয়ে জ্ঞানের মাঝে জন্ম নিলাম। তৃতীয় আসমানে আমি জ্ঞানের কাছে মরে গিয়ে প্রেমের মাঝে জন্ম নিলাম। চতুর্থ আসমানে আমি প্রেমের কাছে মরে গিয়ে ফানা বা বিলীনতার মাঝে জন্ম নিলাম। পঞ্চম আসমানে আমি বিলীনতার কাছে মরে গিয়ে বিস্ময়ের মাঝে জন্ম নিলাম। ষষ্ঠ আসমানে আমি বিস্ময়ের কাছে মরে গিয়ে জাগ্রত অবস্থার মাঝে জন্ম নিলাম। সপ্তম আসমানে আমি নিজের অস্তিত্বের কাছে মরে গিয়ে সেই পরম সত্তাকে খুঁজে পেলাম।"

​মনসুর হাল্লাজের 'কিতাব আল-তাওয়াসিন' গ্রন্থে তাঁর এক দর্শনের বিবরণ রয়েছে। তিনি বলেন, "আমি আল্লাহর রাসূলকে দেখে পথ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি আমাকে এমন একটি দরজার দিকে ইশারা করলেন যা আমি পূর্বে কখনো লক্ষ্য করিনি। সেই দরজার পেছনে আমি নিজেকে সালাতরত অবস্থায় দেখলাম। সেই সত্তার পেছনে আরও একজন নিজেকে সালাত আদায় করতে দেখলাম। এভাবে আমি আমার নিজের সত্তর হাজার সংস্করণ গণনা করলাম যারা সবাই সালাতরত ছিল। সবশেষের সত্তাটি আমার দিকে ঘুরে বলল, 'আমাদের কেউ তুমি নও। তুমি হলে সে যে আমাদের সবাইকে দেখছে।'

​মিশরের আধ্যাত্মিক সাধক জুল-নুন আল-মিসরীর বার্লিনে সংরক্ষিত কিছু প্যাপিরাসের লেখায় পাওয়া যায়, "ঐশী সান্নিধ্য আমার জিহ্বায় এমন এক স্বাদের মতো প্রকাশ পেয়েছিল যা মধুর চেয়েও মিষ্টি কিন্তু আদার মতো ঝাঁঝালো, কর্পূরের মতো শীতল কিন্তু সুরার মতো উষ্ণ। এই স্বাদ একটানা ৪০ দিন আমার মুখে ছিল। এই সময়ে আমার কোনো খাবারের প্রয়োজন হয়নি। সেই স্বাদই আমার বেঁচে থাকার শক্তি ছিল।" তাঁর এক ছাত্র লিখেছেন, "মুর্শিদ যখন আধ্যাত্মিক হালতে প্রবেশ করতেন তখন তাঁর গায়ের চামড়া থেকে নূর বের হতো। চাঁদহীন অন্ধকার রাতে আমরা সেই নূরের আলোতে বই পড়তে পারতাম। এই বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলতেন, 'এটি আমার কোনো আলো নয়। আমি এটি সঠিকভাবে আড়াল করতে ব্যর্থ হচ্ছি।'

নজমউদ্দিন কুবরা তাঁর 'ফাওয়াইহ আল-জামাল' গ্রন্থে আধ্যাত্মিক আলোর ১০টি শ্রেণীর কথা উল্লেখ করেছেন। এগুলো হলো—অহং বা নফসের নীল-কালো আলো, বুদ্ধিবৃত্তির লাল আলো, হৃদয়ের হলুদ আলো, অন্তরের অন্তস্তলের সাদা আলো, রূহের সবুজ আলো, একত্বের কুচকুচে কালো আলো, নৈকট্যের স্বচ্ছ আলো, ছায়াহীন আলো, অন্য আলোকে গ্রাসকারী আলো এবং এমন এক আলো যার মাধ্যমে অন্য সমস্ত আলো দেখা যায়। তিনি নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, "সবুজ আলোটি প্রথমে আমার চোখের কোণে একটি বিন্দুর মতো প্রকাশ পেয়েছিল। কয়েক সপ্তাহ ধরে এটি বড় হতে হতে আমার পুরো দৃষ্টি জুড়ে বিস্তৃত হলো, এমনকি চোখ খোলা রাখলেও আমি তা দেখতাম। এই সবুজের ভেতর দিয়ে আমি দৃশ্যমান জগতের ওপর অদৃশ্য জগতের বিভিন্ন রূপ দেখতে পেতাম। বাজারের বিক্রেতাদের মাঝে ফেরেশতারা দাঁড়িয়ে থাকত এবং হাজীদের পাশাপাশি আরশ বহনকারী ফেরেশতারা কাবা গৃহ তাওয়াফ করত।"

​হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজালী তাঁর 'মিশকাত আল-আনোয়ার' গ্রন্থে লিখেছেন, দীর্ঘ ৪০ দিন নির্জনবাস এবং ক্ষুধা নিবারণের ন্যূনতম খাদ্য গ্রহণের পর তাঁর ভেতরের পর্দাগুলো সরতে শুরু করে। তিনি বলেন, "প্রথমে আমি শব্দকে রঙ হিসেবে দেখতে পেলাম। আজানের ধ্বনি বাতাসে সোনার কুণ্ডলীর মতো ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছিল। এরপর আমি রঙকে সঙ্গীত হিসেবে শুনতে পেলাম। আকাশের নীল রঙ মানুষের শ্রবণসীমার ঠিক নিচে একটি ধ্রুব সুর বাজাচ্ছিল। সবশেষে অর্থের নিজস্ব রূপটি আমার সামনে দৃশ্যমান হলো। কোনো শব্দের পোশাক ছাড়াই অর্থ তার আসল রূপে আমার সামনে প্রকাশ পেল।"
​কুবরাভিয়া তরিকার সাধক আলা উদ-দৌলা সিমনানি তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন, "৩রা মহররম আমার ভেতরের লতিফা বা সূক্ষ্ম কেন্দ্রগুলো একে একে উন্মুক্ত হতে লাগল। ভৌত হৃদপিণ্ডের দুই আঙুল নিচে অবস্থিত লতিফা-এ-কালব ঘড়ির কাটার বিপরীত দিকে ঘুরতে শুরু করল। বুকের কেন্দ্রে অবস্থিত লতিফা-এ-সির থেকে সাদা আলো নির্গত হতে লাগল। দুই ভ্রুর মাঝখানের লতিফাটি একটি চোখের মতো খুলে গেল যার মাধ্যমে আমি কোনো ধারণার পর্দা ছাড়াই সরাসরি বাস্তবতাকে দেখতে পেলাম।"

ইবনে আল-ফারিদের দিওয়ানে তাঁর এক গভীর সাক্ষ্য রয়েছে। মক্কায় মাকামে ইব্রাহিমের সামনে তাঁর দেহটি কাঁচের মতো স্বচ্ছ হয়ে গিয়েছিল। আশেপাশের দর্শনার্থীরা তাঁর শরীরের ভেতর দিয়ে পেছনের কাবা শরীফ দেখতে পাচ্ছিল। তাঁর হাড়গুলো নূরে এবং রক্ত সুগন্ধিতে রূপান্তর লাভ করেছিল। এক শিশু তাঁকে দেখে তার মাকে বলল, "মা, এই মানুষটি সালাত দিয়ে তৈরি কেন?" মা তাকে টেনে নিয়ে গেলেন, কারণ তিনি কেবল একজন সাধারণ মানুষকেই দেখছিলেন।
​নকশবন্দী তরিকার প্রধান বাহা উদ্দিন উক্তি করেছেন, "আমি যখন ছাত্রদের পড়াচ্ছিলাম তখন আমার ওপর এক বিশেষ হালত অবতীর্ণ হলো। আমার ছাত্ররা পরে জানিয়েছিল আমি অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে ওযুর নিয়মাবলী নিয়ে কথা বলছিলাম, অথচ আমার ভেতরের অবস্থা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমি তখন এক বিশাল মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে ছিলাম যার প্রতিটি বালির কণা ছিল এক একটি সূর্য। প্রতিটি সূর্যের ভেতর কোটি কোটি সৃষ্টি সেজদাবনত অবস্থায় ছিল। তাদের সেই যৌথ সেজদা থেকে এক মহাসঙ্গীতের সৃষ্টি হচ্ছিল যা 'আল্লাহ' শব্দে রূপ নিচ্ছিল। এই শব্দটি আবার নতুন নতুন মহাবিশ্বের জন্ম দিচ্ছিল যেখানে নতুন সৃষ্টিরা এসে পুনরায় সেজদার এই চক্র সচল রাখছিল।"

​আবু সাইদ ইবনে আবিল খায়ের তাঁর ছাত্রদের বলেছিলেন, "একটানা ৩ দিন আমি নিজেই সালাত হয়ে গিয়েছিলাম। আমি সালাত আদায় করছিলাম না, আমি নিজেই সালাত ছিলাম। আমার শরীর ছিল কিয়াম বা দাঁড়ানো অবস্থা, আমার রক্ত ছিল কিরাত বা পাঠ, আমার শ্বাস ছিল রুকু এবং আমার হাড়গুলো ছিল সিজদা। আমি তখন বুঝতে পারলাম আমরা সালাত আদায় করি না, সালাতই আমাদের মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করে।"

গাউসুল আজম আব্দুল কাদের জিলানীর 'ফুতুহ আল-গাইব' গ্রন্থে একটি বিবরণ রয়েছে যেখানে তিনি বলেন, "আল্লাহর 'আল-কাদির' নামটি আমার হৃদয়ে এক জীবন্ত সত্তার মতো প্রবেশ করেছিল। এটি এমন এক অতিথির মতো আসন গ্রহণ করল যা কখনো চলে যায় না। আজ ২০ বছর পরেও এই নাম আমার সাথে কথা বলে এবং কোনো ব্যাখ্যার বাইরে সরাসরি অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আমাকে তার অর্থ শেখায়। আমি যখন পৃথিবীর বুকে ক্ষমতার কোনো প্রকাশ দেখি তখন আমার বুকের ভেতরের সেই নামটি আনন্দের সাথে নিজেকে চিনে নেয়।"

