22/07/2025
তাকওয়া: একটি বিস্তারিত পরিচিতি
তাকওয়া, আরবি শব্দ, যার আভিধানিক অর্থ হলো অন্তরকে অপ্রীতিকর বস্তু থেকে সুরক্ষিত রাখা। আল্লামা রাগেব আসফাহানী (রহ.) তাকওয়ার এই অর্থকে আরও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, "তাকওয়া হলো কোনো বস্তুকে তার ক্ষতিকর ও অনিষ্টকারী বস্তু থেকে রক্ষা করা।" এটি মূলত আত্মরক্ষা এবং ক্ষতির কারণগুলো থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলার এক সচেতন প্রক্রিয়া।
আল কুরআনে তাকওয়ার বহুমুখী ব্যবহার
পবিত্র কুরআনে তাকওয়া শব্দটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যা এর ব্যাপকতাকে তুলে ধরে:
১. ভয়-ভীতি: আল্লাহ তায়ালার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভয়ের অর্থে এটি ব্যবহৃত হয়। যেমন: "হে লোকসকল! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর।" [সুরা হজ্জ: ১]
২. ইবাদত: আল্লাহর আনুগত্য ও উপাসনার অর্থেও তাকওয়া ব্যবহৃত হয়। যেমন: "আমি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই, তাই তোমরা আমারই ইবাদত কর।" [সুরা আন নাহ্ল: ২]
৩. অপরাধ বর্জন: পাপ ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকার অর্থও তাকওয়া। যেমন: "এবং তোমরা আল্লাহর অবাধ্য হয়ো না। আশা করা যায় তোমরা সফল হবে।" [সুরা বাকারা: ১৮৭]
৪. আল্লাহর একত্ববাদ: আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপনের অর্থেও তাকওয়া ব্যবহৃত হয়। যেমন: "তারাই ঐ সকল লোক। আল্লাহ যাদের অন্তরকে একত্ববাদ যাচায়ের লক্ষ্যে পরীক্ষা করেছেন।" [সুরা আল হুজুরাত: ৩]
৫. ইখলাস বা একনিষ্ঠতা: আল্লাহর প্রতি সকল কাজে একনিষ্ঠ থাকার অর্থে তাকওয়া বোঝানো হয়। যেমন: "নিশ্চয় এটিই হচ্ছে অন্তরের একনিষ্ঠতা।" [সুরা হজ্জ: ৩২]
শরিয়তের পরিভাষায় তাকওয়া
আল্লামা রাগেব আসফাহানী (রহ.) তাকওয়ার শরয়ী অর্থকে এভাবে বর্ণনা করেছেন: "যাবতীয় গোনাহ থেকে অন্তরকে রক্ষা করা। আর গোনাহ বর্জন সম্ভব হবে সকল সন্দেহজনক বস্তু পরিত্যাগের দ্বারা। এবং তা পূর্ণতা লাভের লক্ষ্যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বৈধ বস্তুও পরিহার করা।" এই সংজ্ঞাটি তাকওয়াকে শুধু হারাম থেকে বাঁচার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, সন্দেহজনক এবং এমনকি কিছু বৈধ বিষয়ও পরিত্যাগ করার কথা বলে, যদি তা পাপের দিকে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস, "হালালের বিষয়টি যেমনিভাবে মানুষের নিকট স্পষ্ট। ঠিক তদ্রƒপ হারামের বিষয়টিও মানুষের নিকট স্পষ্ট।" [সহিহ বুখারি: হা. ৫২] এই ধারণাকে সমর্থন করে।
আল্লামা জুরজানি (রহ.) আরও সুন্দরভাবে বলেছেন, "আল্লাহর আনুগত্যের ক্ষেত্রে তাকওয়া দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ইখলাস তথা একনিষ্ঠতা। আর গোনাহের ক্ষেত্রে তা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো যাবতীয় অন্যায় পরিত্যাগ ও তা থেকে দূরত্ব অবলম্বন করে চলা।" [“আল মুফরাদাত”, আল আসফাহানী: পৃ. ৫৩০]
মুত্তাকিগণের পরিচয়
