05/11/2024
আর রাহীকুল মাখতূম ০২
লালন-পালন
সেসময় আরবদের মাঝে সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ প্রথা চালু ছিল। আরবরা মনে করতো সেসময় যেহেতু শহর-নগরের পরিবেশ জনাকীর্ণ এবং রোগ ব্যাধিতে পরিপূর্ণ, তাই শহর থেকে দূরে উন্মুক্ত গ্রামীণ পরিবেশে তাদের লালন-পালন করাই উত্তম। তাই শিশুরা যাতে রোগমুক্ত থাকতে পারে এবং বলিষ্ঠ দেহ ও মজবুত মাংসপেশির অধিকারী হয়, সেইসঙ্গে বিশুদ্ধ আরবি ভাষা শিখতে পারে, সে উদ্দেশ্যে শিশুদের বেদুইন ধাত্রীদের হাতে তুলে দেওয়া হতো।
সেই নিয়ম অনুযায়ী আব্দুল মুত্তালিব শিশু মুহাম্মাদ-কে দুধ পান করানোর উদ্দেশ্যে ধাত্রী অনুসন্ধান করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত তিনি হালিমা বিনতে আবু যুয়ায়েরকে শিশু মুহাম্মাদ-এর ধাত্রী হিসেবে বাছাই করেন। এই মহিলা বনু সা'দ বিন বকর গোত্রের একজন 'খাতুন' ছিলেন। তাঁর স্বামীর নাম ছিল 'হারিস' বিন আব্দুল উজ্জা। আর ডাক নাম ছিল ‘আবু কাবশাহ'। তিনিও বন্ধু সা'দ গোত্রের সাথে সম্পর্কযুক্ত ছিলেন।
বিবি হালিমা ও হারিস দম্পতির কয়েকটি সন্তান ছিল। তাঁরা রাসূলুল্লাহ-এর দুধ সম্পর্কিত ভাই ও বোনের সম্মান লাভ করেন। তাদের নাম যথাক্রমে আব্দুল্লাহ, আনিসাহ, হোযাফা অথবা জোযামা। হোযাফা 'শায়মা' নামেই অধিকতর পরিচিত ছিলেনকথিত আছে-এই শায়মা-ই রাসূলুল্লাহ-কে লালন-পালনের ব্যাপারে মা হালিমাকে সাহায্য করতেনঅন্যদিকে রাসূল -এর চাচাতো ভাই আবু সুফিয়ান বিন হারিস বিন আব্দুল মুত্তালিবও বিবি হালিমার সূত্র ধরে দুধ-সম্পর্কিত ভাই ছিলেন।
রাসূলুল্লাহ-এর চাচা হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিবকেও বনু সা'দ গোত্রের এক মহিলা দুধ পান করিয়েছিলেনবিবি হালিমার ঘরে থাকা অবস্থায় উক্ত মহিলাও একদিন রাসূলুল্লাহ-কে দুধ পান করিয়েছিলেনএ কারণে রাসূলুল্লাহ এবং হামজা দুজনে সম্পর্কে দুধভাই হয়ে যান-প্রথম সূত্রে সুওয়ায়বার সম্পর্কের মাধ্যমে এবং দ্বিতীয় সূত্রে বনু সা'দ গোত্রের সেই মহিলার মাধ্যমে।১
দুধপান করানোর সময় বিবি হালিমা শিশু মুহাম্মাদ-এর অলৌকিক গুণের বিভিন্ন দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে আশ্চর্য ও হতবাক হয়ে যান। বিবি হালিমার বর্ণনা সূত্রে ইতিহাসবিদ ইবনে ইসহাক বলেছেন, বিবি হালিমা এবং তাঁর স্বামী বনু সা'দ গোত্রের একদল মহিলার সাথে অর্থের বিনিময়ে দুধপান করাবে-এমন শিশুর সন্ধানে মক্কায় আগমন করেন। সেই সময় দুর্ভিক্ষের কারণে আরবে প্রচুর খাদ্য ও অর্থ সংকট চলছিল।
বিবি হালিমা বলেন-'আমি একটি সাদা মাদি গাধার পিঠে চড়ে পথ চলছিলাম। আমার সাথে উস্ত্রীও ছিল। কিন্তু উষ্ট্রীর ওলান থেকে একবিন্দুও দুধ বের হচ্ছিল না। আমার বুকেও দুধ ছিল না। এদিকে ক্ষুধার তাড়নায় শিশুরা এতই ছটফট করছিল যে, সারাটা রাত আমরা ঘুমাতে পারিনি। এমতাবস্থায় আমরা বৃষ্টি ও সচ্ছলতার আশা নিয়ে প্রহর গুণছিলাম। কিন্তু অবস্থার তেমন কোনো উন্নতি না হওয়ায় অবশেষে উপায়ন্তর না দেখে আমরা পুনরায় পথ চলা শুরু করলামআমি মাদি গাধাটির ওপর সওয়ার হয়ে পথ চলতে থাকলাম। গাধাটি ছিল খুবই দুর্বল। গাধাটি দুর্বলতা ও শক্তিহীনতার কারণে এতই ধীরে চলতে থাকে যে, এতে কাফেলার অন্য সাথিরা অত্যন্ত বিরক্তবোধ করতে শুরু করে।
