05/09/2026
কৃষ্ণ মানে কালো।
তাহলে সেই কৃষ্ণকেই আমরা নীল দেখি কেন?
সংস্কৃতের ‘নীল’ আমাদের আজকের উজ্জ্বল আকাশি নীল নয়, বরং গভীর, ঘন, নীল-কালোর কাছাকাছি একটি রঙ, অনেকটা বর্ষার বাদলের মতো, অনেকটা গভীর রাতের আকাশের মতো। তাই কৃষ্ণের একটি নাম ‘নীলমেঘশ্যাম’, অর্থাৎ নীল মেঘের মতো শ্যামবর্ণ যাঁর।
আকাশ নীল কারণ তার কোনো শেষপ্রান্ত আমাদের চোখে ধরা পড়ে না, সমুদ্র নীল কারণ তার গভীরতা চোখ দিয়ে মাপা যায় না, আর কৃষ্ণও নীল কারণ তাঁকে কোনো একটি পরিচয়, কোনো একটি গুণ কিংবা কোনো একটি গল্পের মধ্যে পুরোপুরি আটকে রাখা যায় না।
‘কৃষ’ শব্দের অর্থ আকর্ষণ করা, টেনে নেওয়া, নিজের দিকে ডেকে নেওয়া, আর সেই ‘কৃষ’ থেকেই ‘কৃষ্ণ’ নামটির একটি ব্যাখ্যা করা হয়, যিনি আকর্ষণ করেন তিনিই কৃষ্ণ। কৃষ্ণ এমন একজন চরিত্র, যাঁকে যতবার নতুন করে দেখি, ততবারই অন্য একটি দিক সামনে আসে। তিনি রাজা নন, তবু রাজাদের রাজনীতি বোঝেন তিনি যোদ্ধা নন, তবু যুদ্ধের গতিপথ বদলে দেন, তিনি দূত হয়ে শান্তির প্রস্তাব নিয়ে যান, আবার প্রয়োজনে কৌশলের আশ্রয় নেন, তিনি বন্ধুর বাড়িতে বসে সামান্য শাক খান, আবার রাজসভায় বিশ্বরূপ প্রকাশ করেন, অন্যের জীবন বাঁচান, অথচ নিজের বংশের ধ্বংস ঠেকান না, আর শেষ পর্যন্ত যাঁকে আমরা মহাভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী চরিত্র বলে জানি, তাঁর নিজের মৃত্যুও আসে এক শিকারির ভুল তীরে।
আমরা কৃষ্ণকে সবচেয়ে বেশি জানি গীতার কৃষ্ণ হিসেবে, যেখানে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে দ্বিধাগ্রস্ত অর্জুনকে তিনি কর্তব্য, কর্ম, আত্মা এবং জীবনের অর্থ বোঝাচ্ছেন। কিন্তু মহাভারত এত বড় একটি কাহিনি যে তার মধ্যে কৃষ্ণের চরিত্র কি কেবল সেই রথে বসে থাকা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে যায়? না। তাঁর জীবনের এমন অনেক ছোট ঘটনা ছড়িয়ে আছে, যেখানে তিনি বক্তা নন, সেখানে তিনি বন্ধু, কোথাও তিনি রাজনীতিক, কোথাও সেবক, কোথাও তিনি রক্ষাকর্তা, আবার কোথাও এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের জন্যও নিয়তির বিধান মেনে নেন।
শ্রীকৃষ্ণের জীবন থেকে নেওয়া ১০ টি গল্প বলি। প্রতিটা গল্পই আমাদের জন্য একেকটা নতুন শিক্ষা।
১.
