08/07/2026
সূরা আল-মু'মিনূনের শেষাংশের একটি ভাবনা (আয়াত ১১২-১১৬)
সূরা আল-মু'মিনূনের শেষের দিকে আল্লাহ কিয়ামতের দিনের এক অসাধারণ দৃশ্য তুলে ধরেছেন। তিনি মানবজাতিকে এমন একটি প্রশ্ন করেন যা আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও, জীবন সম্পর্কে আমাদের চিন্তাভাবনাকে ভেতরে ভেতরে নাড়িয়ে দেয়:
**قَـٰلَ كَمْ لَبِثْتُمْ فِى ٱلْأَرْضِ عَدَدَ سِنِينَ**
তিনি জিজ্ঞেস করবেন, “তোমরা পৃথিবীতে কত বছর অবস্থান করেছিলে?” (১১২)
শব্দ চয়নটি অত্যন্ত সুনিপুণ। আল্লাহ কিন্তু জিজ্ঞেস করেননি, 'তোমরা কতদিন বেঁচে ছিলে?' তিনি জিজ্ঞেস করেছেন, 'কাম লাবিছতুম'—তোমরা কতদিন অবস্থান করেছিলে? 'লাবিছা' (لَبِثَ) ক্রিয়াপদটির অর্থ হলো কোনো স্থানে সাময়িকভাবে থাকা, যেমন একজন অতিথি কোথাও অল্প সময়ের জন্য অবস্থান করে। কেউ উত্তর দেওয়ার আগেই এই প্রশ্নটি জীবনের আসল সত্যকে উন্মোচন করে দেয়: এই দুনিয়া কখনোই আমাদের স্থায়ী ঠিকানা ছিল না। আমরা কেবল এটি অতিক্রম করে যাচ্ছিলাম।
তাদের উত্তরটি ছিল চমকে দেওয়ার মতো:
**قَالُوا۟ لَبِثْنَا يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍۢ فَسْـَٔلِ ٱلْعَآدِّينَ**
তারা বলবে, “আমরা মাত্র একদিন বা দিনের কিছু অংশ অবস্থান করেছিলাম। অতএব আপনি তাদের জিজ্ঞেস করুন যারা হিসাব রেখেছিল।” (১১৩)
লক্ষ্য করুন, তারা কিন্তু সত্তর বা আশি বছর বলেনি। বরং তারা বলছে, “একদিন বা দিনের কিছু অংশ।” তারপর কিছুটা অনিশ্চয়তা নিয়ে যোগ করছে, “যারা হিসাব রেখেছিল তাদের জিজ্ঞেস করুন।” নিজেদের জীবনের দৈর্ঘ্য নিয়ে একসময় তাদের যে আত্মবিশ্বাস ছিল, তা যেন পুরোপুরি মিলিয়ে গেছে।
হয়তো এই অনুভূতিটি আমাদের কাছেও খুব একটা অপরিচিত নয়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে সময় যেন সংকুচিত হয়ে আসে। শৈশব, স্কুলজীবন, বিয়ে, সন্তানের জন্ম—দশক জুড়ে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাগুলোকে মনে হয় এই তো সেদিনের কথা। পঞ্চাশটি বছর যদি এই জীবনেই মাত্র একটি ঋতুর মতো মনে হতে পারে, তবে অনন্তকালের প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে একে কেমন মনে হবে?