​শাজিলী তরিকার সাধক আবুল আব্বাস আল-মুরসি সাক্ষ্য দিয়েছেন, "আলেকজান্দ্রিয়ায় রাতের ইবাদতের সময় হঠাৎ ভূমধ্যসাগর স্বচ্ছ হয়ে গেল। আমি তার গভীরতা ভেদ করে সমুদ্রের তলদেশ দেখতে পেলাম যেখানে মুক্তার তৈরি প্রাসাদে অসংখ্য সৃষ্টি মানুষের সৃষ্টির পূর্বের ভাষায় আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করছে। ভোরবেলা যখন এই অবস্থা শেষ হলো তখন আমি আমার জায়নামাজে সাগরের নোনা পানি খুঁজে পেলাম, অথচ আমি আমার স্থান থেকে এক চুলও নড়িনি।"

​চিশতী তরিকার প্রধান মঈনউদ্দিন চিশতী নথিবদ্ধ করেছেন, "কুরআন তিলাওয়াতের সময় আমার ভেতরের সূক্ষ্ম অনুষদটি খুলে গেল। কুরআনের প্রতিটি অক্ষর এক একটি দরজার মতো মনে হলো। প্রতিটি দরজার পেছনে সত্তর হাজার অর্থ এবং প্রতিটি অর্থের পেছনে সত্তর হাজার জগত লুকিয়ে ছিল। প্রতিটি জগতে সেই একই আয়াত পাঠ করা হচ্ছিল কিন্তু তার প্রভাব ও তাৎপর্য ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। আমি তখন বুঝতে পারলাম আমরা যা পাঠ করি তার বিন্দুমাত্র বোঝার ক্ষমতাও আমাদের এখনও তৈরি হয়নি।"
​এই সমস্ত প্রাচীন পাণ্ডুলিপি সুফি ঐতিহ্যের এমন হাজার হাজার আধ্যাত্মিক সত্যকে ধারণ করে রেখেছে। এগুলো কোনো দর্শন বা তত্ত্ব নয়, এগুলো হলো সাধকদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার জীবন্ত সাক্ষ্য। চেতনার এই মানচিত্রকারেরা যে পথরেখা রেখে গেছেন তা অনুসরণ করলে অন্তরের সেই পরম রহস্যের দুয়ার খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

প্রিয় মোরশেদ।আগের তোলা ছবি।
11/04/2026

প্রিয় মোরশেদ।

আগের তোলা ছবি।

গতকাল প্রিয় মোরশেদের সহবতের জন্য কিছুটা তাড়াতাড়ি ভুইগড়ে উনার কাছে যাই, উনি ইতিক্বাফে ছিলেন। বাহিরে ঝড় শুরু হয়েছে,  আমি প...
21/03/2026

গতকাল প্রিয় মোরশেদের সহবতের জন্য কিছুটা তাড়াতাড়ি
ভুইগড়ে উনার কাছে যাই, উনি ইতিক্বাফে ছিলেন। বাহিরে ঝড় শুরু হয়েছে, আমি পিছে চুপচাপ বসে আছি, হুজুর পড়ছেন।

- ছোট মাকামের সালেক।

ঈদের ভোরে হুজুরে পয়লা হুকুম হইল, গাভীগুলিকে গোসল দিয়া আন্‌। হোসেন আর নূরু ত্বরিৎ গতিতে তাহা করিয়া ফেলিল। তারপর এইগুলিকে ...
21/03/2026

ঈদের ভোরে হুজুরে পয়লা হুকুম হইল, গাভীগুলিকে গোসল দিয়া আন্‌। হোসেন আর নূরু ত্বরিৎ গতিতে তাহা করিয়া ফেলিল। তারপর এইগুলিকে তরতাজা কলাই ঘাস খাইতে দেওয়া হইল। হুজুরও সকাল সকাল গোসল করিতে গেলেন। তোলা ঠান্ডা পানি ঢালিতে ঢালিতে বলিলেন, ঘরে বাসের সাবান আছে নাকি? মুহাম্মদ বলিল, না। আমার ছিল তাহাই লইয়া গেলাম। গরজ করিয়া বছরে কেবল দুই ঈদের দিনে হুজুর গায়ে সাবান দিয়া থাকেন। আর কোথাও কেউ যদি গায়ে পরিয়া দিয়া দেয় তো দেওয়া হয়। গোসল সারিয়া হুজুর নতুন লুঙ্গীটা (মুরিদের দেয়া) পরিলেন। ভাঁজ ভাঙ্গিয়া গেঞ্জী, পাঞ্জাবী ও এক রাত্রির জন্য তুলিয়া রাখা চটি জুতা মুহাম্মদ আগাইয়া দিল। বাদামী রং এর কালিতে জুতাগুলি প্রাণ পাইয়াছিল বটে। মাথায় টুপিটা চাপাইতে যাইবেন, আমার দিকে তাকাইয়া বলিলেন, তোমার বাসের তৈলটা আনো না! আমি আহ্লাদের সহিত তাঁহার মাথায় সুগন্ধি তৈল মাখিয়া দিলাম। মুহাম্মদ দিয়া দিল আতর। মুশকিল বাঁধিল সুরমা লইয়া। কাগজের পুরিন্দায় সুরমা। ঘরে সুরমাদান কিংবা শলাকা নাই। হুজুর বলিলেন, পানের বটা দিয়া দে। আবার বলিলেন, বটার আশঁগুলি উঠাইয়া নে; ভিজা বটায় সুরমা আটকিবে। মুহাম্মদ তাহাই করিল। হুজুরের চোখে সুরমা বেশ মানাইল। আমি একটি আয়না ও চিরুনী তাঁহার হাতে দিলাম। সুন্দর করিয়া তিনি সফেদ দাড়িগুলি আঁচড়াইয়া লইলেন।