ভারতের সময় হস্তিনাপুর ছিল কৌরবদের রাজধানী, আর দুর্যোধন ছিলেন সেই রাজ্যের যুবরাজ, যিনি নিজের ক্ষমতা ও অধিকার সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন এবং পাণ্ডবদের প্রতি গভীর ঈর্ষাপরায়ণ ছিলেন। অন্যদিকে বিদুর ছিলেন একই রাজপরিবারের সঙ্গে যুক্ত একজন জ্ঞানী ও সৎ মন্ত্রী, যাঁর জন্মপরিচয় তাঁকে রাজপরিবারের অন্যদের সমান সামাজিক মর্যাদা দেয়নি, কিন্তু তাঁর প্রজ্ঞা ও ন্যায়বোধের জন্য তিনি হস্তিনাপুরের অন্যতম সম্মানিত পরামর্শদাতা মহামন্ত্রী হয়ে উঠেছিলেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগে কৃষ্ণ যখন পাণ্ডবদের পক্ষ থেকে শান্তির প্রস্তাব নিয়ে হস্তিনাপুরে গেলেন, দুর্যোধন তখন তাঁকে নিজের প্রাসাদে নিমন্ত্রণ করলেন এবং রাজকীয় ভোজের ব্যবস্থা করলেন। রাজনীতির দিক থেকে নিমন্ত্রণটির অর্থও ছিল, কৃষ্ণকে নিজের আতিথ্যের মধ্যে নিয়ে আসা, তাঁকে নিজের পক্ষের কাছাকাছি দেখানো এবং সম্ভব হলে তাঁর ওপর প্রভাব বিস্তার করা।
কৃষ্ণ সেই নিমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন না, তিনি চলে গেলেন বিদুরের বাড়িতে। বিদুর তখন রাজ্যের প্রভাবশালী মন্ত্রী হলেও তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল অত্যন্ত সরল, আর কৃষ্ণের মতো একজন অতিথির জন্য রাজকীয় আয়োজন করার মতো কিছুই তাঁর ঘরে ছিল না। কথিত আছে, তিনি কৃষ্ণকে যে খাবার দিতে পেরেছিলেন, তা ছিল সামান্য শাক। কৃষ্ণ সেটিই এমন আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করলেন যেন এর চেয়ে মূল্যবান কোনো ভোজ তাঁর সামনে কখনো আসেনি।
তিনি মানুষের মন দেখেছিলেন। একজনের কাছে ছিল বিপুল সম্পদ, অন্য জনের কাছে ছিল সামান্য যা ছিল তাই দিয়ে আপ্যায়ন করার আন্তরিকতা, আর কৃষ্ণ বেছে নিয়েছিলেন সেই সৎ ব্যক্তির আন্তরিকতাকে।
এর শিক্ষা হল, মানুষের দেওয়া জিনিসের মূল্য তার পরিমাণে নয়, সে জিনিসের মধ্যে কতটা ভালোবাসা আছে তার ওপর নির্ভর করে।
২.
যে মানুষটি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে যাওয়ার জন্য কটাক্ষের নাম পেয়েছিলেন। 'রাণছোড়'। তিনিই বুঝেছিলেন যে, কখনো কখনো যুদ্ধ জিততে হলে আগে যুদ্ধের ময়দান ছাড়তে হয়।
মহাভারতের আগে-পরে কৃষ্ণের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষদের একজন ছিলেন মগধের রাজা জরাসন্ধ। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ক্ষমতাবান শাসক এবং বহু রাজাকে পরাজিত করে নিজের প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। কৃষ্ণের সঙ্গে তাঁর সংঘর্ষও একবারের ছিল না, কিন্তু সরাসরি সামরিক শক্তির লড়াইয়ে জরাসন্ধকে পরাজিত করা সহজ ছিল না। কৃষ্ণ তাই এমন এক কৌশল নিলেন যা বাইরে থেকে দেখতে পরাজয়ের মতো, কিন্তু ভেতর থেকে ছিল নিজের মানুষদের রক্ষা করার সিদ্ধান্ত। তিনি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে গেলেন, আর সেই কারণেই তাঁর একটি বিখ্যাত উপাধি হয়ে গেল ‘রণছোড়’, অর্থাৎ যিনি রণক্ষেত্র ছেড়ে চলে গেছেন।
