12/07/2024
♦শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায় থেকে মনস্তাত্ত্বিক শিক্ষা
ডিপ্রেশন জিনিসটা আধুনিক কিছু বলেই মনে হয়। কিন্তু গীতার প্রথম অধ্যায়ের নামকরণই হয়েছে এক ডিপ্রেশনের ঘটনা নিয়ে — অর্জুন বিষাদযোগ।
আধ্যাত্মিক-দার্শনিক শিক্ষা তো যা এখানে আছে, আছে। তবে আজ আমরা অন্য দৃষ্টিকোন থেকে দেখবো।
আমরা দেখতে পাই কুরুযুদ্ধে দুইপক্ষে যখন সৈন্যগণ দণ্ডায়মান, অর্জুন তখনও প্রখর আত্মবিশ্বাসী। তিনি গাণ্ডীবধনু হাতে নিয়ে যুদ্ধের হুংকার দিয়ে শ্রীকৃষ্ণকে বলছেন, "হে অচ্যুত! রথ মাঝে নিয়ে যাও, আমিও তো দেখি এই দুর্মতি দুর্যোধনের পক্ষে যু্দ্ধ করার জন্য কে কে এসেছে।" (১/২১-২৩)
কিন্তু যুদ্ধের উৎসাহে টগবগে অর্জুন যখন আসলেই দেখলেন যুদ্ধে তার বিপক্ষে তারই পিতৃব্য-পুত্রসম আত্মীয়স্বজন দাড়িয়ে আছে, জ্ঞাতিদ্বন্ধের করালরূপ তার কাছে ফুটে উঠলো, অবসাদ তাকে গ্রাস করলো তাকে, তিনি বিষাদে ভেঙে পড়লেন। তার শরীর অবসন্ন হয়ে কাঁপতে লাগলো, ত্বক জ্বলতে লাগলো, মন চঞ্চল হলো, হাত হতে গাণ্ডীব খসে পড়লো। (১/২৮-৩০)
এবার অর্জুন মনের বিষাদ ঢাকতে জ্ঞানী জ্ঞানী কথা বলে নিজের দুর্বলতাকে জাস্টিফাই করতে বসলেন শ্রীকৃষ্ণের কাছে। বিষাদগ্রস্থ হয়ে তিনি প্রলাপ করতে শুরু করলেন। শেষমেষ অস্ত্রত্যাগ করে রথের পেছনে বসেই পড়লেন। তাতে যদি তিনি মারাও পড়েন, তাতেও আপত্তি নেই, এমন আত্নঘাতী চিন্তাও তার মনে এলো (১/৪৫-৪৬)
কিন্তু এতো প্রলাপ করার পরও শ্রীকৃষ্ণ তাকে থামালেন না বা বললেন না "ছিঃ, যুদ্ধে এসে এখন কী বলছো!" পুরো প্রথম অধ্যায় শ্রীকৃষ্ণ মন দিয়ে শুনে গেলেন অর্জুনের বিষাদমাখা প্রলাপ।
এর থেকে ব্যক্তিগত জীবনেও আমরা কতগুলো মানসিক শিক্ষা পাই,
১. ওভার-কনফিডেন্ট হওয়া ঠিক নয়। কঠিন পরিস্থিতিতে অর্জুনের মত শক্ত যোদ্ধারাও ভেঙে পড়ে।
যুদ্ধে এসে একজন ক্ষত্রিয় বীরের এরকম কাপুরুষতা কেন? অর্জুন জানতেন কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধ হলে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গেই তার যুদ্ধ করতে হবে। কিন্তু গৃহবিবাদ, ভ্রাতৃবিরোধ যে বাস্তবিকপক্ষে কি ভীষণ তা তিনি পূর্বে সম্যক উপলব্ধি করতে পারেননি। কল্পনাতীত দৃশ্য যখন অর্জুন নিজ চোখে দর্শন করলেন তখন স্বাভাবিকভাবেই তার স্নায়ুচাপ বৃদ্ধি পাচ্ছিল, শরীর কাঁপছিল আর শিহরিতও হচ্ছিল।
অনেকে মনে করে "আমি মেন্টালি খুব স্ট্রং / আমি কোনোদিন সুই সা'ইড করবো না"। কিন্তু কোন পরিস্থিতিতে পড়লে যে আমাদের কী অবস্থা হবে, তা আমরা কেউ জানিনা। তাই সতর্ক থাকা উচিৎ।
২. সবারই শ্রীকৃষ্ণের মত একজন ধৈর্যশীল শ্রোতা মেন্টর/ বন্ধু প্রয়োজন। নিজেকেও তেমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যেন প্রয়োজনে প্রিয় কারো কাছে শ্রীকৃষ্ণের মত বন্ধুর ভূমিকা পালন করা যায়। শ্রীকৃষ্ণ তাকে সব ভেঙে বুঝিয়েছেন। কিন্তু ঐ অবস্থায় কোনোকিছু জোর করে চাপিয়ে দেননি।
৩. নির্জের দুর্বলতাকে স্বীকার করে জ্ঞানী ও শুভাকাঙ্খী কারো কাছে বিনয় নিয়ে খোলা মনে উপদেশ নেওয়া প্রয়োজন। যেভাবে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের কাছে নিয়েছিলেন। (২/৭)
দুর্বল মানসিক অবস্থায় নিজেকে নিজে ঠিক করা খুব কঠিন। এমতাবস্থায় কোনো শুভাকাঙ্খীর কাছে নিজের কষ্ট তুলে ধরা দরকার। হতে পারে সেটা মা-বাবা, ভাই-বোন বা বন্ধু কেউ। যদি তেমন কেউ নাও থাকে, তবুও আজকের যুগে মেন্টাল কাউন্সেলিংয়ের সহায়তা নেওয়া যায়।
তবে সেটা যেন প্রকৃতই মন খোলা রেখে নিজেকে পরিবর্তনের উদ্দেশ্যেই উপদেশ নেওয়া হয়। শুধু নিজের সিদ্ধান্তকে জাস্টফাই করার জন্য বা খামোখা কারো সাথে কুতর্ক করার জন্য কথা বললে তত লাভ হয় না। অনেকেই অবসাদগ্রস্থ হয়ে ভিক্টিম মাইন্ডসেটে চলে যায়। তারা নিজেকে পরিবর্তন করতে চায় না। অর্জুনের মন এমন হলে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণও তাকে উদ্ধার করতে পারতেন না।
তাই নিজের মনকে বিনয়ী ও পরিবর্তনে উৎসাহী রাখতে হবে। উভয়পক্ষীয় সহায়তাই পারে একজন অবসাদগ্রস্থ মানুষকে সহায়তা করতে।
♦ নিবেদনে :- 🕉 শাস্ত্রপৃষ্ঠা 🙏
• ন হি জ্ঞানেন সদৃশং পবিত্রমিহ বিদ্যতে।
- “এই জগতে জ্ঞানের সমান পবিত্রকারী নিঃসন্দেহে কিছুই নেই।”
[শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৪/৩৮]
স্বাধ্যায়ান্মা প্রমদঃ
- স্বাধ্যায়ে/ অধ্যয়নে প্রমাদ করবে না।
[তৈত্তিরীয় উপনিষদ/ শিক্ষাবল্লী/১১/১ ]