31/01/2026
ইবন আরাবীর খিজির (আ:) বিষয়ক উপলব্ধি
-------------------------------------------------------------------
আট শতাব্দীরও বেশি আগে, মক্কায় কাবা শরীফের চারপাশে তাওয়াফ করছিলেন হযরত ইবন আরাবি (রহ.)। তাঁর পদচারণা ছিল বাহ্যিক, কিন্তু অন্তর ছিল গভীর ধ্যানে নিমগ্ন। হঠাৎ তিনি অনুভব করলেন—কেউ যেন তাঁর পাশে হাঁটছেন। তিনি তাকিয়ে দেখলেন, সবুজ পোশাকে আবৃত এক ব্যক্তি। তাঁর মুখমণ্ডল এমন এক নূরে দীপ্ত, যা না সূর্যের, না চাঁদের।
লোকটি ঠোঁট নাড়ালেন না, তবু কথা শোনা গেল হৃদয়ের গভীরে। সে কথা এমন ছিল, যা সাধারণ মানুষ জানে না, বইয়ে লেখা থাকে না। তারপর, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি জনসমুদ্রে মিলিয়ে গেলেন।ইবন আরাবি তখন বুঝলেন—তিনি সাক্ষাৎ পেয়েছেন হযরত খিজির (আ.)-এর। সেই অমর সাধকের, যিনি কেবল তাদের কাছেই প্রকাশিত হন, যাদের হৃদয় গোপন ইলম বহনের জন্য প্রস্তুত।
এই সাক্ষাৎ তাঁকে কোনো ফিকহ বা কালাম শেখায়নি। শেখায়নি তত্ত্ব।সে তাঁকে দেখিয়েছিল বাস্তবতা আসলে কীভাবে কাজ করে।
কুরআনে সূরা কাহফে আল্লাহ বলেন—
“আমার বান্দাদের একজন, যাকে আমি আমার পক্ষ থেকে রহমত দান করেছি এবং আমার নিকট থেকে ইলম শিক্ষা দিয়েছি।
তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়নি, কিন্তু উলামায়ে কিরাম একমত—তিনি হযরত খিজির (আ.)।হযরত মূসা (আ.) তাঁর কাছে গিয়েছিলেন এমন ইলম শিখতে, যা কিতাবের পাতায় ধরা পড়ে না। কিন্তু সেই সফরে খিজির (আ.) এমন তিনটি কাজ করলেন, যা বাহ্যিক দৃষ্টিতে পাগলামি মনে হয়েছিল—
একটি গরিব মানুষের নৌকা ক্ষতিগ্রস্ত করলেন,একটি কিশোরকে হত্যা করলেন,আর অকৃতজ্ঞ এক জনপদের জন্য ভেঙে পড়া প্রাচীর মেরামত করলেন।মূসা (আ.) প্রশ্ন করলেন আর প্রতিবার খিজির (আ.) পর্দার আড়ালের হিকমত প্রকাশ করলেন।
নৌকাটি ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছিল এক জালিম রাজার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য।ছেলেটি বড় হয়ে তার পিতামাতার ঈমান ধ্বংস করত।প্রাচীরের নিচে ছিল এতিমদের জন্য সংরক্ষিত গুপ্তধন।এটাই শিক্ষা—ইলমে ইলাহী বাহ্য দেখে না, গভীর সত্য দেখে।
ইবন আরাবি (রহ.) আরও গভীরে গেলেন।তিনি বুঝলেন—খিজির (আ.) কোনো সাধারণ ব্যক্তি নন।তিনি হলেন ইলমে লাদুন্নি-র জীবন্ত রূপ—যে জ্ঞান আল্লাহ সরাসরি হৃদয়ে নিক্ষেপ করেন,যেখানে না বই লাগে, না শিক্ষক, না যুক্তি।
আল-ফুতূহাতুল মাক্কিয়্যাহ-তে ইবন আরাবি লেখেন—
“আমি কাবা শরীফ তাওয়াফ করছিলাম।তখন এক অপরূপ সৌন্দর্যের যুবক আমার কাছে এলেন।
তাঁর চেহারা এমন আলো ছড়াচ্ছিল, যা দুনিয়ার কোনো আলো নয়।তিনি সবুজ পোশাক পরিহিত ছিলেন,আর তাঁর শরীর থেকে এমন ঘ্রাণ আসছিল,যা এই জগতের নয়।”
তিনি জিজ্ঞেস করলেন,“তুমি জানো, কিসের চারপাশে ঘুরছ?”