মানুষ সাধারণত বিজয়ীর গল্প মনে রাখে, কিন্তু যে মানুষটি কখন যুদ্ধ করতে হবে আর কখন সরে আসতে হবে সেটা বোঝেন, তাঁর গল্প একটু অন্যরকম। কৃষ্ণ জানতেন, একটি যুদ্ধের মধ্যে নিজের বীরত্ব প্রমাণ করার চেয়ে যাদবদের নিরাপদ রাখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পরে যাদবদের মথুরা থেকে সরিয়ে দ্বারকায় নিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে সেই কৌশলের ফল দেখা গেল, আর জরাসন্ধের পরিণতিও শেষ পর্যন্ত ভীমের হাতে ঘটল। অর্থাৎ, কৃষ্ণ যুদ্ধের উদ্দেশ্য ছেড়ে দেননি, কেবল যুদ্ধ করার পদ্ধতি বদলে দিয়েছিলেন।
আমাদের জীবনে এমন কত যুদ্ধ আছে, যেগুলো আমরা কেবল লোকের চোখে কাপুরুষ না দেখানোর জন্য লড়ে যাই, যদিও ভিতরে ভিতরে জানি সেই লড়াইয়ের কোনো অর্থ নেই। কৃষ্ণের ‘রণছোড়’ নামটি সেই অহংকারের বিরুদ্ধে বেশ শক্ত একটি শিক্ষা হয়ে থাকে।
এর শিক্ষা হল, সব যুদ্ধ জেতার জন্য লড়তে হয় না, কখনো সরে আসাই জয়ের দিকে যাওয়ার সবচেয়ে বুদ্ধিমান পথ।
৩.
যে মানুষটিকে সবাই সম্মানের সর্বোচ্চ আসনে বসাতে প্রস্তুত, তিনি নিজেই এমন কাজ বেছে নিলেন যেটিকে সমাজ সাধারণত নিচু কাজ বলে মনে করে।
যুধিষ্ঠির ছিলেন পাঁচ পাণ্ডবের জ্যেষ্ঠ এবং কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগে তিনি নিজের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন। প্রাচীন ভারতের রাজাদের জন্য রাজসূয় ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজকীয় অনুষ্ঠান, যেখানে বহু রাজা, ঋষি, পণ্ডিত ও গণ্যমান্য ব্যক্তি একত্রিত হতেন। সেই বিশাল সমাবেশে কৃষ্ণও উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁকে বিশেষ সম্মান দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু, আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত সম্মান পাওয়ার পর কৃষ্ণ এমন কোনো মর্যাদার আসনে বসে থাকলেন না, যেখানে অন্যরা তাঁকে সেবা করবে, বরং তিনি নিজেই অতিথিদের পা ধোয়ার মতো সেবার কাজ গ্রহণ করলেন।
এই ঘটনাটির মধ্যে কৃষ্ণের চরিত্রের একটি দিক খুব পরিষ্কার হয়ে ওঠে, আর সেটি হলো বিনয়। আমরা অনেক সময় মনে করি, বড় হওয়া মানেই 'ছোট কাজ' থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া, যেন নিজের মর্যাদার সঙ্গে কিছু কাজের আর সম্পর্ক নেই। কৃষ্ণ সেখানে সম্পূর্ণ উল্টো একটি কথা বললেন, যদিও মুখে কোনো বক্তৃতা দিয়ে নয়, নিজের কাজ দিয়ে। তিনি দেখিয়ে দিলেন যে, সেবা করলে মর্যাদা কমে না, বরং নিজের মর্যাদার অহংকারটাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাই মানুষকে বড় করে। এই অনুষ্ঠানেই চেদিরাজ শিশুপাল কৃষ্ণের প্রতি তীব্র অপমানজনক ভাষা ব্যবহার করতে শুরু করেন এবং কৃষ্ণ দীর্ঘ সময় তা সহ্য করার পর তাঁর সীমা অতিক্রম করলে সুদর্শন চক্র দিয়ে শিশুপালের জীবন শেষ করেন। ফলে একই ঘটনায় কৃষ্ণের দুটি দিক পাশাপাশি দেখা যায়, একদিকে অসাধারণ বিনয়, অন্যদিকে নিজের সীমারেখা সম্পর্কে স্পষ্ট সচেতনতা।
৪.