[আমার ভালোবাসা মওলানা ভাসানী (তাঁহার ঈদ), সৈয়দ ইরফানুল বারী]

19/03/2026

এক জুমায় আমি জিজ্ঞেস করিলাম, সব ইবাদতের মধ্যে কেবল রোজার সওয়াব আল্লাহ্‌র হাতে রাখিবার অর্থ কি?
হুজুর বলিলেন, আল্লাহ তোমাদের রোজার কথা বলেন নাই। বলিয়াছেন সিয়াম সাধনার কথা। সিয়াম সাধনায় প্রথমে এসতেতার (আত্মদর্শন) হয়। অতঃপর রূহানী তাজাল্লী এবং পরে যাহা সর্বোৎকৃষ্ট অর্থাৎ রব্বানী তাজাল্লীও নসিব হয়। এইসব ক্ষেত্রে আল্লাহর জাত-সিফত ও মানবজীবনলীলা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তাই বলা হইয়াছে, সিয়ামের সওয়াব সরাসরি আল্লাহ্‌র ব্যাপার।

[রমজানের দিবারাত্রি; মুর্শিদ মওলানা; সাপ্তাহিক হক কথা, ১৯৭৮]
মাওলানা ভাসানীর জীবনি হইতে সংগ্রহীত।

19/03/2026

আল্লাহর সত্তা সম্পর্কে চিন্তা করো না
---------------------------------------------------------
সুলতানুল আওলিয়া মাওলানা শায়খ মুহাম্মদ আদিল আর-রব্বানী

১৭ মার্চ ২০২৬ / ২৭ রমজান ১৪৪৭
শায়খ নাযিম দরগাহ, লেফকে, সাইপ্রাস

আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আ‘উযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম।
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
আস-সালাতু ওয়াস-সালামু ‘আলা রাসূলিনা মুহাম্মাদিন সাইয়্যিদিল আওয়ালিনা ওয়াল আখিরীন।

তারিকাতুনাস সুঃহবা ওয়াল খাইরু ফিল জাম‘ইয়াহ।
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম,
“নিশ্চয়ই আমরা আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টি করেছি” (কুরআন ৫০:৩৮)

“এবং তাতে তার জীবিকার পরিমাপ নির্ধারণ করেছি” (কুরআন ৪১:১০)।
সদাকাল্লাহুল আযীম।

আমাদের প্রিয় নবী ﷺ বলেন, তোমরা আল্লাহ ‘আজ্জা ওয়া জাল্লার কুদরাত সম্পর্কে চিন্তা করো। কিন্তু তাঁর সত্তা সম্পর্কে—তিনি কেমন, কোথায়, কী—এসব নিয়ে চিন্তা করো না। বরং তাঁর সৃষ্টির দিকে তাকাও এবং তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করো। সৃষ্টির মাধ্যমে আল্লাহর মহিমা চিনতে চেষ্টা করো—এটাই নবী ﷺ-এর নির্দেশ।

আল্লাহ ‘আজ্জা ওয়া জাল্লা এই পৃথিবী, আসমান—সবকিছু এমন নিখুঁত পরিমাপে সৃষ্টি করেছেন যে কিছু অল্পসংখ্যক মানুষ তা বুঝতে পারে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা উপলব্ধি করতে পারে না। মানুষ যখন এমন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে যা সে বুঝতে পারে না, তখন সে তার বুদ্ধি হারাতে পারে—অথবা তার ঈমান নষ্ট হতে পারে। তাই নবী ﷺ আমাদেরকে সতর্ক করেছেন—আল্লাহর সত্তা সম্পর্কে চিন্তা করা থেকে বিরত থাকো।

কিছু মানুষ সীমা অতিক্রম করে। তারা নিরর্থক জিনিসকে মূর্তি বানিয়ে পূজা করে। আবার কেউ কেউ আরও বিভ্রান্ত হয়ে যায়—(নাউযুবিল্লাহ) মনে করে আল্লাহ বিভিন্ন দেহে মানুষের মধ্যে ঘুরে বেড়ান। এসব সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন কথা। তুমি একজন মানুষ—আল্লাহ তোমাকে বুদ্ধি দিয়েছেন, কিন্তু সেই বুদ্ধিরও সীমা আছে। কিছু বিষয় সীমাবদ্ধ—তাদের কাছে যেয়ো না। কাছে গেলে ধ্বংস হবে, নষ্ট হয়ে যাবে। তাই নিজের সীমা জানা জরুরি।আল্লাহ ‘আজ্জা ওয়া জাল্লা আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। মানুষের হিসাব অনুযায়ী ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু সেই ছয় দিন কত লক্ষ-কোটি বছরের সমান—তা আল্লাহই ভালো জানেন। মানুষ তা জানে না। তবুও মানুষ চেষ্টা করে যাচ্ছে—এই মহাবিশ্ব কত বড়, তার সীমানা কোথায়—তা জানার জন্য। কিন্তু তারা তার শেষ খুঁজে পায় না। এটিও আল্লাহর মহিমার প্রমাণ।

