11/08/2026
হযরত মাওলানা শাহ্সূফি বিশ্বওলী খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের অমিয় বাণীঃ-
একদা হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব তদীয় এক মুরীদসহ কোথাও যাইতেছিলেন।
পথের মধ্যে এক নদী পড়িল।
কিন্তু পারাপারের কোন ব্যবস্থা ছিল না।
অথচ নদী পার হইতে হইবে।
হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব তদীয় মুরীদকে বলিলেন, "বাবা, তুমি আমাকে ধরিয়া 'বায়েজীদ' 'বায়েজীদ' বলিতে থাক।
আর আমি মহান খোদাতায়ালাকে স্মরণ করি।
তাহা হইলে আমরা পানির উপর দিয়া হাঁটিয়া নদী পার হইতে পারিব।" মুরীদ তাহাই করিলেন।
সে 'বায়েজীদ', 'বায়েজীদ' বলিতে লাগিল।
হযরত বায়েজীদ মুরীদকে লইয়া পানির উপর দিয়া হাঁটিয়া চলিতে লাগিলেন।
নদীর মাঝামাঝি স্থানে আসিবার পরে মুরীদের হৃদয়ে এক ওয়াসওয়াছা আসিল।
সে ভাবিল, "আমি কেন 'বায়েজীদ', 'বায়েজীদ' বলিতেছি?
আল্লাহ্ আল্লাহ্ বলি না কেন?
ইহা ভাবিয়াই পীরের নির্দেশকে অমান্য করিয়া 'বায়েজীদ', 'বায়েজীদ' বলা বিরতি দিয়া
আল্লাহ্ আল্লাহ্ বলা শুরু করিল।
আর সংগে সংগে নদীতে তলাইয়া যাওয়ার উপক্রম হইল।
মুরীদ চিৎকার দিয়া বলিল, "হুজুর! "
আমি কেন তলাইয়া যাইতেছি?"
হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, "তুমি কি বলিতেছিলে?"
মুরীদ বলিল,
আমি বায়েজীদ, বায়েজীদ বলা বাদ দিয়া আল্লাহ্ আল্লাহ্ বলিতেছিলাম।"
ইহা শুনিয়া হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব বলিলেন, "আল্লাহ্কে ধরিয়াছি আমি।
তুমি ধর আমাকে।
তাহা হইলে তুমি রক্ষা পাইবে।"
মুরীদ তখন পুনরায় 'বায়েজীদ' 'বায়েজীদ' বলা শুরু করিল এবং বিনা ক্লেশে নদী পার হইয়া গেল।
কাজেই পীর যখন যে পথে চলিতে নির্দেশ দেন,
তাহাই কর।
তাহা হইলে মাঞ্জিলে মাকছুদে সহজে পৌঁছাইতে পারিবে।
এই কারণেই মহাকবি হাফেজ বলিয়াছেন,
"বমায়ে সাজ্জাদা রংগীকুন গারব পীরে মগা গুইয়েদ, কে ছালেক বেখবর না-বুয়াদ যে রাহ্ ও রেসমে মঞ্জেল হা।"
অর্থাং-তোমার পীর যদি তোমাকে শরাব দিয়া জায়নামাজ ধুইয়া তদ্ উপরে নামাজ পড়িতে বলেন, তুমি তাহাই কর, কারণ মোকাম মঞ্জিলের খবর তোমার চেয়ে তোমার পীরই ভাল জানেন।
যে সহজেই খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান হাছিল করিতে পারে। দুনিয়াবী যে কোন ধরনের বিপদেই সে পতিত হোক না কেন,
অর্থাৎ সে যদি বাঘের মুখে পড়ে,
যদি সাপের মুখে পড়ে,
এমনকি যদি সাগরের মাঝেও হাংগর-কুমিরের আক্রমণে পড়ে, তথাপিও তাহার ভয় নাই;
পীরকে স্মরণ করা মাত্রই পীরের ছুরাতে মেছালী তথায় বিদ্যুতের চেয়ে লক্ষগুণ বেগে উপস্থিত হইয়া মহান খোদাতায়ালার ইচ্ছায় তাহাকে উদ্ধার করিবে।
ঠিক তেমনি যখন তরিকতের রাস্তায়,
মোশাহেদার পথে চলিবার সময়ে অর্থাৎ উরুজ ও ছায়েরের সময় শয়তান ও নাফসে আম্মারার ধোকা বা প্রবঞ্চনা বা ওয়াসওয়াছা দেলের মধ্যে উপস্থিত হয়;
তখনই পীরের ছুরাতে মেছালী তথায় উপস্থিত হইয়া মুরীদকে শয়তানি ওয়াসওয়াছা থেকে রক্ষা করে।
তাই বলা হয়,
মুরগী যেমন তাহার বাচ্চাগুলিকে দুই পাখার নীচে রাখিয়া কাক-চিল শত্রুর ছোবল হইতে রক্ষা করে,
ঠিক তেমনি আপন পীর মুরীদকে দুনিয়াবী বিপদ-আপদসহ তরিকতের রাস্তার বিপদ-আপদ অর্থাৎ শয়তান ও নাফসে আম্মারার আক্রমণ থেকে হেফাজত করিয়া খোদাতায়ালা পর্যন্ত পৌঁছানোর রাস্তাকে বিপদমুক্ত করিয়া দেন।
রূহের ছয় ছুরাত।
যথাঃ-
১। ছুরাতে অছলী,
২। ছুরাতে মেছালী,
৩। ছুরাতে রূহানী,
৪। ছুরাতে জেসমানী,
৫। ছুরাতে জাহেরী, ও
৬। ছুরাতে বাতেনী।
এই ছয় ছুরাতের মধ্যে ছুরাতে মেছালীর মূল্য সবচেয়ে বেশী।
লক্ষ লক্ষ খোদাঅন্বেষীদের মধ্যে দুই এক জন মাত্র পীরের ছুরাতে মেছালীকে ধরিতে পারে।
মূলতঃ খোদাতায়ালাকে পাইতে হইলে পীরের সহিত পরিপূর্ণ মেশামেশি করিতে হয়।
এই মেশামেশি কি?
এই মেশামেশি হইল উল্লিখিত ছয় ছুরাত সহ হায়াতে ওহাদানী, হকিকতে ওহাদানী,
খেয়াল খেয়ালে নজর সম্পূর্ণই আপন পীরের সহিত মিশানো।
এই মেশামেশি কাজটি অত্যন্ত কঠিন।
এইজন্যই আপন পীরকে সবকিছুর চেয়ে বেশী ভালবাসিতে হয়।
ভালবাসার সহস্র পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইলেই কেবল পীর তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদী প্রয়োগ করেন।
পীরের তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদীর প্রয়োগেই কেবল মেশামেশি সম্ভব হয়।
তখন দুধের সহিত চিনি মিশাইলে যেমন এক উত্তম লজ্জতের সৃষ্টি হয়,
তেমনি মেশামেশির উল্লিখিত পর্যায়ে পৌঁছাইতে পারিলে মুরীদ এমনই এক লজ্জত,
এমনই এক তৃপ্তি পায়,
হাফেজ বলেন,
যে লজ্জত বা তৃপ্তি বেহেশতেও মিলিবে না।
এই মেশামেশিই ফানা-ফিশ-শেখ বলিয়া স্বীকৃত যাহা খোদাকে চিনিবার পথে প্রথম দরজা।
তথ্যসূত্রঃ- নসিহত খন্ড - ০২ নসিহত নং- ০৭