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডবরা জয়ী হলেও সেই জয়ের মূল্য ছিল ভয়াবহ, কারণ দুই পক্ষের অসংখ্য মানুষ নিহত হয়েছিল এবং পাণ্ডবদের পরবর্তী প্রজন্মও প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। অভিমন্যু, যিনি অর্জুনের পুত্র এবং পাণ্ডবদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অন্যতম আশা ছিলেন, তিনি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে নিহত হন। তাঁর স্ত্রী উত্তরা তখন গর্ভবতী ছিলেন এবং তাঁর গর্ভে ছিল অভিমন্যুর সন্তান, অর্থাৎ পাণ্ডব বংশের ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারী। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরেও অশ্বত্থামার প্রতিশোধ শেষ হয়নি। দ্রোণাচার্যের পুত্র অশ্বত্থামা পাণ্ডবদের ওপর প্রতিশোধ নিতে ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করেন, যার লক্ষ্য ছিল উত্তরার গর্ভস্থ সন্তান।
সেই অনাগত শিশুকে কৃষ্ণ রক্ষা করেন এবং পরে সেই শিশুই 'পরীক্ষিত' নামে পৃথিবীতে জন্ম নেন। পরীক্ষিতের জন্মের মাধ্যমে পাণ্ডব বংশের ধারাটি টিকে থাকে এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর পুত্র জনমেজয়ের মাধ্যমে মহাভারতের কাহিনি আবার মানুষের কাছে পৌঁছায়। ফলে একটি শিশুকে রক্ষা করার ঘটনাটি আসলে মাত্র একটি প্রাণ বাঁচানোর ঘটনার উর্ধ্বে ছিল। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল একটি রাজবংশের ভবিষ্যৎ এবং সেই ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মহাভারতের পরবর্তী স্মৃতিও। ইতিহাসের বড় বড় যুদ্ধের মধ্যে এই ধরনের 'ছোট' জীবনগুলোকে আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, অথচ অনেক সময় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধারাবাহিকতা টিকে থাকে এমন একজন মানুষের মধ্য দিয়ে, যার জন্মের সময় পৃথিবী জানেই না সে কত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এর শিক্ষা হল, ভবিষ্যৎকে রক্ষা করতে সবসময় বড় যুদ্ধের দরকার হয় না, কখনো একটি জীবন বাঁচিয়ে রাখাই ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার সমান।
৫.
অন্যের ভাগ্য বদলে দিতে পারা কৃষ্ণ নিজের ভাগ্যের সামনে দাঁড়িয়ে কেন নীরব হয়ে গেলেন?
গান্ধারী ছিলেন কৌরবদের মা এবং ধৃতরাষ্ট্রের স্ত্রী। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তাঁর একশ পুত্রই নিহত হয়েছিলেন, ফলে যুদ্ধের শেষে তাঁর শোক ছিল সীমাহীন। তিনি বিশ্বাস করতেন, কৃষ্ণ চাইলে কৌরব-পাণ্ডবের এই ভয়াবহ সংঘর্ষ থামাতে পারতেন, তাই পুত্রদের মৃত্যুর জন্য তাঁর ক্রোধের একটি অংশ গিয়ে পড়েছিল কৃষ্ণের ওপর। সেই শোক ও ক্রোধের মুহূর্তে গান্ধারী কৃষ্ণকে অভিশাপ দেন যে যেমন কৌরব বংশ ধ্বংস হয়েছে, তেমনই একদিন যাদব বংশও নিজেদের মধ্যে বিবাদ করে ধ্বংস হবে।
কৃষ্ণ সেই অভিশাপ শুনে প্রতিবাদ করেননি। তিনি গান্ধারীকে বলেননি যে তাঁর অভিশাপ অন্যায়, নিজের ঐশ্বরিক ক্ষমতা দিয়ে ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ারও চেষ্টা করেননি। পরবর্তী সময়ে সত্যিই যাদবদের মধ্যে ভয়াবহ বিবাদ শুরু হয় এবং তারা নিজেদের মধ্যেই ধ্বংস হয়ে যায়। এই ঘটনাটি কৃষ্ণের চরিত্রের সবচেয়ে অদ্ভুত দিকগুলোর একটি। কারণ, আমরা তাঁকে সাধারণত এমন একজন হিসেবে দেখি যিনি বিপদের মুহূর্তে অন্যের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন, অথচ, নিজের বংশের সামনে আসা ধ্বংসের ব্যাপারে তিনি যেন নিয়তির সঙ্গে এক ধরনের সমঝোতা করে নিলেন। এখানেই তাঁর চরিত্রের আরেকটি গভীরতা আছে, সবকিছু করার ক্ষমতা থাকা আর সবকিছু করতে চাওয়া এক বিষয় নয়।
এই ঘটনার শিক্ষা হল, ক্ষমতা থাকলেই জীবনের প্রতিটি পরিণতি নিজের ইচ্ছামতো বদলে দিতে হয় না, কখনো কখনো মেনে নেওয়াও প্রজ্ঞার লক্ষণ।
৬.