তিনি কীভাবে সৃষ্টি করেছেন? কী পরিমাপে? সব কিছু নির্ধারিত। অসংখ্য কোটি কোটি নক্ষত্র রয়েছে—একটি অন্যটির সাথে সংঘর্ষ না করেই চলছে। সব কিছুর মতো তাদেরও একটি নির্দিষ্ট জীবনকাল আছে। যখন তা শেষ হবে, তখন অন্য কিছু সৃষ্টি হবে।কী ঘটবে—তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। আর এখন আমাদের পালা—যখন আমাদের সময় আসবে, তখন আমাদের আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করতে হবে। এ বিষয়ে চিন্তা করো। আমাদের উচিত তাঁর নির্দেশ পালন করা এবং সুন্দর ইবাদত করা। আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখা এবং সেই দিনের অপেক্ষা করা—যেদিন আমরা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করবো। সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন।

ঈমানসহ জীবন শেষ করা, ঈমান রক্ষা করে আখিরাতে যাওয়াই সবচেয়ে বড় বিষয়।আল্লাহ আমাদের সব ইবাদত কবুল করুন। আমাদের ইবাদত অবশ্যই অপূর্ণ। অনেক মানুষ আছে যারা অন্যদের ইবাদত নিয়ে মন্তব্য করে—“তুমি ভালো নামাজ পড়েছ”, “তুমি নামাজ পড়নি”—এমন কথা বলে। কিন্তু আমরা জানি, আমাদের ইবাদতে অনেক ত্রুটি আছে। আল্লাহ সেই ত্রুটিসহই তা কবুল করবেন।

আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন এবং কবুল করুন, ইনশাআল্লাহ। তিনি আমাদের সবাইকে জান্নাতে পৌঁছে দিন, ইনশাআল্লাহ।

রমজান ও ইবন আরাবীর অনুধাবন--------------------------------------------------------সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত তার...
28/02/2026

রমজান ও ইবন আরাবীর অনুধাবন
--------------------------------------------------------

সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত তারা আহার বন্ধ করে, পানীয় ত্যাগ করে, দাম্পত্য সম্পর্ক থেকেও বিরত থাকে। তারা বেশি নামাজ পড়ে, বেশি কুরআন তিলাওয়াত করে, বেশি দান-সদকা করে।
তারপর রমযান শেষ হয়…
আর কয়েক দিনের মধ্যেই অধিকাংশ মানুষ আবার আগের সেই মানুষটিতে ফিরে যায়।
ইবনে আরাবি এই দৃশ্য বহুবার দেখেছিলেন।
তিনি প্রশ্ন করেছিলেন—
“এত তীব্র ইবাদতের এক মাস কেন মানুষের ভেতর স্থায়ী পরিবর্তন আনে না?”
“মানুষ তারাবিতে কাঁদে, অথচ সকালে ব্যবসায় মিথ্যা বলে—কেন?”
“লাইলাতুল কদর লক্ষ মানুষের উপর দিয়ে অতিক্রম করে যায়, অথচ তারা কিছুই অনুভব করে না—কেন?”
তার উত্তর ছিল কঠিন, কিন্তু সত্যের আগুনে দগ্ধ—
অধিকাংশ মানুষ পেট দিয়ে রোযা রাখে, আত্মা দিয়ে নয়।
তারা রমযানের বাহ্যরূপ পালন করে, কিন্তু অন্তর্লীন বাস্তবতাকে স্পর্শ করে না।
রমযান—একটি জ্বলন্ত আগুন
“রমযান” শব্দটি এসেছে “রমদা” মূল থেকে—অর্থ তীব্র উত্তাপ, দহন।
যে আগুন মাটিকে ঝলসে দেয়, তারপর বৃষ্টি আসে।
ইবনে আরাবি বলেন—
রমযান কেবল নাম নয়; এটি একটি প্রক্রিয়া।
তোমার ভেতরে জ্বলার জন্যই এ নাম।
এই আগুন আরামের উষ্ণতা নয়।
এটি এমন আগুন যা তোমার ভেতরের অপ্রয়োজনীয় স্তরগুলো পুড়িয়ে ফেলে।
প্রতি ক্ষুধা, প্রতি সংযম, প্রতি মুহূর্ত যখন তুমি নিজের নফসের চাহিদাকে অস্বীকার করো—
তখন আগুনের একটি জিহ্বা তোমার অহংকারকে গ্রাস করছে।
লোহা যেমন আগুনে বিশুদ্ধ হয়,
তেমনি আত্মাও রমযানের চুল্লিতে শুদ্ধ হয়।
আগুন ধাতুকে ধ্বংস করে না—
মিশ্রিত অপবিত্রতা পুড়িয়ে দেয়।
রমযান হলো সেই ঐশী ভাঁটি,
যেখানে তোমার আত্মা প্রবেশ করে।
কী পুড়ে যায়?
ইবনে আরাবি তিনটি বিষয়ের কথা বলেছেন—
১. স্বয়ংসম্পূর্ণতার ভ্রান্তি
“আমি নিজে উপার্জন করি”, “আমি নিজে টিকে আছি”—
রোযার প্রতিটি ঘণ্টা এই মিথ্যা ভেঙে দেয়।
ক্ষুধা তোমাকে মনে করিয়ে দেয়—
তুমি নির্ভরশীল।
২. গাফলতের অভ্যাস
সেহরি ঘুম ভাঙায়।
ইফতার খাদ্যাভ্যাস বদলায়।
তারাবি রাতকে দীর্ঘ করে।
এই ভাঙনই উদ্দেশ্য—
যাতে চেতনা প্রবেশ করে।
৩. আল্লাহর বিকল্প আসক্তি
খাবার, আলাপ, বিনোদন, ব্যস্ততা—
যা দিয়ে তুমি হৃদয়ের শূন্যতা ভরছিলে।
রমযান তা সরিয়ে দেয়।
শাস্তি হিসেবে নয়—
রোগ নির্ণয়ের জন্য।
যখন এগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়, তুমি কী অনুভব করো?
সেই অনুভূতিই তোমার লুকানো আসক্তি।
রোযার রহস্য
খাদ্য শুধু শরীরের পুষ্টি নয়—
এটি অস্তিত্বের ঘোষণা।
“আমি ক্ষুধার্ত, তাই আমি আছি।”
কিন্তু রোযা বলে—
তুমি ক্ষুধার্ত, তবুও খাচ্ছ না।
এই ফাঁকে ঘটে এক বিস্ময়—
তুমি বুঝতে শুরু করো,
তুমি তোমার চাহিদা নও।
হাদিসে কুদসিতে এসেছে—
“রোযা আমার জন্য, এবং আমিই তার প্রতিদান।”
ইবনে আরাবি বলেন—
রোযা হলো না-করা।
এটি এক পবিত্র শূন্যতা।
তুমি নিজের দাবিকে সরিয়ে দাও—
আর সেই শূন্যতা আল্লাহর উপস্থিতিতে পূর্ণ হয়।
লাইলাতুল কদর—অবতরণের রাত
“কদর” মানে শুধু শক্তি নয়,
সুনির্দিষ্ট পরিমাপ।
এই রাতে ফেরেশতারা নেমে আসে
আল্লাহর নির্দেশ নিয়ে—
তোমার আগামী বছরের তাকদিরের রূপরেখা নিয়ে।
ইবনে আরাবি বলেন—
আত্মা এক পাত্রের মতো।
পাত্র যত বিশাল, গ্রহণ তত গভীর।
ত্রিশ দিনের রোযা, কিয়াম, জিকির—
এই পাত্রকে প্রসারিত করে।
দু’জন একই মসজিদে একই রাতে নামাজ পড়ছে—
একজনের উপর লাইলাতুল কদর নেমে এলো,
অন্যজনের উপর এলো না।
কারণ প্রস্তুতি আলাদা।
কুরআন ও রমযান
রমযানে ক্ষুধা আত্মায় শূন্যতা তৈরি করে।
কুরআন এসে তা পূর্ণ করে।
তিন স্তর—
১. তিলাওয়াত
২. অর্থ বোঝা
৩. তাজাল্লি—
যখন কুরআন তোমাকে পড়ে।
তখন আয়াত কেবল শব্দ নয়—
প্রকাশ।
কেন অধিকাংশ মানুষ বদলায় না?
কারণ তারা রমযানকে “পারফরম্যান্স” বানায়।
তারা ইবাদত করে—
কিন্তু ইবাদতের আগুনে নিজেকে সমর্পণ করে না।
সফল রমযান প্রমাণ হয় তিন মাস পরে।
যদি একটি দোষ চিরতরে কমে যায়—
সে রমযান সত্য ছিল।
যদি সব আগের মতো ফিরে আসে—
তা ছিল অভিনয়।
তারাবির গোপন শক্তি
রাতের শেষাংশে আত্মা কোমল হয়।
দিনের বর্ম খুলে যায়।
ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত, নির্ভরশীল অবস্থায়
যে নামাজ দাঁড়ানো হয়—
সেটিই সবচেয়ে সত্য।
আল্লাহ অবতরণ করেন—
আর ভাঙা হৃদয় ঊর্ধ্বগামী হয়।
মাঝপথে সাক্ষাৎ ঘটে।
শেষ শিক্ষা
আল্লাহ তোমার রোযার প্রয়োজন অনুভব করেন না।
তোমার হৃদয়ের মরিচা পরিষ্কার করার জন্যই তিনি রমযান দিয়েছেন।
রমযান তোমাকে বড় করতে নয়—
ছোট করতে এসেছে।
কম আত্মরক্ষামূলক,
কম অহংকারী,
কম পূর্ণ।
যদি তুমি বছরের পর বছর অপরিবর্তিত থাকো—
রমযান ব্যর্থ হয়নি।
তুমি নিজেকে আগুনে দিতে দাওনি।
পুড়তে দাও।
কারণ ছাই যা রেখে যায়—
তা ক্ষতি নয়।
তা তোমার আসল সত্তা,
যা অবশেষে প্রকাশিত হয়েছে।