আল্লাহ তখন উত্তর দেবেন:
**قَـٰلَ إِن لَّبِثْتُمْ إِلَّا قَلِيلًۭا ۖ لَّوْ أَنَّكُمْ كُنتُمْ تَعْلَمُونَ**
তিনি বলবেন, “তোমরা অল্প সময়ই অবস্থান করেছিলে, যদি তোমরা জানতে!” (১১৪)
এখানে মূল বিষয় বছরের সঠিক সংখ্যাটি ছিল না। জীবন দীর্ঘ হোক বা সংক্ষিপ্ত, আল্লাহ একে বর্ণনা করেছেন কেবল 'ক্বালীলান' (قَلِيلًا) বা 'খুবই অল্প' বলে।
এখানে তিরস্কারটি কিন্তু বছরের হিসাব ভুল করার জন্য নয়। তিরস্কারটি হলো—‘লাও আন্নাকুম কুনতুম তা'লামূন’ (যদি তোমরা জানতে)। তারা জানত জীবন সংক্ষিপ্ত, কিন্তু এই জানাশোনাকে তারা কখনোই তাদের জীবনযাপনের ওপর প্রভাব ফেলতে দেয়নি। সমস্যা তথ্যের অভাব ছিল না, বরং সেই সত্যকে নিজেদের অগ্রাধিকারের তালিকায় জায়গা না দেওয়াটাই ছিল মূল ব্যর্থতা।
আমাদের অবস্থানের সময়কাল নির্ধারণের পরপরই, কুরআন অবিলম্বে সেই প্রশ্নটি করে যা আসলে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ:
**أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَـٰكُمْ عَبَثًۭا وَأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُونَ**
“তোমরা কি মনে করেছিলে যে, আমরা তোমাদের উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমাদের কাছে ফিরে আসবে না?” (১১৫)
'আবাছান' (عَبَثًا) শব্দটির অর্থ কেবল 'দিকহীন' বা 'লক্ষ্যহীন' নয়। এটি এমন কিছুকে বোঝায় যা কোনো প্রজ্ঞা বা উদ্দেশ্য ছাড়াই করা হয়েছে। আমাদের অবস্থান যে কেবল 'ক্বালীলান' (অল্প সময়) তা স্পষ্ট করার পর, আল্লাহ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নটি রাখছেন: তাহলে এই সংক্ষিপ্ত অবস্থানের উদ্দেশ্য কী ছিল?
জীবনের এই সংক্ষিপ্ততা এর গুরুত্বকে কমিয়ে দেয় না, বরং বাড়িয়ে দেয়। একটি সংক্ষিপ্ত পরীক্ষা দীর্ঘ পরীক্ষার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং এর প্রতিটি মিনিট আরও বেশি ওজন বহন করে।
হয়তো এই কারণেই আল্লাহ সম্পদ, অর্জন বা ব্যর্থতার কথা আগে না এনে 'সময়' দিয়ে শুরু করেছেন। কারণ সময় হলো সেই পাত্র যা প্রতিটি নেয়ামত, প্রতিটি পরীক্ষা এবং তাঁর কাছাকাছি যাওয়ার প্রতিটি সুযোগকে ধারণ করে রেখেছিল। সেই পাত্রটি যখন মাত্র 'ক্বালীলান' বা সামান্য বলে প্রমাণিত হয়, তখন অন্য সবকিছুই তার আসল রূপ ও গুরুত্ব ফিরে পায়।
এই পরিচ্ছেদটি আমাদের দৃষ্টিকে নিজেদের থেকে সরিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে শেষ হয়:
**فَتَعَـٰلَى ٱللَّهُ ٱلْمَلِكُ ٱلْحَقُّ ۖ لَآ إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ رَبُّ ٱلْعَرْشِ ٱلْكَرِيمِ**
“অতএব মহিমান্বিত আল্লাহ, যিনি প্রকৃত মালিক, তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি সম্মানিত আরশের অধিপতি।” (১১৬)
কত চমৎকার ও উপযুক্ত একটি সমাপ্তি!
আমাদের অবস্থান ছিল 'ক্বালীলান' (ক্ষণস্থায়ী)। আর তাঁর রাজত্ব চিরস্থায়ী। যিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তোমরা কতদিন অবস্থান করেছিলে?” তিনি হলেন 'আল-মালিকুল হাক্ক'—প্রকৃত শাসক, পরম সত্য; যাঁর কর্তৃত্ব প্রতিটি প্রজন্ম, প্রতিটি সাম্রাজ্য এবং প্রতিটি মানুষের জীবনকে ছাড়িয়ে টিকে থাকে।
আমাদের পুরো জীবনটি যদি একদিন কোনো এক সকাল বা বিকেলের মতো মনে হয়, তবে আসল প্রশ্নটি এটা নয় যে আমরা জীবনকে সংক্ষিপ্ত বলে জানি কি না। আসল প্রশ্ন হলো—যিনি এই প্রশ্নটি করবেন তাঁর সামনে দাঁড়ানোর আগেই আমরা এই জ্ঞানকে আমাদের জীবনযাত্রার ধরন বদলে দেওয়ার সুযোগ দেব কি না।