বন্ধু যখন নিজের অভাব মুখে বলতে লজ্জা পায়, তখন সত্যিকারের বন্ধুর কাজ হলো তার মুখের কথার অপেক্ষা না করা।
সুদামা ছিলেন কৃষ্ণের শৈশবের বন্ধু এবং তাঁদের বন্ধুত্বের সূত্র ছিল ঋষি সান্দীপনির আশ্রমে একসঙ্গে শিক্ষালাভের দিনগুলো। পরে দুজনের জীবন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে চলে যায়। কৃষ্ণ হয়ে উঠেন দ্বারকার রাজা, আর সুদামা দারিদ্র্যের মধ্যে সংসার চালাতে থাকেন। একসময় সুদামার স্ত্রী তাঁকে কৃষ্ণের কাছে যেতে বলেন, কারণ পুরোনো বন্ধু হয়তো তাঁর কষ্টের দিনে সাহায্য করতে পারেন। সুদামা বন্ধুর কাছে যেতে রাজি হলেও সাহায্য চাইতে তাঁর লজ্জা হয়, তাই সঙ্গে নিয়ে যান সামান্য চিড়া, বন্ধুকে দেওয়ার মতো তাঁর কাছে এর বেশি কিছু ছিল না।
দ্বারকায় পৌঁছানোর পর কৃষ্ণ বন্ধুকে যে ভালোবাসায় গ্রহণ করেন, সেখানে রাজা আর দরিদ্র ব্রাহ্মণের কোনো পার্থক্য থাকে না। সুদামা নিজের অভাবের কথা মুখে বলতে পারেন না, কিন্তু, কৃষ্ণ তাঁর সঙ্গে এমনভাবে আচরণ করেন যেন বহু বছর আগের সেই আশ্রমের দিনগুলো তাঁর স্মৃতিপট থেকে সেগুলো এক মুহূর্তের জন্যও হারিয়ে যায়নি। তিনি সুদামার আনা চিড়া আনন্দ নিয়ে খান এবং বন্ধুর মুখে চাওয়ার অপেক্ষা না করেই তাঁর অভাব দূর করেন। সুদামা যখন বাড়ি ফিরে দেখেন তাঁর কুঁড়েঘরের জায়গায় সমৃদ্ধ গৃহ দাঁড়িয়ে আছে, তখন তিনি বুঝতে পারেন বন্ধুত্বের সবচেয়ে বড় দান কখনো কখনো সেই জিনিস, যা চাওয়ার আগেই পাওয়া যায়। গল্পটি যতই অলৌকিক হোক, তার মানবিক অংশটি খুব সহজ, যে মানুষ সত্যিই আপনার বন্ধু, তার কাছে নিজের দুঃখের হিসাব পেশ করতে হয় না। সে হয়তো তার আগেই বুঝে যায়।
শিক্ষাটা কী? সত্যিকারের সম্পর্ক মুখে বলে চাওয়ার অপেক্ষা করে না, নিরবতার মধ্যেও মানুষের প্রয়োজন বুঝতে শেখে। আবার নিশ্চয়ই কখনো কখনো বলতেই হয়। সে গল্পও আছে। সেটা অন্যদিন।
৭.