যা-ই এমনই এক অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্য দিয়ে আমরা মক্কায় উপস্থিত হই। অতঃপর আমাদের দলে এমন কোনো মহিলা ছিল না-যার কাছে শিশু নবী মুহাম্মাদ-কে দুধ পান করানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়নি। কিন্তু যখনই জানতে পারল শিশু মুহাম্মাদ এতিম, তখনই আর কেউ তাঁকে গ্রহণ করতে আগ্রহ দেখাল না। কারণ, দুধদানের বিনিময়ে শিশুর পিতার থেকে আশানুরূপ বিনিময় লাভের প্রত্যাশা সকলেরই ছিল। কিন্তু এক্ষেত্রে তেমন কোনো সম্ভাবনাই নেইমা বিধবা, দাদা বৃদ্ধ, এই শিশুকে লালন-পালন করে বিনিময়ে আর কীই-বা পাওয়ার আশা করা যায়! সুতরাং এসব সাত-পাঁচ ভেবে কাফেলার কেউই তাঁকে নেওয়ার আগ্রহ দেখাল না।'
বিবি হালিমা আরও বলেন-'এদিকে দলের অন্যান্য মহিলা-যারা আমার সাথে গিয়েছিল, তারা সকলেই একজন করে শিশু নিল। অবশিষ্ট রইলাম শুধু আমি। আমার পক্ষে কোনো শিশু সংগ্রহ করা সম্ভব হলো না। যতই ফিরে আসার সময় ঘনিয়ে আসতে লাগল, আমার মনটা যেন ততই ভারাক্রান্ত হয়ে উঠতে লাগল। অবশেষে আমি স্বামীকে বললাম-আমার সাথিরা সকলেই দুধপানের জন্য শিশু নিয়ে ফিরছে, আর আমাকে শূন্য হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে। শূন্য হাতে ফিরে যাওয়ার চেয়ে বরং আমি সেই এতিম শিশুটাকেই নিয়ে যাই-এতে যা করেন আল্লাহ।'
স্বামী বললেন-'আচ্ছা ঠিক আছে, কোনো অসুবিধা নেই। তুমি গিয়ে তাকে নিয়ে এসো। এমনও হতে পারে যে, আল্লাহ হয়তো এর মধ্যেই আমাদের জন্য বরকত রেখেছেন।'
বিবি হালিমা বলেন- 'এমন এক অবস্থায় আমি শিশু মুহাম্মাদ-কে দুধপানের জন্য গ্রহণ করলাম।' বিবি হালিমা আরও বলেন-'আমি যখন শিশু মুহাম্মাদ-কে নিয়ে মক্কায় আমাদের অস্থায়ী বাসগৃহে ফিরে এলাম এবং তাঁকে কোলে নিলাম, তখন তিনি দুই সিনা আমার বুকের সাথে মিলিত করে পূর্ণ পরিতৃপ্তি নিয়ে দুধ পান করলেনতাঁর দুধভাই অর্থাৎ আমার গর্ভজাত সন্তানও পূর্ণ তৃপ্তিসহ দুধ পান করলএরপর দুজনেই ঘুমিয়ে পড়ল। অন্যদিকে আমার স্বামী উষ্ট্রী দোহন করতে গিয়ে দেখেন, ওলান দুধে পরিপূর্ণতিনি এত বেশি পরিমাণে দুধ দোহন করলেন যে, আমরা উভয়েই তৃপ্তির সাথে পান করলাম এবং শান্তিতে রাতীযাপন করলাম। পরিতৃপ্তির সাথে রাতীযাপন শেষে যখন সকাল হলো তখন আমার স্বামী বললেন-“হালিমা, আল্লাহর শপথ! তুমি এক মহাভাগ্যবান সন্তান লাভ করেছউত্তরে বললাম, “ভাব-সাব ও অবস্থাদৃষ্টে আমারও তা-ই মনে হচ্ছে।”
বিবি হালিমা বলেন-'এরপর আমাদের দল মক্কা থেকে নিজ নিজ গৃহে ফেরার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলশিশু মুহাম্মাদ-কে বুকে নিয়ে সেই দুর্বল ও নিস্তেজ মাদি গাধার ওপর সওয়ার হয়ে আমিও যাত্রা শুরু করলাম। কিন্তু আল্লাহর শপথ! আমার সেই দুর্বল গাধাটাই সকলকে পেছনে ফেলে দ্রুতবেগে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকল। কাফেলার আর কোনো গাধা-ই তার সাথে তাল মিলিয়ে পথ চলতে পারছিল না। এমনকি অন্য সঙ্গিনীরা বলতে লাগল, “ওগো আবু যুয়ায়েরের কন্যা! ব্যাপারটা কি হলো বলো তো? আমাদের প্রতি একটু অনুগ্রহ করো। এটা কি সেই গাধাটা নয়-যার ওপর সওয়ার হয়ে তুমি এসেছিলে?”
