07/10/2026
দরূদে ইবরাহিম— কি শুধুই একটি দরূদ? চলুন আজকে একটু জানি...
আমরা প্রতিদিন নামাজে বসে কত সহজেই পড়ে ফেলি—“আল্লাহুম্মা সাল্লি ‘আলা মুহাম্মাদ…”। জিহ্বা উচ্চারণ করে, ঠোঁট নড়ে, আমরা পরের অংশে চলে যাই। অথচ কখনো কি থেমে ভেবেছি— আমি আসলে কী চাইছি? কার জন্য চাইছি? আর এই বাক্যগুলো আসলে আমাকে কে শিখিয়েছেন?
যাঁর নাম উচ্চারণ করলেই অন্তর নরম হয়ে আসে, যাঁর জন্য আমাদের ঈমানের ইতিহাসে এত ত্যাগ, এত ভালোবাসা, এত অশ্রু— সেই মুহাম্মাদ ﷺ-এর ওপর সালাত ও সালাম প্রেরণের পদ্ধতিটি রাসূলﷺ নিজে সাহাবিদের শিখিয়েছেন।
সাহাবায়ে কিরাম বলেছিলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকে কীভাবে সালাম দিতে হয় তা আমরা জানি; কিন্তু আপনার ওপর কীভাবে দরূদ পাঠ করব?” তখন তিনি তাঁদের দরূদে ইবরাহিম শিখিয়েছিলেন। সহিহ বুখারি ৬৩৫৭-এ এই বর্ণনাটি এসেছে।
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَىٰ مُحَمَّدٍ وَعَلَىٰ آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَعَلَىٰ آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَىٰ مُحَمَّدٍ وَعَلَىٰ آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَعَلَىٰ آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ.
এটা আমাদের বানানো কোনো বিশেষ বাক্য নয়। রাসূল ﷺ নিজেই তাঁর উম্মতকে শিখিয়েছেন— কীভাবে তাঁর ওপর দরূদ পাঠ করতে হবে। আর এখানেই দরূদে ইবরাহিমের বিশেষ মর্যাদা।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা কুরআনে ঘোষণা করেছেন—
“নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর ওপর সালাত প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর ওপর সালাত প্রেরণ করো এবং যথাযথভাবে সালাম পাঠাও।”
—সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৫৬।
একটু লক্ষ্য করুন— আদেশটা কেবল রাসূল ﷺ-এর নাম শুনলে দরূদ পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আল্লাহ নিজেই মুমিনদের তাঁর নবীর ওপর সালাত ও সালাম পাঠাতে বলেছেন। সুবহান আল্লাহ! অর্থাৎ দরূদ কোনো ছোট আমল নয় বরং এটি এমন একটি ইবাদত, যার কথা কুরআনে সরাসরি এসেছে এবং যার পদ্ধতি রাসূল ﷺ নিজে তাঁর সাহাবিদের শিখিয়েছেন।
আর সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়টা জানেন?
আপনি যখন রাসূল ﷺ-এর ওপর একবার দরূদ পাঠ করেন, আল্লাহ আপনার ওপর দশবার সালাত প্রেরণ করেন। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার সালাত পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর দশবার সালাত পাঠ করেন।” —সহিহ মুসলিম ৪০৮।
তাহলে ভাবুন—আপনি একবার বললেন, “আল্লাহুম্মা সাল্লি ‘আলা মুহাম্মাদ ﷺ”; আপনার সেই ছোট্ট আমলটি আল্লহর কাছে এত প্রিয় এত প্রিয় যে এ-র বরকতে আপকি এতকিছু পেয়ে যাচ্ছেন! আললহু আকবার! আপনি হয়তো কয়েক সেকেন্ড সময় দিলেন, কিন্তু এর প্রতিদান আল্লাহর পক্ষ থেকে দশগুণ। আমাদের মতো গুনাহে ভারী, আমলে দুর্বল মানুষের জন্য এর চেয়ে বড় সুযোগ আর কী হতে পারে?