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগে পাণ্ডবরা যখন নিজেদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পাওয়ার দাবি করছিলেন, তখন যুদ্ধের সম্ভাবনা ক্রমেই বাড়ছিল। সেই সময় কৃষ্ণ নিজে পাণ্ডবদের পক্ষ থেকে হস্তিনাপুরে শান্তির দূত হয়ে গেলেন। তিনি জানতেন, যুদ্ধ হলে দুই পক্ষের অসংখ্য মানুষ মারা যাবে, তাই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আলোচনার পথ খোলা রাখাই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু দুর্যোধন পাণ্ডবদের কোনো জমি দিতে রাজি ছিলেন না এবং কৃষ্ণের শান্তির প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করলেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেল যে দুর্যোধন কৃষ্ণকে বন্দী করার পরিকল্পনা করলেন, যেন তাঁকে আটকে রাখলেই পাণ্ডবদের সঙ্গে আলোচনার প্রধান শক্তিটিকে নিষ্ক্রিয় করা যাবে।
কৃষ্ণ তখন নিজের বিশ্বরূপ প্রকাশ করেন। রাজসভায় উপস্থিত মানুষরা এমন এক রূপ দেখতে পান, যেখানে কৃষ্ণ তখন আর দ্বারকার এক রাজপুরুষ নন, তাঁর মধ্যে যেন সমগ্র সৃষ্টি, দেবতা, শক্তি, সময় ও ধ্বংসের এক বিরাট রূপ প্রকাশিত হয়েছে। কৃষ্ণ সেই শক্তি দেখানোর পরও যুদ্ধ শুরু করেননি, কারণ তাঁর উদ্দেশ্য দুর্যোধনকে পরাজিত করা ছিল না, শেষবারের মতো বোঝানো যে, যুদ্ধ এড়ানোর সুযোগ এখনো আছে। শক্তি থাকা সত্ত্বেও তা দিয়ে সব সমস্যার সমাধান না করার যে সংযম, এই ঘটনায় তার একটি অসাধারণ উদাহরণ দেখা যায়।
এটার শিক্ষা হল, যার হাতে শক্তি আছে, তার আসল পরীক্ষা শক্তি দেখাতে পারায় নয়, কখন সেই শক্তি ব্যবহার না করতে হবে তা বুঝতে পারা।
৮.
দ্রৌপদী ছিলেন পাঞ্চালের রাজকন্যা এবং পাঁচ পাণ্ডবের স্ত্রী। পাশা খেলায় যুধিষ্ঠির নিজের রাজ্য, সম্পদ, ভাই এবং শেষ পর্যন্ত দ্রৌপদীকেও পণ রাখার পর কৌরবসভায় তাঁকে নিয়ে আসা হয়। সেখানে দুর্যোধনের ভাই দুঃশাসন দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের চেষ্টা করেন। সভায় ভীষ্ম, দ্রোণ, ধৃতরাষ্ট্র এবং কৌরব-পাণ্ডবদের বহু প্রবীণ ও যোদ্ধা উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু সেই মুহূর্তে কেউ কার্যকরভাবে দ্রৌপদীকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলেন না। একসময় দ্রৌপদী নিজের শক্তিতে প্রতিরোধের চেষ্টা করতে করতে শেষ পর্যন্ত কৃষ্ণের কাছে আর্তনাদ করেন।
মহাভারতের পরবর্তী বর্ণনায় কৃষ্ণ তাঁর সেই আহ্বানে সাড়া দেন এবং দ্রৌপদীর বস্ত্র অসীম হয়ে যায়, ফলে দুঃশাসন তাঁকে বিবস্ত্র করতে পারে না। এই ঘটনাকে ধর্মীয় পরিসরে অলৌকিক কাহিনি হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু তার বাইরের দৃশ্যটিও কম শক্তিশালী না। একজন মানুষ যখন চারপাশের সব অবলম্বন হারিয়ে ফেলে, তখন তার ডাক আর সাজানো থাকে না, সেখানে থাকে কেবল সত্যিকারের অসহায়তা। দ্রৌপদীর সেই ডাকের মধ্যে কোনো যজ্ঞ ছিল না, ছিল না দীর্ঘ কোনো শ্লোক, ছিল শুধু আশ্রয়ের জন্য একটি নাম। আর সেই নামটি ছিল কৃষ্ণ।
এটার শিক্ষা কী? মানুষের নিজের শক্তি শেষ হয়ে গেলেও আশার শেষ হয়ে যায় না, কখনো কখনো শেষ অবলম্বনের ডাকই সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠে।
৯.
