21/09/2024
জামায়াত-শিবির নিয়ে ভারতের প্রোপাগান্ডা
বাংলাদেশে অনেকেই এখনো জামায়াত-শিবিরের নাম শুনলে একটু বাকা চোখে তাকায়। এর দুটি কারণ রয়েছে—একটি হলো তাদের ১৯৭১ সালের ভূমিকা, এবং আরেকটি হলো আফগানিস্তান-পাকিস্তান জুজুর ভয়। যা বুঝলাম, ২০২৪ সালে স্বৈরাচার দমনে তাদের যে অবদান ছিল, তা দিয়েও ১৯৭১ সালের বদনাম পুরোপুরি ঘোচানো যায়নি। আমি এই দুটি কারণের সঙ্গে আংশিকভাবে একমত, পুরোপুরি নয়। জামায়াত-শিবিরের বিরোধী সবচেয়ে বড় প্রোপাগান্ডা চালায় ভারত, আওয়ামী লীগ বা বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক শক্তি নয়। বাংলাদেশে ভারতের আগ্রাসনের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে ভারত জামায়াত-শিবিরকে দেখে। জুলাই-অগাস্টের ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ভারতীয় কিছু মিডিয়ার ব্যাখ্যা দেখে এটা বোঝা যায়।
২০ জুলাই, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস তাদের 'এক্সপ্লেইনড' বিভাগের অর্ধেকজুড়ে কোটা বিশ্লেষণ কভার করে। এই দীর্ঘ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কোটা ইস্যুর পটভূমি, আদালতের রায়, সংবিধানিক বৈধতা এবং বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়। শেষে 'রাজাকার' সম্পর্কেও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
২২ জুলাই, টাইমস অফ ইন্ডিয়া একটি সম্পাদকীয় লেখে, যার শিরোনাম ছিল ‘ঢাকায় অশান্তি’। এতে লেখা হয়, ‘আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জনগণের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ ভারতের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি। আওয়ামী লীগ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে পাকিস্তান-সমর্থিত কোনো শাসন যদি বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসে, তা ভারতের জন্য মারাত্মক হবে। তাই ভারতকে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে, যাতে ভারতের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা হয়।’
১ আগস্ট, হিন্দুস্তান টাইমস লেখে, "জঙ্গি ও সন্ত্রাসী: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামিকে নিষিদ্ধ করেছে সহিংস বিক্ষোভের পর"।
২৬ আগস্ট ২০২৪-এ, ইকোনমিক টাইমস শিরোনামে লেখে, "বাংলাদেশে ছাত্র মৃত্যুর পেছনে জামায়াত-ই-ইসলামির অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ"। এতে বলা হয়, "বাংলাদেশের তদন্তে দেখা গেছে, জুলাইয়ের বিক্ষোভের সময় পুলিশের অস্ত্র ছাড়া অন্য অস্ত্রের ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে, যা জামায়াত-ই-ইসলামির সঙ্গে যুক্ত র্যাডিকালদের হাতে রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। সহিংসতা অব্যাহত আছে, রাজনৈতিক বন্দি ও একজন প্রাক্তন সুপ্রিম কোর্টের বিচারকসহ অনেকের ওপর হামলা হয়েছে, যেখানে অস্থায়ী সরকার নিয়ন্ত্রণের জন্য লড়াই করছে।"
৮ আগস্ট ২০২৪-এ, অপইন্ডিয়া লেখে, “শেখ হাসিনার পতনের পর জামায়াতে ইসলামি ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে: তাদের জিহাদি কার্যক্রম ভারতে, হামাসকে অর্থায়ন, হিন্দুদের গণহত্যা এবং ভারতের নিরাপত্তার ঝুঁকি।”
৪ আগস্ট ২০২৪-এ, অপইন্ডিয়া শিরোনামে লেখে, “ইসলামপন্থীদের গোপন যোগসাজশ: বাংলাদেশের সহিংস বিক্ষোভ থেকে ‘ছাত্র আন্দোলন’ এর আড়াল সরিয়ে ফেলা”।
ফ্রেশ এঙ্গেল ২৪ আগস্ট ২০২৪-এ লেখে, “বাংলাদেশে দুঃস্বপ্ন ফিরে এসেছে, ছাত্র আন্দোলনের আড়ালে উগ্রবাদী সন্ত্রাসীরা পুলিশকে হত্যা করছে”।
এগুলো কেবল ভারতীয় মিডিয়া কীভাবে জামায়াতে ইসলামী আর ছাত্র আন্দোলনকে দেখেছিল তার চিত্র তুলে ধরে।
ফ্যাসিবাদের ঘাড়ে চেপে ভারত আমাদের যেভাবে শোষণ করেছে গত পনের বছর, তা নতুন করে বলার দরকার নেই।