আমরা অনেক সময় ভাবি—“আজকে তো অনেক আমল করা হলো না।” “কুরআনও বেশি পড়তে পারলাম না।” “তাহাজ্জুদও হলো না।” “সময়ও পেলাম না।” অথচ দিনের ফাঁকে ফাঁকে দরূদ পড়ার সুযোগ তো থেকেই যায়। হাঁটতে হাঁটতে, কাজ করতে করতে, অপেক্ষা করার সময়, ঘুমের আগে, রাসূল ﷺ-এর নাম শুনে—জিহ্বাকে দরূদে ভিজিয়ে রাখা যায়। এর জন্য আলাদা জায়গা লাগে না, আলাদা পোশাক লাগে না, দীর্ঘ সময়ও লাগে না।
তবে একটা কথা মনে রাখা জরুরি— দরূদকে শুধু সংখ্যা গোনার আমল বানিয়ে ফেলবেন না প্লিজ। একশ, পাঁচশো, এক হাজার— সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি অন্তরটাকেও রাসূল ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা, সম্মান ও অনুসরণের দিকে ফিরিয়ে আনুন। কারণ রাসূল ﷺ-এর ওপর দরূদ পড়া আর তাঁর সুন্নাহকে অবহেলা করা— এই দুইয়ের মধ্যে যেন আমাদের জীবনে অদ্ভুত বৈপরীত্য না তৈরি হয়। মুখে দরূদ থাকবে, অথচ তাঁর আদর্শ জীবনের বাইরে পড়ে থাকবে—এটা ভেবে ভেবে আমাদের নিজেদেরই প্রশ্ন করা দরকার।
দরূদে ইবরাহিমের দিকে একটু গভীরভাবে তাকালে আরও একটি সৌন্দর্য চোখে পড়ে। আমরা মুহাম্মাদ ﷺ-এর জন্য আল্লাহর কাছে সালাত ও বরকত চাইছি, আর তাঁকে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে তুলনা করে সেই বরকতের দোয়া করছি। এটি এমন একটি দরূদ, যার শব্দগুলো আমাদের নবী ﷺ নিজেই নির্বাচন করে দিয়েছেন। তাই এর প্রতিটি শব্দ উচ্চারণের সময় অন্তত এতটুকু অনুভব করা উচিত—আমি এখন আমার প্রিয় নবী ﷺ-এর জন্য আমার রবের কাছে দোয়া করছি।
আর ভাবুন তো—যাঁকে আমরা দেখিনি, যাঁর যুগে আমরা জন্মাইনি, যাঁর কণ্ঠ আমরা শুনিনি, তাঁর নাম শুনেই যদি আমাদের অন্তর নরম হয়ে যায়; তাহলে তাঁর ওপর দরূদ পাঠ করা কি কেবল ঠোঁটের উচ্চারণেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা?
রাসূল ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসার দাবি হলো তাঁকে জানা, তাঁর সীরাহ পড়া, তাঁর সুন্নাহ জানা, তাঁর চরিত্র সম্পর্কে জানা এবং নিজের জীবনকে তাঁর শেখানো পথের দিকে ফিরিয়ে নেওয়া। দরূদ সেই ভালোবাসাকে জাগিয়ে রাখার একটি সুন্দর আমল।
আর দরূদের আরেকটি অসাধারণ ফযীলত হলো—এটি কিয়ামতের দিন রাসূল ﷺ-এর নৈকট্য লাভের কারণ হবে আমরা আশা রাখি বি ইযনিল্লাহ। তিরমিজি ৪৮৪-এ বর্ণিত হয়েছে, রাসূল ﷺ বলেছেন, “কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে সে ব্যক্তি, যে আমার ওপর সবচেয়ে বেশি সালাত পাঠ করেছে।” [ইমাম তিরমিজি এটিকে হাসান গরীব বলেছেন।]
তাহলে আজ থেকে দরূদকে শুধু নামাজের শেষ বৈঠতের কয়েকটি বাক্য হিসেবে দেখবেন না। নামাজে যখন পড়বেন, অর্থটা মনে করার চেষ্টা করুন। রাসূল ﷺ-এর নাম যখন শুনবেন, দরূদ পড়ুন। একা থাকলে পড়ুন। মন খারাপ হলে পড়ুন। ব্যস্ততার ফাঁকে পড়ুন। ভালোবাসা থেকে পড়ুন। নিজের অক্ষমতা অনুভব করে পড়ুন। আর সবচেয়ে বড় কথা—দরূদ পড়তে পড়তে নিজের জীবনটাকেও সেই নবীর ﷺ সুন্নাহর দিকে ফিরিয়ে আনুন, যাঁর ওপর দরূদ পাঠ করছেন।
কারণ দরূদের সৌন্দর্য শুধু এতটুকু নয় যে, আমরা রাসূল ﷺ-এর ওপর সালাত পাঠাই; বরং এর মধ্যে আমাদের নিজের জন্যও কত বড় রহমতের দরজা খুলে যায়—একবার দরূদ, আর আল্লাহর পক্ষ থেকে দশবার সালাত।
তাহলে আজ থেকেই কি আমরা একটা ছোট্ট অভ্যাস শুরু করতে পারি?
দিনের ব্যস্ততার মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু সময় দরূদের জন্য রেখে দেওয়া। নামাজের পর, হাঁটার সময়, ঘুমের আগে, অথবা যখনই রাসূল ﷺ-এর কথা মনে পড়ে—জিহ্বাকে দরূদে অভ্যস্ত করে তোলা।
হয়তো আমাদের জীবনের অনেক আমল খুব ছোট। হয়তো আমাদের আমলনামায় এমন কিছু নেই, যা নিয়ে গর্ব করা যায়। কিন্তু কে জানে—কোনো একদিন, কোনো এক দরূদ, কোনো এক অশ্রুসিক্ত মুহূর্ত, কোনো এক আন্তরিক সালাত ও সালাম—আমাদের জন্য আল্লাহর রহমতের দরজা খুলে দেওয়ার কারণ হয়ে যাবে।
~ Jannatul Ferdouse Lubna
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَىٰ مُحَمَّدٍ وَعَلَىٰ آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَعَلَىٰ آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَىٰ مُحَمَّدٍ وَعَلَىٰ آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَعَلَىٰ آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ.
হে আল্লাহ, আমাদের জিহ্বাকে দরূদে সজীব রাখুন, অন্তরকে আপনার নবী ﷺ-এর সত্যিকারের ভালোবাসায় পূর্ণ করুন, তাঁর সুন্নাহকে আমাদের জীবনের পথ বানিয়ে দিন এবং কিয়ামতের দিন তাঁর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। (يا رب أمين)
---->সংগৃহীত-----< 🌷🌸🤍