নফসের স্তর ও ইবন আরাবীর ভাবনা-----------------------------------------------------তুমি একটিমাত্র সত্তা নও। মহান সুফী আরি...
21/02/2026

নফসের স্তর ও ইবন আরাবীর ভাবনা
-----------------------------------------------------

তুমি একটিমাত্র সত্তা নও। মহান সুফী আরিফ ইবনে আরাবি বহু বছর ব্যয় করেছিলেন মানব-আত্মার মানচিত্র আঁকতে—একজন বিজ্ঞানীর সূক্ষ্মতা ও একজন মরমীর অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে।তিনি দেখলেন, নফস—এই ‘আমি’ ভাব—সাতটি স্বতন্ত্র স্তর অতিক্রম করে বিবর্তিত হয়।
অধিকাংশ মানুষ প্রথম বা দ্বিতীয় স্তরেই জীবন কাটিয়ে দেয়।কিছু মানুষ তৃতীয় বা চতুর্থ স্তরে পৌঁছে ভাবে—“আমরা পৌঁছে গেছি।”কিন্তু খুব অল্পসংখ্যক মানুষ সপ্তম স্তরে পৌঁছায়—যেখানে ‘আমি’ এত বিশালতায় বিলীন হয় যে তাকে ‘আমি’ বলা-ই অর্থহীন হয়ে যায়।আজ আমরা সেই পূর্ণ মানচিত্রের পথে হাঁটব—
যাতে তুমি নিজেই চিনতে পারো—এখন তুমি কোন স্তরে অবস্থান করছ,কী তোমাকে সেখানে আবদ্ধ রেখেছে,
আর পরবর্তী স্তরে উত্তরণের জন্য কী প্রয়োজন।
কারণ একবার এই মানচিত্র চোখে পড়লে, আর অদেখা করা যায় না।তখন প্রতিটি মুহূর্ত একেকটি নির্বাচন—
এখানেই থাকবে, নাকি আরো ওপরে উঠবে?
প্রথম স্তর: নফসুল আম্মারা — আদেশদাতা নফস
এই স্তরেই প্রায় সবাই শুরু করে। অনেকেই এখানেই শেষ হয়।কুরআন সরাসরি বলে—
“নিশ্চয় নফস মন্দের আদেশ দেয়।”এখানে নফস সম্পূর্ণভাবে কামনা-বাসনায় নিমগ্ন।যা চায়, তা-ই এখন চাই।যে তাড়না আসে, তাতেই সাড়া।
এ যেন এক অশিক্ষিত ঘোড়া—অশ্বারোহী নেই, লাগাম নেই।
এ স্তরে নৈতিকতা বাইরের ভয় ও পুরস্কারের উপর নির্ভরশীল।মানুষ ভালো থাকে—যখন কেউ দেখছে।
ভয় না থাকলে, সংযমও থাকে না।অনেক সময় এরা সমাজে সম্মানিতও হতে পারে। নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, দান করে—কিন্তু সবই লেনদেন।“আমি করলাম, তুমি দাও”—এই মনোভাব।এখানে ইবাদত প্রেম থেকে নয়, হিসাব থেকে।সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য—অচেতনতা।মানুষ জানেই না, কেন সে এমন করছে।
সে ভাবে, সে স্বাধীন—
আসলে সে তার কামনার দাস।
এই স্তর ভাঙতে প্রয়োজন ধাক্কা—
কোনো বেদনাদায়ক সত্যের মুখোমুখি হওয়া।
দ্বিতীয় স্তর: নফসুল লাওয়ামা — আত্ম-ভর্ত্সনাকারী নফস
কুরআন এ স্তরেও ইঙ্গিত দেয়—
“আমি শপথ করছি আত্মভর্ত্সনাকারী নফসের।”
এখানে মানুষ জাগতে শুরু করে।
ভুল করলে অনুতাপ হয়।
পাপ করে, কাঁদে। তওবা করে, আবার পড়ে যায়।
এ এক অন্তর্দ্বন্দ্ব—
নফসের টান ও বিবেকের আলো।
অধিকাংশ ধর্মপ্রাণ মানুষ এখানেই আটকে থাকে।
সংগ্রাম আছে, কিন্তু রূপান্তর অল্প।
পাপ → অনুতাপ → প্রতিজ্ঞা → পুনরাবৃত্তি—
এক ঘূর্ণাবর্ত।
এখানে বিপদ—নিজের সংগ্রাম নিয়েই অহং জন্মাতে পারে।
“আমি তো চেষ্টা করছি”—এই পরিচয়েই তৃপ্তি।
এ স্তর অতিক্রম করতে হলে লড়াই নয়—বোঝাপড়া দরকার।
দেখতে হবে—কামনাও নফস, বিচারকও নফস।
আর তুমি?
তুমি সেই সচেতনতা—যে দুটোকেই প্রত্যক্ষ করছে।
এই সাক্ষীভাবই তৃতীয় স্তরের দরজা।
তৃতীয় স্তর: নফসুল মুলহামা — প্রেরণাপ্রাপ্ত নফস
এখানে অন্তর্দ্বন্দ্ব স্তিমিত হতে শুরু করে।
অন্তরে জন্ম নেয় অন্তর্দৃষ্টি।
তুমি রাগ অনুভব করো—কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দাও না।
কামনা আসে—কিন্তু তুমি তা দেখো, বুঝো, পরীক্ষা করো।
প্রতিরোধ নয়—বোঝা।
আর বোঝা হলেই বহু কামনা নিজে থেকেই মিলিয়ে যায়।
এখানে জীবনেও সমাপতন (synchronicity) বাড়ে।
মন এক সুরে মিলে যায় তাকদিরের সাথে।
তুমি বাস্তবতাকে ঠেলো না—বাস্তবতাও তোমার বিরুদ্ধে যায় না।
বিপদ?
আধ্যাত্মিক অহংকার।
“আমি পেয়েছি”—এই ভাব।
চতুর্থ স্তর: নফসুল মুতমাইন্নাহ — প্রশান্ত নফস
কুরআন বলে—
“হে প্রশান্ত আত্মা, তোমার প্রতিপালকের দিকে ফিরে যাও।”
এখানে শান্তি সংগ্রাম থেকে নয়—সমন্বয় থেকে।
ইবাদত বোঝা নয়—প্রবাহ।
ধৈর্য চর্চা নয়—স্বভাব।
এখানে প্রতিক্রিয়া নেই, আছে সাড়া।
ঝড় এলে—ভেতরের আকাশ স্থির থাকে।
তবু এখানে এখনও ‘আমি শান্ত’—এই অনুভব আছে।
এটি সুন্দর, পরিশুদ্ধ ‘আমি’—কিন্তু ‘আমি’ তবু আছে।
পঞ্চম স্তর: নফসুর রাদিয়া — সন্তুষ্ট নফস
এখানে মানুষ আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট নয় শুধু—প্রসন্ন।
রোগ এলে—আলহামদুলিল্লাহ সুস্থতা এলে—আলহামদুলিল্লাহ ।ক্ষতি এলে—আলহামদুলিল্লাহ ।
এ অভিনয় নয়।অন্তরে এক অটল আনন্দ—
যা জানে, সবই কল্যাণের ছায়া।