শাম্ব ছিলেন কৃষ্ণের পুত্র এবং যাদবদের মধ্যে এক তরুণ রাজপুত্র। একদিন তিনি কয়েকজন ঋষির সঙ্গে কৌতুক করার জন্য নিজেকে গর্ভবতী নারীর বেশে সাজিয়ে তাঁদের সামনে নিয়ে গেলেন এবং জানতে চাইলেন, তাঁর গর্ভে ছেলে হবে না মেয়ে। ঋষিরা এই ঠাট্টায় ক্রুদ্ধ হয়ে অভিশাপ দিলেন যে তাঁর গর্ভ থেকে একটি লোহার মুষল জন্ম নেবে এবং সেই মুষলই যাদবদের ধ্বংসের কারণ হবে। পরে সেই লোহার মুষলকে ধ্বংস করার চেষ্টা করা হলেও তার উপাদান থেকে তৈরি হওয়া অস্ত্রই শেষ পর্যন্ত যাদবদের পারস্পরিক সংঘর্ষে ব্যবহৃত হয় এবং যাদব বংশের পতনের পথ তৈরি হয়।
এই ঘটনাটিকে শুধু একটি অভিশাপের গল্প হিসেবে দেখলে কৃষ্ণের চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক চোখ এড়িয়ে যায়। শাম্ব তাঁর নিজের ছেলে, অথচ তাঁর জন্য নিয়তির নিয়ম বদলে দেওয়া হয়নি। কৃষ্ণ নিজের পরিবারের জন্য এমন কোনো বিশেষ ব্যবস্থা করেননি, যার ফলে তাঁর সন্তান অন্য সবার চেয়ে নিরাপদ থাকবে। আমরা সাধারণ জীবনে নিজের মানুষদের জন্য নিয়ম একটু নরম করে ফেলতে অভ্যস্ত, কিন্তু কৃষ্ণের জীবনের এই অধ্যায় যেন বলে, সম্পর্ক যত ঘনিষ্ঠই হোক, তারও ওপরে কিছু নিয়ম কাজ করে, যাকে নিজের সুবিধার জন্য বদলে দেওয়া যায় না।
এটার শিক্ষা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। নিজের মানুষ বলে জীবনের নিয়ম আলাদা হয়ে যায় না, নিয়তির সামনে পরিচয়ের গর্বটাও শেষ পর্যন্ত টেকে না। তাই বংশধরদের সেই কথা মাথায় রাখা উচিত।
১০.
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের বহু বছর পরে যাদব বংশও ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায় এবং কৃষ্ণের জীবনের শেষ অধ্যায় শুরু হয়। একসময় তিনি এক বনে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। জরা নামের এক শিকারি দূর থেকে কৃষ্ণের পায়ের তলা দেখে সেটিকে হরিণের শরীরের অংশ মনে করে তীর ছুড়ে দেন। কৃষ্ণর পাকে বলা হয় রাতুল চরণ। মানে, লালবর্ণী পা। তীর গিয়ে কৃষ্ণের শরীরে বিদ্ধ হয় এবং কাছে এসে জরা বুঝতে পারেন তিনি কী ভয়াবহ ভুল করেছেন। শিকারি ভয়ে কাঁপতে থাকেন, কিন্তু কৃষ্ণ তাঁর ওপর রাগ করেননি, তাঁকে অভিশাপও দেননি, বরং তাঁকে সান্ত্বনা দিয়েছেন এবং নিজের মৃত্যুকে গ্রহণ করেছেন।
এই মৃত্যুর দৃশ্যটি কৃষ্ণের চরিত্রকে বোঝার জন্য সম্ভবত সবচেয়ে গভীর দৃশ্যগুলোর একটি। যে মানুষ কুরুক্ষেত্রের মতো এক মহাযুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণ করেছিলেন, যিনি রাজাদের সঙ্গে রাজনীতি করেছেন, যিনি অর্জুনকে গীতা শুনিয়েছেন, যিনি নিজের বিশ্বরূপ দেখিয়েছেন, তাঁর শেষ মুহূর্তে কোনো রাজকীয় মঞ্চ ছিল না, কোনো বিজয়ী সৈন্যদল ছিল না, কোনো মহাবীরের সঙ্গে দ্বন্দ্বও ছিল না। ছিল একটি বন, একজন সাধারণ শিকারি এবং একটি ভুল তীর।