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা মুত্তাকিদের সুস্পষ্ট পরিচয় তুলে ধরেছেন। সূরা বাকারার ১-৫ আয়াতে বলা হয়েছে: "এই কিতাব যাতে কোনো সন্দেহ নেই, তা মুত্তাকিদের জন্য হিদায়াত স্বরূপ। (যাদের পরিচয় হলো) তারা পরকালে বিশ্বাসী, নামাজ প্রতিষ্ঠা করে এবং আমার দেয়া রিজিক থেকে ব্যয় করে। আর তারা আপনার ও আপনার পূর্ববর্তী অবতীর্ণ বিষয়ে বিশ্বাসী এবং আখেরাতের প্রতিও ঈমান আনে। (জেনে রাখবে) তারাই তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে সৎপথ প্রাপ্ত এবং তাঁরাই সফল।"
অন্য আয়াতে (সূরা বাকারা: ১৭৭) আরও বিস্তারিতভাবে মুত্তাকিদের বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে: "আর পূর্ব-পশ্চিমে মুখ ফিরানোতে কোনো কল্যাণ নেই। তবে কল্যাণ লাভকারী একমাত্র তারা যারা আল্লাহ তায়ালা, পরকালে, ফেরেশতাগণ, আসমানী কিতাবসমূহ এবং নবীগণের প্রতি ঈমান এনেছে। আর তাঁরাই আল্লাহকে ভালবেসে নিকটাত্মীয়, অসহায়, গরীব, মুসাফির, অভাবি এবং দাসমুক্তিতে সম্পদ ব্যয় করে। আর নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, জাকাত আদায় করে এবং নিজেদের অঙ্গিকার পূর্ণ করে, আর বিপদ ও কষ্টে ধৈর্য ধারণ করে। (আল্লাহর নিকট) তারাই প্রকৃত সত্যবাদী এবং প্রকৃত খোদাভীরু।"
হাদিসে রাসুল (সা.)-এ তাকওয়া
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকওয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে বহু হাদিস বলেছেন:
* "কোন বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মুত্তাকি হতে পারবে না। যতক্ষণ না সে সমস্যাযুক্ত বস্তুতে জড়িয়ে যাবার ভয়ে, সমস্যাহীন বস্তু পরিত্যাগ করে।" [জামে তিরমিযি: হা. ২৪৫১]
* "তিন বস্তুর ক্ষেত্রে তাকওয়া অবলম্বন করা দরকার। এক. বংশ মর্যাদার ক্ষেত্রে। দুই. ধন-সম্পদের ক্ষেত্রে। তিন. মান-মর্যাদার ক্ষেত্রে।" [জামে তিরমিযি: হা. ৩৬৭১]
সালফে সালেহীনের (নেককার পূর্বসূরী) দৃষ্টিতে তাকওয়া
নেককার পূর্বসূরীগণ তাকওয়ার গভীর তাৎপর্যকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন:
* আব্দুল্লাহ বিন জুবাইর (রা.): মুত্তাকিদের চারটি চিহ্ন উল্লেখ করেছেন: বিপদে ধৈর্য ধারণ, তাকদিরের ওপর সন্তুষ্ট থাকা, নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায় এবং কুরআনী বিধানের সামনে নিজেকে পূর্ণরূপে সঁপে দেওয়া।
* ওমর বিন আব্দুল আজিজ (রহ.): বলেছেন, "সারাদিন রোজা রাখা এবং সারারাত দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার নাম তাকওয়া নয়; বরং তাকওয়া হলো আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক নিষিদ্ধ বিষয় পরিত্যাগ করা।"
* মায়মুন বিন মিহরান (রহ.): বলেছেন, "কোন ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুত্তাকি হতে পারবে না। যতক্ষণ না সে নিজের ব্যাপারে নিজ পড়শি থেকেও বেশি হিসেবী হয়।"
* সাঈদ বিন মুসায়্যিব (রহ.): বলেছেন, "মুত্তাকি ঐ ব্যক্তি যে গোনাহ হওয়া মাত্রই তাওবা করে। (এমনকি) গোনাহ না হলেও তাওবা করে।"
* আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম জাওযী (রহ.): মুত্তাকি হওয়ার জন্য চারটি গুণের সমাবেশ প্রয়োজন বলেছেন, যার মধ্যে একটি হলো - অত্যধিক আল্লাহ অভিমুখী হওয়া।
* ত্বল্ক বিন হাবীব (রা.): তাকওয়াকে সংজ্ঞায়িত করেছেন: "তাকওয়া হলো, আল্লাহ তায়ালার রহমতের আশায় তাঁর আনুগত্য করা। আর তাঁর শাস্তির ভয়ে তাঁর অবাধ্যতা পরিহার করা।" [মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা, ১১/২৩]
* সুফিয়ান ছাওরি (রহ.): সাহাবাগণকে মুত্তাকি নামে ভূষিত করার কারণ বলেছেন, "তারা এমন বিষয়ে ভয় করে চলতেন যা সাধারণত পরিহার করা হয় না।"