আমি বললাম-"হ্যাঁ হ্যাঁ, আল্লাহর শপথ! এটা সেই গাধাই-যেটার ওপর সওয়ার হয়ে মক্কায় এসেছিলাম।"
তারা বলল-“নিশ্চয় এর মধ্যে বিশেষ রহস্যজনক কোনো ঘটনা ঘটেছে।” তারা জাল রহস্যাবৃত অবস্থার মধ্য দিয়ে
আমার জানা ছিল না যে, আল্লাহর এ জমিনে আমাদের অঞ্চলের মানুষের চেয়ে অন্য কোনো অঞ্চলের মানুষ অধিকতর অভাবগ্রস্ত থাকতে পারে। কিন্তু আনুষঙ্গিক বিভিন্ন অবস্থার প্রেক্ষাপটে আমার সে ভুল ধারণা ভেঙে গেল।
মক্কা থেকে ফিরে আসার পরবর্তী সময়ে আমাদের বকরিগুলো চারণভূমি থেকে ঘাস খেয়ে পরিতৃপ্ত হারো বাড়িতে ফিরে আসত। ইতঃপূর্বে দুগ্ধবতী বকরিগুলো দোহন করে আমরা পরিতৃপ্তির সাথে দুধ পান করতাম। অথচ অন্য লোকেরা এক ফোঁটা দুধও পেতো না। তাদের পশুগুলোর ওলানে কোনো দুধই থাকত না। এমন অবস্থার কারণে অন্য পশুপালের মালিকরা তাদের রাখালদের বলত, 'হতভাগারা! বনু যুওয়ায়েরের কন্যার রাখাল পশুপাল নিয়ে যেখানে যায়, তোমরা কি পশুপাল নিয়ে সেই চারণভূমিতে যেতে পারো না?'
ফলে আমাদের রাখাল যে চারণভূমিতে পশুপাল নিয়ে যেত, অন্যান্য রাখালরাও সেই ভূমিতে যেত। কিন্তু এ সত্ত্বেও তাদের পশুগুলো ঘাসের অভাবে ক্ষুধার্ত ও অভুক্ত অবস্থায় গৃহে ফিরে আসত। সেসব পশুর ওলানে দুধও থাকত নাঅথচ আমাদের বকরিগুলো ঘাস খেয়ে পরিতৃপ্ত এবং ওলানে পূর্ণমাত্রায় দুধ সহকারে ঘরে ফিরে আসতআমরা প্রত্যেকটি কাজকর্মে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে বরকত লাভ করতে থাকলাম।
এভাবে শিশু মুহাম্মাদ-এর পুরো দুটো বছর অতিবাহিত হয়ে গেলতারপর আমি তাঁর স্তন পান বন্ধ করে দিলাম। অন্যান্য শিশুদের তুলনায় শিশু মুহাম্মাদ এমন সুন্দরভাবে বেড়ে উঠতে থাকলেন যে, দুই বছর পুরো হতে না হতেই তাঁর দেহ বেশ শক্ত ও সুঠাম হয়ে গড়ে উঠল।
লালন-পালনের মেয়াদ দুই বছর পূর্ণ হওয়ায় আমরা শিশু মুহাম্মাদকে তাঁর মায়ের কাছে দিতে গেলাম।
কিন্তু তাঁকে নিয়ে আসার পর থেকে আমাদের সংসারে যে সচ্ছলতা ও বরকতের সুফল ভোগ করে আসছিলাম, সে কারণে মনে মনে আশা করছিলাম, তিনি যেন আরও কিছুদিন আমাদের কাছে থাকেন।
তাঁর মায়ের কাছে আমাদের ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করে বললাম-তাঁকে আরও কিছু সময় আমাদের সাথে থাকতে দিন-যাতে সে সুস্বাস্থ্য ও সুঠাম দেহের অধিকারী হয়ে উঠতে পারেসেইসঙ্গে মক্কায় মহামারির ব্যাপারেও আমরা কিছুটা ভয় করছিআমাদের বারংবার অনুরোধ ও আন্তরিকতায় আশ্বস্ত হয়ে তিনি শিশু মুহাম্মাদ-কে পুনরায় আমাদের সাথে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সম্মতি প্রদান করলেন।