এর শিক্ষা তো সার্বজনীন। ক্ষমতা, জ্ঞান, মর্যাদা কিংবা মহত্ত্ব আমাদের অনেক দূর নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু জীবনের শেষ সত্যগুলোর সামনে আমাদের সবাইকেই একইভাবে দাঁড়াতে হয়।
এই দশটি ঘটনা একসঙ্গে দেখকে কৃষ্ণকে আর কেবল গীতার কৃষ্ণ বলে মনে হয় না। তখন তাঁকে দেখা যায় একজন এমন মানুষ হিসেবে, যাঁর চরিত্রের মধ্যে পরস্পরবিরোধী অনেকগুলো স্রোত একই সঙ্গে বয়ে চলেছে। তিনি রাজপ্রাসাদের ভোজ প্রত্যাখ্যান করে দরিদ্র বন্ধুর বাড়ির শাক খেতে পারেন, আবার সেই মানুষটিই রাজাদের সঙ্গে এমন রাজনীতি করতে পারেন যার ফল গোটা ভারতবর্ষের ইতিহাস বদলে দেয়। তিনি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে যেতে পারেন, অথচ প্রয়োজনে যুদ্ধের গতিপথও নিজের কৌশলে ঘুরিয়ে দিতে পারেন। তিনি অতিথির পা ধুয়ে দিতে পারেন, আবার অপমানের সীমা অতিক্রম করলে শিশুপালের জীবনও শেষ করে দিতে পারেন। তিনি অনাগত শিশুকে রক্ষা করেন, কিন্তু নিজের বংশের ধ্বংস ঠেকাতে কোনো বিশেষ সুবিধা নেন না।
সম্ভবত কৃষ্ণের গভীরতা এখানেই যে তাঁকে একটি মাত্র পরিচয়ে ধরে রাখা যায় না। তিনি কেবল রাজনীতিক নন, কেবল দার্শনিক নন, কেবল বন্ধু নন, কেবল যোদ্ধাও নন। এই কোনো 'কেবল' এর মধ্যেই তিনি নেই। তিনি এই সবকিছুর মধ্যে দিয়ে চলেছেন এবং প্রতিটি ভূমিকায় তাঁর চরিত্রের অন্য একটি দিক প্রকাশ পেয়েছে। তাই কৃষ্ণকে যতটা দূর থেকে দেখা যায়, তিনি ততটাই সহজ মনে হয়, কিন্তু একটু কাছে গিয়ে দেখলেই বোঝা যায়, মানুষটিকে এক কথায় ব্যাখ্যা করা যায় না।
হয়তো সেই কারণেই কৃষ্ণ নীল।
আকাশের মতো নীল, যার সীমা চোখে ধরা পড়ে না। সমুদ্রের মতো নীল, যার গভীরতা চোখ দিয়ে মাপা যায় না। কৃষ্ণকেও হয়তো তেমন করেই দেখতে হয়, তাঁকে পুরোপুরি বোঝার জন্য নয়, বরং যতবার দেখা যায় ততবার তাঁর মধ্যে নতুন কোনো অর্থ আবিষ্কার করার জন্য। ‘কৃষ’ মানে আকর্ষণ করা, যিনি আকর্ষণ করেন তিনিই কৃষ্ণ, আর হাজার হাজার বছর পরেও যদি একটি চরিত্র মানুষের কৌতূহল, ভক্তি, বিতর্ক, ভালোবাসা এবং চিন্তাকে নিজের দিকে টেনে রাখতে পারে, তবে সেই নামের অর্থটিও যেন তার জীবনের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলে যায়।
কৃষ্ণ একেক রূপে একেক রকম।
সম্ভবত কৃষ্ণের সবচেয়ে বড় রহস্য সেখানেই।
কলম ও ছবি কৃতজ্ঞতা: Rizwan Sheikh
#সম্মিলনী