* আব্দুল্লাহ বিন মোবারক (রহ.): বলেছেন, "যদি কোনো ব্যক্তি একশটি বস্তু পরিহার করে চলে। আর একটি মাত্র বস্তুর ক্ষেত্রে অবহেলা করে। তবে সে পরিপূর্ণ তাকওয়া লাভ করতে পারেনি।"
তাকওয়ার গুরুত্ব ও ফজিলত
মানব জীবনে তাকওয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। এটি শুধু ব্যক্তিগত পরিশুদ্ধতার বিষয় নয়, বরং জাগতিক ও পারলৌকিক সফলতার চাবিকাঠি। রাসুল (সা.), সাহাবাগণ এবং যুগে যুগে আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ তাকওয়ার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, তা এর গুরুত্বকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
হাদিসে তাকওয়ার ফজিলত:
১. জান্নাতে প্রবেশের অন্যতম কারণ: "রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অধিক জান্নাতে প্রবেশকারী ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে, তিনি বললেন, দুই ধরণের ব্যক্তি- এক. খোদাভীতি। দুই. সৎচরিত্রবান ব্যক্তি।" [জামে তিরমিযি: হা. ৬১৬]
২. সকল ইবাদতের মূল: "আমি তোমাকে তাকওয়ার উপদেশ দিচ্ছি কেননা তা সকল ইবাদতের মূল।" [“আল মুজামুল কাবীর”, তাবারানী: ২/১৬৮]
৩. মুমিনকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ: "তুমি একমাত্র মুমিনকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে। আর তোমার খাবার যেন একমাত্র মুত্তাকি বান্দাই খায়।" [সুনানে আবু দাউদ: হা. ৪৮৩২]
৪. আল্লাহর পছন্দের ব্যক্তি: "নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা খোদাভীরু, ধনী, বিনয়ী বান্দাকে বেশি পছন্দ করেন।" [সহিহ মুসলিম: হা. ২৯৬৫]
৫. দীন ও সম্মানের নিরাপত্তা: "যে ব্যক্তি সন্দেহপূর্ণ বস্তু এড়িয়ে চলবে, তার দীন-ধর্ম, মান-সম্মান সবই নিরাপদ থাকবে।" [সহিহ বুখারি: হা. ৫২]
সালফে সালেহীনের দৃষ্টিতে তাকওয়ার ফজিলত:
১. মুয়াজ বিন জাবাল (রা.): কিয়ামতের দিন মুত্তাকিরা আল্লাহর পার্শ্বে একত্র হবেন এবং তাদের ও আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা বা আড়াল থাকবে না।
২. কাতাদা (রহ.): জান্নাত তাকওয়া অর্জনকারীদের জন্য মোবারকবাদ দিয়েছে।
৩. আব্দুল্লাহ বিন আউফ (রহ.): বলেছেন, "তোমার জন্য আবশ্যক হলো, আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করা। কারণ আল্লাহ ও মুত্তাকি বান্দার মাঝে কোনো একাকিত্ব নেই।"
৪. যায়েদ বিন আসলাম (রহ.): বলেছেন, যে আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করে, মানুষ নিজ থেকেই তাকে ভালবাসবে।
তাকওয়ার সুফল
আল্লাহ তায়ালা কুরআনে কারীমে মুত্তাকিগণকে ২৬টি সুসংবাদ দান করেছেন, যা তাকওয়ার এক অসাধারণ গুরুত্বের প্রমাণ:
১. সম্মান ও মর্যাদা লাভ: "যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে তাঁদের জন্য রয়েছে বিশেষ সম্মানের সুসংবাদ।" [সুরা ইউনুস: ৬৩-৬৪]
২. সাহায্য-সহযোগিতা লাভ: "নিশ্চয় আল্লাহর সাহায্য মুত্তাকিগণের সাথেই রয়েছে।" [সুরা আননাহল: ১২৭]
৩. জ্ঞান ও প্রজ্ঞা লাভ: "যদি তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো, তবে তিনি তোমাদেরকে বিশেষ জ্ঞান দান করবেন।" [সুরা আনফাল: ২৯]
৪. পাপমোচন ও মহাপ্রতিদান: "আর যে আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করে। তিনি তার পাপ মোচন করেন এবং তাকে মহাপ্রতিদান দেন।" [সুরা তলাক: ৫]