আমি বললাম, “আল্লাহর ঘর।”
তিনি হাসলেন,
“না। তুমি নিজের চারপাশে ঘুরছ।
কাবা একটি আয়না।তুমি তার প্রতিফলন।”
সেই মুহূর্তে ইবন আরাবির তাওয়াফ থেমে গেল।হজের অর্থ ভেঙে পড়ল—আর নতুন করে গড়ে উঠল।কালো ঘনক, পাথরের ঘর—এটাই গন্তব্য নয়।এটি ইশারা মাত্র।আসল কাবা হলো পরিশুদ্ধ হৃদয়।
খিজির (আ.) বললেন—
“আল্লাহ বলেন,
আমার জমিন ও আসমান আমাকে ধারণ করতে পারে না,
কিন্তু আমার মুমিন বান্দার হৃদয় আমাকে ধারণ করে।
তাহলে বলো, আল্লাহর প্রকৃত ঘর কোথায়?”
ইবন আরাবি বুঝলেন—
মানুষ কাবার চারপাশে ঘোরে আল্লাহকে খুঁজতে, কিন্তু আল্লাহ কাবার মাধ্যমে মানুষকেই খুঁজছেন।তারপর খিজির (আ.) সেই প্রশ্ন করলেন,যা তাঁকে সারাজীবন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে—“যদি তুমি ঘর হও, আর আল্লাহ বাসিন্দা হন—
তাহলে কে কার চারপাশে তাওয়াফ করছে?”উত্তর দেওয়ার আগেই তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
পরবর্তী সাক্ষাতে খিজির (আ.) দেখালেন বিপরীতের রহস্য।নূর ও অন্ধকার, রহমত ও গজব, প্রসার ও সংকোচন সবকিছু একে অপরের শত্রু নয়।এরা একে অপরের সঙ্গী।
তিনি বললেন—“তুমি মনে কর রহমত ভালো, গজব খারাপ।
কিন্তু গজব হলো রহমতেরই আরেক মুখ।একই আগুন জালিমকে পুড়ায়,আর মুমিনকে উষ্ণ করে।”আল্লাহ প্রথম ও শেষ—আল্লাহ প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য—কারণ প্রতিটি রূপই তাঁকে প্রকাশ করে, আবার আড়ালও করে।“তুমি বৈপরীত্য দেখো,” খিজির (আ.) বললেন, “কারণ তুমি চোখ দিয়ে দেখো।হৃদয় দিয়ে দেখলে সব এক হয়ে যায়।”এক মুহূর্তের জন্য ইবন আরাবি দ্বৈততা ছাড়া বাস্তবতা দেখলেন। স্রষ্টা ও সৃষ্টি আলাদা রইল না।এক অস্তিত্ব—অগণিত রূপে প্রকাশিত।
শেষ সাক্ষাতে খিজির (আ.) তাঁকে সময়ের রহস্য দেখালেন।
তিনি দেখালেন—‘কুন ফায়াকুন’ কোনো অতীত ঘটনা নয়।
এটি এখনো ঘটছে। প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহ নতুন করে সৃষ্টি করছেন। তুমি প্রতি মুহূর্তে নতুন।আগের তুমি মৃত।
পরের তুমি এখনো জন্মাওনি।এটাই “খালক জাদীদ”—নতুন সৃষ্টি। তওবা মানে অতীত মুছে ফেলা নয়। তওবা মানে চেতনার অন্য ফ্রেমে লাফ দেওয়া।
শেষ জীবনে ইবন আরাবি বলেছিলেন—
খিজির কোনো ব্যক্তি নন।
তিনি একটি মাকাম।
যখন হৃদয় যথেষ্ট পরিশুদ্ধ হয়,তখন মানুষ নিজেই খিজির হয়ে ওঠে।
তিনি বলেছিলেন—
“আমি খিজিরকে তিনবার রূপে দেখেছি,আর হাজারবার অর্থে।”
যখন জ্ঞান শেখানো ছাড়াই আসে—সে খিজির।
যখন বিশৃঙ্খলার পেছনে হিকমত দেখা যায়—সে খিজির।
যখন বহুত্বে ঐক্য দেখা যায়—সে খিজির।
প্রশ্ন এটা নয়—
তুমি খিজিরকে দেখবে কি না।
প্রশ্ন হলো—
তিনি তো আগেই আছেন,
তুমি কি তাঁকে চিনতে প্রস্তুত...