এখন ১৯৭১ সালের জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করলে, জামায়াত বলবে তাদের উদ্দেশ্য ছিল ভারতের আগ্রাসন থেকে দেশকে রক্ষা করা। গত পনেরো বছরের ভারতীয় আগ্রাসন এবং জামায়াত নিয়ে ভারতের উদ্বেগ দেখে মনে হয়, জামায়াতের এই ভয় অমূলক ছিল না। তথাপি, ১৯৭১ সালে বসে চিন্তা করলে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। পাকিস্তান যখন ১৯৭১ সালে আগ্রাসী হয়ে বাংলাদেশের ঘাড়ে বসেছিল, তখন ভবিষ্যতে কে আগ্রাসী হবে এটা ভেবে আপনি জাতির সাথে এই হঠকারিতা করতে পারেন না।
এবার আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, জামায়াতের লোকজন কি দেশকে ভালোবাসে কিনা। এটা ব্যক্তিভেদে নির্ভর করে। তবে একটা বিষয় আলোকপাত করতে পারি, ২০০৯ সালের আগে শিবিরের মোট শহিদ সংখ্যা ছিল প্রায় ১৩০। জামায়াতের উল্লেখযোগ্য সংখ্যা জানা নেই। কিছু আর্কাইভে ঢুকে দেখলাম সংখ্যাটা সেখানেই রয়েছে, আপডেট করা হয়নি। নেতাকর্মীরা আসলে এতটাই দৌঁড়ের উপর ছিল যে হিসেবেই করতে পারেনি। ১৯৬৯ সাল থেকে ২০০৯ পর্যন্ত ১৩০ জন, আর ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ পর্যন্ত কত হবে ধারণা করেন তো? শুধু কোটা আন্দোলনে তাদের প্রায় ২০০ জন খুন হয়। ২০১৩ সালে যখন দেলোয়ার হোসেন সাইদির বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় হয়, একদিনেই প্রায় ২৫০ জন খুন হয়। আর পরিসংখ্যান নাই দিলাম, গুম, বন্দুকযুদ্ধ আর আয়নাঘর নিয়ে কথা বলা বাদ দিলাম। সাতক্ষীরা বা ঝিনাইদহ গেলে আপনি ঘরে ঘরে হতাহত পাবেন। ফ্যাসিস্টরা তাদের ফ্যাসিবাদ টিকিয়ে রাখার জন্য প্রাণ নিতে পারে, কিন্তু দিতে পারে না। অন্যদিকে, গত পনেরো বছরে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা তাদের আদর্শের জন্য জীবন দিয়েছে। তারা যদি দলের চেয়ে দেশকে বড় মনে করে এবং দেশপ্রেম ইমানের অঙ্গ (হাদিসের সত্যতা জানি না) মনে করে, তবে হয়তো তারা দেশপ্রেমিক।
দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো আফগানিস্তান-পাকিস্তান আর জঙ্গিবাদের জুজুর ভয়। আমি বলব, এটি বিশ্বজুড়ে ইসলামফোবিয়ার অংশ। আমরা একটু আগেই দেখলাম ভারতীয় মিডিয়ায় কীভাবে প্রোপাগান্ডা চালায়। এটা দেখে প্রথমেই যেটা ভাবি, 'ওরা যা বলে তা বিশ্বাস করা যাবে না'। ভারতীয় দালাল কিন্তু বাংলাদেশের প্রথম আলো আর ডেইলি স্টার গংরা। ২০০৯ সালে এরাই ফ্যাসিবাদকে ক্ষমতায় এনেছিল। ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তারা ভারতীয় আগ্রাসন নিয়ে কোনো কথা বলেনি। এখন যদিও ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে কিছু কথা বলে, কারণ তারা ফ্যাসিস্টদের অভিমানী গার্লফ্রেন্ড—অভিমান হয়েছে। মতি গংরা দিনে শেষে ফ্যাসিস্টই চায়। ভারতীয় মিডিয়া নির্লজ্জভাবে বলছে আর এরা স্লো পয়জনিং করবে। আমি তাদের চোখ দিয়ে দেখি না।
অন্তত এটুকু দেখে নিশ্চিন্ত হতে পারি, জামায়াতে ১৯৪১ সাল থেকে এই মাটিতে রাজনীতি করছে এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরাতন রাজনৈতিক দল। জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসবাদ কায়েম করার জন্য এত লম্বা সময়ের দরকার হয় না।
বাংলাদেশের কওমি আলেম সমাজ জামায়াতে ইসলামিকে পছন্দ করে না কারণ তারা দাড়ি ঠিকভাবে রাখে না, পাঞ্জাবি-জুব্বা পরে না। যদিও গত পনেরো বছরে এই দূরত্ব কিছুটা কমেছে কারণ একসঙ্গে একই সেলে-আয়নাঘরে ছিল অনেকেই। ভবিষ্যতে দেখা যাবে এই ঐক্য কতদিন থাকে। যেটা বলছিলাম, জামায়াতে ইসলামীর লোকজনের লেবাস ঠিক নেই। প্রশ্ন করা হলে তাদের মতে, 'জামায়াত কোনো আকিদা বা মাজহাব নয়, এটা শুধু একটি রাজনৈতিক দল। যার যার লেবাস তার নিজের পছন্দ।' এটুকু দেখে একটু নিশ্চিন্ত হই যে, তারা ক্ষমতায় আসলে দাড়ি রেখে জুব্বা পরে দেশে যেতে হবে না (মজা করলাম)।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে জামায়াতের সমালোচনা করার অনেক কারণ রয়েছে। আমার গত সপ্তাহের লেখাটি পড়ে নিতে পারেন। আপনি যদি ফ্যাসিবাদের আর ভারতীয় চোখ দিয়ে দেখেন, তবে এই দুটি আলোচনাই করবেন। আসুন আমরা ১৯৭১ সালের চেতনার খাজুরে আলাপ আর জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের আলোচনা বাদ দিয়ে জামায়াত-শিবিরকে ধুয়ে দেই।
লেখকের ব্যাক্তিগত মতামত।
মাহমুদুল হাসান
এটর্নি এট ল
নিউইয়র্ক