৫. গুনাহ মাফ: "এবং তোমরা আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করো। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" [সুরা আনফাল: ৬৯]
৬. প্রতিটি কাজে সহযোগিতা: "আর যে আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করে। তিনি তার কঠিন বিষয়কে সহজ করে দেন।" [সুরা তলাক: ৪]
৭. সংকট হতে মুক্তি: "আর যে আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করে। তিনি তাকে মুক্তির পথ বের করে দেন।" [সুরা তলাক: ২]
৮. দুশ্চিন্তামুক্ত প্রশস্ত রিজিক: "এবং তিনি তাকে অকল্পনীয় স্থান থেকে রিজিকের ব্যবস্থা করেন।" [সুরা তালাক: ৩]
৯. শাস্তি হতে পরিত্রাণ: "অতঃপর আমি মুত্তাকিদেরকে মুক্তি দেই।" [সুরা মারয়াম: ৭২]
১০. উদ্দেশ্যে সফলতা: "নিশ্চয় সফলতা একমাত্র মুত্তাকিদের জন্য।" [সুরা নাবা: ৩১]
১১. নেক কাজের যোগ্যতা ও পবিত্র জীবন: "আর সৎলোক তারা, যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী....... এবং তারাই একমাত্র মুত্তাকি।" [সুরা বাকারা: ১৭৭]
১২. সত্যবাদীতার সনদ: "তারাই ঐ সকল লোক যারা সত্যবাদী এবং তারাই মুত্তাকি।" [সুরা বাকারা: ১৭৭]
১৩. সম্মানের উচ্চ আসন: "তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সবচেয়ে সম্মানিত হলেন মুত্তাকিরা।" [সুরা হুজুরাত: ১৩]
১৪. আল্লাহর ভালোবাসা: "নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা মুত্তাকিদেরকে ভালবাসেন।" [সুরা তাওবা: ৪]
১৫. সফলতা লাভ: "তোমরা আল্লাহ তায়ালাকে ভয় কর। অবশ্যই তোমরা সফল হবে।" [সুরা আলে ইমরান: ১৩০]
১৬. আল্লাহর নৈকট্য ও সান্নিধ্য: "কিন্তু একমাত্র তোমাদের তাকওয়াই তাঁর নিকট পৌঁছে।" [সুরা হজ্জ: ৩৭]
১৭. শ্রমের স্বীকৃতি: "নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং ধৈর্য ধারণ করে। আর নিশ্চয় আল্লাহ সৎকার্মশীলদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না।" [সুরা ইউসুফ: ৯০]
১৮. আমল কবুল: "আল্লাহ তায়ালা একমাত্র মুত্তাকিদের আমলই কবুল করেন।" [সুরা মায়িদাহ: ২৭]
১৯. অন্তরের পবিত্রতা: "আর এটাই অন্তরের পবিত্রতা।" [সুরা হজ্জ: ৩২]
২০. ইবাদতে পূর্ণতা: "তোমরা আল্লাহ তায়ালাকে পরিপূর্ণভাবে ভয় কর।" [সুরা আল ইমরান: ১০২]
২১. জান্নাত ও প্রস্রবণ: "নিশ্চয় মুত্তাকিগণ জান্নাত ও প্রস্রবণের মাঝে থাকবে।" [সুরা আয যারিয়াত: ১৫]
২২. বিপদ-আপদ হতে মুক্তি: "নিশ্চয় মুত্তাকিরা থাকবে নিরাপদ স্থানে।" [সুরা আদ দুখান: ৫১]
২৩. সকল সৃষ্টির ওপর শ্রেষ্ঠত্ব: "যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে। তারা কিয়ামতের দিন সাফল্যের শীর্ষে অবস্থান করবে।" [সুরা বাকারা: ১১২]
২৪. শাস্তি হতে নিরাপত্তা: "আর যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করেছে। তাদের কোনো ভয় নেই আর তারা দুঃখিতও হবে না।" [সুরা আরাফ: ৩৫]
২৫. অনুগত স্ত্রী লাভ: "নিশ্চয় মুত্তাকিদের জন্য রয়েছে সফলতা, ঘন বাগান, আঙ্গুর এবং অল্পবয়স্কা কুমারী নারী।" [সুরা নাবা: ৩১-৩৩]
২৬. আল্লাহর নৈকট্য ও সান্নিধ্য: "নিশ্চয় মুত্তাকিরা সর্বোচ্চ শক্তির অধিকারী বাদশাহের নিকটবর্তী নিরাপদ আসনে বাগান ও প্রস্রবণের মাঝে থাকবে।" [সুরা কমার: ৫৪-৫৫]
তাকওয়া কেমন হওয়া উচিত
