24/05/2026
নজরুলের কালীভক্তি ও শ্যামা সঙ্গীত
আজ আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিন। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বলা হয় প্রেম,বিরহ ও বিদ্রোহের কবি যার২২ টি কাব্যগ্রন্থ, ৬ টি সঙ্গীত গ্রন্থ, ৫ টি গল্প ও উপন্যাস, ৯ টি নাটক ও অন্যান্য রচনাসহ অসংখ্য অমর সৃষ্টি রয়েছে।
তাঁর সংগীত সমূহের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল শ্যামা সংগীত। শাক্তদর্শন’ দ্বারা ব্যপকভাবে প্রভাবিত ছিলেন নজরুল।
শাক্তদর্শন থেকেই নজরুলের শ্যামাসঙ্গীত রচনা শুরু।
দেবী কালীর অন্য নাম শ্যামা। শ্যামাবন্দনা বা শ্যামাদেবীর উদ্দেশ্যে নিবেদিত গানগুলোকে সাধারণভাবে শ্যামাসঙ্গীত বলা হয়। শাক্তসঙ্গীত নামটিরও ব্যবহার হয় এক্ষেত্রে। ‘শ্যামা মা’র পরিচয় দিতে গিয়ে কবি লিখেছিলেন-
“মার হাতে কালি মুখে কালি,
মা আমার কালিমাখা, মুখ দেখে মা পাড়ার লোকে হাসে খালি।
মোর লেখাপড়া হ’ল না মা, আমি ‘ম’ দেখিতেই দেখি শ্যামা,
আমি ‘ক’ দেখতেই কালী ব’লে নাচি দিয়ে করতালি।”
নজরুলের শ্যামাসঙ্গীত জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল, আবেগের গভীরতা। কেউ কেউ মনে করেন, নজরুল হৃদয়ের গভীর থেকে শ্যামার প্রতি ভক্তি নিবেদন করেছিলেন। আর সে ভক্তি সাকার হয়েছিল তার গানের ভাষাতে। তিনি লিখেছিলেন-
“ভক্তি, আমার ধুপের মত,
ঊর্ধ্বে উঠে অবিরত।
শিবলোকের দেব দেউলে,
মা’র শ্রীচরণ পরশিতে।”
বঙ্গদেশে তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শাক্তদর্শন ও শক্তিপূজা ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে। শ্যামা সঙ্গীতের ধারাটি বিকাশ লাভ করে খ্রিষ্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীতে। আঠারো শতকের মধ্যভাগে সাধক কবি রামপ্রসাদ সেন এতে প্রাণ সঞ্চার করে বাংলা গানের জগতে শাক্ত পদাবলি বা শ্যামা সঙ্গীত নামে একটি বিশেষ সঙ্গীতধারা প্রতিষ্ঠিত করেন। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ শ্যামা সঙ্গীতকার ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম।
নজরুল প্রায় ৪০০০ গান রচনা করেছেন এবং অধিকাংশের সুর নিজেই করেছেন, যেগুলো এখন নজরুল সঙ্গীত বা ‘নজরুল গীতি’ নামে পরিচিত। যার বড় একটি অংশই শ্যামা সঙ্গীত। সঙ্গীত বিষয়ক নজরুলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হচ্ছে ‘রাঙা-জবা’। ১৯৬৬ সালে ১০০টি শ্যামা সঙ্গীতে সমৃদ্ধ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। তখন মূল্য ছিল তৎকালীন তিন টাকা। শক্তি পূজায় তাঁর ভক্ত হৃদয়ের অকৃত্রিম আকুলতা ও আর্তি রাঙা-জবা’র গানের মধ্যে রূপায়িত।
এক সময় পূর্ববঙ্গে নজরুলের রচিত এই সকল শ্যামা সংগীত নিষিদ্ধ ছিল।
নারীশক্তির প্রতি নজরুলের ভক্ত হৃদয়ের অকৃত্রিম আকুলতা চিরকালই ছিল। তাই শুধু শ্যামা সঙ্গীতের প্রভাব সঙ্গীতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং তার কবিতাতেও প্রকাশ পেয়েছিল। ধূমকেতুতে প্রকাশিত ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ নামে যে কবিতাটির জন্য কবির এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়। সেই কবিতায়ও ছিল শাক্তসাধনার প্রকাশ-
“আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?
স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল।
দেব–শিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবকদের দিচ্ছে ফাঁসি,
ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, আসবি কখন সর্বনাশী?”
সাহিত্য চর্চার জন্য সামান্য কিছু সময় পেয়েছিলেন নজরুল। কিন্তু জীবনের এই অল্প সময়েই তিনি রেখে যান বাংলার জন্য এক সুর ভাণ্ডার। তাঁর শ্যামাসঙ্গীতের রচনা কৌশল আর ভক্তির গভীরতা বোঝা যায় নির্দ্বিধায়। সে সব ভক্তিগীতির মধ্যেও ছিল ধূমকেতুর ন্যায় অন্তরজ্বলা আর বিষেভরা চির বিদ্রোহের বাণী। আজও ভারতবর্ষে শ্যামা সঙ্গীত বিষয়ে আলোচনা উঠলে সবার আগে নজরুলের সৃষ্টি দিয়ে শুরু করতে হয়। শ্যামা সঙ্গীতের নান্দনিক প্রভাব পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মরমী ও ভক্তিগীতি, এমনকি দেশাত্মবোধক গানের মধ্যে আজও প্রবহমান।কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর অসামান্য ও সুরসমৃদ্ধ শ্যামা সঙ্গীতের জন্য চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।নজরুলের শ্যামা সঙ্গীতের উল্লেখযোগ্য দিক ও বিখ্যাত কিছু গানের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
মূল বৈশিষ্ট্যমানবীয় রূপ: নজরুলের শ্যামা সংগীতে দেবী কালী কোনো ভীতিকর চরিত্র নন, বরং তিনি একজন স্নেহময়ী মা।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: একজন মুসলিম হয়েও তিনি হিন্দু দেবীর প্রতি যে নিখাদ ভক্তি দেখিয়েছেন, তা তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অনন্য নিদর্শন।
গ্রন্থ: তাঁর শ্যামা সঙ্গীতগুলোর বড় একটি অংশ ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত [রাঙা-জবা] নামক গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে।
জনপ্রিয় শ্যামা সঙ্গীতসমূহ"আমার ভাবের অভাব লয় হয়েছে শ্যামা-ভাব-সমাধিতে""কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন""আমার কালো মেয়ে পালিয়ে বেয়ায়""কালী কালী মন্ত্র জপি""আজও মা তোর পাইনি প্রসাদ""আমায় আঘাত যত হানবি শ্যামা"নজরুল সঙ্গীতের অন্যান্য ধারার মতো তাঁর শ্যামা সঙ্গীতগুলোও আজও অত্যন্ত জনপ্রিয়।
©️ সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।