ষষ্ঠ স্তর: নফসুল মারদিয়া — আল্লাহর প্রিয় নফস
এখানে বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টিতে সন্তুষ্ট নয় শুধু—
আল্লাহও তার প্রতি সন্তুষ্ট।
এ মানুষ নিজের ইচ্ছা নিয়ে আর ব্যস্ত নয়।
সে হয়ে ওঠে এক নিঃশব্দ যন্ত্র—রহমতের প্রবাহ তার মাধ্যমে চলে।
সে প্রচার চায় না, পরিচয় চায় না।
সে জানে—অদৃশ্য থাকাই নিরাপদ।

সপ্তম স্তর: নফসুল কামিলা — পরিপূর্ণ নফস
এখানে মানচিত্র শেষ, রহস্য শুরু।
এ স্তরে ‘আমি কে?’ প্রশ্ন বিলীন হয়।
মানুষ জানে—সে ঢেউ, আর সে-ই সমুদ্র।
সে রশ্মি, আর সে-ই সূর্য।
মুহাম্মদ ছিলেন এই পূর্ণতার সীলমোহর—আল-ইনসানুল কামিল।এখানে অলৌকিকতা স্বাভাবিক হয়ে যায়—কারণ সত্তা উৎসের সাথে একাত্ম।
কিন্তু বাহ্যিকভাবে?
সাধারণ।
ক্ষুধা লাগলে খায়। ক্লান্ত হলে ঘুমায়।বিশেষত্বের চিহ্ন নেই—
কারণ ‘বিশেষ’ হওয়ার ধারণাও বিলীন।
নিজের স্তর চিনবে কীভাবে?
ইবাদতের প্রেরণা কী? ভয়, অপরাধবোধ, প্রেম, না স্বাভাবিক প্রবাহ?
কষ্ট এলে কী হয়? বিদ্রোহ, সহ্য, শান্তি, না কৃতজ্ঞতা?
কামনা কি তোমাকে চালায়, না তুমি তাকে দেখো?
সারাদিন তুমি নিজের কথাই ভাবো, না নিজেকে ভুলে থাকতে পারো?
মনে রেখো—
এই স্তরগুলো কঠিন সীমানা নয়।
একই মানুষ ভিন্ন ক্ষেত্রে ভিন্ন স্তরে থাকতে পারে।
এ মানচিত্র বিচার করার জন্য নয়—জাগার জন্য।
ইবনে আরাবির শেষ শিক্ষা—
এ সাতটি স্তর আসলে সাতটি ভিন্ন সত্তা নয়।
এ সাতটি ভিন্ন মাত্রার বিস্মৃতি ও স্মরণ।
প্রথম স্তরে তুমি সম্পূর্ণ ভুলে গেছ।
সপ্তম স্তরে সম্পূর্ণ স্মরণে ফিরেছ।
আর মাঝখানে—স্বপ্ন থেকে জেগে ওঠার ধীর প্রক্রিয়া।
এখন নিজেকে জিজ্ঞেস করো—
তুমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছ?
আর পরবর্তী ধাপে যেতে তোমার সবচেয়ে বড় বাধা কী?

Address

Dhaka
১২১৬

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when সুফী-Sufi posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share