তাকওয়া কেবল মুখে বলার বিষয় নয়, বরং এটি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হওয়া উচিত। কিছু উদাহরণ তাকওয়ার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে:
* রাসুল (সা.)-এর তাকওয়া: আব্দুল্লাহ বিন শাখির (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) নামাজে দাঁড়ালে তাঁর বুকের ভেতর ফুটন্ত গরম পানির পাতিলের মত গড়গড় শব্দ হতো।" [সুনানে আবু দাউদ: হা. ৮৯০] আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) গভীর রজনীতে নামাজে এত বেশি সময় ব্যয় করতেন যে, তাঁর কদম মোবারক ফুলে যেত।
* আবু হুরায়রা (রা.)-এর উপমা: আবু হুরায়রা (রা.) কাঁটা বিছানো রাস্তায় সতর্ক হয়ে চলার উপমার মাধ্যমে তাকওয়ার অর্থ ব্যাখ্যা করেছেন।
* জিবরাঈল (আ.)-এর ভয়: জিবরাঈল (আ.) জাহান্নাম সৃষ্টির পর থেকে আল্লাহর নাফরমানির ভয়ে ক্রন্দনরত ছিলেন।
* দাউদ (আ.)-এর ভীতি: দাউদ (আ.) অসুস্থ না হয়েও আল্লাহর ভয়ে এমন ভীত থাকতেন যে লোকেরা ভাবতো তিনি অসুস্থ।
* ঈসা (আ.)-এর স্মরণ: ঈসা (আ.) যখন আল্লাহ তায়ালার কথা স্মরণ করতেন, তখন তাঁর শরীর রক্তিম বর্ণ ধারণ করতো।
তাকওয়া: কিছু শিক্ষণীয় ঘটনা
তাকওয়ার বাস্তব উদাহরণ ইতিহাসের পাতায় অম্লান হয়ে আছে:
* পাপী ব্যক্তির ক্ষমা লাভ: এক ব্যক্তি সীমাহীন পাপ করার পর মৃত্যুর পূর্বে সন্তানদেরকে বলে যায় যে, তার দেহ পুড়িয়ে ছাই বাতাসে উড়িয়ে দিতে। আল্লাহর ভয়ে এমনটি করার কারণ ছিল, এবং আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিলেন। [ফতহুলবারি: ৭/৩৩২, হা. ৩৪৮১]
* আব্দুল্লাহ বিন মোবারক (রহ.)-এর সততা: ধার নেওয়া কলম ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি মক্কা থেকে শামে ফিরে গিয়েছিলেন।
* ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর সতর্কতা: ত্রুটিযুক্ত কাপড় বিক্রির সময় ত্রুটির কথা না বলায়, তিনি ৩০ হাজার দিরহাম সদকা করে দিয়েছিলেন।
* ইমাম শামসুদ্দিন যাহাবী (রহ.)-এর আমানতদারী: খনন করার সময় পাওয়া দিনার ভর্তি কলসীর মালিক না জানায়, শত দরিদ্রতা সত্ত্বেও তা স্পর্শ করেননি।
* মিসরের ছাত্রের তাকওয়া: ক্ষুধা সত্ত্বেও মালিকের অনুমতি ছাড়া খাবার গ্রহণ না করায় আল্লাহ তাকে অপ্রত্যাশিতভাবে বিবাহের মাধ্যমে প্রচুর সম্পদ দান করেছিলেন।
শেষ কথা
তাকওয়া আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর বান্দাদের জন্য এবং রাসুল (সা.)-এর পক্ষ থেকে তাঁর উম্মতের প্রতি এক মূল্যবান উপদেশ। এটি এমন এক মহৎ গুণ, যা মানুষের জীবনে এনে দেয় শান্তি, সফলতা এবং আল্লাহর নৈকট্য। রাসুল (সা.) নিজেই তাকওয়ার প্রতি এত গুরুত্বারোপ করতেন যে, তিনি সাহাবিদেরকে একাকী বা বিশেষভাবে নিদৃষ্ট কাউকে নসিহত করার সময় তাকওয়ার উপদেশ দিতেন। এমনকি তিনি দোয়াও করতেন, "হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট হিদায়াত, তাকওয়া, সুস্থতা এবং প্রাচুর্যতা কামনা করছি।" [সহিহ মুসলিম: হা. ২৭২১]
তাকওয়া মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অপরিহার্য। এটি শুধু ব্যক্তিগত পরিশুদ্ধতাই নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের সুষ্ঠু পরিচালনার জন্যও মৌলিক ভিত্তি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে প্রকৃত মুত্তাকি বান্দা হিসেবে জীবন যাপন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।