15/12/2025
হাMলা, Hoত্যা, লুটতRaজ ! মহাগ্রন্থ পবিত্র কুরআন ও হাদিসে কী বলে?
মহান আল্লাহ এই পৃথিবীকে বৈচিত্র্যময় করে সৃষ্টি করেন ৷
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন"
يٰۤاَيُّهَا النَّاسُ اِنَّا خَلَقۡنٰكُمۡ مِّنۡ ذَكَرٍ وَّاُنۡثٰى وَجَعَلۡنٰكُمۡ شُعُوۡبًا وَّقَبَآٮِٕلَ لِتَعَارَفُوۡا ؕ اِنَّ اَكۡرَمَكُمۡ عِنۡدَ اللّٰهِ اَ تۡقٰٮكُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰهَ عَلِيۡمٌ خَبِيۡرٌ
“হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন স্ত্রীলোক থেকে এবং তোমাদেরকে পরিণত করেছি বিভিন্ন জাতিতে ও বিভিন্ন গোত্রে, যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধিক মর্যাদাবান সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধিক মোত্তাকি। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু জানেন, সবকিছুর খবর রাখে (সুরা আল হুজুরাত ৪৯: আয়াত ১৩)
আল্লাহ তায়ালা এক জোড়া মানব-মানবী থেকে জাতিগোষ্ঠী সৃষ্টি করেন৷ মানুষ যেন বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি ও মানুষ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে আল্লাহর সৃষ্টিশৈলির প্রশংসা করতে পারে এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি তাদের ইমান বৃদ্ধি করতে পারে, মহান আল্লাহ সেই ব্যাবস্থা করেন ৷ মানুষ যেই জাতিরই হোক না কেন, সকলেরই সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা ও লালনকর্তা আল্লাহ ৷ সকলেই আল্লাহর সৃষ্টি আলো-বাতাস গ্রহণ করে পৃথিবীতে বেঁচে থাকে ৷ একজন মুসলিম মায়ের মাতৃগর্ভে মানব শিশুর ভিতরে যিনি রুহ ফুঁকে দেন, একজন অমুসলিম মায়ের মাতৃগর্ভে তিনিই মানব শিশুর ভিতরে রুহ ফুঁকে দেন৷ মুসলিম কিংবা অমুসলিম এমনকি প্রাণীকুল, সকলেই আল্লাহর সৃষ্টি এবং সকলের রিজিকের ব্যবস্থা স্বয়ং আল্লাহ-ই করেন৷
বিদায় হজে হযরত রাসুল (সা.) আরাফাতের পর্বত শীর্ষে দাঁড়িয়ে উপস্থিত সাহাবিদের উদ্দেশে যে বাণী মোবারক প্রদান করেন, তা এখনো প্রত্যেক মুসলমানের হৃদয়ে সমুজ্জ্বল হয়ে আছে। এই বাণী মোবারক অন্ধকার ও অসাম্যের চির অবসান ঘোষণা করে দুনিয়ার বুকে শান্তির আদর্শ এবং এক নতুন আলোকময় যুগের সূচনা করে। বিদায় হজের ভাষণের এক পর্যায়ে তিনি বলেন, “হে লোকজন! সাবধান! তোমাদের আল্লাহ একজন। কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের, কোনো আরবের ওপর কোন অনারবের, কোনো কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের, এবং কোনো শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, আল্লাহভীতি ছাড়া।” [মুসনাদে আহমাদ: ৫/৪১১]
আল্লাহ যদি ইচ্ছা করতেন, তিনি সবাইকে এক জাতিগোষ্ঠী করে তৈরি করতে পারতেন, কিংবা তিনি ইচ্ছা করলে পৃথিবির সব লোকই ইমানদার হতো ৷ মুসলিম বা অমুসলিম হওয়া আল্লাহর ইচ্ছাধীন, তাই ইসলাম জোর করে কাউকে মুসলিম করার অনুমতি দেয় না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর আপনার রব যদি চাইতেন, তবে পৃথিবীতে যারা আছে তারা সবাই সমবেতভাবে ইমান আনতো। তবে কি আপনি মানুষের উপর জবরদস্তি করবেন, যাতে তারা মু'মিন হয়ে যায়?” (সুরা ইউনুস ১০ আয়াত ৯৯) ৷
ইমান আনয়নের জন্য জোড়, জবরদস্তি ও জুলুম আল্লাহর পছন্দ নয় , বরং মানুষকে ইমানদার বানানো আল্লাহর পবিত্রহাতে ৷ মানুষকে জোড় জবরদস্তি ও অত্যাচার করলে ইসলামের প্রতি তাদের ক্ষোভ ও ঘৃণা তৈরি হবে ৷ আল্লাহ ও হযরত রাসুল (সা.) থেকে তারা আরো দূরে সরে যাবে।
পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে মহান আল্লাহ নবুয়তের যুগে নবি-রাসুল পাঠিয়েছেন ও বর্তমান বেলায়েতের যুগে আওলিয়া কেরাম পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন , তাঁরা সকলেই মানবদরদি, উদার এবং অত্যন্ত মানবিক।আল্লাহ প্রেরিত মহামানবগণ মানবতার মূর্ত প্রতীক হয়ে থাকেন। ভিন্নমতের মানুষদেরকে তারা দমন পীড়ন করেন না, বরং যথাসম্ভব সুবিচার করেন ৷ হযরত রাসূল (সা.) নিজে এবং তাঁর সাহাবিগণ বিধর্মীদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষভাব পোষন করতেন না ৷
হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে, হযরত সাহল ইবনে হুনাইফ (রা.) ও হযরত কায়েস ইবনে সাদ (রা.) একদিন বসা অবস্থায় ছিলেন। তাঁরা তখন কাদিসিয়ায় থাকেন। পাশ দিয়ে একটি লাশ নেওয়া হচ্ছিল। তা দেখে তারা দুজনই দাঁড়ালেন। উপস্থিত লোকেরা তাদেরকে জানাল, ‘এ এক অমুসলিমের লাশ।’ তাঁরা তখন শোনালেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পাশ দিয়েও একবার এক লাশ নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তিনি যখন তা দেখে দাঁড়ালেন, উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম তখন বললেন, এটি তো ইহুদির লাশ। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, أليست نفسا অর্থাৎ ‘সে মানুষ ছিল তো?’ -সহীহ বুখারী, হাদীস : ১৩১২
অন্য এক হাদিসে এসেছে , যখন সাকিফ গোত্রের প্রতিনিধিরা হযরত রাসুল (সা.)-এর দরবারে হাজির হন, তখন তারা মসজিদের শেষে গম্বুজের কাছে অবস্থান করেছিলেন। যখন নামাজের সময় হলো, একজন লোক বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল! নামাজের সময় হয়েছে। এরা একদল অমুসলিম, তারা মসজিদে আছেন। তখন রাসুল (সা.) বলেন, ‘অমুসলিমদের কারণে জমিন নাপাক হয় না।” (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস : ৮৫৭৬) ৷ দয়াল রাসুল (সা.)-এর হাদিস থেকে স্পষ্ট যে, তারাও এক আল্লাহর সৃষ্টি , যাদেরকে আল্লাহই রিজিকের ব্যবস্থা করেন, এবং পৃথিবীতে বাঁচিয়ে রেখেছেন ৷ তারা অমুসলিম, কিন্তু তাদের কারণে জমিন নাপাক হয় না ৷
মহান আল্লাহ এতটাই মহান, তিনি চান না যে, এক আকিদার মানুষের ওপর অন্য আকিদার মানুষ অত্যাচার করুক, এক জাতির উপর অন্য জাতি দমন পীড়ন করুক ৷ হোক সে অন্য আকিদার, অন্য জাতের, শেতাঙ্গ কিংবা কৃষাঙ্গ৷ হোক ধনী কিংবা গরিব ৷
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন,“ আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না সদ্ব্যবহার ও ন্যায়াচরণ করতে তাদের সাথে, যারা দ্বিনের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেয়নি। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়চারীদেরকে ভালোবাসেন। আল্লাহ তো তোমাদেরকে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেন কেবল ঐসব লোকের সাথে, যারা দ্বিনের ব্যাপারে তোমাদের সাথে যু/দ্ধ করেছে এবং তোমাদেরকে ঘরবাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে এবং তোমাদেরকে বহিষ্কার করার ব্যাপারে সাহায্য করেছে। যারা এদের সাথে বন্ধুত্ব করবে তারা তো হবে প্রকৃত জালিম।” (সুরা মুমতাহিনা ৬৯ : আয়াত ৮-৯)৷
আল্লাহ চান আমরা যেন ইনসাফকারী হই ৷ হযরত উমর (রা.)-এর দৃষ্টান্ত আমাদের জন্য যথেষ্ট শিক্ষা। তিনি একজন বৃদ্ধ ইহুদিকে ভিক্ষা করতে দেখে বায়তুল মালের ভাতা থেকে তার জীবিকার ব্যবস্থা করেন এবং বলেন, “আমরা যদি তোমার যৌবনে জিজিয়া নেই, আর বার্ধক্যে তোমাকে ধ্বংসের মুখে ফেলে দিই, তবে আমরা ইনসাফ করলাম না।” (কিতাবুল আমওয়াল, হাদিস ১৭৯)।
সুতরাং অন্য আকিদার মানুষের প্রতি অত্যাচার , নির্যাতন ও হত্যাতো করা যাবেই না, এমনকি বিধর্মীদের প্রতি সঠিক ইনসাফ করতে হবে। আল্লাহ ইনসাফকারীদের ভালোবাসেন। যে সকল অমুসলিম মুসলিম দেশে সেই রাষ্ট্রের আইন মেনে বসবাস করে, তাদের আঘাত করা অন্যায়। হাদিসে বর্ণিত আছে, “যে ব্যক্তি কোনো অমুসলিম নাগরিককে হত্যা করল, সে জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না, অথচ তার সুগন্ধি ৪০ বছরের রাস্তার দূরত্ব থেকেও পাওয়া যায়।’ (বুখারি শরিফ: ৩-১৬৬)।
সুতরাং ভিন্নমত দমনে হামলা, হত্যা, লুটতরাজ ইত্যাদি বেইনসাফি কর্মকাণ্ড মোহাম্মদী ইসলাম সমর্থন করে না ৷ আল্লাহ আমাদের সবাইকে ধর্মের সঠিক বুঝ দান করুন ৷ আমিন।।
*লেখাঃ Dr. Qudrat E Khoda